ঢাকা, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪২৬, ১৯ এপ্রিল ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

দ্বিতীয় বউ-ও চলে গেল

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৯-২৫ ২:৫৫:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:১০:৩২ এএম

|| সাইফ বরকতুল্লাহ ||

বিএ পরীক্ষা দিয়েই ঢাকায় এসেছিল বাকের। আসার অবশ্য কারণও ছিল। আইএ পড়ার সময় প্রেমে পড়েছিল। জেরিনের প্রেমের জাদুতে পাগল হয়ে গিয়েছিল বাকের। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবারের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয় বাকের। বিয়ের পর কিছু দিন সুখেই ছিল তারা। বিএ ভর্তির সময় থেকেই বাকেরের জীবনে নেমে আসে অস্থিরতা। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। টিউশনি করে যে টাকা আয় হতো তা দিয়ে পড়াশোনার খরচ, হাতখরচ, জেরিনকে সামলানো- হিমশিম খেত বাকের। এ অবস্থা থেকে নিজেকে বদলাতে শুরু করে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে জেরিন। অবশেষে বাকেরকে ডিভোর্স দেয় সে। অভাব, বেকারত্ব, পারিবারিক সমস্যা, জেরিনের চলে যাওয়ায় বিমূর্ত হয়ে যায়। চোখে-মুখে শুধুই অন্ধকার দেখে বাকের। শেষে শোক সইতে না পেরে চলে আসে ঢাকায়।

ঢাকায় নতুন জীবন। নতুন পরিবেশ। শান্ত, প্রকৃতি আর মেঠো পথ গ্রাম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে নানা কৌশল করে বাকের। বিএ পরীক্ষার ফল বেরোল। দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে। খুঁজতে শুরু করে চাকরি। কিছুদিনের মধ্যেই পেয়ে যায় একটি পোশাক কারখানায় স্যাম্পল আনা নেয়ার কাজ। এভাবে একমাস পেরিয়ে গেল। প্রথম মাসের বেতনের টাকা দিয়ে একটা চৌকি কিনল। মিরপুরের রূপনগরে মেসে এতদিন মেঝেতে ঘুমিয়েছে। বুয়ার হাতের রান্না এই জীবনে আর কোনো দিন খায়নি বাকের। একদিন তরকারিতে লবণ বেশি তো আরেকদিন প্রচণ্ড ঝাল। সকালে বাথরুমের সিরিয়াল। রাত এগারটা বাজতেই লাইট অফ করতে হয় রুমের। এরকম পরিমিত বদ্ধ জীবন বাকেরকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।

শীতের সকাল। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না । রোজ রোজ অফিস আর ভাল্লাগে না। কিন্তু অফিসে না গেলে যে বেতন কাটা যাবে- এ চিন্তায় কিছুক্ষণ শুয়ে বিছানা থেকে উঠল। শীত হলেও আজকের সকালটায় একটু রোদ উঠেছে। বাইরে মৃদু বাতাস। সাথে মিষ্টি রোদ। সকালের নাস্তা খেয়ে বের হলো অফিসের উদ্দেশে।  

বিকেল ছয়টা। সূর্য পশ্চিম আকাশে অস্ত যাওয়ার অবস্থা। অফিস ছুটি হলো। কলিগরা সবাই বের হচ্ছে। বাকেরও সিঁড়ি দিয়ে নামছে। সিঁড়িতে নিচতলার কাছে আসতেই চোখে চোখ পড়ল এক তরুণীর। সিঁড়ি থেকে নেমে বাইরে বের হয়ে তরুণীকে বলল, ‘এক্সিউজ মি, আপনি কোন সেকশনে আছেন?’
তরুণী বলল, ‘আমি সাত তলায় সেলাইয়ের কাজ করি। আপনি?’
‘আমি স্যাম্পল আনা নেয়ার কাজ করি। আপনি কতদিন আছেন এখানে?’
‘আমি তিন বছর ধরে আছি এখানে।’
‘থাকেন কোথায়?’
‘মিরপুর মাজারের ওখানে। আচ্ছা আসি, বাস চলে যাচ্ছে।’
‘ওকে, বাই।’

রাতে বুয়া আসেনি। রান্নাও হয়নি। রুমের অন্য সদস্যরা বাইরে হোটেলে খেয়ে এসেছে। সারাদিন অফিস করে রাতে ক্ষুধায় ক্লান্ত বাকের। পকেটে বেশি টাকা নেই। হোটেলে খেতে গেলে কমপক্ষে পঞ্চাশ টাকা লাগবে। বেতন হবে বারো তারিখে। কী আর করা। চৌকির নিচে রাখা বয়ামটা বের করে চাল ভাজা খেতে শুরু করল। খেতে খেতেই ক্লান্ত শরীর টেনে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। পানিও আর খেতে ইচ্ছে হলো না। ঘুম নেমে এলো দু’চোখে।

শীতের উষ্ণ রোদের অলস দুপুর। অফিসে দুপুরের খাবার খেয়ে দশ মিনিট সময় হাতে আছে। অফিসের গেটের উলটো দিকটায় একটা চায়ের দোকান। কয়েকদিন ধরে বাকের এখানে দুপুরের খাবারের পর এক কাপ চা খেয়ে আবার অফিসে কাজ শুরু করে। আজ অফিসে কাজ করতে যেতে ইচ্ছে করছে না। হঠাৎ গতকাল কথা হয়েছিল; ঔ তরুণীর কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু কথা বলবে কীভাবে? চেহারা ছাড়া কিছুই জানেনা তার সম্পর্কে। অফিসে এসে দ্রুত কাজ শেষ করে ফেলল। আজ  দেখা করতে হবে ঔ তরুণীর সাথে। তরুণীর ভাবনা তার মাথায় চেপে বসে। বিভোর হয়ে তার কথাই ভাবতে থাকে বাকের। অনেকদিন মনটাকে রঙিন পৃথিবীর আভায় রাঙাতে পারেনি। কষ্ট কষ্ট জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। হঠাৎ বস তাকে ডাকল। বলল, ‘আজ বাইরে কাজ আছে, তাড়াতাড়ি বের হচ্ছি, তুমি কাজ শেষ করে যেও।’
বাকের বলল, ‘ওকে স্যার।’

অফিস শেষ করে গতকালের মতো সিঁড়ি দিয়ে নামতেই  ঔ তরুণী আজ প্রথম দেখল বাকেরকে। দেখেই জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো, আপনি?’
‘এইতো কেটে যাচ্ছে।’
‘আপনার হাতে সময় আছে, এক্ষুণি বাসায় যাবেন? চলেন চা খাই।’
‘আধা ঘণ্টা পরে গেলেও চলবে। চলেন।’

ওরা হাঁটতে হাঁটতে মিরপুর-৬ এর পাশ দিয়ে স্টেডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়াল। পাশে কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ ফুসকা ও চায়ের দোকান। ওরা ফুসকা খাচ্ছে। বাকের জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনার নামটাই জানা হলো না!’
তরুণী বলল, ‘আমি কিন্তু আপনার নাম জানি।’
‘কীভাবে?’
‘আরে বাবা নাম জানা কোনো ব্যাপার হলো। বাকের আপনার নাম।’
কিছুটা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে বাকের বলল, ‘আপনার?’
তরুণী জানাল জেরিন। ওমনি বাকেরের হাত থেকে ফুসকার প্লেটটা পড়ে গেল। শরীরটা কাঁপছে। হালকা বিষম খেল। এ সময় জেরিনও ভয় পেল। নাম জানার পরই বাকের বিমূর্ত। মাত্র দুইদিনের সাক্ষাৎ। যদি কিছু হয়ে যায়। নানা ভাবনা কাজ করছে জেরিনের মনে। ফুসকাওয়ালা বলল, ‘ভাই পানি খান, ঠিক হয়ে যাবে।’
পানি খেতে হলো না। কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হলো বাকের। একটু একটু রাতও বাড়ছে। ওরা চলে গেল দুজনের বাসায়।

বাসায় এসেই শুয়ে পড়ল। শরীর মন কোনোটাই স্বাভাবিক নাই। একটু শান্তি খুঁজে পেতে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত-এর মতো আবারও ঝড়। কে এই জেরিন? জেরিন তো চলে গেছে! মাথায় যেন সুনামী শুরু হয়ে গেছে বাকেরের। চোখ দুটো বন্ধ করে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করে। শীতের রাত। বাইরে তখন কুয়াশায় নিথর সময়।

রাত একটা পঁচিশ। চারদিকে সুনশান নীরবতা। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল জেরিনের। মাথায় চক্কর দিচ্ছে বাকেরের ওই ঘটনা। কী হলো ওর? ও এখন কেমন আছে, বাসায় ঠিকমতো গিয়েছে তো- নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ থেকে ছয় বছর আগের ঘটনা। এরকম এক ঘটনায় স্ট্রোক করে মারা গিয়েছিল পরাণ। পরাণের মৃত্যুর পর জেরিন ছয়মাস প্রায় পাগল ছিল। পাগল হবারই কথা। জেরিনের বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ বেঁচে নেই। পরাণকে  ভালোবেসে বিয়ে করে পৃথিবীতে সুন্দরভাবে থাকতে চেয়েছিল। হঠাৎ পরাণের মৃত্যু জেরিনকে এলোমেলো করে দিয়েছে। বর্তমান সময়ে সমাজের যে অবস্থা, তাতে একা একা বাস করা বড় কঠিন। নির্মম সত্য। জেরিন বাকেরকে ফোন দিল। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করতেই জেরিন বলল, ‘কী খবর বাকের ভাই, আপনি আমাকে তো ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। তাই ফোন করলাম। এখন শরীরের কী অবস্থা?’

জেরিনের ফোন পেয়ে বাকের কিছুটা বিমর্ষ। মৃদু কণ্ঠে বলল,‘একটু ভাল। তো আপনি আমার সেল নাম্বার কীভাবে পেলেন?’
‘ওসব পরে কথা হবে। আগে আপনি সুস্থ হন। শরীর ভালো হলে কাল অফিসে এলে কথা হবে।’

শীত হলেও আজ  সকালটা একটু অন্যরকম লাগছে। বাইরে রোদ। খুব একটা শীত লাগছে না। বুয়া সকালে এসে খিচুড়ি রান্না করেছে। খিচুড়িটা খেয়ে বাকের বের হলো অফিসের উদ্দেশ্যে। অফিসে গিয়ে সব কাজ এক ঘণ্টা আগেই শেষ করে নিচে চায়ের দোকানে গেল বাকের। এ সময় ফোন এলো। রিসিভ করতেই জেরিন বলল, ‘আপনি কোথায়?’
‘চায়ের দোকানে।’
‘থাকুন, আসছি।’

দুজনের আবার দেখা। দোকানের পাশ দিয়ে খালি রিকশা যাচ্ছিল। জেরিন রিকশা থামাল। তারপর দুজন উঠে রিকশাওয়ালাকে বলল, মিরপুর এক-এ যেতে। সেখানে প্রিন্স বাজারের পাশে এক রেস্টুরেন্টে ঢুকল। তারপর এক টেবিলে মুখোমুখি বসল দুজন। কথাপ্রসঙ্গে জেরিন জানতে চাইল কালকের সেই ঘটনার কারণ।

গ্রামের সহজ সরল অভ্যাসটা বদলাতে পারেনি বাকের। মায়াবী স্বভাবটা আজও  চাঙা হলো। জেরিনকে তার খুব আপন মনে হচ্ছে। কতদিন চলে গেছে, কেউ তো এমন করে কোনো কিছু জানতে চায়নি। জেরিনের কাছে কেন জানি নির্ভরতা খুঁজে পাচ্ছে। বাকের সব বলে দিল জীবনের পেছনের ঘটনা। জেরিন বাকেরের হাতটা ধরল। বলল, ‘তুমি আমার জীবনের সবকিছু জেনেছো, আমিও তোমার সবকিছু জানলাম। তাই সরাসরি বলছি,এ জীবনে বাঁচতে হলে সঙ্গী প্রয়োজন। তোমাকেই সঙ্গী করতে চাই।’

বাকের কী বলবে প্রথমে ভেবে পেল না। বুয়ার হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে গেল। কখনো তরকারিতে লবণ বেশি, কখনো ঝাল, আহা! কী যে যন্ত্রণা। এ রকম অনেক কিছু ভাবতে লাগল বাকের। এরপর কীভাবে যে কেটে গেল সাতটা দিন! ফোনে যদিও কথা হচ্ছিল দুজনার। কিন্তু কাজের চাপে দেখা করার সুযোগ হচ্ছিল না। সুযোগ মিলল শুক্রবার। তারা দুজন ঘুরতে গেল আশুলিয়া। ঠিক সন্ধ্যার সময় ওরা যখন আব্দুল্লাহপুর, তখন রাস্তার পাশেই একটা কাজী অফিস দেখতে পেল। জেরিন বাকেরকে নিয়ে ঢুকে গেল অফিসে। কাজী সাহেবকে বিয়ের আয়োজন করতে বলল জেরিন। বিয়ে হয়ে গেল।

জেরিন থাকে মিরপুরে। টিনশেড বাসায় একরুমে একাই থাকে। ওরা আব্দুল্লাহপুর থেকে সরাসরি জেরিনের বাসায় চলে আসে। বাইরে থেকে খেয়েই এসেছে। জেরিন মিষ্টি নিয়ে এসেছে। জেরিনের ছোট্ট একটা খাট। পরিপাটি বিছানা। কতদিন এই বিছানায় সে একা কাটিয়েছে। আজ অনেকদিন পর বাকেরকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় উঠে যায় সে। তারপর চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতে থাকে বাকেরের চোখ-মুখ, কপাল, ঠোঁট। এভাবেই কেটে যায় বাকেরের দ্বিতীয় বিয়ের প্রথম রাত।

সপ্তাহখানেক পর জেরিনের একটা কথায় বাকেরের মাথাটা আবারও চক্কর দিয়ে ওঠে।  কেন যে জেরিন বলল, ‘ধুর তুমি একটা ছাগল, তোমাকে বিয়ে করাটাই আমার ভুল হয়েছে।’ বাকের কথাটা মেনে নিতে পারে না। সে মনের কষ্টটা চেপে রেখে অফিসে যায়। অফিসে এসেও যে কাজে ভুল করে। বস ডেকে দুকথা শুনিয়ে দেয়। বাকের মাস শেষে জানতে পারে তার চাকরিটা আর নেই। কী হবে এখন? সংসারটাই বা চলবে কীভাবে? কেনই বা আবারও হুট করে বিয়ে করল সে? ইত্যাদি নানান চিন্তায় বাকের বাসা থেকে বের হয় না। প্রতিদিন বাসায় বসে থাকতে থাকতে শরীরটাও খারাপ হয়ে গেছে। জেরিনেরও আর সহ্য হচ্ছে না এভাবে বাকেরকে ঘরে বসিয়ে রেখে দুবেলা খাওয়াতে। অল্প বেতন। বাসা ভাড়া, সাথে বাকেরের খরচ। ত্যক্ত হয়ে ওঠে জেরিন। একদিন এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। এক পর্যায়ে রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে আসে জেরিন। বাকের অনেক ফোন করেও তাকে ফেরাতে পারে না।  যাকে বিশ্বাস করে সে ঘরে এনেছিল, সে কেন এভাবে কষ্ট দেবে? আর কোনো কষ্ট পেতে চায় না জেরিন এবং সে সিদ্ধান্ত নেয়, এখান থেকে মুক্তির পথ একটাই- ডিভোর্স।

বাকের সবকিছু হারিয়ে এয়ারপোর্ট রেলস্টেশনে চলে আসে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না সে। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কে তাকে খাওয়াবে? না কিছুই বুঝতে পারছে না। এ সময় স্টেশনে  চট্টলা এক্সপ্রেস এসে থামে। বাকের কিছু না বুঝেই ট্রেনে উঠে বসে। একটু পর ট্রেন ছেড়ে যায় গন্তব্যেরে উদ্দেশে। সেই ট্রেনে কোনো গন্তব্য ছাড়াই যেতে থাকে বাকের।




লেখক : গল্পকার, সাংবাদিক।






রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫/তাপস রায়

Walton Laptop
     
Walton AC
Marcel Fridge