ঢাকা, শনিবার, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বাংলা নাটক ও সেলিম আল দীন : একটি তাৎপর্যের রেখা || শুভাশিস সিনহা

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৬-২৮ ৫:৩৯:১৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:২৯ এএম

বাংলা নাটক নামের শিল্পকর্মটি তার রচনাশৈলীর দিক দিয়ে অন্যান্য শিল্পের চেয়ে অনেক ক্ষেত্র দিয়েই দুর্বল ছিল। সেই দুর্বলতার সূত্র আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হয়েছে। সেটি হলো- নাটকের ভাষা। মঞ্চে আমরা যে নাট্যকর্মটি দেখি, তার সামগ্রিক যে ভাষাটি থাকে, যাকে আমরা থিয়েটারের ভাষা বলি, সেটি নয়, যাকে আমরা টেক্সট বলি, সেটি। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, কেবল পাত্র-পাত্রী বা চরিত্র ধরে মুখের ভাষাটি এগোনোর কারণে ভাষা আটকে থাকে রীয়েলিটির দায়ে অর্থাৎ বস্তুগত সত্যতার শর্তে। ঔপনিবেশিক মননের সীমাবদ্ধতার জন্য আমরা আমাদের চোখকে বেশিদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারিনি, পেছনের দিকে, ফলে এ সীমাব্ধতাকে পেরোনোর উপায় বের করা আমাদের জন্য মুশকিলেরই ব্যাপার ছিল।

 

মধুসূদন ‘অলীক কুনাট্য রঙ্গে মজে লোকে রাঢ়ে বঙ্গে’ বলে যে শ্লেষভাষ্য দিয়ে তাঁর নাট্যরচনা শুরু করলেন, সেখানে আমরা এ সমস্যা থেকে উৎরানোর খানিক ইশারা পেলাম। আমরা বুঝলাম যে, ঐহিকতার শর্তে ভাষাকে বাঁধবার ঐতিহাসিক যে ভার বয়েছে বাংলা নাটক, সে ইতিহাস ভুল। ফলে মধুসূদনের নাটকের পাত্র-পাত্রীরা যে ভাষায় কথা বলল, তা দৈনন্দিকতার গণ্ডী থেকে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করল। কিন্তু সেই চেষ্টা সম্পূর্ণ হয়নি। দেশজ আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তাঁর শিল্প-অভিজ্ঞতার যে দুর্বলতা, তার কারণেই হয়ত সম্ভব হয়নি। মধুসূদনের কাব্য আর নাটকের ভাষার শক্তি ও কাঠামোর মধ্যে তাই মানগত যোজন যোজন ফারাক।

পরবর্তীতে কাজটিকে যিনি অসামান্য ক্ষমতায় পুষ্ট ও ঋদ্ধ করে তুললেন তিনি যথারীতি রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ কবি এবং গীতিকার ও সুরকার। কাব্য, সুর ও গীতলতা নিয়ে নাটকের ভুবনে ঢুকে তিনি কল্পনাবিস্তারি যে ভাষার জন্ম দিলেন, তা ছিল বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে এক দুঃসম্ভব অভিজ্ঞতা।

 

‘হরগজ’ নাটকের একটি দৃশ্য

 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটকের পাত্র-পাত্রীদের মুখে যে ধরণের ভাষা আরোপ করলেন, তাতে ভাষার সমাজতাত্ত্বিক শর্ত একেবারেই ত্যক্ত হলো। সেটা তার কাছে আগাছা ছাড়া কিছুই ছিল না। চরিত্র এবার নাট্যকারের বা রচনাশিল্পীর শিল্পপ্রকল্পের বাহক হলো ঠিকই, কিন্তু নাটক নামের আঙ্গিকটিকে টেক্সটের দিক দিয়ে নিয়ে গেল অত্যুচ্চ মহিমায়। নাট্যভাষার সব সীমাসূত্রকে ভেঙেচুরে রাবীন্দ্রিক নাট্যভাষা পৌঁছে গেল মহাকাব্যের অসীম আকাশনীলে। সেই নীলাভ বিষ মধুজ্ঞানে পান করার সাহস অনেকেরই ছিল না। এজন্য অনেক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু মুক্তি পেয়েছে বাংলা নাটক। অন্তত সেই সময়ের মতো।

 

তারও পরে আমাদের ওয়ালীউল্লাহ অনেকটা বিদেশীদের ধরণে বিমূর্ত ও খানিক অসংগত নাট্যভাষার নির্মাণ করে আধুনিক বাংলা নাটকের ভাষাযজ্ঞের অগ্নিশিখাকে উজ্জ্বল করে তুললেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত নাট্যভাষার ক্ষেত্রে যে কাজটি করা হলো, তা ছিল নাটককে কাহিনীর পাত্র-পাত্রীদের সংলাপকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সেখানেও ছিল অনেক সীমাবদ্ধতা। কারণ একটা চরিত্র তার বাস্তব স্থান ও কাল নিয়ে কতটাই বা অতি-বাস্তব এবং অধি-রঞ্জিত হতে পারে! সে কি আর আমাদের বলার বাইরে ও গহনে জীবজগৎ ও প্রকৃতিতে বিচরিত সমস্ত জগতের সব অনুভূতি ও অভিব্যক্তিকে ধারণ করতে পারে? না বলা কথাকে কি স্বগতোক্তিতে ধারণ করা আসলেই সম্ভব ? কিন্তু কেন সে কাজটি পারা গেল না?

 

সে প্রশ্নের সুরাহা করলেন আমাদের কালের একজন। তাঁর নাম সেলিম আল দীন। তিনি নতুন করে প্রশ্নগুলো তুললেন, তাঁর প্রশ্নবাণগুলোতে রক্তাক্ত হলো বাংলার আরোপিত পাশ্চাত্য মননসৃজনপ্রকল্পফানুস। আমাদেরই ঐতিহ্যে ও ইতিহাসে যে বিশাল নাট্যশিল্পজগৎটি জীবন্ত রয়েছে, তাঁর প্রাণস্পন্দন টের না পেয়ে বা অনুভব করতে না যেয়ে আমরা ঘুরে মরেছি মিথ্যা ভ্রমণমণ্ডলে। নাটক বা নাট্য কেন সংলাপ আর চরিত্র ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না? সংস্কৃত নাটক যে সূত্রধারের আবির্ভাব ঘটিয়েছেল তারও কেন প্রবেশ ছিল না নাটকের অন্তঃস্থানে?

 

তিনি বললেন, না। আছে। বাংলারই নগরবিচ্ছিন্ন লৌকিক শিল্প বা নাট্যজগতে সে আকাঙ্ক্ষার উপাদান আছে। আমরা তাকে নাই ভেবে এসেছি। তিনি নিজের নাট্যরচনাকালের অনতিদূরপর্যায়ে এসে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন এসব প্রশ্ন আর মীমাংসার একটা ভিত্তি খুঁজে পেয়ে।

বাংলার হাজার হাজার গ্রাম যে নাট্যআঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে জীবিত আছে, তাকে মৃত ভাবার অপরাধ থেকে মুক্তির পথ সন্ধান করলেন তিনি। আর ব্যাপক গবেষণার মধ্য দিয়ে জানালেন, ইহাই নাটক। এইখানে আমাদের থিয়েটার। পালা, লীলা, কীর্তন, পাঁচালি, কথকতা, গীতিকা ইত্যাদি শত শত নাট্য ও নাট্যসম্ভব অঙ্গের ভেতর থেকে তিনি আবিষ্কার করলেন, বলার এবং বলাবার পরম গড়ন।

 

নাটক কেবল সংলাপ বা চরিত্রের ও চরিত্রসমূহের ঘাত-প্রতিঘাতের বাহ্যকথন নয়, নাটক ঘটনার অন্তর্গত বয়ানবিস্তারও। শকুন্তলা, কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল...নাটকগুলোতে সেলিম আল দীন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ আর ওয়ালীউল্লাহরই উত্তরসূরি। কিন্তু যৈবতী কন্যার মন, চাকা, হরগজ এসব নাটকে এসে তিনি যে রূপটি নিলেন, সেটা বাংলা নাটকের কল্পনারও দূর সম্ভাবনাকে পেরিয়ে গেল বলা যায়। এভাবে আমাদের আধুনিক সময়ের নাটক রচিত হতে পারেনি।

 

একটা অনির্দিষ্ট কালস্থানমাত্রা ও অনির্ণেয় ব্যক্তিস্বর থেকে একটি আখ্যান তার সকল জটিলতাকে নিয়ে বহুভাবে বহু ঢঙে বহু স্বরে এইমতো বিবৃত হতে পারে নাই। কোথায় উড়ে গেল পাত্র-পাত্রীর উপর নির্ভরতার ভাষাসূত্র। চরিত্রের কথাবার্তাকে নিয়ে, এড়িয়ে, মুখ্য ও তুচ্ছ করে এসব নাটকের বয়ান নাট্যকারের শিল্পভ্রমণের বহুরেখ পথে এগিয়ে যেতে লাগল। আর ‘চাকা’ নামের একটি সৃষ্টি এ নাট্যসৃজন তৎপরতার সবচেয়ে অবাধ্য ও দুর্দান্ত ভাষ্-অবতার হয়ে উঠল।

 

 ‘নিমজ্জন’ নাটকের দৃশ্য

 

একেবারেই সমকালীন ও রাজনৈতিক একটি ঘটনাকে তার পূর্বাপর সকল অভিক্ষেপ দিয়ে, বোঝা না-বোঝার সব রূপকল্পে ও বাক্প্রতিমায় লোকপ্রতীক ও মিথের অনবদ্য যুথচারণে যেভাবে গেঁথে তোলা হলো, ছোট্ট বাহ্যশরীরের মধ্যে তার সেই বিশাল উদ্ভাসকে পাঠের ভেতর দিয়ে ধারণ করা কষ্টের ছিল বৈকি।

কিন্তু সে কষ্টের স্বাদ বড়োই মধুর।

 

বেদনা ও সহমর্মিতার যুগল মন্থনে যে আখ্যানটি বিবৃত হলো সেটি চিত্রসম্ভব, কাব্যসম্ভব, গীতসম্ভব, আবৃত্তিসম্ভব; আবার বলা যায় সম্ভব শুধু নয়, তা সম্পন্নও। আমরা হোমারকে পেয়েছি, কালিদাসকে পেয়েছি, রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি, তারাশঙ্করকেও হয়ত পেয়েছি সেলিমের এ নাট্যযজ্ঞের ভাবকাঁচামাল হিসেবে। কিন্তু সব সূত্র ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে সেলিম আল দীন ছিলেন স্বয়ং এক নতুন আবির্ভাব। সবদিক দিয়েই।

 

এখন বাংলা নাটক নির্দ্বিধায় নেমে যেতে পারে অন্যান্য সকল সাহিত্যিক ফর্মের সাথে প্রতিযোগিতায়। এখন তাকে আর ছোটজাত বলে নাকসিটকানোর উপায় নেই। আমাদের এ বঙ্গের শিল্পীচণ্ডাল নাটককে শিল্পের ব্রাহ্মণ্যত্ব দিলেন। সেটা আঙ্গিকের মধ্য দিয়েই কেবল নয়। ভাব, কল্পনা ও ঘটনা নির্মাণের মধ্য দিয়েও।

 

কিত্তনখোলায় পাই রঙ্গশিল্পীদের জীবনের কষ্ট-যন্ত্রণার দ্বান্দ্বিক আখ্যান, হাতহদাই-এ আমরা পাই আনাড় ভাণ্ডারির জীবনপথের শত বাঁকের ঘটনাকাব্য, তারই মধ্য দিয়ে নদীবিধৌত বাংলার রক্তমাংসের গন্ধ ও স্বাদের মধু অশ্রুলবণ, যৈবতী কন্যার মন-এ বাংলার নারীর শিল্পীসত্তার অন্তর-বাহিরের সংঘর্ষের কল্পনাঋদ্ধ কথন, বনপাংশুল-এ মান্দি সম্পদায়ের অবলুপ্তির মহাকাব্যিক বেদনাআখ্যান, প্রাচ্য-তে প্রাচ্যের মানুষের সংস্কার, বিশ্বাস ও জীবনসংগ্রামের দ্বন্দ্ববহুল মানসচরিত, ধাবমান-এ মানুষ ও পশুর শ্রেণীগত নির্ধারিত সম্পর্কধরণকে ভাঙার শৈল্পিক প্রয়াস, স্বর্ণবোয়াল-এও তাই। আবার নিমজ্জন-এ গোটাবিশ্বের মানবিক নৃশংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর স্পর্ধা।

 

আরও অসংখ্য নাটক নির্মাণ করেছেন সেলিম আল দীন, অসংখ্য বিষয় নিয়ে। নাটকের বিষয়, ভাষা নিয়ে আলোচনা অনেক হয়েছে, এ শিল্পীর মৃত্যুর আগে ও পরে। আামি চেষ্টা করছি এক একটি ভাবনারেখার মধ্য দিয়ে বাংলা নাটকে সেলিম আল দীনের আবির্ভাবের তাৎপর্যের জায়গাটিকে স্পষ্ট করে তুলতে। এ তাৎপর্য বোঝার জন্য আমাদের যাত্রাপথের বাঁক ও রেখা শত শত। সেসব বাঁক ও রেখায় গেলে আমরা আবিষ্কার করতে থাকব যে বাংলার জীবন ও জগৎকে সেলিম আল দীন মঞ্চের পরিসরে ধারণ করাবার জন্য রচনাকার হিসেবে কী কঠিন সংগ্রাম করেছেন।  সে সংগ্রামে তিনি পেয়েছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফকে। তাঁরা বাংলা নাটককে ঐতিহ্যের ভেতর থেকে আবিষ্কারই কেবল করেননি, তাঁরা তার অবধারিত আধুনিক রূপ দিয়েছেন। সেলিম আল দীন দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের চরিত্রভিত্তিক নাট্যকাহিনীকে বাতিল করে দিয়েছেন, তার জায়গায় বসিয়েছেন মানুষচরিত্র ও তার সকল পরিপার্শ্বকে জীবন্তরূপে  উপলব্ধি করার ভাষিক নাট্যকাঠামো। এত কঠিন স্বাধীনতার সন্ধান বাংলার নাট্যকাররা এর আগে কখনোই এনে দিতে পারেন নি। এখন আমরা তার সুযোগ নিচ্ছি। কতটুকু পারছি তার হিসাব করবে আগামী সময়।

 

এক নৈব্যর্ক্তিকতার মধ্য দিয়ে কাহিনি ও আখ্যান এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য যে আঙ্গিকটি আমরা পেলাম, তারই শক্তিতে বাংলা নাটক পেল চরিত্র, ঘটনা ও বাস্তবতার সীমাকে ভেঙে কল্পনার আকাশ ও নভোমণ্ডলে বিচরণের পাখা। এই উড্ডয়নেই মিলেছে আমাদের সমকালের নাট্যঝড়ের নান্দনিক মেঘমালা ও বিদ্যুৎ।

সেলিম আল দীনের নির্মম অনুপস্থিতির নাট্যযাত্রায় আমরা চিরস্থিতির ভিতরপথে তাঁর ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া মুক্তোদানাগুলো যেন কুড়িয়ে নিতে ভুল না করি।

 

 

লেখক : নাট্যকার, কবি

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ জুন ২০১৬/তারা

Walton Laptop