ঢাকা, বুধবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৩, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

ফাঁসির মঞ্চ থেকে কারামুক্ত ওলিয়ার শেখ

মোস্তফা ইমরান রাজু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-১৫ ৫:০৮:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-১২-১৫ ৫:০৮:৫৫ পিএম

মোস্তফা ইমরান রাজু, মালয়েশিয়া : বন্দি খাঁচা থেকে মুক্ত পাখির মতো আনন্দিত ওলিয়ার শেখ। রোদ ঝলমলে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ঝাপসা চোখ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখলেন, তারপর এক দৃষ্টিতে যতদূর যায় শুধু দেখছেন।

 

বিনাদোষে সাত বছরের বন্দিজীবনের অবসান ঘটেছে ওলিয়ারের। ফাঁসির আদেশ হয়ে যাওয়া ওলিয়ার মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহযোগিতায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ফিরে যাচ্ছেন দেশে।

 

জোড়া খুনের অভিযোগে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আটক হন ওলিয়ার। উপযুক্ত তদবিরের অভাবে এই মামলায় ফাঁসির আদেশ হয়ে যায় তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের দৃষ্টিগোচর হলে তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কারামুক্ত হন নির্দোষ ওলিয়ার শেখ।

 

যেভাবে ঘটনার শিকার : ভিটেমাটি বিক্রি করে ২০০৮ সালে কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানো ‍ওলিয়ার শেখের জন্ম গোপালগঞ্জের মুকসেদপুরের টেকেরহাটে। শুরুতেই মালয়েশিয়ার জোহর বারুর একটি বাইসাইকেল ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিলেও পরে একটি মুরগি ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেন। থাকতেন কুয়ালালামপুরের শ্রী দামান সারা।

 

কারামুক্ত হয়ে ওলিয়ারের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথপোকথনে উঠে আসে, সে সময় রুম ভাগাভাগি করে থাকতেন তারা বেশ কয়েকজন। বলেন, ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৩টায় পাশে শুয়ে থাকা হেলালের অর্ধমৃত শরীরের ছটফটানিতে ঘুম ভাঙে তার। ঘুমের ঘোরে দেখেন দুজন ব্যক্তি হেলালকে গলা কেটে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছে, ঘরের মেঝেতে ছটফট করছে তার দেহ। ঘর লুট করার জন্য ডাকাত পড়েছে, এমন সন্দেহে চিৎকার করতে থাকা ওলিয়ার ওই দুই ব্যক্তিকে তাড়া করেন। এ সময় পেছন থেকে রক্তমাখা ছুরি হাতে আরো দুই ব্যক্তি ওলিয়ারকে মারতে উদ্যত হলে সে পালিয়ে দেড় মাইল দূরে এক বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নেয়। তখনও ওলিয়ার জানত না রুমমেট হেলাল শুধু নয় উপরের কক্ষে থাকা কাদের ও শাহীন নামে দুই বাংলাদেশিকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। পরের দিন ওলিয়ারকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তার এজেন্টের অফিস থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। যদিও ওলিয়ারের বিপক্ষে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। তবুও সন্দেহাতীতভাবে তাকে এই মামলায় ফাঁসির আসামি হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত।

 

বিষয়টি বাংলাদেশ দূতাবাসের দৃষ্টিগোচর হলে দূতাবাস কর্মকর্তা মুসরাত জেবিন ও মোকছেদ আলি আসামি ওলিয়ারের সঙ্গে দেখা করেন এব্ং উকিল নিয়োগের মাধ্যমে আপিলের উদ্যোগ নেন। উকিল মো. রাজদি বিন এয়াতিমান ফরেনসিক রিপোর্ট, অস্ত্রে হাতের ছাপসহ বেশ কয়েকটি প্রমাণ আদালতে পেশ করেন যা আসামি ওলিয়ারের পক্ষে যায়। তবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে আইনের মারপ্যাঁচে  ওলিয়ারকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করতে সাত বছর সময় চলে যায়। বুধবার ওলিয়ারের মুক্তির পর তাকে আদালত থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিয়ে আসেন হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব ফরিদ আহমেদ ও মোকছেদ আলি। পরে লেবার কাউন্সিলর সায়েদুল ইসলাম মুকুল এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, শুরু থেকেই আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। ওলিয়ারের সঙ্গে দেখা করার পর আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে সে পরিস্থিতির শিকার। তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিয়ে গেছে হাইকমিশন। এরই ফলে আজ সে মুক্ত হয়েছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।

 

এদিকে মুক্ত হওয়ার পর পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ওলিয়ার। হাইকমিশনের সহযোগিতায় খুব শিগগিরই দেশে ফেরার বন্দোবস্তে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

 

আবেগতাড়িত ওলিয়ার এ প্রতিবেদককে আরো বলেন, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়েও দীর্ঘ সাতটি বছর কারাগারে কাটিয়েছি। অন্য কারো ভাগ্যে যেন এমনটি না হয়। এ সময় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ দিতেও ভুললেন না ওলিয়ার।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ ডিসেম্বর ২০১৬/রাজু/মুশফিক