ঢাকা, সোমবার, ৪ আষাঢ় ১৪২৬, ১৭ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গ্রাম-বান্ধবীদের মনে পড়ে || টোকন ঠাকুর

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৭-১০ ৭:৩২:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:০৫ এএম
Walton AC 10% Discount

বাইসাইকেল উড়তে পারে! ডানা আছে, সাইকেলের? সাইকেল যে চালায়, সে কে? সে কি জানে, তার সাইকেল তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? সাইকেল তাকে মধুপুর থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে কোন কোন গ্রামে, কোন নদীর ঘাটে?

আমার একটা সাইকেল ছিল, গত শতকের আশির দশকের শুরুতেই। আমার সাইকেলেরও নিশ্চয়ই ডানা ছিল! সাইকেলকেই মনে হতো কি- প্যাগাসাস? আমি সেই সাইকেলে উড়ে উড়ে বেড়াতাম, ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম। কোথায়?

দুর্দান্ত এক কিশোরবেলা পার করে এসেছি বটে। সঙ্গে ছিল আমার পঙ্খিরাজ, বাইসাইকেল। স্কুল ছুটির পর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম মধুপুর ছাড়িয়ে বারোইপাড়া, শৈলকূপা, বিজুলিয়া হয়ে কতদূর...যে গ্রাম দেখা যায় মাঠের ওপারে, সেই গ্রামের নাম জানি না। কারো কাছে শুনলেই, হয়তো জানা যাবে, গ্রামের নাম গোকুলনগর, গ্রামের নাম দহকোলা, গ্রামের নাম রাণীনগর, ব্রিহামপুর, লক্ষ্মণদিয়া, বাজুখালী কিংবা গ্রামের নামটি অঞ্জনা।

কিন্তু আমার মনে পড়ে ঈদের দিনের কথা। আমি ও আমার বাইসাইকেল- দুজনে বেরিয়ে পড়তাম ঈদের দিনে, সেই সন্ধ্যায় হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসা গ্রামজীবনে। ঈদের দিন এক অন্যরকম উৎসবের দিন। এই উৎসবে সবাই তার প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হয়, আনন্দের যাত্রী হতে চায় সবাই। তাই আমিও বেরিয়ে পড়তাম সাইকেলে চড়ে, কাছে-দূরের গ্রামে। গ্রামের পর গ্রাম। গ্রাম পেরোলেই নদী। নদী না ওটা, নদী না ওটা, ওটা হচ্ছে নদ। কুমার নদ। তখনো তো আর ব্রিজ হয়ে ওঠেনি, ছিল নৌকায় পারাপার ব্যবস্থা। আমি ও আমার বাইসাকেল নৌকায় চড়ে নদ পেরোলাম।

আসলে, নদ-টদ যা-ই হোক, আমরা জানতাম গাঙ। গাঙের ওপারেই রাধানগর গ্রাম। ঈদের দিন রাধানগর যাচ্ছিলাম। রাধানগরে বাড়ি ছিল জেসমিনদের। জেসমিন আমার বান্ধবী। ঈদের কারণেই ‘সহজ প্রবেশ’ ছিল। জেসমিনদের বাড়িতে ঈদের দিনে রান্না হওয়া সেমাই, মিষ্টি খেয়ে হয়তো কিছুক্ষণ গল্প করে তারপর বেরিয়ে পড়েছি। তখন তো আর মোবাইল ফোন বা ‘সেলফি’ তোলার ব্যবস্থা ছিল না। মাঝেমধ্যে মনে হয়, ‘আমরা বড় সেকালের মানুষ।’ আমাদের শৈশব-কৈশোরের দুর্দান্তপনা দিনগুলোর কোনো ছবি নেই। তখন ক্যামেরা বস্তুটা এতটা সহজলভ্য কিছু হয়ে ওঠেনি। আজকের দিনে যা অনেক খেলনার মতো দেখা যায়। তাই রাধানগরের পর আবার নদী পার। হ্যাঁ, এবারেরটা নদীই। নদ নয়। তবে এককথায় গাঙ। রাধানগরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কালী নদী। কালী নদী পার হয়ে মির্জাপুর। ঈদের দিনে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে কী কী দেখা যেত তখন? আইসক্রিমঅলা আসত। দশ পয়সা, পনেরো পয়সা টাইপের দাম একেকটা আইসক্রিমের। যা-ই হোক, মির্জাপুরে ছিল আমাদের বান্ধবী নাজমাদের বাড়ি। নাজমার মনে হয় নাইনে থাকতেই বিয়ে হয়ে যায়। নাজমা সুন্দরী ছিল। সুন্দরীদের মনে হয় বিয়ে হয় আগেভাগেই। নাজমার  মুখটা এইটে ওঠার পর আর দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার


চণ্ডীপুরে স্বপ্না ও যমুনাদের বাড়ি। ওরা ছিল সৎবোন। দুই মায়ের দুই মেয়ে। দুটোই আমার প্রাইমারি-হাইস্কুলের বান্ধবী। ব্রিহামপুরের বাড়ামী স্কুলের বান্ধবী শাহিদা- সবার বাড়িতে যেতে না পারলেও অনেকগুলো বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ায় একটা অভ্যাস আমার গড়ে উঠেছিল, বিশেষ করে ঈদের দিন। বাইসাইকেলে করে বেরিয়ে পড়তাম। কাটামাটির রাস্তা। কখনো ঈদের দিন ছিল খুব রোদ, কখনো ঈদের দিন ছিল বৃষ্টিমুখর। শীতকালে কখনো ঈদ পেয়েছি? মনে পড়ে না।

বড়দহে আরো একজন বান্ধবী ছিল আমার, ওর নামও জেসমিন। বীথিদের বাড়ি ছিল দহকোলা। হড়রাতে বাড়ি ছিল হোসনে আরার। শুধু কি এই কয়েকজন বান্ধবী ছিল আমার, হাইস্কুলে? প্রাইমারি স্কুলে? ক্লাসের মধ্যে তো এক পাশে সারি সারি ছেলেদের বসার জন্য বেঞ্চ, অন্য পাশে সারি সারি মেয়েদের বেঞ্চ। তো সেই বেঞ্চগুলোতে আরো কত বান্ধবী ছিল, তাদের নাম কী বা পরে তারা কোথায় গেল বা কার কোথায় বিয়ে হয়ে গেল- আমার কিচ্ছু জানা হয়নি। গোত্রান্তরিত মানুষের মতো আমি বিভূঁইয়ের পথে বেরিয়ে পড়েছি। গাড়াগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাইমারি স্কুলের বান্ধবীদের কথাই বলছি। সত্যি, আমি আর জানিই না যে আমার সেই বান্ধবীরা এখন কে কোথায়? এখন তো ঈদের দিন আসে, রাস্তায় কাউকে বাইসাকেল চালিয়ে যেতে দেখি। জানি না, সে কোথায় যায়?

তবে এখন বাইসাইকেল আর ততটা সমাদরের জিনিস নয়। এখন কোথাও যেতে হয়? মোবাইল ফোন আছে। ইন্টারনেট আছে। ফেসবুক আছে। ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে দিলেই বলা হয়ে যায়, ‘হোয়াটস অব ইওর মাইন্ড।’  কিন্তু আমাদের কৈশোরে নিজের থেকে সশরীরের যেতে হতো। সে সাইকেল চালিয়েই হোক, আর হেঁটেই হোক। তারপর ‘বান্ধবী’র চেয়ে আরেকটু বেশি কিছু ভেবে ওঠা মেয়েটার বাড়ির আশপাশে ‘ভালো ছেলের ছদ্মবেশে’ঘোরাঘুরি করতে হতো। বড়দের চোখ এড়িয়ে যদি একবার ‘বান্ধবীর চেয়ে বেশি কিছু ভেবে ফেলা’ বালিকাকে দেখা যায়। দূর থেকে হলেও।

এমন ঈদের দিনে, এই ফোন-ফেসবুক আসার পরেও আমি আমার সেই স্কুল বান্ধবীদের খুঁজে পাইনি। খুব যে খোঁজাখুঁজি করে চলেছি, তাও নয়। তবু ঈদ এলেই, আমার সেই গ্রামসখীদের কথা মনে পড়ে। ওদের কেউ নিশ্চয়ই অনলাইনে এই লেখাটা পড়ে নিক, এটা আমি চাই। চাইলেই সব হয় না। সেদিনের সেই গ্রামবালিকারা এখন কে কী অবস্থায় ঈদের দিন কাটায়- তা তো আমি কিছুই জানি না। আবার কি কখনো দেখা হবে? সবাইকে একসঙ্গে হয়তো আর পাব না কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবেও তো কারো সঙ্গে দেখা হতে পারে। পারেই তো। তা-ই যেন হয়।

কারণ, আমার গ্রামবান্ধবীরা ছিল একেকজন একেকটা ফুলের মতো। সহজ, সুন্দর। গ্রাম প্রতিবেশের সবুজমাখা মেয়েগুলো। ওরা যে এখন কোথায়? আমাদের সেই গাড়াগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বান্ধবীদের মুখ মনে আছে আজ, ঈদের দিনে। আমার পোষা কবুতর হারিয়ে গেলে জেসমিনদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেটাও ছিল ঈদের দিন। মনে আছে। শুধু মনে নেই, জেসমিন আমার সঙ্গে এক দুপুরে জামগাছতলায় দাঁড়িয়ে চোখে চোখে কী যেন বলেছিল। কী বলেছিল?

ঈদের আনন্দ সবার আনন্দ হয়ে উঠুক। সারা বছর সবচেয়ে দুঃখিত মুখটাও আজ হেসে উঠুক, আমার সেই হারিয়ে যাওয়া বান্ধবীদের মতো, ফুলের মতো ফুটে ওঠা গ্রামসখীদের মতো। আর আমি মনে মনে দেখতে থাকি, সেই গাঙপাড়। বিকেল ছাড়িয়ে বেলা যাচ্ছে সন্ধের দিকে। গাঙপাড়ের রাস্তা দিয়ে আমি যাচ্ছি দুধসর-ডাঙ্গিপাড়ার দিকে। রাস্তার এক পাশে ধানমাঠ, অন্য পাশে সেই গাঙ, কুমার নদ। নদের ওপরে আকাশ, ওপারে রাধানগর। কিশোর ছেলেটা তার প্যাগাসাসে উড়ছে। সন্ধ্যার আগের স্থানীয় আকাশটা কী সুন্দর রঙে চিত্রায়িত।

ঈদের দিন, সাইকেল চালিয়ে স্কুলবান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছিলাম। বাড়িটা কোন গ্রামে? বান্ধবীটা কে?

মনে নেই।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুলাই ২০১৫/তাপস রায়/কমল কর্মকার

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge