ঢাকা, সোমবার, ১৩ চৈত্র ১৪২৩, ২৭ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

নির্লোভ ও নির্মোহ এক বিচারপতি

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-১১ ১১:১১:৪৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-১১ ১১:১১:৪৭ এএম
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

শাহ মতিন টিপু : বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন নির্লোভ ও নির্মোহ এক অবাক করা মানুষ। তিনি স্বস্তি বোধ করতেন প্রধান বিচারপতির পরিচয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব তিনি পালন করেছিলেন সত্য; কিন্তু এই ব্যবস্থাটিকে তিনি অপরিসীম ক্ষমতালিপ্সার প্রতীক বলে গণ্য করতেন। তিনি এটিকে ‘কণ্টকমুকুটশোভা’ বলে আখ্যায়িত করতেন।

বরেণ্য এই বিচারপতির মহাপ্রয়াণের তৃতীয় বার্ষিকী আজ। ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন। প্রধান বিচারপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এই দুটি পরিচয়ের বাইরেও তিনি সর্বজন গ্রহণযোগ্য  ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করেন। দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার উপযোগী রাজনৈতিক আবহাওয়া সৃষ্টির জন্য ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বও নিয়েছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন প্রণীত হওয়ার পর তিনিই প্রথম এ দায়িত্ব পালন করেন।

লেখক হিসাবে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমানের । নিরবে-নিভৃতে তিনি দুহাতে লিখে গেছেন। তার সেই লেখার পরিমাণ পাহাড়সম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ভার বইটিতে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উটকো দায়িত্ব গ্রহণ করতে আমি কোনো উৎসাহ বোধ করিনি। আমি এই দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করলে সংবিধানের ৫৮গ(৩) শর্ত অনুসারে আমার অব্যবহিত পূর্বে যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তাকে রাষ্ট্রপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারতেন। আমার অব্যবহিত পূর্বে প্রধান বিচারপতি ছিলেন সাহাবুদ্দীন আহমদ।’ তিনি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে গিয়ে তাকে এ দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। সাহাবুদ্দীন আহমদ জবাব দেন, তিনি দেখতে পাচ্ছেন দেশে ‘রক্তগঙ্গা বইবে’। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ‘ভারাক্রান্ত মনে’ ফিরে এসে গুরুদায়িত্বটি নেন।

দায়িত্বটি তিনি সুচারুভাবে পালন করেন, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা সুমধুর হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ তাকে সহ্য করতে হতো। কখনো তা সৌজন্যের ন্যূনতম সীমাও পেরিয়ে যেত। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিনি যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন না, এ অভিযোগ তুলে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া একবার তাকে উত্তেজিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আপনাকে আমরা ঘরে থাকতে দেব না, দেশেও থাকতে দেব না।’

সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে মে ১৯৯৬-এ। সেনাবাহিনীর ওপর কর্তৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ নাসিমের মধ্যে প্রবল দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। রাষ্ট্রপতি দুজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেন। একটি বক্তৃতায় এও বলেন যে, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করেই তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। বহু চেষ্টার পর নাসিম পরদিন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার সময় পান। সাক্ষাতের পর নাসিম ফিরে আসেন দ্বিগুণ উত্তেজিত হয়ে। সেখান থেকে তিনি সরাসরি আসেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের দপ্তরে।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নাসিমকে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং বোঝান যে, সেনাপ্রধানকে কোনো পরামর্শ দেওয়ার অবস্থায় তিনি নেই। তিনি বরং এখন গিয়ে দুপুরের খাবার খান এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে পরামর্শ করুন।এরপর ঘটনা গড়িয়ে চলে দ্রুতগতিতে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নাসিম অ্যাটাচড (ওএসডি) করেন চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে। সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এমন একটি পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর অস্থিরতার মধ্যে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অসামান্য ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। সব উপদেষ্টার সঙ্গে একত্রে বসে তাদের মধ্যে একাত্মতা গড়ে তোলেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তৃতায় দেশবাসী ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের শান্ত করেন। এই হচ্ছেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, যিনি সকল সময়েই গড়ার মানসিকতায় প্রোজ্জ্বল ছিলেন। আর তাই মহান বিচারপতি ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের অনেক শিক্ষনীয় রয়েছে।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নিরাশাবাদী ছিলেন না। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে পূর্ববঙ্গের অতীত ইতিহাসের গভীরে এ জনগোষ্ঠীর উত্থানের আকুতি তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তার প্রকাশিত-অপ্রকাশিত-অসমাপ্ত নানা লেখায় জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার রেখা আঁকতে চেয়েছেন। আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে এক লেখায় তিনি বলেছেন, ‘আমার দাদার বাবা ছিলেন একজন কৃষক, আমার দাদা কৃষক-কাম-সিল্ক ব্যবসায়ী এবং আমার বাবা একজন আইনজীবী। শিক্ষাই ছিল আমার একমাত্র পুঁজি।’

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। তিনি ছিলেন একাধারে ভাষাসৈনিক, কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ এবং আইনজীবী।

তার জন্ম ১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামে শিক্ষিত ও রাজনৈতিক পরিবারে। বাবা মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস আইনজীবী ছিলেন। জহিরউদ্দিন বিশ্বাস প্রথমে আঞ্জুমান এবং পরে মুসলিম লীগ আন্দোলনের সাংগঠনিক পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হাবিবুর রহমানের বাবা জাতীয় যুদ্ধ ফ্রন্টের বিভাগীয় নেতা ছিলেন। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে মুশির্দাবাদ ছেড়ে জহিরউদ্দিন বিশ্বাস রাজশাহীতে চলে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। হাবিবুর রহমানের মা গুল হাবিবা ছিলেন গৃহিণী।

হাবিবুর রহমানের সংসার জীবনে প্রবেশ ১৯৬১ সালে। বিয়ে করেন ইসলামা রহমানকে। স্ত্রী অধ্যাপনা করতেন। একমাত্র পুত্র সন্তান শাকিল বিন হাবিব জন্মের এক বছর পর ৬ আগস্ট মারা যায়। তিন মেয়ের মধ্যে বড় রুবাবা রহমান, মধ্যমা মেয়ে নুসরাত হাবিব ও ছোট মেয়ে রওনক শিরীন।

জীবনে সংবর্ধনা, সম্মাননা ও স্বীকৃতির অভাব নেই তার। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পান। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গবেষণা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে দক্ষ প্রশাসক পুরস্কার, ইব্রাহিম মেমোরিয়াল পুরস্কার, অতীশ দীপংকর পুরস্কার, হিউম্যান ডিগনিটি সোসাইটি থেকে সরোজিনী নাইডু পুরস্কার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার-২০০৫ এবং স্পেশাল কনট্রিবিউশন টু হিউম্যান রাইটস পুরস্কার পান। এছাড়া সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পান একুশে পদক-২০০৭।

লেখালেখির হাতেখড়ি আইন ব্যবসা শুরুর দিকে। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরের ২৯ কি ৩০ তারিখে বই লেখা শুরু করেন। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। তার গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে অভিধান, নানাবিষয়ে রবীন্দ্র উক্তি সংকলন, বচন- প্রবচন সংগ্রহ, বিষয়ানুযায়ী কোরানের উদ্ধৃতি বিন্যাস, বঙ্গের ইতিহাস সম্পর্কিত বই, বাংলাদেশের ঘটনাপঞ্জি এবং ভাষণের সংকলন।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রবন্ধ বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এর মধ্যে আছে- মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩), রবীন্দ্র প্রবন্ধে সংজ্ঞা ও পার্থক্য বিচার (১৯৮৩), কোরান সূত্র (১৯৮৪), রবীন্দ্র রচনার রবীন্দ্রব্যাখ্যা (১৯৮৬), রবীন্দ্রবাক্যে আর্ট, সঙ্গীত ও সাহিত্য (১৯৮৬), বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক (১৯৯৬), যথাশব্দ (১৯৭৪), বচন ও প্রবচন (১৯৮৫), বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক (১৯৯৬), তেরই ভাদ্র শীতের জন্ম (১৯৯৬), কলম এখন নাগালের বাইরে (১৯৯৬), আমরা কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে (১৯৯৬), বাংলাদেশের সংবিধানের শব্দ ও খন্ডবাক্য (১৯৯৭), বাংলাদেশের তারিখ (১৯৯৮), বং বঙ্গ বাঙ্গালা বাংলাদেশ (১৯৯৯), সরকার সংবিধান ও অধিকার (১৯৯৯), মৌসুমী ভাবনা (১৯৯৯), মিত্রাক্ষর (২০০০), কোরান শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ (২০০০), চাওয়া-পাওয়া ও না- পাওয়ার হিসেব (২০০১), স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন ও বোবার স্বপ্ন (২০০২), রবীন্দ্র রচনায় আইনি ভাবনা (২০০২), বিষন্ন বিষয় ও বাংলাদেশ (২০০৩), প্রথমে মাতৃভাষা পরভাষা পরে (২০০৪), রবীন্দ্রনাথ ও সভ্যতার সংকট (২০০৪), দায়মুক্তি (২০০৫), উন্নত মম শির (২০০৫), এক ভারতীয় বাঙালীর আত্মসমালোচনা (২০০৫), একজন ভারতীয় বাঙালীর আত্মসমালোচনা (২০০৫), কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ (২০০৬), শিক্ষাথী ও শিক্ষাদাতাদের জয় হোক (২০০৭), বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না (২০০৭), উদয়ের পথে আমাদের ভাবনা (২০০৭), যার যা ধর্ম (২০০৭), বাংলাদেশের তারিখ ২য় খন্ড (২০০৭), রাজার চিঠির প্রতীক্ষায় (২০০৭) এবং জাতি ধর্মবর্ণনারীপুরুষ নির্বিশেষে (২০০৭)। শিক্ষাথী ও শিক্ষাদাতাদের জয় হোক (২০০৭), বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না (২০০৭) ও স্বাধীনতার দায়ভার (২০০৭)।

তার কবিতাগ্রন্থ চারটি। এগুলো হলো : কলম এখন নাগালের বাইরে (১৯৯৭), মনের আগাছা পুড়িয়ে (১৯৯৮), সাফ দেলের মহড়া (২০০৪) এবং মানুষের জন্য খাঁচা বানিও না (২০০৭)।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তার কর্মকান্ড ও সৃষ্টির জন্য বাঙালী গণমানসে অনেক অনেক দিন জাগ্রত থাকবেন। যতই দিন যাবে সময়ের প্রয়োজনে তিনি আমাদের সামনে মূল্যবান ও গর্বিত উপমা হয়ে উঠবেন।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ জানুয়ারি ২০১৭/টিপু

Walton Laptop