ঢাকা, শুক্রবার, ৮ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

এই বেশ ভালো আছি অ্যালেস সিভেনে || রবিশঙ্কর মৈত্রী

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৭-১১ ১১:৪৫:৫১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:০৫ এএম
Walton AC 10% Discount

প্যারিস গার্দু লিও থেকে ট্রেন ছেড়ে যাবে সকাল দশটা ছয় মিনিটে। অতএব রোমাভিল থেকে সকাল সাড়ে আটটায় বেরিয়ে গেলাম। মেরি দু লিলা মেট্রো এগারোর প্রথম স্টেশন। লিলা থেকে এগারোর শেষ স্টেশন সাতলে পৌঁছে গেলাম ন’টার মধ্যে। সাতলে আর লেহাল মিলে মাটির নিচে বিশাল বড়ো এক জগৎ হয়। সাতলে থেকে মাটির অনেক গভীর সুড়ঙ্গ পথ ধরে হেঁটে সাতলেহাল পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে আবার আরইআর ডি ট্রেন ধরে যেতে হবে গার্দু লিও।
একটু মন খারাপ। প্রায় একটানা পাঁচ মাস প্যারিসে থাকার পর আজ আমরা চলে যাচ্ছি ফ্রান্সের দক্ষিণের একটি শহরে। প্যারিস থেকে প্রায় নয়শ কি.মি. দূরে। আরইআর ডি ট্রেনে দ্রুত উঠে পড়লাম। সাতলেহালের পরেই স্টেশনই গার্দু লিও। মাত্র চার-পাঁচ মিনিটের পথ।

গার্দু লিও স্টেশনও এক বিশাল রহস্য। প্যারিসের এই গার্দু লিও’র উপরের স্টেশনগুলো থেকে পুব আর দক্ষিণের সব শহরের উদ্দেশে অসংখ্য ট্রেন ছেড়ে যায়। গার্দু লিওতেই আছে মেট্রো লাইন এক আর চৌদ্দ। আরইআর এ বি ডি ট্রেন। এতো বড়ো স্টেশনে ডিরেকশন ধরে চলা খুব সহজ। কিন্তু ডিরেকশন না বুঝলে শুধুই ঘুরপাক খেতে হয়।

আমরা দ্রুত উপরের ডিরেকশন ধরে গার্দু লিও’র হল দুয়ে দাঁড়িয়েই পেয়ে গেলাম নিম শহরে যাবার নির্ধারিত ট্রেনের নাম্বার। টিজিভি ট্রেন ছেড়ে যাবে ডি প্ল্যাটফর্ম থেকে একটু পরেই। অতএব নির্ধারিত সময়ের আগেই ট্রেনে গিয়ে বসা। ডুপ্লেক্স ট্রেন টিজিভি। আমাদের সিট প্রথম তলায়। বুলেটপ্রুফ ট্রেন। তিনশ থেকে তিনশ পঞ্চাশ কি.মি. গতিতে ট্রেন মাত্র দু’ঘণ্টা একান্ন মিনিটে পৌঁছে যাবে দক্ষিণের শহর নিমে। সিটে বসার তিন মিনিট পরেই ট্রেনের সকল দরজা লক হয়ে গেল। প্লেন টেক অফের আগে তবু কিছু বোঝা যায়, ভালোভাবেই বোঝা যায়; টিজিভি ছাড়ার আগে কিছুই বোঝা গেল না। সামান্য একটু গতি অনুভব করলাম আর জানালার বাইরে তাকাতেই দেখি খুব দ্রুত প্যারিস শহর সরে সরে যাচ্ছে।

ফেরিয়া উৎসব স্পেনের সেভিলা নাচ


এর আগেও টিজিভি ট্রেনে ভ্রমণ করেছি; কিন্তু কোনোদিন দিনের আলোয় ভ্রমণের সুযোগ হয়নি। প্যারিস থেকে ব্রাসেলসে টিজিভিতে মাত্র এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেছি। জানালার ওপারে রাতের পৃথিবীর তেমন কিছুই দেখতে পাইনি। টিজিভি ট্রেন আজ মনে হচ্ছে, একটু বেশি গতিতেই ছুটে চলেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্যারিস শহর উধাও। এরপর ট্রেনের দুপাশে শুধুই পাহাড় মাঠ, সুপ্রশস্ত আট লেনের মহাসড়ক, দূরে দূরে ছোটো ছোটো শহর আর ভিলেজের বাড়িঘর দেখা যায়।

মার্চের সতেরো তারিখ আজ। শীতের প্রচণ্ড দাপট আর নেই। এখন প্লাস সেভেন থেকে টুয়েলভ চলছে। মাঠে মাঠে সবুজের সমারোহ তৈরি হচ্ছে। মনিটরে দেখছি ট্রেন ছুটছে দুইশ নিরানব্বই গতিতে। জানালার দু’পাশে মেষদলের অপলক চেয়ে থাকা চোখে পড়ল। মনে হয় মেষের খামার। একটু পরেই দেখি শত শত সাদা রঙের গোরু চরে বেড়াচ্ছে মস্ত বড়ো একটা পাহাড়ের নিচে। দূরে দূরে ছোট ছোট মাঠজুড়ে গমখেত। মাঝে মাঝেই আঙুর আর আপেল বাগান অনুমান করা যায়। অতিদ্রুত ধাবমান ট্রেন থেকে সুস্পষ্টভাবে কিছুই দেখার নেই।

প্যারিসের বাইরে এতো সুন্দর; ছবির মতো সাজানো একটা নিপাট সবুজ পৃথিবী আছে ভাবিনি। প্যারিস ছেড়ে আসার মন খারাপ ভাবটা আস্তে আস্তে কাটতে থাকে। মনে হয়, এই তো ভালো আরেক নতুন পৃথিবীর মানুষ হব এবার। ট্রেনের দু’পাশে হঠাৎ হঠাৎ ছোট ছোট নদী দেখে মন পুলকিত হয়ে উঠল। অতি শাসিত শ্যেন নদী ছাড়া অনেকদিন আর কোনো নদীর দেখা পাইনি।
টিজিভি ট্রেনের গতি একটু কমে এল। মনিটরে দেখছি, সামনেই ভ্যালেন্স স্টেশন। ভ্যালেন্সে অল্প কজন যাত্রী নেমে গেলেন। আমাদের কামরায় উঠলেন মাত্র তিনজন। ট্রেনের অর্ধেক সিটই খালি। ভ্যালেন্স আবার গতি। এবার আর বেশি সময় গতির মধ্যে থাকা হল না। ট্রেন আবার নরম হয়ে থেমে গেল নিম স্টেশনে। আমরা দ্রুত নেমে গেলাম স্টেশনে।

অ্যালেস ফেরিয়ায় লেখকের মেয়ে সত্তা মৈত্রী, স্ত্রী নীলু মৈত্রী এবং শ্যালিকা দুলু রায়


১২ মে নদীর পাড়ে নির্ধারিত স্থানে দেখি অনেকগুলো কারাভান এসে হাজির। কারাভানগুলোতে জল আর বিদ্যুতের সংযোগ নেয়ার জন্য বেশ কিছু পয়েন্ট আছে। ছোটবেলায় আমি যেমন আমাদের এলাকায় মেলার আগে দেখেছি, সেইরকমই মনে হল যেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের মেঘচুম্বী ইউনিয়নে। মধুখালি, কামারখালি, বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, নলিয়াগ্রাম হল আমাদের গ্রামের নিকটবর্তী বাজার বন্দর। মনে আছে, সমাধিনগরের মেলায় গিয়ে দেখেছিলাম, সার্কাস, পুতুলনাচ আর যাত্রাদলের লোকেরা তাঁবুর ঘরে থাকতেন। আমার খুব ইচ্ছে করত, ওই তাঁবুর ঘরে রাত্রিযাপন করি। ভাবতাম, কী মজা, ওরা একদেশ থেকে আরেক দেশে নৌকায় নৌকায় ঘুরে বেড়ায়, মেলায় নাচগান করে।

কতো বছর পরে মনে হল, অ্যালেসের উৎসবে দূর দূর থেকে কারাভান নিয়ে অশ্বারোহীরা এসেছেন, ষাঁড়ের লড়াইয়ের প্রতিযোগী প্রশিক্ষকরা এসেছেন, এসেছেন নাচগানের শিল্পীরা। কারাভানগুলোর মধ্যে কী সুন্দর ছিমছাম থাকার ঘর। ভেতরে টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন সব আছে। কারভানগুলোর সামনে কেউ কেউ জামাকাপড় মেলে দিয়েছেন। কেউবা রোদে বসে কফি মেকারে কফি করছেন। অদ্ভুত এক অন্যরকম ভালোলাগার পরিবেশ। মনে হল, এই তো ভালো। জীবনে কোথাও যখন নিশ্চিত দাঁড়াবার জায়গা নেই তখন এই ভ্রমণ ভ্রাম্যমাণ জীবনই ভালো। টেকসই জীবনের আকাঙক্ষায় কেন আমরা একখানে মুখ গুঁজে কাদাখোঁচা পাখির মতো পড়ে থাকি। তারচেয়ে এই তো ভালো, দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে আনন্দ বিতরণ।

কারাভানের মানুষগুলোকে আমার ভারী পছন্দ হল। মানুষগুলোকে দেখেই মনে হল, ওরা জীবন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বোঝার মতো টেনে বয়ে নিয়ে বেড়ায় না। উৎসবের প্রথম দিনেই অ্যালেসের রাস্তার দু’পাশে কতো দোকান বসে গেল। একটু পরে পরেই নাচগানের মঞ্চ আর ওয়াইন বিয়ার পানের আনন্দ। মঞ্চগুলোতে লোকসংস্কৃতির প্রভাবই বেশি। লক্ষ করলাম, কোনো কোনো মঞ্চে স্পেনের নাচগান হচ্ছে। বিশেষ করে স্পেনের জনপ্রিয় নাচ ‘সেভিলা’ দেখে আমরা মুগ্ধ। এই নাচ আমি সরাসরি আগে কখনো দেখিনি। একজন পুরুষ শিল্পী গান গাইছেন আর একেক দল মঞ্চে উঠে নেচে যাচ্চেন। অসাধারণ কোরিওগ্রাফি। স্প্যানিশ গানের সঙ্গে কোথায় যেন বাংলা লোকগানের মিলও খুঁজে পেলাম। গানের কথায় মিল না থাকলেও সুরের সঙ্গে সকল দেশের সকল সংগীতের একটা অন্তরঙ্গ মিল তো থাকতেই পারে। থাকেও।

অ্যালেস ফেরিয়ায় সংগীত শোভাযাত্রা


ফেরিয়া উৎসবের ভারী খাবারের আয়োজনও বেশ। বিশেষ করে পায়েলার দোকানগুলোতে বেশ ভিড় চোখে পড়ল। অ্যালেস থেকে একশ কি.মি. দূরের ভিলেজ থেকেও শত শত মানুষ উৎসব দেখতে এসেছেন। এখানে বলে রাখা ভালো, ভিলেজ আর শহরের মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই। আমাদের দেশে যেমন গ্রাম মানেই শহরের সুবিধাবঞ্চিত লোকালয়, ফ্রান্সে এবং ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই কিন্তু তা নয়। ফ্রান্সে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস যেখানে সেটাই শহর; কম হলে গ্রাম। গ্রামের বাড়িগুলোও বিচ্ছিন্ন নয়। প্রায় সব বাড়িই পাশাপাশি। পাশপাশি না থাকলে জল, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোনের সংযোগ দেয়া কঠিন বলেই এই ব্যবস্থা। শহর থেকে সকল গ্রামেই যাতায়াতের জন্য একাধিক সংযোগ সড়ক তো আছেই, অনেক গ্রামের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগও আছে। তাছাড়া গ্রাম কি শহর যে যেখানেই বাস করুক, প্রায় সবারই তো গাড়ি আছে।

বলছিলাম অ্যালেস ফেরিয়ার কথা। এই ফেরিয়া উপলক্ষে অ্যালেস বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। অন্য সময়ে এই শহরে একটুও ভিড় থাকে না। বিকেল হলেই সুনসান। ফেরিয়া উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে গাড়িতে চড়ে গোরু-ঘোড়া এসেছে। এ যাবত দেখেছি ঘোড়া গাড়ি টানে; এখানে দেখছি ঘোড়াগুলো গাড়ি চড়ে খেলতে এসেছে।  গোরুও তাই। খামারবাড়ি থেকে প্রশিক্ষিত গোরুও আনা হয়েছে গাড়িতে করে খেলানোর জন্য।

অ্যালেস শহরে অন্যতম আকর্ষণ লো গার্দো নদী। লো গার্দো নদীতে হবে ঘোড়ার দৌড়। সোজা পথে দৌড় নয়। আকাবাঁকা বন্ধুর পথ এবং কিছুটা নদীর জল দিয়েও দৌড়াতে হবে। মেয়েরাও ছেলেদের সঙ্গে ঘোড়া দৌড়ানোর প্রতিযোগিতায় আছে। আমরা দুপুর বেলায় ঝরনা জলের পাহাড়ি নদী লো গার্দোর তীরে গিয়ে পাথরের উপরে বসলাম। ব্রিজের উপরে আর নদীর দুই পাড়ে হাজার হাজার দর্শক। তুমুল উত্তেজনা। প্রথম রাউন্ড, দ্বিতীয় রাউন্ড, কোয়ার্টার ফাইনালের পরেই এবার ফাইনাল। ফাইনালে দেখা গেল একজন তরুণী রানার্স আপ হল। কিন্তু অনেক পিছনে পড়ে রইলেন এক বৃদ্ধ অশ্বারোহী। যে তরুণীটি রানার্স আপ হল সে আবার ট্রাকে ফিরে এসে একলা বৃদ্ধকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। ঘটনাটা আমাকে আপ্লুত করল। শুধু আমাকে নয়, হাজার হাজার দর্শকও করতালি দিয়ে তরুণী আর বৃদ্ধকে অভিনন্দন জানাল। আমি নিজেই ওই তরুণীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় নরম হয়ে গেলাম। এই হল সভ্যতা, শিষ্টাচার।

একটা ভেনুতে কিশোরীদেরও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল। কিশোরীদের জন্য একটু ছোট ঘোড়া, ছোট মাঠ। জানলাম, ফরাসি তরুণ তরুণীরা সাঁতার শেখার পাশপাশি ঘোড়ায় চড়া শেখে। সাঁতার শেখা সবার জন্য বাধ্যতামূলক, ঘোড়ায় চড়তে শেখাটা বাধ্যতামূলক না হলেও প্রায় সবাই শখ করে এরা ঘোড়া দৌড়াতে শিখে নেয়। ওরা ভুলতে চায় না, একসময় ঘোড়াগুলোও ফরাসিদের অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে।
আমাদের দেশে অপসংস্কৃতি বলে একটা শব্দ বেশ চালু আছে। ফরাসিরা অপসংস্কৃতির অস্তিত্ব স্বীকার করে না। যার যা ভালো লাগবে এবং অন্যকে আঘাত করবে না তাই শুদ্ধ সংস্কৃতি। অন্য কারো সংস্কৃতি ফরাসিদের উপরে কোনো প্রভাব ফেলছে কিনা— এসব চিন্তা একদম নেই। অ্যালেস যেহেতু ফ্রান্সের দক্ষিণের একটি শহর, এখান থেকে স্পেন যেহেতু একটু কাছে, তাই স্পেনের নাচগানের প্রভাব একটু বেশি এই শহরে। এখান থেকে পুবের দিকে গেলে ইতালি। ইতালির প্রভাবও একটু আছে। বিশেষ করে কিছু ইতালিয়ান শব্দ এখানে চলে। এখানে আলজেরিয়া আর তুরস্কের কিছু মানুষ থাকে, তাই তাদের একটু প্রভাব আছে। সবার একটু একটু ভালো যোগ করেই তো অনেক ভালো কিছু হয়ে ওঠে।

গোরু আর ঘোড়া নিয়ে বেশ কয়েকটা ইভেন্ট ছিল। অতো সবের বর্ণনা দিতে গেলে কয়েক পৃষ্ঠা লেগে যাবে। টিভিতে দেখেছিলাম, স্পেনের শহরের একটি রাস্তায় শিঙওয়ালা কয়েকটা গোরু কয়েকশ মানুষকে তাড়া করে  ফিরছে, কেউ কেউ গোরুর পায়ের নিচে পড়ছে, কেউ শিঙের গুঁতো খেয়ে রক্তাক্ত হচ্ছে। অ্যালেস ফেরিয়ায় এই ভয়ংকর খেলাও হবে। আমরা এটা দেখবই। কম সাহস নয়! মনে মনে একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম। কিন্তু গোরুর এই ভয়ংকর খেলার ভেনুতে গিয়ে দেখি অনেকখানি জায়গা নিয়ে গ্রিল দিয়ে বেঁধে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। মাঝখানে একটা আইল্যান্ড, তারপর এদিকে ওদিকে দু’তিনটে গলির মুখের চারপাশ ঘিরে রাখা। অর্থাৎ এর ভেতরেই গোরুগুলো তাড়া করবে। ব্যারিকেডের বাইরে দুর্বল ভীরু উৎসুকরা দর্শক, আর ব্যারিকেডের ভেতরে যারা থাকবে তারাই গোরুর তাড়া খাবে এবং সাহস করে সুযোগ বুঝে গোরুর শিঙ যে যতোবার ছুঁতে পারবে সেই হবে চ্যাম্পিয়ন। ব্যারিকেডের এক কোণায় কাভার্ড ভ্যানে গোরুগুলো রাখা ছিল। মাইকে যেই ঘোষণা হল আলিজে আলিজে অর্থাৎ আসছে আসছে। ব্যারিকেডের ভেতরে বাইরে চরম উত্তেজনা শুরু হয়ে গেল। একসঙ্গে পাঁচটা তাগড়া গোরু কাভার্ড ভ্যানের ভিতর থেকে বেরিয়ে পাগলের মতো ছুটতে লাগল। আসলে গোরুগুলো  ব্যারিকেডের বাইরে পালাতে চাইছে। পুরো ভেনু চষে ফিরছে কোথায় একটু ফাঁক আছে। সেই ফাঁক খুঁজে না পেয়ে ব্যারিকেডের ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে তাড়া করে ফিরছে। ভয়ে রাগে গোরুগুলোর মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে, তবু প্রাণপণ চেষ্টায় তারা ঘুরে ঘুরে দৌড়াচ্ছে। আর এরই মধ্যে কেউ কেউ প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে গোরুর শিঙ ছুঁয়ে দিচ্ছে। যার পিছনে গোরু ছুটছে সে হয়তো শেষে ছুটতে না পেরে ব্যারিকেডের গ্রিল ধরে উপরে উঠে গিয়ে গুঁতো থেকে নিজেকে রক্ষা করছে। চরম এক উত্তেজনাপূর্ণ খেলা।

অ্যালেস ফেরিয়ার অন্যতম প্রিয় খাবার পায়েলা


গোরু আর মানুষের এই কাণ্ড-কীর্তি দেখে মজা পেলাম, হাসলাম। ভাবলাম, এই উত্তেজনা, গোরুকে দৌড়িয়ে নিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা, হাট থেকে গোরু কিনে তিন চার জনে মিলে যুদ্ধ করতে করতে বাড়ি ফেরা- এসব কতো দেখেছি নিজের দেশে। গোরু হল আমাদের গৃহস্থের অংশ। তাই গোরু নিয়ে খেলার চিন্তা আমাদের মাথায় আসে না। বড়জোর ষাঁড়ের লড়াইয়ের কথা মনে পড়ে। কিন্তু এখানকার প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে এমন বিনোদন কুড়িয়ে আনতে হয়; এখানে সবার জীবন তো প্রতিদিন চরম স্বাভাবিক, শান্তশিষ্ট কাজ আর আড্ডাবিশিষ্ট। খুব একটা সংগ্রাম নেই, মারামারি নেই, উচ্চস্বরে কথা নেই, হো হো করে বিকট শব্দে হেসে ওঠা নেই। এখানে তো এই বিনোদনই পরমপ্রাপ্তি।

শুধু অ্যালেস নয়, সমগ্র ফরাসি দেশের প্রায় প্রতিটি শহরে গ্রামে সারা বছরই কোনো না কোনো উৎসব লেগেই থাকে। সংগীত, অপেরা, চলচ্চিত্র আর নানান ক্রীড়ানুষ্ঠান নিয়ে এরা মেতে থাকে। কৃষি পণ্যের উৎসবও হয়। আর হ্যাঁ, এখানে মানে অ্যালেসে হাট বসে রবিবারে সোমবারে। রবিবারে সবজি ফল, মাছ, মুরগিসহ নানান খাবারের হাট বসে। সোমবারে জামাকাপড়, জুতার হাট।

রবিবারের হাট থেকে আমরা পালংশাক, পেঁয়াজ, আলু, পুলে, আঙুর, আপেল, চেরি, বাগেত কিনি। সোমবারের হাটে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি বাংলাদেশের শার্ট, গেঞ্জি বিক্রি হচ্ছে। ভালো লাগে দেশের সঙ্গে সামান্য একটু মিল খুঁজে পেলে। এখানে নির্জন রাস্তায় হাঁটতে ঘুরতে এখন আর মন্দ লাগে না। এই তো বেশ আছি, ভালো আছি অ্যালেসে। একটু মন খারাপ হলেই তো যেতে পারি ম্যাকডোনালসে, যেতে পারি মিদিয়াতেকে। মিদিয়াতেক হল বিশাল বড়ো লাইব্রেরি, আর্কাইভ আর সংস্কৃতি কেন্দ্র। বিনামূল্যে মানসিক উৎকর্ষের সময় সুযোগ আগে তো কোথাও পাইনি, এই তো বেশ আছি, ভালো আছি।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ জুলাই ২০১৫/তাপস রায়


Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge