ঢাকা, সোমবার, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, ২৪ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আজানের ধ্বনি ভেদ করে গেল পাকবাহিনীর গুলি।। মামুনুর রশীদ

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-১২-১৫ ৯:৪৩:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:৪৭ এএম
Walton AC 10% Discount

আমরা ১ মার্চ থেকেই অনুমান করছিলাম যে, একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল যে, অবশ্যম্ভাবী সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। সেটাকে রুখবার ক্ষমতা (তখনকার রাজনৈতিক আলোচনা সাপেক্ষে বলা যায়) কারোরই নেই।

 

ইতিমধ্যে আমরা একদিন কয়েক বন্ধু কেন্দ্রীয় টেলিফোন অফিসের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। একজন ইপিআরের সদস্য আমাদের দূর থেকে ডাকল। আমরা কাছে গিয়ে দেখলাম ইপিআরের সেই সদস্যের চোখে ভীতি, কণ্ঠ শুষ্ক। সে জানাল, তাদের অস্ত্র নিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই তাদের ওপর হামলা হতে পারে এবং ক্লোজ করে নেওয়া হতে পারে। সে আমাদের কাছে আবেদন জানাল সংবাদটা যাতে শেখ সাহেবের (বঙ্গবন্ধু) কাছে পৌঁছে দেই। আমরা সংবাদটি পৌঁছেও দিয়েছিলাম।

 

তখন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছিলো। বিদেশি সাংবাদিকে ঢাকা শহর ভরা। আমাদের দৃষ্টি ধানম-ির ৩২ নম্বরের বাড়িটির দিকে। বঙ্গবন্ধু এবং রাজনৈতিক নেতারা তখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। মওলানা ভাসানী ও বাম রাজনীতিকরাও একইভাবে সক্রিয় এবং নানা সভা-সমিতিতে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে ছাত্ররা এক আপসহীন সংগ্রামে রত। তারা কিছুতেই ঘরে ফিরে যাবে না। তাদের দাবি এক দফায় গিয়ে ঠেকেছে।

 

এর মধ্যে এলো ২৫ মার্চের রাত। সন্ধ্যার আগেই জানতে পারি আলোচনা ভেঙে গেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা ফিরে গেছেন। সেই সঙ্গে কুখ্যাত সেনানায়ক ইয়াহিয়াও ঢাকা ত্যাগ করেছেন। সারা শহরে সেদিন ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল। তার মানে জনগণ বুঝে গিয়েছিল এই রাতেই একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

 

আমি ওইদিন আমাদের শ্রদ্ধেয় চিত্রগ্রাহক ও পরিচালক সামাদ ভাইয়ের গ্রিন রোডের বাসায় আটকে গিয়েছিলাম। তখন আমি ‘সূর্যগ্রহণ’ ছবির স্ক্রিপ্ট করছিলাম। কথায় কথায় রাত হয়ে গেল। এ রকম রাত প্রায়ই হতো। স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ তেমন একটা হচ্ছে না। ব্যস্ত থাকছি রাজনৈতিক আলোচনায় এবং উৎকণ্ঠায়। সে রাতে কেমন যেন বাতাসেই সংবাদ রটে যায় কিছু একটা হবে। নির্ঘুম সেই রাতে প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি আকাশে সহস্র বিদ্যুৎ চমকের মতো আগ্নেয়াস্ত্র গর্জে ওঠে। সেই সঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা ট্যাঙ্কের বহর আর সাঁজোয়া গাড়ির শব্দ। মর্টারের শব্দে, বারুদের গন্ধে ট্যাঙ্কের কর্কশ শব্দে মানুষ ভীত হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গেই কারফিউ জারি হয়ে যায়। একটা যান্ত্রিক ভয়াবহ কণ্ঠস্বর শোনা যায়। কারফিউ জারি হো গি, কই বাহার আওছে গোলি মার দুঙ্গা। এরপর আমরা অনুমান করতে পারি রাজারবাগ পুলিশলাইন আক্রান্ত হয়েছে। ইপিআর-এর সদর দফতর পিলখানায় শুরু হয়েছে গোলাগুলি। আরো অনুমান করতে পারি, ইকবাল হল ও জগন্নাথ হল আক্রান্ত হয়েছে। বস্তিগুলোতে আগুন জ্বলছে, মানুষের আর্তনাদ-কান্না ও আহাজারিতে ভারি হয়ে গেছে আকাশ-বাতাস। কী অবস্থা এর পূর্ণাঙ্গ বর্ণনাও দুরূহ। তবে এটুকু আমরা বুঝেছিলাম ভয়ঙ্কর সব ঘটনা ঘটছে। কিন্তু তার পরই মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধতা। শুধু কামান এবং গুলির শব্দ।

 

পাকিস্তানি শাসকরা সব সময় বলত ‘ইসলাম খাতারমে হ্যায়’ (ইসলাম বিপন্ন) এবং এর জন্য দায়ী বাংলাদেশের মানুষ। অথচ শেষ রাতে যখন আজান ধ্বনিত হচ্ছে সেই আজানের ধ্বনিকে ভেদ করে চলে গেল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলি। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা করল না আজানের ধ্বনিকেও। ওই সময়ে পাকিস্তানিদের প্রথম গুলি ছোড়ার মুহূর্তেই আমি সিদ্ধান্ত নেই আমি প্রতিশোধ নেব, আর বসে থাকা নয় এবং প্রতিশোধের পথ খোঁজা শুরু করলাম। ২৭ মার্চ কারফিউ উঠে যাওয়ার পর জিঞ্জিরায় আশ্রয় নেয়ার পরদিন। সেটা ২৮ বা ২৯ মার্চ। রেডিওতে ভাঙা ভাঙা শব্দে মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। কিন্তু কোথায় যুদ্ধ? শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ খুঁজে পেলাম টাঙ্গাইলে আমার মামাবাড়িতে এবং পরে আমার পিত্রালয়ে।

 

সাক্ষাৎ হলো কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে। তরুণ কাদের সিদ্দিকী তখন অবরুদ্ধ সেই টাঙ্গাইলে খুঁজছে অস্ত্র এবং সাহসী মানুষ। আমার পিত্রালয় থেকে সামান্য দূরে কালিহাতীর পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া কিছু অস্ত্র ও গুলি তাদের ঘরে রেখে দিয়েছিল। তারা সেগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হস্তান্তর করতে চাচ্ছিল। সেগুলোর মধ্যে একটা এলএমজিও ছিল। সেই এলএমজি ও আরো কিছু অস্ত্র কাদের সিদ্দিকীর কাছে সমর্পণ করা হলো। শুরু হয় গেল যুদ্ধ। কিন্তু আমার বেশিদিন থাকা হলো না। ডাক এসে গেল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। এক অনিশ্চিত যাত্রাপথে রওনা দিলাম আগরতলার পথে।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ ডিসেম্বর ২০১৫/শাহনেওয়াজ/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge