ঢাকা, রবিবার, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

চুম্বন সরোবর নিরন্তর || পিয়াস মজিদ

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৬-২৮ ৪:১৪:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:২৯ এএম

প্লেটোনিক লাভের যুগ শেষ। প্রস্তর-নব্য প্রস্তর ইত্যাদির পর এবার কোমল পলিময় চুম্বন যুগ শুরু। চুম্বন কারো বাড়া ভাতে ছাই দেয়নি, শিরচ্ছেদ করেনি, ধর্মের নামে যুদ্ধ বাধায়নি তবে চুম্বনে বাধা কিসে! আছে আছে; চুম্বনে বাধা দিতে খাড়া আছে হরেক কিসিমের কায়েমি স্বার্থবাদ এবং চূড়ান্ত অপ্রেমময় সাম্রাজ্যবাদ। কারণ চুম্বন মানে এবংবিধ প্রাচীরের ধ্বংসস্তূপের ওপর  প্রেমপারাবত উড়ানো। প্রেমের শত্রু-মুক্তিময় উড়ালের শত্রুরা জাল বিছিয়ে আছে সর্বত্র, আড়ি পেতে আছে, দেয়ালে কান দিয়ে আছে, ঘাঁটি গেড়ে আছে, মিসাইল রেডি করে আছে। সুযোগ পেলেই হলো। মিসাইল- ক্লাস্টার- টমাহক নয়; ওদের লক্ষ্যস্থল আমাদের অধোরেখ। ওরা গোয়েবলস সেজে প্রচার রটায় দিগবিদিক- প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে মাগার শান্তি পাবে না, শান্তি পাবে না। (সূত্র : শহীদ কাদরী) কিন্তু ওরা আবার শান্তির মা-বাবার নামে ডক্টরেট দেয়। আইস, তবে আজ আমরা চুম্বনের প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে; প্রেমের নামে এদের প্রতিহত ও প্রতিরোধের শপথ নিই।

 

মৃত নামের অমরগণের সারি থেকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলছে ওই- আমাকে ভালোবাসলে আমার চুম্বনেরও আস্বাদ নাও, কারণ আমি ও আমার চুম্বন মূলত এক ও অবিভাজ্য। চুম্বনের পক্ষে দাঁড়ানো মানে সভ্যতাকে শক্তিশালী করা; মা যেমন নবজাত শিশুকে স্নেহাশ্লেষে বড় করেন তাকে আমাদের সুরক্ষা দিতে হবে, পবিত্র গ্রন্থে যেমন শ্রদ্ধা-ছোঁয়া দেয় ভক্ত তাকে আমাদের নিরাপদ রাখতে হবে, দেশমাতৃকার মাটিতে চুমু খেয়ে বীর সন্তান স্বদেশ সুরক্ষার শপথ নেয়, তাকে আমাদের সম্মান দেখাতে হবে। আর চিরকালের প্রেমের বার্তাকে বহমান রাখতে চুম্বনপক্ষ গঠন করতে হবে।

 

পুজোর প্রতিমাকে চুমু খেয়ে কিশোর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন মানবীপ্রেমের নিশান উড়ায় তেমনি এক একটি চুম্বনের মধ্য দিয়ে তো মূলত আমরা সভ্যতার সকল সদর্থকতা-সুকৃতিকে সম্মান জানাই। চুম্বন মানে ঐক্যের সংগীত; অস্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারী-আভোগে এই সোচ্চার ঘোষণা যে আমি আর তুমি মূলত এক, আমি আর আমরা মূলত একক বিন্দু থেকে বিশাল মহাবিশ্ব। এই ঐক্যের বিরুদ্ধে যারা বিভেদের প্রাচীর গড়ে- বিভাজনের বিষ ছড়ায়, চুম্বন তাদের জন্যও মধুপুরের রাস্তা খোলা রাখে। কারণ চুম্বন যেকোনো সীমারেখা, পরিসর ত্যাজ্য করে অনন্তের জলসাকে ধর্মজ্ঞান করে।

 

চুম্বন যেমন সত্য চুম্বনের আকাঙ্ক্ষা তেমনি আরেক সুসত্য। অচরিতার্থ চুম্বনের বাণীতে ভরপুর গল্প-কবিতা-নাটক-নভেলকেও সহস্র সেলাম; কারণ অক্ষরের কালো সীমা ভেদ করে তারা চুম্বনের দিকে, ভালোবাসার দিকে, চলিষ্ণু সভ্যতার দিকে আমাদের শতকণ্ঠে আহ্বান করেন। আর উপমহাদেশীয় প্রাচীন চিত্রে-ভাস্কর্যে চুম্বনের তীব্র চিত্রও তো এই ইতিহাসই সপ্রমাণ করে যে আমাদের ইতিহাস চুম্বনেরই ইতিহাস। চুম্বনরেখা ধরেই আমরা শাশ্বত মিলন-মৈত্রী ও মাধুর্য-মহলের সাক্ষাৎ পেয়েছি। সুতরাং চুম্বন আমাদের কাছে অবিকল্প প্রেমপুষ্পের নাম।

 

চুম্বনকে ঘায়েল করতে যারা আসে তারাই মৌলবাদ-তারাই সাম্প্রদায়িকতা-তারাই জালেম-তারাই গণশত্রু-তারাই পশ্চাতগামিতা-তারাই রণরক্তের উসকানিদাতা-তারাই অশান্তির গোলাবারুদ-তারাই সভ্যতা-ধ্বংসের অনুঘটক-তারাই ব্যক্তি তোমার শত্রু-তারাই ব্যক্তি আমার শত্রু-তারাই সমষ্টি মানুষের শত্রু।

 

চুম্বন মানেই শুধু মধুস্বাদ না, লবণস্বাদও গ্রহণ করা; গ্রহণ করে অপরকে এই স্বীকৃতি দেওয়া যে তুমি যেমনই হও তোমাকে স্বীকার করছি। এই স্বীকরণের ওপরই তো পারস্পরিক স্নেহ-শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তাই চুমুর গোলাপ কখনো অনাদরে ভেসে গেলে বুঝতে হবে মালঞ্চ দখল করে নিয়েছে কালো সাপ, বুঝে নিতে হবে ধরণীর দূরপ্রান্তে যুদ্ধ লেগেছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো বুঝে নিতে হবে মানুষ বড় কাঁদছে তবে মানুষ হয়ে তার পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। বিরহী যক্ষ যেমন উজ্জয়িনী প্রাসাদ থেকে মেঘদূত নামে চুমুর উড়ন্ত ফোয়ারা ছোড়ে তেমনি লক্ষ মানুষের জনজমায়েতের উদ্দেশ্যে প্রিয় নেতা-নেত্রী চুম্বনের প্রতীক প্রদর্শন করে তো এই বলে- আছি তোমার সাথে, আছি তোমাদের সাথে। খাদ্য নেই, শান্তি নেই, সুখ নেই এমন বিচিত্রবিধ হাজারটা নেই-এর ভিড়ে চুম্বন মানে আছি আর থাকা। তাই বেঁচে আছি মানে চুম্বনময় আছি। চুমু নেই মানে তো কঙ্কালগ্রন্থি হয়ে টিকে থাকা শুধু।

 

আমার অনুভূতিতে এভাবে প্রতিটি উত্তীর্ণ কবিতা মানে গভীর চুম্বন, প্রতিটি নৃত্যের ঢেউ মানে উত্তাল চুম্বন, প্রতিটি গানের সুর মানে চুম্বনস্রোত, প্রতিটি সার্থক ফিল্ম মানেই চুম্বনঝঙ্কার আর দ্যাখ এই ছাইপাঁশ লেখায় কলম-চালনা করতে দেখি কালি আর কাগজ পরস্পর চুম্বনে লিপ্ত। আমি কলম বন্ধ করছি তো শুরু সে হিমযুগের যেখানে চুম্বনের কোনো অবসর নেই।

দূরে থাক অচুম্বন, দূরে থাক অপ্রেম।

 

লেখক : কবি ও গদ্যকার

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ জুন ২০১৬/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC