ঢাকা, বুধবার, ১২ আষাঢ় ১৪২৬, ২৬ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রসঙ্গটি বিব্রতকর || রুমা মোদক

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৭-১০ ৫:৫৬:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:০৫ এএম
Walton AC 10% Discount

সেইবার ভোটাভুটি হয়েছিল।
সেইবার? সেইবার মানে কোনবার? এত দিন-তারিখের হিসাব তাদের জানার দরকার কী বাপু! বছরের পর বছর যায়, কখন ভোট হবে তার খবর জানার কোনো দরকার তাদের পড়ে না। তবে ভোট এলে গ্রামে ক্যান্ডিডেটদের আনাগোনা বাড়ে, দলে দলে ক্যানভাসার আসে, দরকার না পরলেও তারা ঠিক জেনে যায় ভোট এসেছে। সেইবার ভোটের দিন সকাল সকাল পঞ্চায়েত পুকুরে ডুব দিয়ে তেলে-সিন্দুরে-স্নো-পাউডারে সেজে কোলের গেদাগুলোকে নিয়ে তেমুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে লাইন ধরে ভোট দিয়েছে তারা। পুরুষদের এক লাইন, নারীদের আরেক। গেদা ভোট দেয়ার জন্য স্কুল মাঠে গড়াগড়ি দিয়ে কান্না শুরু করলে, পোলিং অফিসারের কাছ থেকে তার আঙুলে কালির ছাপ দিয়ে ‘এইডাই ভোট’ বলে পাশের দোকান থেকে চিপস কিনে বাড়ি ফিরেছে তারা।
নারীরা আগে টিভি ছেড়ে তারপর রান্না চাপিয়েছে কাঠ-কয়লার উনুনে। ভোট বলেই টিভিতে আজ সিনেমার গান আর সিনেমা দেখতে দেখতে হাঁড়িতে চাপানো ডাল পুড়ে গেছে। কী আর করা! প্রতিদিন তো টিভিতে দিনভর সিনেমার গান আর সিনেমা হয় না। গেদার বাপও টিভি পর্দায় চোখ রেখে ঠিক পোড়া ডালই খেয়ে নেয়।

এই পর্যন্ত ভালোই কাটে দিনটি, কিন্তু গোল বাধে সন্ধ্যার পর, ভোটে কে হারে কে জেতে কে জানে? হল্লা করতে করতে পোলাপানের দল পাড়ায় ঢুকে প্রথমেই মন্টুদের ঘরে আগুন দেয়। গণশাদের সাদাকালো টিভি আর আমকাঠের মিটসেফ ভেঙে টুকরা টুকরা করে। নিয়তির চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলে- রাতভর চলে তাণ্ডব।
(বিব্রতকর প্রসঙ্গটির সাথে এ প্রসঙ্গটি আপাতভাবে অপ্রাসঙ্গিক বোধ হলেও, প্রসঙ্গটি যে প্রাসঙ্গিক গল্পের অন্তে পাঠক তা হয়তো উপলব্ধি করবেন।)

অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দু’জনের কথাগুলো শুনে ফেলে মোনা। কথা শোনার জন্য ও মোটেই কান পেতে ছিল না। কানে আসাটা নেহাতই কাকতালীয়। পার্বতী যখন রাজলক্ষ্মী দেবীর কাছে কথাগুলো বলছিল, মোনার তখন বাড়িতে থাকার কথা নয়। ও, নিশি আর দ্যুতি বেরিয়েছিল হাঁটা দূরত্বে খ্রিষ্টান মিশন দেখতে- ইংরেজ আমলের কীর্তি, অপূর্ব স্থাপত্য। বাথরুম চেপেছে বলে নিশি দ্যুতিকে রেখে বেড়ানো সংক্ষিপ্ত করে ফিরে এসেছিল মোনা। কিন্তু এ কথা জানা ছিল না তাদের দু’জনের কারোরই- পার্বতীরও না, রাজলক্ষ্মী দেবীরও না। জানা থাকলে তারা এ মূহূর্তে প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলত না, এটা নিশ্চিত জানে মোনা।

না, এই জানাটা দু’দিনে ঠিকঠাক মতো চিনে না ওঠা এ বাড়ির বাসিন্দাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ভরসায় নয়, বরং যে প্রসঙ্গ নিয়ে ওদের আলোচনা, প্রসঙ্গটা এতই বিব্রতকর যে, মোনা স্বাভাবিক বিবেচনায়ও বলতে পারে, অন্তত মোনাকে শুনিয়ে এ কথাগুলো বলার মতো কুরুচিসম্পন্ন মানুষ তারা নয়। একজন ছাড়া বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে মাত্র দু’দিন। যে একজনের সম্পর্কের যোগসূত্রে এ বাড়িতে আসা, বাড়ির সদস্যদের সাথে পরিচয়, তার সাথে মোনার সম্পর্কের গভীরতা যে কত গভীর তা অশীতিপর বৃদ্ধা রাজলক্ষ্মী দেবীকে ঠিকঠাকমতো বোঝানোর ব্যাপারে কোনো ত্রুটি ছিল না পার্বতীর। আর এজন্যই সত্যের সাথে মিথ্যার মিশেল নিয়ে খানিকটা অশ্লীলতার রং মিশিয়ে পার্বতী যখন কথাগুলো বলছিল তখন দমবন্ধ ঘরে মোনার নাক কান দিয়ে গরম বাতাস বের হচ্ছিল।

রাজলক্ষ্মী দেবী এ বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ কর্ত্রী। তাঁর নামানুসারেই এ বাড়ির নাম- রাজলক্ষ্মী। তিনি যে কোনো প্রশ্ন করে পার্বতীকে উৎসাহিত করছেন, এমনটি বোধ হয়নি মোনার। তবে সে মূহূর্তে তাঁর মুখাবয়বটি দেখার কোনো উপায় ছিল না বলে তাঁর সত্যিকারের প্রতিক্রিয়াটি আঁচ করা সম্ভব হয়নি মোনার পক্ষে।

পার্বতী মেয়েটি বুদ্ধিমতী, ভীষণ বুদ্ধিমতী! তবে তার এই বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রাম্য অশালীন কৌতূহল আর অসহ্য বাচালতা। ‘রাজলক্ষ্মীতে আসার পর-পরই বিষয়টি টের পেয়েছে মোনা। আর যতটা সম্ভব সাবধান থেকেছে আচরণে-কথায়। পারতপক্ষে সমীরের সঙ্গে একা-একা কথাই বলেনি। অন্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় যথাসাধ্য নির্বিকার থেকেছে। কখনো সঙ্গে আসা আরো দুই বন্ধু নিশি, দ্যুতির চেয়েও বেশি। ভরা পূর্ণিমায় সমীরদের শত বছরের পুরোনো দালানের ছাদে বসে বন্যার ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’ শুনতে ইচ্ছে হলেও প্রাণপনে তা দমিয়ে রেখেছে। দমিয়ে রেখেছে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি ছড়ায় সমীরের হাতে হাত রেখে পা ভেজানোর ইচ্ছেটাও। তবু বিকেলের জল খাবারে সমীরের বউদি টেবিলে ফুলকো লুচি আর ছানার ডালনা এনে দিলে ওরা ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, শোন, এগুলো মোটেই তোদের আজিজ সুপারের লুচি নয়, খেয়ে দেখ কী ভীষণ মোলায়েম আর টেস্টি। আরে এগুলো হলো আসল লুচি, আজিজ সুপারে যা খাই ওগুলো তো ক্লোন রে, ক্লোন।

লুচির ক্লোন! সমীর মুখ টিপে হেসে ‘খাও খাও, নিজের বাড়ি মনে করে খাও’ বলে যখন মোনার প্লেটে আরো দুটি লুচি তুলে দেয়, তখন আর কারো চোখে না হোক পার্বতীর চোখে সন্দেহ ছাপিয়ে ‘চোর ধরে ফেলা’র মতো সাফল্যের আনন্দ পড়তে ভুল হয় না মোনার। নিশি-দ্যুতির সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপও করে মোনা। ওরা উড়িয়ে দেয়- দূর, গৃ-হ-প-রি-চা-রি-কা এত পাত্তা দেয়ার দরকার আছে?
পাত্তা তো মোনা দিতে চায়নি। কিন্তু ওর মুখে লেগে থাকা রহস্যময় হাসি, চপলা দৃষ্টি, সুযোগ পেলেই গা ঘেঁষে অযাচিত কৌতূহল কেমন যেন উদ্দেশ্যমূলক মনে হয়। পাত্তা না দিয়ে উপায় থাকে না।
সমীরকে বলেও ফেলে একবার- তোমাদের কাজের মেয়েটি ভারি ইঁচড়ে পাকা তো।
সমীর সুযোগ পেয়েই টিপ্পনী কাটে- ও বাবা এরই মাঝে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে কমপ্লেন শুরু হয়ে গেল?
আপাত বিষয়টা হাসিঠাট্টার মাঝে ফুরিয়ে গেলেও শেষতক তো আর শেষ রক্ষা হলো না, পচা শামুকে পা কাটার মতো পার্বতীর কারণেই ঘটনা ঘোট পাকিয়ে গেল।

আসার আগে থেকেই বললে ভুল হবে, সম্পর্কের শুরু  থেকেই সমীর ধারণা দিয়েছিল, আসলে ঠিক রক্ষণশীল বলা যায় না, এটা সংস্কার। কিছু সংস্কার মেনে চলতে হয় গ্রামের অভিজাত পরিবারগুলোকে।
মোনা টিপ্পনী কেটেছিল, ইশ্! অভিজাত বলে আবার দোষ হালকা করা হচ্ছে, গোঁড়া বলো গোঁড়া।
আসার আগেই জেনে এসেছে মোনা, সমীরের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারটি এখনই জানানো যাবে না। হ্যাঁ, আঁচ তো করেই এসেছিল কিন্তু রক্ষণশীলতা কিংবা গোঁড়ামি কিংবা সংস্কার যা-ই হোক না কেন, তার শিকড়বাকড় যে এতটা দৃঢ়, এতটা গভীরে ছড়ানো মোনা তা কল্পনাই করেনি।

এই শিকড়বাকড়ের সন্ধান খুঁজে না বেড়ালে অবশ্য বাইরে থেকে পাবার কথা নয়। যেমন পায়নি নিশি ও দ্যুতি। বাইরেটা একেবারেই মসৃণ ছিমছাম। আদর-আপ্যায়ন-আন্তরিকতা কিছুরই অভাব নেই। মেয়েগুলো হোস্টেলে কী খায়, না খায় বলে দাদা আস্ত খাসি নিয়ে আসে, বউদি পাটিসাপটা বানায়। মা ইলিশ-পোলাওয়ের আয়োজন করতে বলে। কিন্তু সমীরের সাথে সম্পর্ক আর সম্পর্কটাকে পরিণতির দিকে টেনে নেয়ার প্রবল ইচ্ছেটার কারণেই আসা অবধি মোনা গোয়েন্দার চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে এ বাড়ির মানুষ এবং পরিবেশ। যদিও রাজলক্ষ্মীতে শিকড় পুঁতে রাখা একান্নবর্তী সংসারনিষ্ঠ মানুষগুলোকে দু’দিনে জেনে ওঠা বেশ কঠিন। তবু মোনা জানতে চেয়েছে, কাউকে বুঝতে না দিয়ে আঁচ করতে চেয়েছে এই রাজলক্ষ্মীতে শেকড় পোঁতা সমীরের সাথে কতটা বেমানান হবে সে, কতটাই বা মানানসই।

যতই গভীর থেকে দেখছে ততই মুষড়ে পড়ছে মোনা ভিতরে ভিতরে। সিদ্ধান্তহীনতা, দ্বিধা, সংকোচ তার তিন বছরের প্রেম আর অনাগত ভবিষ্যৎকে বারবার উন্মত্ত জোয়ারে খেই হারানোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও সমীর হেসে উড়িয়ে দিয়েছে- রাখো তো, ও বিয়ে করে ফেললে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কী ঠিক হবে? এই যে বাড়ির পূজামণ্ডপ, প্রতিদিন নিয়ম করে পুরোহিত এসে পঞ্চপ্রদীপে ঘিয়ে ভেজানো সলতে জ্বালিয়ে আরতি দেয়, ধূপের গন্ধ আর ধোঁয়ায় ম-ম করে চারদিক, বারান্দায় লাইন দিয়ে বসে থাকে রাজলক্ষ্মীর নারীরা; পার্বতীও থাকে এক কোনায়। সেদিন মোনা এর বারান্দায় উঠতেই সবাই হইহই করে উঠেছিল। এমনকি সমীর পর্যন্ত। মোনা ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়েছিল। মোনা এ বাড়ির বউ হয়ে এলে কি এই পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যাবে? মোনা নির্দ্বিধায় মণ্ডপের বারান্দায় উঠতে পারবে? তখন যদি জাত যায় তো তখন যাবে না?

প্রথম দিনের এই অভিজ্ঞতার পর থেকেই মোনার দৃষ্টি খালি খুঁজে ফিরেছে ছিদ্রগুলো। মোনা লক্ষ করেছে টেবিলে সাজানো খাবারের বাটিগুলোর উদ্বৃত্ত খাবার কোনোদিন রান্নাঘরে ফিরে যায় না। খাবারগুলো ফেলে, পুকুরে বাসন ধুয়ে, গোসল করে পার্বতী ঘরে ঢোকে। ওদের রান্নাঘরটা যে ঠিক কোনদিকে এখনো খেয়াল করে উঠতে পারেনি মোনা। ওদের যাতায়াত এই সামনের দু-তিনটা ঘরেই সীমাবদ্ধ, যেন অন্দরের বাকি ঘরগুলোর মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল। ওরা যে ঘরটায় থাকে, রাজলক্ষ্মী দেবী সেই ঘরে ঢোকেন না, বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলেন। ওরা অনেক ডেকেও ঘরে নিতে পারেনি তাঁকে।
কথাগুলো নিশি ও দ্যুতির কাছে বলে খুব একটা পাত্তা পায়নি মোনা। উল্টো ওকেই ওরা দোষী সাব্যস্ত করে বলেছে, আরে বাবা কী ভীষণ আন্তরিক এরা, এত্তো ঘেঁটে গন্ধ বের করার দরকার আছে?
ঘাঁটার দরকারটা মোনা ঠিক ওদের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারে না। আর সমীরের সাথে সম্পর্কটা যেমন ওর একান্ত নিজস্ব, সম্পর্কটাকে পরিণয় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবার পরিকল্পনাটাও তো ওর একান্ত নিজস্বই। আর এই ঘাঁটার প্রয়োজনটাও নিজেরই থাক, নিজের সাথে বোঝাপড়ার জন্যই থাক। কিন্তু আজ যা ঘটল তাতে আর একান্ত নিজস্ব থাকল কই?

মোনা প্রথমটায় কাউকেই বলতে চায়নি। লুকিয়েচুরিয়ে খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়েই বলতে হয়েছে নিশি, দ্যুতিকে। পরে সমীরকেও। সাথে আনা দুটো প্যান্টির একটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বারান্দায় ব্লু ওড়নাটার নিচেই ছিল বলে স্পষ্ট মনে আছে মোনার। প্রথমে রুমে, বাথরুমে, ব্যাগে, বারান্দার আনাচে-কানাচে না পেয়ে বাধ্য হয়ে ওদের জানিয়েছে মোনা। কেননা আরো দুদিন থাকতে তো হবে এখানে। এত্তো জরুরি জিনিসটা, নাগরিক অভ্যাসে এখন এটি ছাড়া চলা মুশকিল। সমীরকে না জানিয়ে উপায় ছিল না, এই গ্রামগন্ধী উপজেলা শহরে কোথায় মার্কেট, কোথায় দোকান? আর এ জানানোটাকেই পার্বতী, সমীর ও মোনার সম্পর্কের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে হাজির করেছে রাজলক্ষ্মী দেবীর দরবারে- ও দিদিমা, জামাই ছাড়া কাওরে বেডিরা এগুলান কথা কয় গো দিদিমা? আমি নিজের চক্যে দেখছি, ছোটদাদার গায়ে গা লাগাইয়া ঢলতে ঢলতে কইতাছে। অথচ ক্যাম্পাসে লুকিয়ে চুরিয়ে ডেটিং করলেও এ বাসায় এসে ভুলেও মোনা সমীরের গায়ে গা লাগিয়ে কথা বলেনি। অনেক সাবধানে নিজেকে সংযত রেখেছে সে, লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে ওর।

সন্ধ্যায় সমীরের বাবা বাজার থেকে ফিরলে, সমীরকে মাঝখানে রেখে বিশাল সভা বসে বৈঠকখানায়। টেলিভিশন সেট ঘিরে এমন সভা নিত্য বসে এ বাড়িতে। ব্যতিক্রম কিছু নয়। কিন্তু মোনা ঠিক পর্যবেক্ষণ করে আজ সবার চোখেমুখে আলাদা ঘন কালো মেঘের ছায়া। নিশি, দ্যুতি সকালে ঘুরে আসা খ্রিষ্টান মিশনে তোলা ছবি আপলোডে ব্যস্ত ফেসবুকে। ওদের বলে বোঝানোর চেষ্টা বৃথা। একান্ত নিজস্ব সমস্যাগুলো নিজের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অন্যের কাছে তা কখনোই হয় না। মোনা লক্ষ করে, মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বসে আসে সমীর। ভেতরে কাঁটা বিঁধতে থাকে মোনার, যতটা না সমীরের জন্য তার চেয়ে বেশি প্রসঙ্গটার জন্য। আচ্ছা এই যে কথা-পাল্টাকথা, যার কিছুই এখান থেকে শোনা যাচ্ছে না। ওখানে কি ঘুরেফিরে মোনার প্যান্টি হারানোর বিব্রতকর প্রসঙ্গটি আসছে?

হয়তো না। কিন্তু এই হঠাৎ করে পাল্টে যাওয়া পরিবেশের পেছনে যে এই বিব্রতকর প্রসঙ্গটাই রয়েছে তা তো সবাই জেনে গেছে এর মধ্যে নিশ্চয়ই। রাজলক্ষ্মীতে এরপর কাটানো দিনগুলো বড় নিরানন্দ বিষণ্ণ-প্রাণহীন-অসহ্য ঠেকে মোনার। বিদায় নেয়ার সময় কেউ বাইরে আসে না বউদি ছাড়া। বিষণ্ণ মুখে গেট পর্যন্ত আসতে আসতে সে রেকর্ড বাজিয়ে গেছে কেমন বনেদি বংশ তার শ্বশুরবাড়ির, পুরুষের পর পুরুষ ধরে কী করে এই বংশ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে চলছেন তারা, এই বংশের কোন মেয়ে শূদ্র বিয়ে করেছিল বলে তার শ্রাদ্ধ করে মানুষ খাইয়েছেন মেয়ের বাবা। এই মূহূর্তে এসব গল্প বলার মানে মোনা বুঝতে পারে।

স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে সমীরের সদা উচ্ছ্বল চেহারাটার স্তব্ধ হয়ে যাওয়াটা অচেনা লাগে মোনার। মনে মনে আকাশ-পাতাল হিসাব মেলায়, একটা মুসলিম মেয়েকে বাড়ির বউ করে ঘরে তুললে কতটা অস্তিত্বের সংকটে মুষড়ে পড়বে পরিবারটি; কতটাই বা লোকলজ্জার ভয়ে। সংস্কারের যতটা গভীরে তাদের শিকড় প্রোথিত সেখান থেকেই উঠে আসা চারাগাছ সমীর। যত অযৌক্তিক গোঁড়ামিই হোক না কেন, কতটা বিচ্ছিন্ন করা যাবে সমীরকে এর থেকে? করাটা কি উচিত হবে? স্বজন-পরিজন-উৎসব-সম্মিলনের আনন্দ না থাকলে শুধু একটি মানুষকে নিয়ে বিয়ে নামের সামাজিক প্রথায় বন্দি হবারই বা দরকার কী? মানুষ কতদিন ‘ভালোবাসার মোহে’ ডুবে থাকতে পারে, জৈবিকতা যার অন্তরালের সত্য।

ভেতরে সমীরের জন্য মোহ, আবেগ, আর খুব কাছ থেকে দেখা সংস্কৃতির দ্বন্দ্বে বিপন্ন বোধ করে মোনা। সমীরের হাতে হাত রাখে। সমীর অন্য হাতে ঢেকে দেয় হাতটি, বলে, জানো, মা কাল রাতে আমার পায়ে ধরে কেঁদেছে, বলেছে আমি যেন আমাদের সাজানো সংসারটা ধ্বংস না করি।
মোনা চুপ করে থাকে। সমীরের জল ছলছল চোখেও মোহ, আবেগ আর বিপন্নতার ছায়া স্পষ্ট পড়া যায়। একটা বিব্রতকর প্রসঙ্গ কেমন রাতারাতি নগ্ন করে দিয়েছে পুরো বাস্তবতা, উন্মোচন করে দিয়েছে সত্যের রূঢ়তা। সেগুনবাগিচার শিল্পকলায় নাটক দেখতে দেখতে আর আজিজ সুপার মার্কেটে লুচি খেতে খেতে যা মোটেই আঁচ করতে পারেনি মোনা, কোনোদিন পারতও না।

সবাই চলে গেলে এক নিস্তব্ধ নীরবতা নামে পুরো রাজলক্ষ্মীজুড়ে। হঠাৎ টর্নেডোর আঘাতে যেন বিপর্যস্ত জনপদ। রাজলক্ষ্মী দেবী একা একা হাঁটেন এ-ঘর সে-ঘর। একটু আগেই গেস্ট রুমটা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। ঘরে ঢুকে পাবর্তীকে দেখেন তিনি, পিছন ফিরে বসে কী যেন দেখছে- কীতা রে তর হাতঅ? দেখা, দেখা আমারে।
পার্বতী যতই লুকানোর চেষ্টা করে, ঠিক ধরে ফেলেন রাজলক্ষ্মী দেবী- এইটা, এইটা তুই চুরি করছস? মাগি, কত্তো বড় কইলজা তর।
ক্রোধান্ধ রাজলক্ষ্মী দেবীর মুখনিঃসৃত হতে থাকে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অশালীন গালিটি। অসহায় কাঁদতে থাকে পার্বতী। আজ আর রক্ষা নাই। বাঁচার জন্য বলতে থাকে আকুল স্বরে- দিদিমা গো, সেইবার ভোটের পরে নমশূদ্র পাড়ার দুই-দুইটা মাইয়ারে ধইরা লইয়া গেলে, মায়, বাপের লুঙ্গি ছিঁড়া পায়জামার নিচে পেঁচাইয়া পাটখেতে লুকাইয়া রাখছিল গো দিদিমা। আবার ভোট হইলে এইডা পইরা লুকামু গো দিদিমা...।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুলাই ২০১৫/তাপস রায়/কমল কর্মকার 

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge