ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ ভাদ্র ১৪২৪, ২২ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

‘তিন পয়সার জ্যোছনা’ ও কিছু স্মৃতি

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২৬ ৬:০২:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-১২-২৬ ৬:০২:০৮ পিএম

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : কোনো কোনো জীবন আছে, জীবনের চাইতে বেশি; যে জীবন কথা কয় নদীর মতো, চিরায়ত নারীর মতো, কথা কয় সময়ের সাক্ষী হয়ে খরস্রোতা শব্দের মতো। জ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, চিন্তা ও সাধনায় এমন প্রাণই ধারণ করে থাকে মহাজীবন, ধারণ করে এক একটি যুগ ও বটবৃক্ষের ঐতিহ্য।

 

আমাদের দেশে যাঁদের নাম কণ্ঠে উচ্চারিত হলে সমগ্র বাংলাদেশ বেজে উঠে, যাঁদের শব্দগাঁথুনীতে মজবুত হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সেতু; সৈয়দ শামসুল হক সেইসব বিরলপ্রাণদের একজন। তাঁর দৃষ্টির গভীরতায়, সৃষ্টির উদ্দামতায়, শব্দের মোহনরূপে মুগ্ধ হননি এমন পাঠক বোধকরি আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সৈয়দ হক তাঁর লেখা ও চর্চা এবং নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে কেবলই অনিন্দ সুন্দর আর ভালোবাসার সন্ধান মেলে।

 

একথা নতুন করে বলার কিছু নেই যে, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হক তাঁর লিখনশৈলীর মাধ্যমে পাঠকদের মনের অনেকটা স্থান জুড়ে আছেন। তাই তাঁর সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তি, জীবন-যাপন ও উদযাপন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ, পাঠক ও বোদ্ধাদের আগ্রহের কোনো কমতি না থাকাই স্বাভাবিক। বোধকরি, সেই আগ্রহী, তৃষ্ণার্ত শ্রেণির জন্যে সৈয়দ হকের ‘তিন পয়সার জ্যোছনা’ আত্মজৈবনিক গ্রন্থটি মরুভূমির উদ্যানের মতো প্রত্যাশিত ও বহুল কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি হয়েছে। সৈয়দ হক এ বইটিতে তাঁর সাহিত্যজীবনের বিপুল একটি অংশ তুলে ধরেছেন চমকপ্রদ গদ্যের প্রয়োগে। আত্মজীবনী হলেও উৎকৃষ্ট গদ্যের গুণে পাঠক এই গ্রন্থপাঠে জীবনীর চেয়েও বেশি কিছুর স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন। সব্যসাচী তাঁর এই গ্রন্থে যে গদ্যের প্রয়োগ করেছেন তা পাঠককে ঘোরগ্রস্ত করবে; পথচলার ও কথাবলার আনন্দকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

 

পূর্বেই বলেছি, সৈয়দ হক মহাজীবনের ধারক। স্বপ্ন বুনে বুনে তিনি স্বপ্নকে বাস্তব করেছেন, শব্দের পথে হেঁটে হেঁটে তিনি আজ সফল পথিক। তিনি তাঁর সাহিত্য জীবনে, অথবা সাহিত্যচর্চায় যাঁদের পাশে পেয়েছেন, যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছেন- তা এক কথায় বিস্ময়কর। মূলত, বাংলা সাহিত্য ও শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ খুব কম লোকই সেসময় বাকি ছিলেন, যাঁদের সাথে সৈয়দ হকের ঘনিষ্টতা, অন্তরঙ্গতা ছিলো না। কায়কোবাদ, ফররুখ আহমেদ, জসীমউদ্দীন, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, মুনীর চৌধুরী, জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, শওকত ওসমান, আনিসুজ্জামান, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, শহীদ কাদরী, ফজলে লোহানী, রশীদ করিম, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, সিকদার আমিনুল হক, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, বেলাল চৌধুরী প্রমুখ বরেণ্যদের সান্নিধ্য ও ঘনিষ্ঠতা যে সৈয়দ হকের সাহিত্যচর্চাকে উস্কে দিয়েছে, আলোড়িত করেছে, ধাবিত করেছে গোপন, গহীন সুন্দরের দিকে- একথা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়।

 

মূলত সৈয়দ হকের আবির্ভাব ও বিকাশের দিনগুলো কেবল তাঁর জন্যই নয়, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্যও এক অসাধারণ সময় ছিলো। সেই পঞ্চাশের দশকের শিল্প-সাহিত্যকর্মীরাই এ দেশের শিল্পাঙ্গনকে যেভাবে টইটুম্বুর করে উপহার দিয়েছে স্বর্ণালীসময়, পরবর্তী দশকের শিল্পী, সাহিত্যিকগণ সেভাবে আর দিতে পারেননি। সৈয়দ হক ‘তিন পয়সার জ্যোছনা’র মুখবন্ধে এরকম কথাই আমাদের জানান : ‘আমি ও আমাদের ছবিগুলো দেখে আমার মনে হয় এমন একটি দশক এই বাংলাদেশে আর কখনো আসেনি, আসবেও না। এই অর্থে আসবে না যে, সাহিত্য সঙ্গীত চিত্রকলা আর রাজনীতিতে একসঙ্গে এতগুলো প্রতিভাবানের অভ্যুত্থানও আর ঘটবে না, আবার এত অনেক প্রতিভাবানের বিনষ্টিও আমরা আগে-পরে আর কোনো দশকেই দেখব না।’

 

‘তিন পয়সার জ্যোছনা’ প্রথমত সৈয়দ হকের জীবনী হিসেবে বিশেষভাবে আলোকিত, দ্বিতীয়ত এ গ্রন্থে সব্যসাচীর বয়ানশিল্পও উল্লেখ করার মতো। লেখক কীভাবে গদ্যের কাব্যিক কারুকাজে তাঁর জীবন তুলে ধরেছেন এ গ্রন্থে, তার একটু নমুনা দেয়া যাক : ‘ছেদনের শব্দ পাই অবিরাম, জীবনের মাঠে ক্রিয়াশীল মহাকাল, কলম হাতে আমার সময়ের প্রায় সবাই এখন চলে গেছেন ঘাসের তলায়। ছেদন করে নিয়ে গেছে কালের কাস্তে, শুনতে পাই ছেদনের ধ্বনি অবিরাম, মধ্যরাতে, নিষ্করুণ সেই শব্দের গলা টিপে কবিতার ধ্বনি করে উঠি, নাটকের মঞ্চ আলোয় ঝলসে দিই করোটির ভেতরে, গল্পের মানুষগুলোকে সঞ্চার ও মুখরতা দেই।’

 

এমন দীর্ঘ দীর্ঘ লাইনে, নানা উপমায়, নানা ভঙ্গিতে সৈয়দ হক এঁকেছেন তাঁর ফেলে আসা জীবন, এঁকেছেন গনগনে সময়ের ইতিহাস।

 

‘তিন পয়সার জ্যোছনা’য় কেবল ধবল-জ্যোছনা জীবনের কথাই বর্ণিত হয় নি, বিধৃত হয়েছে কষ্ট, সংগ্রাম, আড্ডা, গল্প, রাগ ও অভিমান। সৈয়দ হকের এই আত্মজীবনীর মধ্য দিয়ে অনেক অজানা কথা উঠে এসেছে, যা পাঠকসমাজের কাছে স্বাভাবিকভাবেই অচেনা, অজানা। সৈয়দ শামসুল হকের লেখকজীবনের এ বয়ান পাঠকদের কাছে তাঁর লেখালেখি জীবনের বিচিত্রতা, সাধনা, নিরন্তর কষ্টসাধ্য চর্চাকে উন্মোচিত করবে। তাই প্রতিটি পাঠকেরই উচিত অন্তত একবার হলেও এই বইটি পাঠ করা, আর এর পঠন বাংলাদেশের শিল্পচর্চা ও  বহুবিচিত্র শিল্পীজীবন সম্পর্কে জ্ঞাত হবার জন্যই প্রয়োজন।

 

দুই.

এতোক্ষণ সৈয়দ হকের আত্মজীবনী নিয়ে কথা বললাম। ব্যক্তি সৈয়দ হককে নিয়ে দু-কথা বলতে চাই। কথাগুলো একান্তই আমার স্মৃতিকথা। তাঁর সাথে আমার ক্ষুদ্র কথাবার্তা। সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে কয়েকজন তরুণ কবির কাছ থেকে শুনেছিলাম-তিনি ভীষণ অহঙ্কারী মানুষ। তিনি তরুণদের খুব একটা সময় দেন না, তরুণদের সাথে মেশেন না। তরুণরা তাঁর বাসায় গেলে কখনো কখনো তাদের ঢুকতে পর্যন্তও দেয়া হয় না। দেখা করা বা কথা বলা তো দূরে থাক! এমন বহুমুখী অভিযোগ শুনে স্বাভাবিকভাবে বহুপ্রজ অগ্রজ এই লেখকের সাথে আমি প্রথম প্রথম যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি।

 

২০১৪ সালের বইমেলায় বাংলা একাডেমিতে যখন গেলাম, তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান স্যার কথায় কথায় বলেছিলেন, সময় ও সুযোগ পেলে ‘তিন পয়সার জোছনা’ বইটি একবার পড়ো। সৈয়দ শামসুল হকের আত্মজীবনী এটি। চাঁদপুরে এসে কলেজ লাইব্রেরিতে ঢুকে হঠাৎ একদিন বইটি পেয়ে যাই। নিবিষ্ট মনে বইটি পড়া শেষ হলে আমি অভিভূত হয়ে থাকি। আমার বিস্ময়, আমার ঘোর আমাকে জেঁকে ধরে। অসাধারণ গদ্য, অপূর্ব উপস্থাপনা আর বর্ণাঢ্য জীবন। এতো গুণী মানুষের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন যা বলার মতো নয়।

 

সৈয়দ শামসুল হক স্যারের মোবাইল নম্বরটি আমার কাছে আগে থেকেই ছিলো। ‘তিন পয়সার জোছনা’ পড়ে আমি আমার পাঠানুভূতি জানিয়ে তাঁকে মেসেজ করলাম। মেসেজের প্রতি উত্তর স্বভাবতই প্রত্যাশা করিনি। কারণ আমি নিতান্ত একজন তরুণ লেখক, আর তিনি মহীরুহ। তাছাড়া জানতাম তিনি অহঙ্কারী মানুষ। মাসখানেক সময় পার হলে আমি মেসেজ দেয়ার কথা ভুলে যাই। কিন্তু তিন মাস পরে হঠাৎ একটি মেসেজ পেয়ে আমি চমকে ওঠি। সৈয়দ হক স্যার বার্তা পাঠিয়েছেন। দীর্ঘ বার্তার শুরুতেই তিনি লিখেছেন : ‘ব্যস্ততার কারণে প্রতি উত্তর পাঠাতে দেরি হয়েছে। সেজন্যে তিনি দুঃখিত।’ পরবর্তীতে বই নিয়ে আরো বেশ কিছু কথা বলেছেন। আমি বিস্ময়বোধ করি এই ভেবে-সর্বজন শ্রদ্ধেয়, সব্যসাচী সৈয়দ হক এই প্রবীণ বয়সে খ্যাতির চূড়ায় বসে আমার মতো একজন নবীন লেখককে মুঠোফোনে দীর্ঘ মেসেজ পাঠিয়েছেন!

 

কতটা বিনয়ী হলে এই কাজ করা সম্ভব! সেদিন থেকে ব্যক্তি সৈয়দ হককে আমি ভিন্নভাবে জানা শুরু করি। এক মুহূর্তেই তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো কেটে যায়। এরই মধ্যে অনেকটা দিন এগিয়ে যায়। আমি গল্পের কাগজ ‘বাঁক’ সম্পাদনা শুরু করি। ২০১৫ তে বাঁকের প্রথম সংখ্যাটি সেলিনা হোসেনসহ আরো অনেক গুণী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং প্রশংসা কুড়ায়। জাতীয় সাতটি দৈনিকে ‘বাঁক’ প্রথম সংখ্যার আলোচনা ছাপা হয়েছিলো। দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ করতে গিয়ে ভাবলাম, সৈয়দ শামসুল হক স্যারের কাছে গল্প চাইবো। ভয়ে ভয়ে, কিছুটা সংকোচে তাঁকে কল দিলাম। রিং হচ্ছে... আর আমি ভাবছি-কী যে বলে! অবশেষে ফোন ধরলেন। আমার পরিচয় দিয়ে বাঁকের জন্যে লেখা চাইলাম। তিনি নরম কণ্ঠে বললেন, গল্পের কাগজ করছেন খুব ভালো কথা। বাংলাদেশে গল্পের কাগজ বেশি নেই। আপনাকে গল্প দিবো। তবে তার আগে বাঁকের প্রথম সংখ্যাটি আমি দেখতে চাই। পরের দিন তাঁর  ঠিকানায় প্রথম সংখ্যা কুরিয়ার করলাম। সপ্তাহ খানেক পর তাঁকে ফোন করেছি। বললাম, আমি অমুক।

 

তিনি বললেন, বাঁকের সম্পাদক!

আমি বললাম, জ্বি।

 

তিনি বললেন, কাগজটা ভালো হয়েছে। আমি গল্প দেব।

পরে তাঁকে আবার যখন ফোন দিলাম, তিনি বললেন, গল্প দেয়ার কথা তাঁর মনে আছে।

 

আমি বললাম স্যার, আপনি যদি বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাহলে আপনার লেখা আপনার প্রিয় একটি গল্পের কথা বলুন। সেটি আমি রিপ্রিন্ট করবো ‘লেখকের প্রিয় গল্প’ সাব-টাইটেল দিয়ে।

 

আমার কথা শুনে তিনি হাসেন। বলেন, যেই কাঙ্ক্ষিত গল্পটির জন্যে এতটা বছর গল্প লিখে এসেছি, সেই গল্পটি এখনো লেখা হয়নি। তাঁর কথা শুনে আমি ভাবি-সত্যিই তো! সবচেয়ে ভালো লেখাটি লেখার জন্যেই লেখক আমরণ লিখে যান! তারপর আরো একদিন কথা হয় তাঁর সাথে। আমাকে অবাক করে দিয়ে সেদিন তিনি বললেন, ফরিদ আপনি একদিন আমার বাসায় আসেন। গল্পের কাগজের সম্পাদকের সাথে গল্প নিয়ে কথা হবে।

 

ফোন রাখার আগে তিনি বাসায় যাওয়ার কথাটি আবারো রিপিট করেন। সৈয়দ হক সম্পর্কে আমার অনুরাগ আরো পোক্ত হয়। তাঁর আন্তরিক কথাবার্তায় আমি মুগ্ধ। কিন্তু সৈয়দ হকের সাথে আমার আর দেখা হয় নি। তাঁর বাসায়ও যাওয়া হয় নি। তাঁকে বলেছিলাম, স্যার, আমি আসবো। কিন্তু পারিবারিক কারণে সেসময়ে আর যেতে পারিনি। সৈয়দ শামসুল হক স্যারকে সামনাসামনি দেখতে পাইনি, তাঁর বাসায় যাইনি-এটি আমার জন্যে এক ধরনের দুর্ভাগ্য। ব্যর্থতা তো বটেই। এখন সেই গুণী মানুষটি নেই! আমি নিজের জন্যে অনুতপ্ত হই। তবে তাঁর ‘তিন পয়সার জোছনা’, ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘বোশেখে রচিত পঙক্তিমালা’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ পাঠের মধ্যে আমি তাঁকে প্রতিনিয়ত দেখি, তাঁর কলমী জাদু প্রত্যক্ষ করি।

 

সৈয়দ শামসুল হক-তিনি তো সাহিত্যের এক অমর জাদুকর, এক ইতিহাস, একটি জ্বলজ্বলে অধ্যায়।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা

Walton Laptop