ঢাকা, শুক্রবার, ১০ চৈত্র ১৪২৩, ২৪ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

‘এ অভিযাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতায়’

বিশ্বজিত রায় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-১০ ৬:১৫:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-১০ ৬:১৫:৫৭ পিএম

বিশ্বজিত রায় : ‘পাখি উড়ে গেছে’-১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি ভোরে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে একটি চার্টার্ড বিমানে উঠিয়ে দিয়ে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো এক রহস্যময় বার্তায় কথাটি বলেছিলেন। জানি না তিনি সেদিন শান্তি ও মুক্তির অগ্রদূত বঙ্গবন্ধুকে কোন পাখির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি যে মানসিকতা নিয়েই বাঙালি জাতির জনককে ‘পাখি’ হিসেবে মূল্যায়ন করুন না কেন, বাঙালি ও বিশ্ব মানবতাবাদী নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে শান্তির ‘শ্বেত পায়রা’ বলতে কুণ্ঠিত হয়নি। সেই মানবতা ও শোষকের মুক্তির শ্বেত পায়রা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি প্রিয় স্বাধীন স্বদেশে মহাপ্রতাপে প্রত্যাবর্তন করেন।

১০ জানুয়ারি এ কারণে বাঙালি জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় দিন। দিনটি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর বিশ্ব নেতাদের চাপের মুখে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বন্দীদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর লন্ডন-দিল্লী হয়ে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পৌঁছান। প্রিয় নেতাকে বহনকারি বিমানটি বিমানবন্দরে কখন অবতরণ করবে সে অপেক্ষায় পুরো বিমানবন্দর এলাকা সেদিন পরিণত হয় এক মহামিলনমেলায়। স্বাধীন দেশের মাটিতে কখন পা রাখবেন তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতা- অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল দেশবাসী। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতির জনক বিজয়ীবেশে পা রাখলেন লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত স্বাধীন বাংলার মাটিতে। সদ্য স্বাধীন দেশটির আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হতে লাগল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান।

স্বদেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ ৯ মাস পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের গণহত্যার সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এর সঙ্গে যেন মিশে গিয়েছিল আবেগের অশ্রু। নেতা কথা রেখেছেন। কেননা তিনিই তো বজ্রকণ্ঠে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সামনে ঘোষণা করেছিলেন : ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, তবুও এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ’। বাঙালি জাতিকে মুক্ত করেই ফিরে এসেছিলেন তিনি স্বাধীন সার্বভৌম ভূ-খণ্ডে।

আপন ভূমে পা রাখার কিছুদিন পর ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রকাশিত নিউজ উইকের এক নিবন্ধে বলা হয়, পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ওই দিন মধ্যরাতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে মুজিবুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে রাওয়ালপিন্ডি বিমানবন্দরে যান এবং একটি চার্টার্ড বিমানে উঠিয়ে দেন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও গন্তব্য নিয়ে ভুট্টো ব্যক্তিগতভাবে তাঁর (বঙ্গবন্ধু) সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। ‘মুজিব ফ্লাইস টু ফ্রিডম’ শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়, মুজিবকে বহনকারী বিমানটি হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় ৫১ বছর বয়সী এই বাঙালি নেতাকে বিশ্ববাসী প্রথম দেখল, যাকে গত বসন্তকালে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. ইয়াহিয়া খান কারাগারে পাঠিয়েছিল। লন্ডনের সবচেয়ে অভিজাত হোটেল ক্লারিজ-এ এক সংবাদ সম্মেলনে ক্লান্ত বঙ্গবন্ধু আবেগের সঙ্গে পাকিস্তানের কারাগারে তার অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি কারাগারের কনডেম সেলে ফাঁসির অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলাম। কারাগারে যাওয়ার দিন থেকেই আমি বুঝতে পারছিলাম না, জীবিত থাকব কি থাকব না। আমি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম, বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’

ভারতের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে একটি গান গেয়েছিলেন। আজ গানটি স্মরণ করা যেতে পারে :

‘বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায় তুমি আজ

ঘরে ঘরে এত খুশি তাই।

কী ভাল তোমাকে বাসি আমরা, বলো কী করে বোঝাই।

এদেশকে বলো তুমি, বলো কেন এত ভালবাসলে,

সাত কোটি মানুষের হৃদয়ের এত কাছে কেন আসলে,

এমন আপন আজ বাংলায়... তুমি ছাড়া কেউ আর নাই

বলো, কী করে বোঝাই।

সারাটি জীবন তুমি নিজে শুধু জেলে জেলে থাকলে

আর তবু স্বপ্নের সুখী এক বাংলার ছবি শুধু আঁকলে

তোমার নিজের সুখ-সম্ভার কিছু আর দেখলে না তাই

বলো কী করে বোঝাই।’

বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও মানবিক গুণাবলী এমন অসংখ্য গান রচনার রসদ জোগায়। যে কারণে অসংখ্য গীতিকার, কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের কলম, চিত্রকরের তুলির আঁচড় এবং সঙ্গীতে বঙ্গবন্ধুর নাম উঠে এসেছে বারবার। পাক হানাদার বাহিনী যখন বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে যায়, তখন আমরা পরাধীন ছিলাম। আমরা নিশ্চিত ছিলাম না বঙ্গবন্ধুকে, আমাদের প্রিয় নেতাকে জীবিত আর দেখতে পারব কিনা। কিন্তু ঈশ্বর আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করেছিলেন। তিনি পক্ষে ছিলেন আমাদের। এ এক মহা আনন্দের দিন! উচ্ছ্বসিত বাঙালির চেহারায় সেদিন ফুটে উঠেছিল জাতির জনকের প্রতি ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার ভাষা অনুবাদ করার সামর্থ সম্ভবত কারো নেই। আমার মতো ক্ষুদ্র কলামিস্টের তো নেই-ই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন :

‘মোর লাগি করিওনা শোক

আমার রয়েছে কর্ম

আমার রয়েছে বিশ্বলোক।’

কথাটি জাতির জনকের জন্য যথাযোগ্য। বঙ্গবন্ধু কর্মের মাঝে চিরভাস্বর হয়ে আছেন, থাকবেন। তিনি নিজেই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে বলেছিলেন : ‘এ অভিযাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায় অভিযাত্রা।’

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলেও প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরো কিছুদিন। বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাঙালির পূর্ণ মুক্তি অসম্ভব ছিল। যে কারণে আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হয় আরেকটি বিজয়ের জন্য। অবশেষে অর্জিত হয় সেই বিজয়। তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন। আবার গর্জে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস স্লোগানে স্লোগানে।

রবীন্দ্রনাথের কথাতেই বলি, ‘মুক্তিদাতা, তোমারও ক্ষমা, তোমারও দয়া, রবে চির পাথেয় চির যাত্রায়।’ জাতির জনকের প্রতিটি কর্মে এই কথাগুলো খুঁজে পাই। পিতা তুমি সত্যিই মুক্তির অগ্রদূত, ক্ষমাশীলতার মূর্ত প্রতীক, তোমার আশীষে হাসি ফুটেছিল সবহারা মানুষের মুখে। যারা মুক্তিযুদ্ধ শেষে সত্যিকার অর্থেই হয়ে পড়েছিলেন নিঃস্ব, অসহায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধীনতা প্রতিটি শব্দের অপর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমাদের জাতীয় জীবনে এক দৃশ্যমান আলোকবর্তিকা।

তারপরও বলতে হয়, তাঁকে নিয়ে কেন আজ ইতিহাস বিকৃতি। এই ধৃষ্টতার বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব আজ শুনি না কেন? পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া ত্রিশোর্ধ্ব এক যুবক হিসেবে জাতির কাছে তাই আজ এই প্রশ্ন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জানুয়ারি ২০১৭/তারা

Walton Laptop