ঢাকা, বুধবার, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, ২৩ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম : রূপসার নেহালপুর

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২২ ৬:০৭:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০১ ৯:৫৩:৫৩ এএম
রূপসার নেহালপুর গ্রামে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাজে ব্যস্ত কারিগররা... (ছবি : মুহাম্মদ নূরুজ্জামান)

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা : বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। ক্রিকেটের হাত ধরে এসেছে দেশের অনেক সম্মান-মর্যাদা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বেড়েছে সুখ্যাতি।

বিশ্ব ক্রিকেটের অলরাউন্ডারের সাফল্যও বাংলাদেশের। ক্রিকেট বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে অনেক উঁচু স্তরে। আর এসব সাফল্যের দাবিদার অনেকটাই  খুলনা অঞ্চলের। কারণ টাইগার অধিপতি মাশরাফি বিন মুর্তজা থেকে শুরু করে বিশ্ব কাঁপানো কাটার মুস্তাফিজসহ জাতীয় দলের অধিকাংশ ক্রিকেটারই এ অঞ্চলের কৃতি সন্তান। এতে গোটা জাতির সঙ্গে গর্বিত খুলনা অঞ্চলের মানুষও।

আর এসব সাড়া জাগানো সাফল্যের ঝুলিকে আরো ভারি করতে যোগ হয়েছে ক্রিকেটের অন্যতম উপকরণ ব্যাট, স্ট্যাম্প ও বেল। এখন এগুলোই তৈরি হচ্ছে খুলনার রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের নেহালপুর গ্রামে।

এ গ্রামের বেশ কয়েকজন তরুণ-যুবক-বেকার তাদের শৈল্পিক হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি করছেন এসব উপকরণ। তাদের তৈরি ক্রিকেট সামগ্রী এখন শোভা পাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকার স্পোর্টস মার্কেটের অভিজাত বিপণি বিতানগুলোতে।

সঙ্গত কারণেই ক্রিকেট ব্যাট, স্ট্যাম্প ও বেল-এ এখন হাসছে গোটা নেহালপুর গ্রাম। ব্যাটসহ অন্যান্য কুটির শিল্পকর্ম তৈরিতে প্রসিদ্ধ হওয়ায় লোকজন গ্রামটিকে ‘মিস্ত্রিপাড়া’ বলে চেনেন। আর নিজ হাতে এসব ক্রিকেট উপকরণ তৈরি করতে পেরে গর্বিত এর কারিগররাও।

খুলনার সব থেকে কাছের উপজেলা রূপসা। রূপসা নদী পার হয়ে ঘাট থেকে উপজেলা সদরের দূরত্ব আধ ঘণ্টার। তবে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বেই অবস্থিত নৈহাটি ইউনিয়ন।

এ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী গ্রামটির নাম নেহালপুর। এ গ্রামের যুবক অরবিন্দ সিংহ এবং মিঠুন রায়ের পাশাপাশি বিপ্লব দাস, রাজিব বিশ্বাস, সুব্রত রায়, অমিত দাস, গোবিন্দ রায়, আজম মল্লিক ও বিল্লাল শেখ নিজ নিজ বাড়িতে কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগেই গড়ে তুলেছেন ক্রিকেট ব্যাট, স্ট্যাম্প ও বেল তৈরির কারখানা।

এসব কারখানায় আমড়া, কদম, ছাতিয়ান (ছাইতেন), পাহাড়ি নিম গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ক্রিকেট ব্যাট। একইভাবে শিশু, ইপিল ইপিল এবং মেহগনি গাছের কাঠে ব্যাটের হাতল, স্ট্যাম্প ও বেল তৈরি হচ্ছে। ব্যাট এবং হাতল আলাদাভাবে তৈরি করে জোড়া লাগানো হয়।

এসব কারখানায় গড়ে প্রতিদিন কয়েকশ ব্যাট উৎপাদন করা হয়। প্রতি মৌসুমে তৈরি হয় কয়েক হাজার পিস। বছর ধরেই এসব কারখানায় ব্যাট তৈরির কাজ চলে। তবে বিক্রি হয় মার্চ থেকে অক্টোবর- এই আট মাস।

ব্যাট তৈরির প্রক্রিয়া : সরেজমিনে নেহালপুরের মিস্ত্রিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, এখানকার কারিগররা স্থানীয় বাজার থেকে কাঠ কিনে স’মিল থেকে নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী কেটে (চেরাই) নেন। ব্যাটের প্রতি পিস কাঠ সাড়ে ৪ ইঞ্চি চওড়া, আড়াই ইঞ্চি মোটা এবং দুই ফুট লম্বা রাখা হয়।  যার প্রতিটির ওজন থাকে ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম। এরপর প্রায় এক থেকে দেড় মাস ধরে কাঠ রোদে শুকাতে হয়।

শুকানোর পর বাইশ নামক যন্ত্র দিয়ে কেটে নির্দিষ্ট সাইজ করা হয়। এরপর ব্যাটের সঙ্গে আলাদাভাবে তৈরিকৃত বাট আঠা দিয়ে জোড়া লাগাতে হয়। বাট লাগানোর পর হাতেই করা হয় ফিনিশিংয়ের কাজ। এরপর পুটিং লাগিয়ে শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে মসৃন করতে হয়। পর্যায়ক্রমে ব্যাটের ভেতর পাটে প্রটেকটর, স্টিকার এবং হাতলে গ্রিপার লাগিয়ে তিন ধাপে কাজ শেষে প্লাস্টিকের কাগজে প্যাকেটিং করতে হয়। এভাবেই তৈরি হয় ক্রিকেটের উপযোগী ব্যাট।

বাজারজাতকরণ : ব্যাট তৈরি সম্পন্ন হলে তা পাইকারি মূল্যে বাজারে বিক্রি করা হয়। প্রতিটি ব্যাটের উৎপাদন ব্যয় হয় ১৪০ টাকা। বিক্রি করা হয় ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা।

খুলনা ছাড়াও পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয় এসব ব্যাট। বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত মেলার স্টলেও স্থান পায় ব্যাট।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, উপজেলা ও ইউনিয়ন এবং ক্লাব পর্যায়ের সংগঠনের পক্ষ থেকেও অর্ডার আসে এসব কারখানায়। চাহিদা অনুযায়ী স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা হয় ব্যাট-স্ট্যাম্প-বেল। অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কারখানা থেকে ব্যাট কিনে নেন। এভাবেই চলে বাজারজাত প্রক্রিয়া।

ব্যাট কারিগররা যা বললেন : ক্রিকেট ব্যাটের কারখানা ‘অর্পিতা ব্যাট ঘর মালিক’ অরবিন্দ সিংহ রাইজিংবিডিকে বলেন, তার বাবা মৃত হরিপদ সিংহের ছাতার বাট তৈরির কারখানা ছিল। পৈত্রিক সূত্রে তিনিও ওই ব্যবসা করতেন। তবে নতুন কিছু করার ভাবনা থেকেই মূলত তিনি ক্রিকেট ব্যাট তৈরির প্রতি আকৃষ্ট হন। খালাতো ভাই মিঠুন রায়কে সঙ্গে নিয়ে ২০০৯ সালে শুরু করেন ব্যাট তৈরির কার্যক্রম। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এ ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই চলছে দুই পরিবারের সংসার, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াসহ অন্যসব প্রয়োজন।

এ উদ্যোক্তা আরো বলেন, তিনি ছোটবেলায় নিজেও ক্রিকেট খেলতেন। ভালো লাগত। এখনও লাগে। তবে খেলার সময় পান না। তাদের তৈরি ব্যাটে অন্যরা খেলায় বেশি আনন্দ উপভোগ করেন।

অপর উদ্যোক্তা মিঠুন রায় বলেন, তাদের তৈরি ব্যাটে খেলেই খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভালো মানের ক্রিকেটার তৈরি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার মাঠে-ঘাটে ছেলে-মেয়েরাও এখন খেলছে। খেলা শিখছে তাদের তৈরি ব্যাটে। বিষয়টি তাকে আরো নতুন কিছু করতে প্রেরণা জোগায়।

প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা : ক্রিকেট ব্যাট তৈরির উদ্যোক্তারা জানান, এ পেশাটি এখনও শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এমনকি কুটির শিল্পের তালিকায়ও স্থান পায়নি। যে কারণে সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা নেই। তবে সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা সামান্য ঋণ দিতে শুরু করেছে। কিন্তু নেই সরকারি কোনো উদ্যোগ।

তাদের দাবি, ব্যাট তৈরির উপযোগী সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ। যা তাদের পাওয়ার সুযোগ নেই। এ কাঠ সরকারিভাবে সরবরাহ এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এটি একটি বড় শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে- এমনটিই প্রত্যাশা তাদের।




রাইজিংবিডি/খুলনা/২২ ডিসেম্বর ২০১৬/মুহাম্মদ নূরুজ্জামান/রিশিত

Walton Laptop