ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আষাঢ় ১৪২৬, ১৮ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নীলগিরি পাহাড়ে সবুজের পুনরাবৃত্তি || অলাত এহ্‌সান

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৬-২৯ ১২:২৪:০৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:২৯ এএম
Walton AC 10% Discount

আচ্ছা, এই কথাটা কি আমি আপনাকে আগে বলেছি?

ইদানিং কি বিষম সমস্যা হচ্ছে যে আমার-আমি কাউকে কিছু বলতে পারছি না। বলতে গেলে মনে হচ্ছে-আরে! এ কথা তো তাকে আগেও বলেছি। নির্ঘাত কথা থেমে যায়। কিংবা কথা শুরুর আগেই বলে নিচ্ছি-আচ্ছা, এই কথাটা কি আমি আপনাকে আগে বলেছি? কী বেকুবের মতো প্রশ্ন। গভীর সমুদ্রগামী জাহাজকে পদ্মার চড়ে টেনে তোলার মতো ক্লান্তিকর। কথা বলার ফুর্তিই মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। কখনো বলতে বলতে মাঝ পথে খেই হারিয়ে ফেলি-তার মুখ চেয়ে কি মনে হলো, তাকে আবার জিজ্ঞেস করছি, আমি কি এই কথাটা আপনাকে আগে বলেছি?

 

উফ্, নিজের কাছেই বিরক্তিকর।

তিনি হয়তো স্বাভাবিকভাবেই বলেন-না। কিন্তু কেন যেন আমার মনে হয়, আমি তাকে বলেছি। নিশ্চিত বলেছি। এখন তার পুনরাবৃত্তি করছি মাত্র। ক্রমেই এই পুনরাবৃত্তির শঙ্কা আমাকে ভীত করে তুলছে। আমি মোটেই কিছুর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। এটা বিরক্তিকরভাবে অহেতুক সময় নাশ। আমাকে সব সময় তাড়া করে ফিরে-আমি আসলে জীবনেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলছি। কিন্তু জীবন এগুচ্ছে না-পিছুচ্ছে, সেই ভেদ মিমাংসা দুষ্কর।

আমি সবচেয়ে বেশি কথা বলি আমার রুমমেটের সঙ্গে। খুবই অন্তরঙ্গ মানুষ সে। আমার চেয়ে বয়সে বড়। বিবাহিত। বলতে পারেন, তার সঙ্গে সববিষয়ে আলাপ হয়। ছাত্র সময় থেকেই একসঙ্গে আছি। আমার এমন কিছু নেই তার সঙ্গে ভাগ করা হয়নি। আমার প্রথম বন্ধবীকে সুযোগ পেয়েও যে যৌন সম্পর্ক করা হয়নি, তাকে বলেছি। প্রেমের প্রতি স্বর্গীয় পবিত্রতা আর অপার্থিব ভাবনা থেকেই তা করা হয়ে ওঠেনি। সত্যি বলতে কি, এজন্যই প্রেমটা ভেস্তে গেল। আমার দ্বিতীয় বান্ধবী যে তলে তলে অন্য পুরুষকেও ভালবাসতে পারে, ছল করে সে রহস্য তিনিই উদ্ধার করেছেন। মায়, আমার হস্ত মৈথুনের খবরটা যার জানা, তার কাছে গোপন করার কি-ই-বা থাকতে পারে না?

 

ছাত্রত্ব ফুরানো মাত্র চাকুরিতে ঢুকে পড়লাম। (হ্যাঁ, চাকুরি-ই। দয়া করে আমাকে এখানে সংশোধনের চেষ্টা করবেন না যে, ওটা হবে ‘চাকরি’। আমাকে কাছে ওটা ‘চাকর-ই’)। তখন হলো কি, অফিস থেকে ফিরেই কাজ হয়ে দাঁড়াল, তার কান ভারি করা। সারাদিন অফিসে কি হলো তার ফিরিস্তি নিয়ে বসা। নেতিয়ে পড়া বয়সী মোষের পিঠে তরুণ ঘোরসাওয়ারের মতো বিরক্তিকর অনুভূতিতে ঠাসা। তিনিও মানুষ বটে। নতুন বৌয়ের মুখে সারাদিনের ঘর-দোর গুছানো থেকে শুরু করে কুটা-বাটার কাহিনী শোনার মতো ধৈর্য্য ছিল তার। তারপরও থেকে যেতেন একেবারে নির্বিকার। তিনি হয়তো ধরেই নিয়েছিলেন, নতুন বৌয়ের মতোই আমি তার জন্য মুখিয়ে থাকি। কখনো তিনি বিজ্ঞের মতো জিজ্ঞেস করতেন-অফিসে কাজের চাপ বেশি যাচ্ছে কি না। ‘নাকি কলিগদের সঙ্গে এখনো হয়ে ওঠেনি। বাসায় এসেও অফিসের আলাপ করিস।’-চোখে চোখ না রেখেই বলতেন তিনি।

 

তখন মনে হতো, সত্যি অফিসে আমি নূন্যতম কারো সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। বৃষ্টি দেখে বাড়ির দিকে মুখিয়ে থাকা গবাদির মতো আমিও তাকিয়ে থাকতাম আর ভেতরে ভেতরে ‘পরাণ-দুঃক’ ডাক ছাড়তাম। তার কথা শুনে বোকা বনে যেতাম-আমি কি এতটাই বাচাল! ‘প্রথম চাকুরি তো, এমন হবেই’-হয়তো তিনি আমার অবস্থা দেখে বলতেন, ‘আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। তখন অফিসের নাম নিতেই বিরক্ত লাগবে।’ সত্যি বলতে এখন আমার যেমন লাগে।

আমার সবকিছুতে তার সস্নেহ প্রশ্রয় তার। তবু কথা বলতে গেলে, প্রথমে শিরোনাম করি-এই কথা কি আপনাকে আগেও বলেছি?

‘না, বলিস নি’-তিনি হয়তো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘামে ভেজা স্যান্ডল গেঞ্জিটা ফ্যানের বাতাসে শুকাতে দিতে দিতে বলেন। কিন্তু পরোক্ষণেই মনে হতো, তিনি আমাকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়েই অহেতুক প্রশ্রয় দিচ্ছেন। করুণাও বা।

অনেক সময় কিছু না বলে এক সপ্তাহ-পনেরদিনের জন্য ভিন্ন জেলায় যেতেন অফিসের কাজে। ঠিক কতদিন মনে থাকলেও, তাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, বাসায় ফিরছেন কবে?

‘এই তো, দুই-তিন পর।’

 

যতবার এমন ফোন দিয়েছি, পুনঃপুনিক একই উত্তর। আশ্চর্য! তিনি যথা সময়ই ফিরে আসতেন। কিন্তু আমার মনে হতো-আমি ফোন দিলেই কেন এই ঘটনা ঘটে! এই দুই-তিনদিনের সময়ই কেন আমি ফোন দেই?

সেদিন কথা বলছিলাম অফিসের বসের পাসপোর্ট হারানোর ঘটনা নিয়ে। হঠাৎ করেই তার পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথাও না। অথচ তিনদিন আগেই ওটা আমাদের, ইন ফ্যাক্ট আমাকেই, দিয়েছিলেন অনলাইনে ইন্ডিয়ান ভিসা প্রসেস করার জন্য। যতদূর মনে পড়ে তা ফেরতও দিয়েছিলাম। কিন্তু স্বভাব মতো স্যার এতটা কনফিড্যান্টলি ব্লেইম করলেন যে, অস্বীকার করা উপায় ছিল না। এর দু’দিন আগেই তার প্রয়াত বিজনেস পার্টনারের ওয়াইফের পাসপোর্ট দিয়েছিলেন ভিসি ইন্ট্রির কাজে। বছর খানিক পূর্বে স্বামী মারা যাওয়ায় উত্তরসূরি হিসেবে ভদ্র মহিলাই এখন ব্যবসা সামলাচ্ছেন। স্যারই তাকে নানাভাবে সাহায্য করছেন। আগে থেকে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকেন। তখন থেকেই তাদের সম্পর্ক নিয়ে ইন-হাউস অনেক রসায়ণ প্রচলিত আছে। ইনফ্যাক্ট, স্যারের বিজনেস পার্টনারের অকাল মৃত্যু নিয়ে তার স্ত্রী ও স্যারের যোগ সূত্র আছে বলে-বাইরে কানা-ঘুষা আছে। কিছু পত্রিকায়ও লিখালেখি হয়েছিল। এ সব আমার রুম মেট আগে থেকেই জানতেন। আমি ওসবে তেমন পাত্তা দিতাম না।

 

এখন একটা বিজনেস সামিটে অংশ গ্রহণ করার জন্য স্যার ও ভদ্রমহিলা ইন্ডিয়া যাচ্ছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে স্যারের পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না। খোয়া গেল কী! তাহলে কী উপায়? স্যার তখন কঁচুকাটার মতো কথায়-কথায় এর-ওর চাকুরি খতমের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা সবকিছু তন্ন তন্ন করে খুঁজছি। সরকারের সরবরাতকৃত ওই নসিহতনামাই হয়ে ওঠেছিল আমাদের চাকুরি বাঁচানোর পাসপোর্ট। এমনকি যেখানে সারা অফিসের ঝাড় দেয়া ময়লা ফেলে, মুখে মাস্ক সেঁটে তাও খুঁচিয়ে দেখলাম। স্যার নিজেও এ-ও জায়গায় ফোন দিচ্ছেন। শেষ ভরসা, বাসায় ফোন করে নিশ্চিত হলেন সেখানে নেই। ফোন করতে করতে ব্যাটারির চার্জ ফুরালে চার্জে বসিয়ে এসে ফুল চার্জে যাচ্ছে তাই বলে যাচ্ছেন স্যার। শেষ পর্যন্ত রিসিভশনের ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠলো পুরনো আর বিদঘূটে শব্দে। স্যারকে ডেকে দিলে দৌড়ে গিয়ে ফোনের ওপাশ থেকে কী শুনলেন-একদম ঠাণ্ডা। নিজের চেম্বারে ফেরা আগে খানিক বিব্রত ও বিরক্তি চড়ানো মুখে শুধু একবার আমাদের রুমে উঁকি দিয়ে ধমকে গেলেন, ‘আর খুঁজতে হবে না আপনাদের। এবার কাজে মন দিন। যত্ত্সব অপদার্থের দল।’

‘ওই পার্টানারের ওয়াইফ ফোন দিয়ে তাকে বললো-ভুলে গতরাতে তার বাসায় পাসপোর্টটা ফেলে গেছে, তাই না’- আমার রুমমেট বললেন।

‘এই ঘটনা আপনাকে আগে বলেছি, বলেনি কেন?’- আমি খানিক উষ্মা ঝড়ালাম।

হাসতে হাসতে তিনি বলেন, একটা ছোট্ট হিসেব কষেই বলতে দিয়েছেন। তার কথায়- অফিসপাড়ায় এসব নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু আমার দুঃখ হয়, তিনি আমাকে নিয়ে রসিকতা করছেন।

‘তা, তোর সেই সুন্দরী কলিগের কি খবর, প্রতিদিন সকালে যে তোর জন্য বাসস্ট্যান্ডে রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করতো।’ প্রসঙ্গ এড়াতেই হয়তো তিনি বলেন।

আমি সে অফিস ছেড়ে দিয়েছি আগেই। আমার কাছে তা রীতিমতো কনডেম সেল মনে হতো। সেটা ছেড়ে দুইমাস এপাশ-ওপাশ ঘুরে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ঢুকেছি। এখানে কারো সঙ্গে কোনো কথা বলারই সুযোগ নেই। বড় প্রতিষ্ঠান, সবাই সো-প্রোফেশনাল। কলিগের সঙ্গে কথা মানে গুপ্তচড় বৃত্তি, নয়তো কৌশলে পিছিয়ে পড়া। বাসা থেকে বয়ে আনা এ্যালিমিনিয়ামের ওয়াটার ক্যানে ফ্রেস পানি বা গরম কফি আর মিনি টিফিন বক্সে আনা নুডুলস কিংবা পিওন দিয়ে আনানো স্যান্ডুইজ-বার্গার খেতে খেতে কম্পিউটারের মনিটরে এক ধিয়ানে তাকিয়ে থাকে। খুব বেশি হলে ফেসবুক চ্যাটিং, কালব্রিজ কিংবা শেয়ার বাজার ফলো করা। নয়তো ঘাড়ও নাড়বে না।

 

আমার এখনো কথা বলার জায়গা বলতে ওই রুমমেট বড় ভাই। আর এই শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরের মফস্বলে মা। দু’জনের সঙ্গে আমি এতো কথা বলেছি যে, প্রতিটা কথার আগে আমাকে ভাবতে হয় নতুন কিছু আছে কি না। এর বাইরে আমার বন্ধু-বান্ধবও নেই তেমন। পড়ালেখার পাঠচুকিয়ে সবাই কর্মজীবনে ব্যস্ত। মফস্বলের স্কুল বন্ধুরা বিয়ে-সাদি করে দস্তুর সংসারি। তাদের জীবনযুদ্ধ এতোটাই যে, কে আমার এই ‘চান্দে পাওয়া’ ফ্যাসাদের কথা শুনতে চাইবে?

একবার প্রায় রুদ্ধশ্বাসে মা’কে বলছিলাম- জানো মা, আমার খুব মনে পড়ে নানা বাড়ি কথা। মা কোনো শব্দ না করেই সব শুনেন, মুগ্ধ শ্রোতার মতো। এখনো, আমার সব কথায় শিশু-মুখে আধো আধো বোলের মতো মা’র অপার বিস্ময়। এটা ছিল এক আগমনী বর্ষায় একবেলায় বিশাল এলাকার সঙ্গে নানার জমিদারি তাল্লুক পদ্মার গর্ভে তলিয়ে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা।

পরোক্ষণে মা হেসেই বুঝিয়ে দেন, ওটা তার বাপের-বাড়ি ভাঙার ঘটনা। আক্ষরিক অর্থেই, মা’র কাছে মামাবাড়ির গল্প। আমি তখন খুব ছোট। ‘তোকে আমি নিয়ে না গেলে তুই গেলি কি করে! অতটুকু কালের কথা তোর মনে থাকার কথা না। তুই তো তখন থাকিস সবার কোলে কোলে।’-মা বলেন সহমর্মী আর স্মৃতিকাতর কণ্ঠে।

 

সত্যিই তো, আমি লজ্জা পাই। হয়তো মা’র কাছ থেকেই শুনেছিলাম ঘটনাটা। মা’র কোথাও যাওয়ার নেই ভেবে যখন কোনো কোনো সন্ধ্যায় ঘরের দক্ষিণের দরজা খোলা রেখে হাতেবোনা জায়নামাজের ছোট্ট পাটিতে পা বিছিয়ে বসে তার মৃত বাবা-ভাই আর তাদের স্মৃতিমেদুর বিশাল বাড়ির জন্য চাপা স্বরে গীত করে কাঁদতেন। তখন হয়তো তার পাশে বসেই আমি এইসব শুনেছি। কিন্তু এখন তা আমার চোখে তা এতো দৃশ্যময় যে, জিব্রাইলের হাতে মুকাদ্দাসের রিপ্লেকা দেখে তার দরজা-জানালা-জানালার পট্টা-সিক গুণে গুণে বলে দেয়ার মতোই সহজ। অথচ অফিসের ফাইল কবে কোথায় রাখি কিছু মনে থাকে না।

কয়েক দিন আগে যেমন; অফিসের বস্ সকাল সকাল সব স্টাফ ডেকে হিসাব ফাইল চেয়ে বসেলন-‘হিসাবটা কমপ্লিট হয়েছে?’ তল করা চোখ আর শ্লেষ ভরা কণ্ঠে যার যার ফাইল আনতে বললেন। আমি ছিলাম খুবই আনন্দিত ও সুখী। কারণ আর সবার ফাইল ইনকমপ্লিট থাকলেও আমারটা শেষ হয়েছে যথা সময়ের আগেই। কিন্তু ডেস্কে ফিরে চট করে তা পেলাম না। তারপর শুরু হলো ড্রয়ার, ডেস্ক, সেলফ সব উলট-পালট করা। পেলাম না তাতেও। মানুষের যেমন অনুভব-কাজের সময় কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না, চোখের সামনে থাকলেও পাওয়া যায় না-তেমনই মনে হচ্ছিল। অনেকটা সময় চলে গেল। এসি রুমে রীতিমতো ঘেমে গেলাম। কয়েকবার হয়তো বসের পিয়ন ডেকে গেছে, খেয়াল নেই। শেষ পর্যন্ত বস আমার ডেস্কে এসেই যা-ইচ্ছে-তাই বলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে দু-একজন কলিগও স্বর মিলালো-আমি স্ট্যান্ডবাজি করে সবাইকে অপমান করেছি।

হায় খোদা! আমি কি করে তাদের বোঝাই যে, আমি কেবল ভুলে যাওয়ার ভয়ে একটু কষ্ট হলেও আগে-ভাগে ফাইল কমপ্লিট করেছি। তাদের মোটেই অপমান করতে চাইনি। কোনো স্ট্যান্ডবাজিও করিনি আমি। ফাইলটা চূড়ান্তভাবে হারানোর অভিযোগে কি অপদস্থই না হতে হয়-ক্রমেই আমার ভেতর ভয় জেগে উঠতে লাগলো। তার চেয়ে বড় কথা, কলিগরা প্রতিশোধ হিসেবে-ফাইলটা আমি অন্য কোম্পানিতে গোপনে চালান করে দিয়েছি-রটিয়ে সবটুকু ক্ষোভ মেটাতে চাইতে পারে।

 

ধপ করে নিজের আসনে বসে পড়লাম এক নাদা গোবরের মতো। ঠিক তখনই নজরে এলো, ভুলে যাওয়ার ভয়েই ফাইলটা আমি ডেস্কের সামনের বোর্ডে হেলান দিয়ে রেখেছিলাম। ফাইল নড়া-চাড়া ঠেলা-ধাক্কার কোনো অলক্ষুণে মুহূর্তে তা কম্পিউটার মনিটরের পেছনে হেঁদিয়েছে, খোঁজার সময় বিলক্ষণ চোখে পড়েনি। রোগি মারা যাওয়ার পর ডাক্তারের আগমন-কোনো শ্রাদ্ধেও লাগলো না। কেননা আমাকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই, ততক্ষণে বস অফিসের বাইরে গেছেন। আসতে দেরি হবে। এখন আগবাড়িয়ে কলিগদের বলাও হবে জ্বলন্ত চুলায় লবণ ছিটিয়ে পোড়ার পিরপির শব্দ শোনা।

চুপ-চাপ বসে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে অফিস সংলগ্ন লেকের জল দেখতে দেখতে সহকর্মীদের বিজয়ী দৃষ্টি আর ভৎর্সনা উপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু এতে যে শেষ রক্ষা হবে না, তা ততক্ষণে বুঝে গেছি। বিকেল ঘনিয়ে আসতেই লেকের জলে সূর্যের কনে দেখার আলো নেমে এসে চিক চিক করছিল। লেকের দুই মুখই বন্ধ। পানিও পঁচে নীল হয়েগেছে। গন্ধ ছড়াচ্ছে বিশ্রী রকম। নিশ্চিতভাবেই সেখানে মাছের বংশ থাকার কথা না। এখন কীট-পতঙ্গের অভয় আশ্রম। তবে আমার কাঁচে মোড়া অফিসের ভেতর থেকে সেইসব জুররত আমলে না আনলেও চলে। বরং হালকা বাতাসে জলের দৃদু ঢেউ বেশ উপভোগ্য। থিতিয়ে পড়া ক্ষুধার পর ঘুমের ভেতর সৌন্দর্যের মতো এইটুকু নৈসর্গ সহজেই হৃদয়ঙ্গম করা যায়। বিহ্বল দুঃখের পর তা অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে। আসলে পানি পঁচে যাক আর দুর্গন্ধ ছড়াক, যতক্ষণ সে তরল থাকবে তাতে ঢেউ উঠেই। তখন হেলে পড়া সূর্যের সোনালী আলো মৃদু ঢেউ তোলা জলের বুকে পড়লে মনে হবে, ঝাঁক ঝাঁক পুঁটি একসঙ্গে জলের ওপর লেজ বল্টে ডুবে যাচ্ছে।

 

সূর্যের আরেকটু ঢলে পড়া আলোর প্রলম্বিত একটা রেখা আমার শরীর ও ডেস্কের ওপর পড়লে হঠাৎ করে আমার মনে হয়-আজ আর কোনো কাজ নেই, আজকে মতো আমার ছুটি। অনেকবার বলার পরও চাকুরির প্রথম বছরের ছুটিরহিত বিধানের কারণে, বারবার প্রত্যাখাত হওয়া সাতদিন ছুটির আবেদন আজই মঞ্জুর হলো। আগামীকাল থেকে টানা সাতদিনের ছুটি আমার।

মুহূর্তেই মনটা নেচে উঠলো। এই ছুটিতেই বহুবার দিন করেও না যাওয়া প্রতীক্ষিত বিরিসিঁড়ি বা নীলগিরি ঘুরে আসা যাবে। টিকিট তো সেই কবেই কেটে রেখেছি। তারিখ বদলে বদলে কত দেরি হয়েগেছে আমার। এবার আর মিস হচ্ছে না। পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে নীলগিরি এতটাই সবুজ মনে হয় যে, এখানে পা গেঁড়ে সারাজীবন নিঃসঙ্গ থাকা যাবে। এখানে আত্মহননও সুখের, উপভোগ্য।

 

ব্যাগ কাঁধে তুলে চট করে বেড়িয়ে পড়লাম। এক্ষুণি অফিস টু মহাখালী। সেখান থেকে ডাইরেক্ট নীলগিরি। বেরুতে গিয়ে রিসিপশনের মুখেই বসের সঙ্গে দেখা। তার টেবিলে রাখতে যাওয়া ফাইলটা দ্রুতই মেলে ধরে বললাম-‘স্যার, রাতের বাসে বান্দরবান যাচ্ছি। সাতদিন নীলগিরিতেই কাটাবো।’

ছৌ-নৃত্যের মতো চোখটা ফাইলের এই পাতা-ওই পাতা করে তার মনে হলো, তখন তাকে অহেতুকই উত্তেজিত হতে বাধ্য করেছি। এটা একধরনের প্রতারণা। যার জন্য সে সবার সামনে আমাকে অমন অশ্রাব্য গালি-গালাজ করতে বাধ্য হয়েছেন, যা ঠিক তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একেবারেই যায় না। আমি তার সরলতাকে আঘাত করেছি।

 

‘কে আপনাকে ছুটি দিয়েছে? কখন?’-আমার ভাবনা ভেঙ্গে তিনি ততোধিক চিৎকারে বলে উঠলেন। শ্রেফ একটা পাহাড়ি মোরগের ডাকে শান্ত জনপদের ঘুমে ভেঙে যাওয়া মতো সবাই ততক্ষণে আমার পেছনে এসেছে দাঁড়িয়েছে।

‘স্যার আজই। নোটিশ বোর্ডে ছুটির তালিকায় আমার ছুটির কথাই তো স্পেশ্যালি লেখা আছে।’-ব্যাগটা কাঁধ বদলাতে বদলাতে আমি অফিস ক্রাইটেরিয়ার হাসি ঝুলিয়ে বলি।

‘ননসেন্স’-পুনরায় চিৎকার উঠেও কিছুদিন আগে তার হার্টে ব্লকে ধরা পড়ায় তিনটা রিং পড়ানোর কথা মনে করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেন। ‘ইউ আর রাবিশ।’ গর গর করে তার বেরিয়ে এলো, ‘এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেন নির্বোধ, এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও।’

আমার ভেতর ছুটির আনন্দ। ইন্টারনেটে নীলগিরির ছবি এতবার দেখেছি যে, নামটা মনে পড়লেই গায়ে পরাগমাখা মৌমাছির মতো ভেতরে সুর বেজে উঠে। আজ সেই প্রার্থিত সবুজের ভেতর চড়ুইয়ের মতো হুটোপুটি দেব! মহাখালী বাস্ট্যান্ড থেকেই বান্দরবানের গাড়ি পাওয়া যায়। আর টিকিট তো কাটাই আছে। এবার উঠে পড়লেই হয়।

‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার’-বলেই বেরিয়ে পড়লাম উচ্চশব্দে দরজা বন্ধের শব্দ পেছনে রেখে।

আমি মহাখালী দাঁড়াতেই নীলগিরিগামী একটা বাস ছেড়ে দিচ্ছিল। হায়, এর টিকিটই তো কতদিন ধরে জমিয়ে রেখেছি।

‘নীলগিরি বান্দরবান

সবুজের আমন্ত্রণ’

 

আরে! বাসের কনট্রাক্টরও ছড়া কাটে। চমৎকার। অমন সবুজের আবাহনে পাতায় পাতায় মিলিয়ে যে কেউ ছন্দ মিলাতে পারবে। বাসের পা-দানিতে দাঁড়ানো কনট্রাক্টর আমার দিকে স্লো-মোশনে হাত নাড়িয়ে ধীরে গাড়িটা ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তার পেছনে দৌড়াতে শুরু করলাম-আমি বান্দরবান যাবো, নীলগিরি যাবো-টিকেট হাতে তুলে নাড়তে নাড়তে বলি। বাসটা যখন রেলক্রসিংটা পার হলো, অমনি, রেলের সিগন্যাল-বার নেমে এলো আকাশ দানোর মতো। রেল আসছে। আমি এই পাশে দাঁড়িয়ে। আর ওই পাশে বাসে যাত্রী তুলছে আর কনট্রাক্টর ছোকড়াটা আমার দিকে তাকাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে গাড়িটা নন-স্টপ ছেড়ে যাবে। আমার ভেতর বিষন্নতার ঢেঁকুর উঠে সব ছেয়ে গেল তেঁতো ঝাজে, সঙ্গে স্নায়ু চাপও।

ট্রেনের হুঁইসেল শুনতে মনে পড়লো, বিষন্নমুখ-বুকের ভেতর দিয়ে একটা আবছা ট্রেন চলে যায় পরাবাস্তবতার মতো। তারপর সব স্বাভাবিক হয়। অনেকবার সিনেমায় দেখেছি। অনির্ণিত তালে মৃদঙ্গের ধ্বনি বেজে উঠলো মনে। অদ্ভুত সাহস আসে। তখন বসে থাকলে চলে না। রেলক্রসিংয়ের সিগন্যাল ম্যানের ডাক, স্টপ বার উপেক্ষা করা তখন নস্যি ব্যাপার। অমনি মনে হলো, আরে! এই ঘটনা তো আগেও ঘটেছে। একটা জবরজং জান্তব ট্রেন আমার শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল মস্তিষ্কে।

 

লোকজন দ্রুতই ছুটে এসে আমার হাতে টিকিটের মতো ভাঁজ করা একবছর আগের তারিখের রিজাইন লেটার থেকে অফিসের নাম আর প্যান্টের পকেটে দুমরানো মানিব্যাগের ভেতর ভিজিটিং কার্ড থেকে অফিসের নাম্বারে কল দিলো। আমার সাবেক হয়ে যাওয়া কলিগরা কেবল তখনই খেয়াল করলো, বোর্ডে ঝোলানো নোটিসে লেখা-‘যথাসময়ে অফিসের কাজ সম্পন্ন না করা ও মিথ্যাচারের জন্য সাইয়াদুল ইসলামের আগামী কাল থেকে পরবর্তী সাত মাসের সব ছুটি বাতির করা হলো।’

এবার বলুন, এই ঘটনাটা কি আপনাদের বলিনি?

নিশ্চয়ই বলেছি। লোকমুখে, ঘনিষ্ট সূত্রে কিংবা পত্রিকার সুবাদে আপনাদের জানা এমন ঘটনার মানুষটাই আমি কি না, মিলিয়ে দেখেন নি কখনো, এই যা। বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, সত্যি বলছি ঘটনাটা আমারই। নীলগিরির অমন গাঢ় সবুজের বাসিন্দা আর বিগত প্রাণের আত্মারা কখনো মিথ্যে বলবে না। যদিও, আগের কথাটার সঙ্গে এবারের কথাগুলো রকম ফের করে বলে থাকবো।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ জুন ২০১৬/এএন/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge