ঢাকা, সোমবার, ৩ পৌষ ১৪২৫, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

আমি লিপিকার মাত্র, সময়কে লিখে যাই : স্বকৃত নোমান

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৩-১৬ ৬:১২:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৫-০৬-১৫ ১০:৩৮:৩৮ এএম

স্বকৃত নোমান উদীয়মান ঔপন্যাসিক। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে ইতিমধ্যে তিনি দৃষ্টিগ্রাহ্য মাত্রা সংযোজন করেছেন। জ্ঞান অন্বেষণ ও শিল্পসৃষ্টিকে জীবনের অন্যতম কাজ বলে মনে করেন তরুণ এই লেখক। তার উপন্যাসে একাঙ্গ হয়ে থাকে গ্রামবাংলার বিচিত্র মানুষ, প্রকৃতির বিপুল বৈভব, ইতিহাস, সমকাল, পুরাণ, বাস্তবতা ও কল্পনা। ‘রাজনটী’ উপন্যাসের জন্য ২০১২ সালে এইচএসবিসি-কালি ও কলম কথাসাহিত্য পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। লেখালেখির নানা বিষয় নিয়ে এই সাক্ষাৎকারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক কথা বলেছেন।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অলাত এহসান।

অলাত এহসান : গল্পকার হিসেবে আপনার প্রস্তুতি ও চর্চা অনেক দিনের। এর শুরুটা কীভাবে হলো?

স্বকৃত নোমান : প্রস্তুতি অনেক দিনের বটে। কিন্তু আমার শুরুটা উপন্যাস দিয়ে। উপন্যাসও এক অর্থে গল্প। গল্প লেখা শুরু করেছি প্রায় চৌদ্দ বছর আগে। যদিও ২০০৬ থেকে ২০১০  পর্যন্ত আমি কোনো গল্প লিখিনি। ২০১১ সালে এসে ‘রাজনটী’ উপন্যাসটি প্রকাশের পর, পুরনো গল্পগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। বুঝতে পারি ওগুলো আসলে কিছু হয়নি। গল্প লেখা আবার শুরু করব ভাবিনি। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতার সম্পাদক এবং ঈদ সংখ্যাগুলোর জন্য অনেকে গল্প চান। কেউ কেউ সংকলনের জন্যও গল্প চান। ভাবলাম আবার শুরু করি।  এই আরকি। ২০১৪-এর একুশে গ্রন্থমেলায় বেশ কটি গল্প নিয়ে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নিশিরঙ্গিনী’ প্রকাশিত হলো।


এহসান : ‘নিশিরঙ্গিনী’র গল্পগুলোতে আপনি কী বলতে চেয়েছেন? মানে কোনো বিশেষ বিষয় উপস্থান করতে চেয়েছেন কি না?

স্বকৃত নোমান : প্রত্যেক গল্পেরই তো কোনো-না-কোনো বার্তা থাকে। আমার গল্পগুলোতেও তাই আছে। ‘ফণা’ গল্পটির কথাই ধরুন। একটা পুরনো রাজবাড়ির বাগান পাহারা দেয় একটা ছেলে। ওই বাড়িতে খুব সাপের উৎপাত। ছেলেটি সব সময় হাতে একটা লাঠি রাখে, সামনে সাপ পড়লে যাতে মারতে পারে। একদিন বিকেলে বাগানে একটা গাছের তলায় সে ঘুমাচ্ছে। তার হাতের কাছেই লাঠিটা। হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল। দেখতে পেল একটা সাপ তার পায়ের কাছে ফণা ধরে আছে। সাপটা ইচ্ছে করলেই তাকে দংশন করতে পারে, আবার ছেলেটা ইচ্ছে করলেই হাতের লাঠি দিয়ে সাপের মুণ্ডুটা গুড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু ফণার সৌন্দর্যে ছেলেটা বিমোহিত হয়। সে সাপটাকে মারতে পারে না। সে হাত দুটো জোড় করে, অনেকটা প্রণামের ভঙ্গিতে, শোয়া থেকে উঠে বসে। দূর গ্রামে মাঙ্গলিক সাইরেন বাজে। সাপটা ফণা নামিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে যায়। এখানে মাঙ্গলিক সাইরেন একটা প্রতীক। অর্থাৎ মানুষ যেমন প্রকৃতির অংশ, সাপও তাই। মানুষ এবং মানবেতর প্রাণী যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে পরস্পরকে ছাড় দিল, ক্ষমা করল, তখনই মাঙ্গলিক সাইরেনটা বেজে উঠল। কিংবা ধরুন ‘ক্যান্সার’ গল্পটির কথা। এই গল্পে ভিক্ষাবৃত্তি যে সমাজের একটা মারাত্মক রোগ, বিষয়টিকে আমি ক্যান্সার হিসেবে দেখাতে চেয়েছি।


এহসান : আপনি দীর্ঘদিন লেখার প্রস্তুতি নিয়েছেন, লিখেছেন অনেক পরে। প্রস্তুতিটা কীভাবে হলো?

স্বকৃত নোমান : ১৯৯৬ সাল থেকে মূলত আমি সাহিত্য পাঠ শুরু করি, যখন আমার বয়স মাত্র ১৬। আমাদের উপজেলায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের শাখা আছে। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বইগুলো সেখানে পাওয়া যেত। ফলে পড়ার সুযোগ পেয়েছি। বিশ্ব সাহিত্যের মূল পাঠ শুরু হয় সেলিম আল দীন স্যারের সান্নিধ্যে আসার পর। তিনি আমাকে বিরাট একটা সিলেবাস ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ-এর অনুবাদে ‘মহাভারত’ পড়তে হয়েছিল স্যারের চাপে পড়ে। এভাবে অনেক বই আমি পড়তে বাধ্য হয়েছি। একেকটা বিরাট বিরাট বই পড়ে শেষ করতাম আর তিনি আমার বেতন বাড়াতেন। স্যারের তত্ত্বাবধানে বিশ্ব সাহিত্যের পাঠ নেয়ার পর একটা সময় মনে হলো, আমি এখন সিরিয়াসলি লেখালেখি শুরু করার জন্য প্রস্তুত। তখন লিখতে শুরু করি। তবে আমি মনে করি, আমি আসলে এখনো প্রস্তুতির মধ্যেই আছি।


এহসান : লেখার ক্ষেত্রে আপনি কোনটি বেশি গুরুত্ব দেন- বিষয় নাকি ফর্ম?

স্বকৃত নোমান : না, লেখার ক্ষেত্রে আমার নির্দিষ্ট কোনো বিষয়বস্তু নেই। নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের প্রতি আমার দুর্বলতাও নেই। ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে যেমন আমি ‘হীরকডানা’ লিখেছি, তেমনি সমকালীন বিষয়ে নিয়ে ‘কালকেউটের সুখ’ লিখেছি। যখন যে বিষয়ে লিখতে মন চায় সে বিষয়েই লিখি। ফর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা। বিষয় এবং আঙ্গিক দু’টোই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তথাকথিত নীরিক্ষার নামে আঙ্গিককে গুরুত্ব দিয়ে আমি বিষয়বস্তু হারিয়ে ফেলি না। এ বিষয়ে আমি খুব সতর্ক থাকি।


এহসান : গল্প লেখার জন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একটি ঘটনা বা অভিজ্ঞতা কী করে আপনি গল্পে রূপান্তর করেন?

স্বকৃত নোমান : লেখার জন্য অভিজ্ঞতা জরুরি। তবে লেখার জন্য অভিজ্ঞতাকে অভিজ্ঞানে রূপ দিতে হয়। শুধু অভিজ্ঞতার বর্ণনা করলে গল্প হবে না, প্রতিবেদন বা ভ্রমণ কাহিনি বা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমি সাধারণত আমার অভিজ্ঞতাগুলোকে স্মৃতিতে পাঠিয়ে দিই। যতদিন পর্যন্ত না স্মৃতিগুলো গেজানো মদের মতো না হয়, ততদিন আমি ঐ অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু লিখি না। আমার অনেক গল্পেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এসেছে। যেমন ‘নাগরিক’ গল্পটির কথাই ধরুন। ঢাকা শহরে আমার দৈনন্দিন যে অভিজ্ঞতা, তারই গল্পরূপ এটি। ‘ক্যান্সার’ গল্পটি লেখার আগে আমি এমন একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। গাজীপুরের হোতাপাড়া থেকে একদিন বাসে আসার সময় দেখি, একটা লোক তার ছেলেকে কোলে নিয়ে ভিক্ষা করছে। এই দৃশ্যটি দেখার অভিজ্ঞতা যদি আমার না হতো তাহলে হয়ত গল্পটির আইডিয়া আমার মাথাতেই আসত না।


এহসান : গল্প উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আপনি কি মেটাফোর বা নিজস্ব শব্দ তৈরি করেন?

স্বকৃত নোমান : প্রত্যেক সৃজনশীল লেখককেই মেটাফোর বলুন, নিজস্ব শব্দ বলুন তৈরি করতে হয়। এটা তো সৃজনশীলতারই অংশ। আমাকেও তাই করতে হয়। ঐ যে ‘নিশিরঙ্গিনী’ শব্দটি- এটা তো আমারই তৈরি। এ রকম আরো অনেক শব্দ আমি তৈরি করেছি। যেমন ধরুন কম্পিউটারের ওয়ার্ড ফাইল। আমি এর নাম করেছি ‘শব্দনথি’।


এহসান : প্রায় সব গল্পেই তো কোনো না কোনো অনুসন্ধান থাকে। যেমন আত্ম, নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক ইত্যাদি। আপনি কোন ধরনের অনুসন্ধানে গল্প তৈরি করেন?

স্বকৃত নোমান : আমার গল্প, উপন্যাসে প্রায় সব ধরনের অনুসন্ধানই থাকে। আমার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘কালকেউটের সুখ’-এর কথাই ধরুন। স্বধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুসন্ধান আমি করতে চেয়েছি এ উপন্যাসে। হিন্দুরা নীরবে দেশ ছাড়ছে, মুসলমানরা তাদের নানাভাবে নির্যাতন করছে, প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধাপরাধী চক্রের উত্থান ঘটছে এইসব বিষয়। ফলে উপন্যাসটি সমকালীন সেন্টিমেন্ট-এ আঘাত করেছে। এ কারণে একটা গোষ্ঠী আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে বা দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমাকে থানায় জিডি পর্যন্ত করতে হয়েছে। ‘হীরকডানা’ উপন্যাসে আমি দেখাতে চেয়েছি ইতিহাস কীভাবে মিথে রূপান্তরিত হয়।  শমসের গাজী নামে এক রাজা ছিলেন। এটা বাস্তব ইতিহাস। তার জীবনের বাস্তব সত্যগুলো কীভাবে মিথে রূপান্তরিত হয়, উপন্যাসে আমি তা বলতে চেয়েছি। এ আমার অনুসন্ধান। ‘কালকেউটের সুখ’ উপন্যাসে আমার সাংস্কৃতিক অনুসন্ধানও আছে। উপন্যাসটির একটা চরিত্র দীপিকা। সে হিন্দু থেকে মুসলমান হয়। অনেক দিন পর বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসে। পাশের বাড়িতে মাগরিবের নামাজ পড়তে দাঁড়ায়। তখন ঐ বাড়ির সামনে দিয়ে লোকজন একটা কালীমূর্তি নিয়ে যায়। দীপিকা জানালার ফাঁক দিয়ে কালী মূর্তিটির লকলকে জিব দেখে নামাজের মধ্যে ভুল করে মা কালীর একটা মন্ত্র পড়ে ফেলে। এটা কিন্তু এক ধরনের সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান। উপন্যাসটির এই দৃশ্য নিয়ে ‘ধার্মিকদের’ আপত্তি। এতে নাকি তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লেগেছে! আমি এটা স্পষ্টভাবে বলছি যে, এটা ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। এটা সংস্কৃতির অনুসন্ধান। মেয়েটা হিন্দু, হাজার বছরের হিন্দু সংস্কৃতি তার মধ্যে আছে সুপ্তভাবে। সে তার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে মুসলিম সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে, কিন্তু পুরোপুরিভাবে পুরনো সংস্কৃতিকে অর্থাৎ পূর্বপুরুষের সংস্কৃতিকে ছাড়তে পারেনি। পারেনি বলেই সে নতুন সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়ে ভুল করেছে।  এটা তার ভুল, আমার নয়।


ধরা যাক, আপনি নাস্তিক। কিন্তু আপনি ঠিকই আপনার বাবা বা কোনো মুসলমান শিক্ষককে দেখলে সালাম দেবেন। এই সালাম দেয়াটা কিন্তু আপানার বিশ্বাস থেকে নয়, এটা আপনার সংস্কৃতিজাত। ‘কালকেউটের সুখ’ উপন্যাসেও আমি সংস্কৃতির এই অনুসন্ধানটা করতে চেয়েছি। এটাকে ধর্মানুভূতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না। শুধু ধর্মানুভূতি কেন, আমি জ্ঞানত কারো অনুভূতিতেই আঘাত দেয়ার পক্ষপাতী নই। কেউ যদি একটা অনুভূতি নিয়ে শান্তিতে থাকতে চায় থাকুক না। তাতে আমার অসুবিধা থাকবে কেন? আমি পৃথিবীতে অনুভূতি পরিবর্তন করার জন্য বিপ্লব করতে আসিনি। আমাকে কেউ এই দায়িত্ব দেয়নি। সমাজের যেসব বিষয়গুলো প্রচলিত সেগুলোই আমার উপন্যাসের বিষয়। সেগুলোতে যদি ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার মতো উপাদান থাকে, সেটা তো আমার দোষ নয়, দোষ ঐ উপাদানগুলোর। আমি তো একজন লিপিকার মাত্র, আমি সময়কে লিখে যাই।


এহসান : গল্পের বিষয়বস্তু আপনি কীভাবে নির্ধারণ করেন? বিষয়বস্তু নির্বাচনের সঙ্গে তো দর্শনের একটা যোগাযোগ আছে।

স্বকৃত নোমান : আগে দেখি বিষয়টা গল্প হওয়ার মতো কিনা। একটা লাইনও অনেক সময় গল্প, উপন্যাসের বিষয় হয়ে যায়। আমার ‘রাজনটী’ উপন্যাসটির গল্প শুধু এক লাইনের- ‘যে মসজিদে কেউ নামাজ পড়েনি’। এই একটিমাত্র লাইন থেকেই আমি একটা উপন্যাসের বিষয় খুঁজে পাই। গল্পের সঙ্গে দর্শনের তো যোগ আছেই। থাকতে হয়। না থাকলে চলে না। সাহিত্যে ফিলসফি থাকতে হয়। আমিও আমার গল্প-উপন্যাসে দর্শনের প্রতিফলন দেখিয়েছি, দেখাতে চেয়েছি। ঐ যে ‘ফণা’ গল্পটির কথা বললাম, ছেলেটি ও সাপটি পরস্পরের ক্ষতি করে না। সেটাও তো দর্শন। অর্থাৎ তুমি মানুষ, তুমি তোমার মতো থাক, সাপকে সাপের মতো থাকতে দাও। তুমি যদি সাপের কোনো ক্ষতি না কর, সাপও তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। এটা পারস্পরিক সহাবস্থানের দর্শন। এটা প্রকৃতির দর্শন।


এহসান : আপনার গল্পগুলোকে বিশেষ ধারা বা ঘরানার, যেমন মার্কসবাদী, জীবনবাদী, নারীবাদী, ফ্রয়েডীয়, অস্তিত্ববাদী ইত্যাদি বলে মনে করেন?

স্বকৃত নোমান : আমি আসলে এসব ঘরানা নিয়ে ভাবি না। আমি কোনো ‘বাদ’-এ থিতু নই। কিন্তু সব ‘বাদ’ সম্পর্কেই জ্ঞান রাখার চেষ্টা করি। লেখক হিসেবে যদি আমি নিজে একটা ‘বাদ’ গড়ে তুলতে না পারি সেটা আমার ব্যর্থতা। আমি কেন মার্কসীয় সাহিত্যরীতিতে লিখব? মার্কসীয় সাহিত্যরীতি আমার জানা থাকবে, কিন্তু আমাকে ওই রীতিতে কেন লিখতে হবে? আমি আমার মতো করেই লিখব। এই ঘরানাটা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তবে ভবিষ্যতে পাঠক বলবে ‘নোমানবাদী’ বা ‘নোমানী ঘরানা’। হা হা হা।


এহসান : বাংলা সাহিত্যে উত্তরাধিকারের ধারা বহন করেছেন অনেক লেখক। আপনি নিজেকে কীভাবে দেখছেন?

স্বকৃত নোমান : আমি আসলে কার উত্তরাধিকারী এ বিষয়ে ক্লিয়ার নই। আমার ‘বেগানা’ উপন্যাসটি পড়ে বাংলাদেশের একজন বড় কবি একদিন বললেন, তোমার লেখায় মার্কেজের প্রভাব দেখতে পাই। অথচ উপন্যাসটি লেখার সময় মার্কেজের কোনো লেখাকেই আমি আদর্শ হিসেবে সামনে রাখিনি। ‘হীরকডানা’ পড়ে একজন বললেন, আপনি ঠিক সত্যেন সেনের উত্তরাধিকারী। আমি হাসলাম। একেক পাঠক একেক মন্তব্য করেন। আমি প্রত্যেকের মত শ্রদ্ধা করি। তবে আপনার প্রশ্নের উত্তরটা যদি এভাবে দেই যে, আমি সেসব সাহিত্যিকের উত্তরাধিকারী, যাঁরা বিশ্বভূগোলের প্রকৃত পৃষ্ঠাগুলো লিখেছেন, যারা তাদের সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতর-বাহিরটাকে দেখাতে চেয়েছেন। আপনি যদি তাদের নাম করতে বলেন তাহলে বলব- রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মার্কেস, ভিক্টর হুগো, মিলান কুণ্ডেরা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, লিও তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, মিখাইল শলোখভ, দেবেশ রায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কথা। এমন অনেকে আছেন। নাম বলে হয়ত শেষ করতে পারব না।


এহসান : সাহিত্যের দশক বিচার প্রচলিত আছে। আপনি আপনার দশককে কীভাবে  উপস্থাপন বা চিহ্নিত করছেন?

স্বকৃত নোমান : দশকের হিসাবটাকে আমি খুব একটা আমলে নেই না। আচ্ছা, হাসান আজিজুল হকের কথাই ধরুন। তিনি ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছেন। তাই বলে কি তিনি ষাট দশকের লেখক? তাই যদি হয় তার ‘আগুনপাখি’ বা ‘সাবিত্রি উপাখ্যান’ এই শতকে বের হলো কেন? আসলে প্রকৃত লেখককে কখনো দশক দিয়ে বিচার করা যায় না। লেখালেখিটাকে যারা বিখ্যাত হওয়ার বা ধান্দাবাজির মাধ্যম হিসেবে নেয় তারা এসব নিয়ে পড়ে থাকেন। আমি কোনো দশকের লেখক নই। যত দশক বেঁচে থাকব তত দশকই লিখব। আমি সব দশকের লেখক।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ মার্চ ২০১৫/তাপস রায়

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC