ঢাকা, শনিবার, ১৬ বৈশাখ ১৪২৪, ২৯ এপ্রিল ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

‘আন্তরিকতা নিয়ে পড়ালে সফলতা আসবেই’

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-০৮-১৯ ২:৪১:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৮-১৯ ৪:২৭:৩০ পিএম

বরাবরের মতো এবারো এইচএসসিতে শতভাগ পাসের হার নিয়ে রেকর্ড করেছে নরসিংদীর আব্দুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। ঢাকা বোর্ডে সবাইকে চমকে দিয়ে কলেজটি তার ধারাবাহিকতার সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে।

 

এইচএসসি পরীক্ষায় এবার এ কলেজ থেকে ৪৯৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে সবাই পাস করেছে। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৯৮ জন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নেওয়া ২০৪ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০২ জন, ব্যবসায় শিক্ষা থেকে ১৮৭ জনের মধ্যে ৫০ জন ও মানবিক বিভাগের ১০৩ জনের মধ্যে ৪৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

 

নরসিংদীতে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের অঙ্গীকার নিয়ে বিশিষ্ট শিল্পপতি থার্মেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাদির মোল্লা ২০০৬ সালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে প্রতিষ্ঠা করেন আব্দুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ। বর্তমানে ৫৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার সার্বিক তত্ত্বাবধানে কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে কলেজটি পরিচালিত হচ্ছে।

 

কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর ২০০৯ সালে ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম, ২০১০ সালে নরসিংদী  জেলার সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২০১১ সালে ঢাকা বোর্ডে সপ্তম, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক ভাবে ঢাকা বোর্ড তথা সমগ্র বাংলাদেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। ২০১৫ সালে শতভাগ পাস এবং এবারও শত ভাগ পাস করে গৌরব অর্জন করে মফস্বল শহরের এই কলেজটি।

 

বর্তমানে কলেজটিতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির তিনটি বিভাগ মিলে প্রায় ৯শ’ শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান বিভাগে তিনটি, ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় তিনটি আর মানবিক শাখায় দুটি সেকশন চালু আছে।

 

কলেজের ছেলে ও মেয়েদের জন্য রয়েছে পৃথক দুটি হোস্টেল, যেখানে আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬০০। হোস্টেলের সার্বিক বিষয় দেখভালের দায়িত্বে থাকে শিক্ষকদের একটি দল। তারা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর লেখাপড়া, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে বিষয়ভিত্তিক সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। আর এসব অনাবাসিক শিক্ষার্থীকে কলেজে আনা-নেওয়া করা হয় নিজস্ব বাসে।

 

এবারের ফলাফলে আনন্দিত কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।  আর সে আনন্দ উৎসবের মধ্যেই রাইজিংবিডির নরসিংদী প্রতিনিধি গাজী হানিফ মাহমুদের সঙ্গে  একান্তে কথা হয় যার মেধা,নিরলস প্রচেষ্টায় কলেজটি সমগ্র বাংলাদেশে আলোকিত হয়েছে, সেই ব্যক্তি কলেজটির অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধার।

 

ড. মশিউর রহমান মৃধার জন্ম ১৯৬৭ সালে ৫ আগস্ট নরসিংদী সদর উপজেলার সাহেপ্রতাব গ্রামে। বাবা মোখলেসুর রহমান মৃধা ছিলেন নরসিংদী সরকারি কলেজের প্রধান অফিস সহকারী। মা জাহানারা বেগম গৃহিণী। তার আট ভাই-বোন। তিনি ভাইদের মধ্যে সবার বড়। স্থানীয় সাহেপ্রতাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর বাগহাটা নূর আফতাব আদর্শ বিদ্যাপীঠ থেকে মাধ্যমিক ও নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং ১৯৯৩ সালে জেলার পলাশ উপজেলার চরসিন্ধুর শহীদ স্মৃতি কলেজে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ওই খান থেকে ২০০৬ সালে আব্দুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ২০০৯ সালে সমকালীন বাংলা সাহিত্য ও একটি প্রয়োগিক বিশ্লেষণ অভিসন্দর্ভে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুল, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন নিজেকে। আর সেই সাংগঠনিক ক্ষমতা তাকে একজন দক্ষ অধ্যক্ষ হতে সহযোগিতা করেছে। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। অবসরে কবিতা লেখেন। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হলো বিপন্ন যৌবন, স্বপ্নের খসড়া, আনন্দ নন্দিত শুভ সম্ভাষণ, হৃদয়ের চিলেরকোঠায়, বেদনার সাবলীল প্রকাশ, গহীন রাতের উড়ো চিঠি এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ জীবন ও স্বপ্ন সমান্তরাল। এ ছাড়া তার লেখা কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে সিডি ফাগুনে আগুনে বাসন্তী জীবন।

 

 

তিনি জানান তার ধ্যান-জ্ঞান, স্বপ্ন, সাধনা ও সাফল্যের কথা।

 

রাইজিংবিডি : কেমন আছেন ?

. মশিউর রহমান মৃধা : আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।

 

রাইজিংবিডি : কিভাবে কলেজটি যাত্রা শরু করে ?

ড. মশিউর রহমান মৃধা : কলেজের যাত্রা শুরুর পথটা এতটা সহজ ছিল না। ২০০৬ সালে ভাড়াবাড়িতেই যাত্রা শুরু করে কলেজটি। তাই প্রথম বছর শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের। কলেজ পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করেন। নানা শর্ত মেনে ভর্তিযুদ্ধ শেষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮ জন।

 

এরপর নবীন ও তরুণ শিক্ষকদের নিয়ে অনেকটা প্রতিজ্ঞা করেই মাঠে নামি। দিন-রাত কলেজ ও বাড়িতে সমানতালে পাঠদান চালাতে থাকি। দু-একজন ছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাই। শিক্ষকদেরও মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হই। প্রায় সব শিক্ষকই সংসার ত্যাগ করে পাঠদানে নিজেদের উৎসর্গ করে দিলেন। তার সুফল পাই ২০০৭ সালে। ওই বছর আর শিক্ষার্থী সংকট হয়নি। এই সবে নিরন্তর অনুপ্রেরণা ছিল প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল কাদির মোল্লা মহোদয়ের।

 

রাইজিংবিডি : অল্প সময়ের মধ্যে কলেজের টানা এ সাফল্যের মূল কারণ কি ?

ড. মশিউর রহমান মৃধা : বৈচিত্র্যময় পাঠদান-কৌশল ও পরিচালনা পদ্ধতির প্রয়াগেই এসেছে এ সফলতা। আমাদের এ সাফল্যের পেছনে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। আমাদের রয়েছে একঝাক তরুণ দক্ষ শিক্ষক। প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে গাইড শিক্ষক। শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা, নিয়মিত ক্লাস, বিশেষ ক্লাস, হোম ভিজিট, টিউটোরিয়াল ও মাসিক পরীক্ষা। এ ছাড়া কলেজের শিক্ষকরা নিয়মিত বাসায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নেন।

 

তাছাড়া আমি মনে করি একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি সকাল সন্ধ্যা ও মধ্যরাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে তবে সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য আসবেই। দেশের সব কলেজের শিক্ষকেরা যদি সৎ ইচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করেন, তাহলে সাফল্য অর্জন করা মোটেও কঠিন কিছু না।

 

রাইজিংবিডি : কলেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনারা কি কি পদ্ধতি অনুসরণ করেন ?

ড. মশিউর রহমান মৃধা : কলেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা দুটি বিষয়কে প্রধান্য দেয়। একটি হলো শৃঙ্খলা, অন্যটি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বপ্নের এই বীজ বুনে দিতে হবে যে, জীবন হচ্ছে স্বপ্নের সমান,স্বপ্ন হচ্ছে জীবনের সমান। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে স্বপ্নবান করে তোলাই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব। আমাদের কলেজের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় তিন দিনের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসের মধ্য দিয়ে। এতে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিরা। শিডিউলের চেয়ে নেওয়া হয় বেশিসংখ্যক ক্লাস। প্রতিটি অধ্যায়ের পাঠদান শেষে নেওয়া হয় ক্লাস টেস্ট। তারপরও যাদের অপূর্ণতা রয়ে যায় তাদের জন্য আছে রিকভারি ক্লাস এবং হোমভিজিট।

 

 

রাইজিংবিডি : আপনার মতে একজন ভালো শিক্ষকের কি কি গুণাবলি থাকা প্রয়োজন ?

ড. মশিউর রহমান মৃধা : আমার মতে শিক্ষকদের কেবল শিক্ষকতা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে। তাঁর ধ্যান-জ্ঞানজুড়ে থাকবে শিক্ষার্থী আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর চেয়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করবেন এবং জীবনধারাকে বেশি করে দেখবেন। আমি মনে করি একজন শিল্পীর মতো শিক্ষকও একজন তারকা, যদি তিনি তার ক্লাসটিকে মাতিয়ে তুলতে পারেন।

 

রাইজিংবিডি : দক্ষতা ও মেধা দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটির সুনাম অর্জন করেছেন, এ ব্যাপারে আপনার দুএকটি কথা

ড. মশিউর রহমান মৃধা : কলেজের এ সাফল্যে আমি প্রথমে মহান আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আজ আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। এ সাফল্য সামনে এগিয়ে চলতে আরও অনুপ্রাণিত করবে। আমরা বার বার প্রমাণ করতে পেরেছি, মফস্বলের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানেরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকলেও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তাদের পক্ষে ভালো ফল করা সম্ভব।

 

এ ছাড়া টানা নয় বছর ধরে আমাদের এ কলেজটি শতভাগ পাসের সাফল্য পেয়েছে। এটা শুধু আমাদের আনন্দ নয় এ আনন্দ সারা নরসিংদীবাসীর। দিনের পর দিন নিয়মতান্ত্রিকভাবে কঠোর অনুশীলনের কারণেই ছেলে মেয়েরা এই সাফল্য পেয়েছে। আমাদের ভাল ফলাফলের মূল চাবিকাঠি হলো শৃঙ্খলা ও নিবিড় পরিচর্যা এবং এই কলেজের একঝাঁক তরুণ মেধাবী শিক্ষকের নিরন্তর পরিশ্রম। আমাদের এ কলেজে প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন দিকনির্দেশক শিক্ষক শুধু লেখাপড়া নয়, তাদের খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, বিনোদন থেকে শুরু করে সব ধরনের চাহিদা পূরণে নিরন্তর শ্রম দিচ্ছেন।  সর্বোপরি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বাড়তি নজর থাকায় এবং ছাত্র-শিক্ষকদের চমৎকার সম্পর্কের কারণে আমাদের ধারাবাহিক এ সাফল্য এসেছে।

 

রাইজিংবিডি : সরকার যে সৃজনশীল প্রদ্ধতি চালু করেছে এ সর্ম্পকে কিছু বলুন ?

ড. মশিউর রহমান মৃধা : সরকার যে সৃজনশীল প্রদ্ধতি চালু করেছে তার জন্য শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে নিলে শিক্ষার্থীরা আরো ভালো ফলাফল করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। সৃজনশীলতায় গড়ে উঠবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

 

রাইজিংবিডি : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. মশিউর রহমান মৃধা : আপনাকেও ধন্যবাদ। ধন্যবাদ রাইজিংবিডি পরিবারকে।

 

 

রাইজিংবিডি/নরসিংদী/১৯ আগস্ট ২০১৬/ গাজী হানিফ মাহমুদ/রুহুল

Walton Laptop