ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ বৈশাখ ১৪২৫, ১৯ এপ্রিল ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

মানুষের মুখে আমার সৃজন নিয়ে বিতর্ক ভালো লাগে : হেলাল হাফিজ

জব্বার আল নাঈম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১১-২৯ ৭:২১:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৮ ৪:০৭:২০ পিএম

সমকালীন বাংলা কবিতায় হেলাল হাফিজ এক রাজকুমারের নাম। প্রতিবাদ ও প্রেম, দ্রোহ আর বিরহের এই কবি অকল্পনীয় নৈপুণ্য ও মমতায় শব্দের মালা গেঁথে কবিতাপ্রেমী মানুষকে অনির্বচনীয় আমোদ দিয়ে চলেছেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রচিত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি পাইয়ে দেয়। ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'- এই অমর পঙ্‌ক্তিযুগল তাঁর পাণ্ডুলিপি থেকে উঠে আসে মিছিলে, স্লোগানে আর দেয়ালে দেয়ালে। বিস্ময়ের বিষয় হেলাল হাফিজের কবিতা ব্যতীত প্রেম যেন অসম্পূর্ণ। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় এই কবির প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রীত এই কাব্যগ্রন্থ তাঁকে এনে দেয় তুঙ্গস্পর্শী কবিখ্যাতি আর ঈর্ষণীয় পাঠকপ্রিয়তা। অল্প লিখেও হেলাল হাফিজ গল্প হয়েছেন। নিজের কবিতার মতোই রহস্যাবৃত তার যাপিত জীবন। কবির রচিত মমতা জড়ানো মর্মস্পর্শী পঙ্‌ক্তিমালা, রূপকথার এই মানুষটিকে সত্যিই আজ কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। এই কবির মুখোমুখি হয়েছেন আরেক তরুণ কবি জব্বার আল নাঈম। পড়ুন তাদের কথোপকথনের প্রথম পর্ব।

 

জব্বার আল নাঈম :  কবিতার প্রতি টান বা ভালোবাসার সূত্রপাত কখন থেকে বুঝতে পারলেন?

হেলাল হাফিজ : শৈশব বলো আর কৈশোর বা যৌবনের শুরুর দিকে আমি কবি ছিলাম না। কবিতা পড়তাম। লিখতাম না। ছিলাম একজন খেলোয়ার। নেত্রকোনা শহরের বিভিন্ন জায়গায় আমি তখন খেলতে যেতাম। খুব ভালো খেলতাম। খেলোয়ার হিসেবেও আমার একটা সুনাম ছিল। সেজন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে আমার ডাক পড়ত বেশ। বলা যায় শৈশবে আমি খুব খেলাপাগল ছিলাম। তাই বেশির ভাগ সময়ই মাঠে পড়ে থাকতাম।

 

জব্বার আল নাঈম : কী খেলতেন?

হেলাল হাফিজ : এই ধরো ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট। তবে ক্রিকেট কম খেলতাম। আজকের এই পর্যায়ে ক্রিকেট চলে আসবে তখন অনেকেই ভাবেনি। ক্রিকেটের এত প্রচার বা প্রসারতার কারণ কর্পোরেট কোম্পানি। নেত্রকোনার মতো মফস্বল শহরে আজ থেকে ৫৫-৬০ বছর পূর্বে আমি লং টেনিসও খেলেছি। আমার বাবা  খুব খ্যাতিমান শিক্ষক ছিলেন। সেই সুবাদে আমার খেলার সুযোগ হয়েছে। খেলাধুলা বেশি করারও একটা কারণ ছিল। আমার বয়স যখন তিন তখন মাতৃবিয়োগ হয়। সারাদিন মন খারাপ থাকত। একটা সময় খেলার দিকে মনোযোগী হলে মায়ের আদর ও ভালোবাসা একটু হলেও ভুলে থাকতে পারতাম। আমার বড় ভাইও মানসিকভাবে খুব ভেঙে পরেছিল। এত কম বয়সে মাকে হারানোটা আসলেই তখন মেনে নিতে পারিনি।

 

জব্বার আল নাঈম : আপনারা দুই ভাই ছিলেন?

হেলাল হাফিজ : আমরা দুই ভাই ছিলাম আগের সংসারের। আম্মা মারা যাওয়ার পর বাবা আবার বিয়ে করেন। সেখানে আমাদের আরো দুই ভাই ও তিন বোনের জন্ম হয়। তার মানে আমরা চারভাই তিনবোন। এই যে মাতৃহীনতার বেদনা আমাকে খুব আহত করল। যত বয়স বাড়ে ততই বেদনা বাড়ে। এরপর খেলার দিকে থেকে মনোযোগ সরিয়ে আমি কবিতায় মনোযোগী হয়েছি। কবিতাই করব বা সাহিত্য করব- সিদ্ধান্তটা মূলত তখন নেওয়া।

 

জব্বার আল নাঈম : কত সালের ঘটনা?

হেলাল হাফিজ : ১৯৬৫ বা ৬৬ হবে। তখন টুকটাক লেখা শুরু করি। ছড়া লিখতাম বেশি। ওগুলো মানসম্মত ছিল না। তারপর ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ১৯৬৭ সালের দিকে ঢাকা চলে আসি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন পরিচয় হয় বিভিন্ন শিল্পী ও সাহিত্যিকের সঙ্গে, সিনিয়র-জুনিয়র লেখকদের সঙ্গে। ফলে লেখালেখিতে একটা শক্তি আসে।

 

জব্বার আল নাঈম : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াও কি পরিকল্পনার অংশ ছিল?

হেলাল হাফিজ : আমি আইএসসি পড়েছিলাম ডাক্তারি পড়ার জন্য। বাবাও তাই চাইতেন। যেহেতু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি, কবিতা লিখব; তখন কবিতার নেশাও আমাকে পেয়ে বসেছে ফলে কবিতাই হলো আমার এতেক্বাফ। কবিতাকে ধ্যান ভাবতে থাকলাম। ডাক্তারি লাইনে মেডিক্যাল বিষয়ক বই পড়ার জন্য অনেক সময় আমার ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে কবিতা লেখার সময় বেশি পাওয়া যাবে ভেবে সেখানেই ভর্তি হই। নির্মলেন্দু গুণের সাথে আমার পরিচয় ও জানাশোনা ছিল আগে থেকেই। গুণ তখন কবিতা লিখছে। আবুল হাসানের সাথেও পরিচয় হলো। সেও কবিতা লিখছে। আমাদের একটা সুবিধা ছিল। তখন এই ভূখণ্ড নানান কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তুরের নির্বাচন এবং রক্তক্ষয়ী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালির জাতীয় জীবনে বিশেষ করে এটি একটি বড় ঘটনা। এই ঘটনাগুলোই পাল্টে দিতে থাকে আমাদের সকল চিন্তা-চেতনার স্তর। বদলে যেতে থাকি আমরা।

 

জব্বার আল নাঈম : ছয় দফা উত্থাপনের সময় আপনি ঢাকায়...

হেলাল হাফিজ : আমি তখনও ঢাকায় নিয়মিত নই। এসব নিয়ে মনোযোগীও ছিলাম না। কারণ ঢাকায় না থাকা। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো ছিল না। ফলে ঢাকায় কী হচ্ছে সাথে সাথে আমরা জানতাম না। সময় লেগে যেত দুই-তিনদিন। ততদিনে আন্দোলনের গতি অন্যদিকে ঘুরে যেত। কিন্তু ঊনসত্তুরের গণঅভুত্থান আমাকে এক ধাক্কায় ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি লিখতে সাহায্য করে। গণঅভুত্থান না হলে কবিতাটি মাথায় আসত না। লেখাও হতো না। কবিতাটি যখন লিখি তখন আমি ইকবাল হলের আবাসিক ছাত্র। তখন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুটি জায়গা। একটি শেখ মুজিবের ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি। আরেকটি ইকবাল হক হল।

 

যাই হোক, নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় লিখে রাতারাতি বিখ্যাত বলো কিংবা কবিখ্যাতি সেটি পেয়ে যাই। তখন ইউনিভার্সিটিতে সব দেয়ালে এর পঙ্‌ক্তিগুলো লেখা হলো। এটা হয়েছিল আহমদ ছফা এবং হুমায়ূন কবীরের নেতৃত্বে। দুজনই আমাকে পছন্দ করতেন। কবিতাটি প্রথমে ক্যাম্পাসেই বেশি আলোচিত ছিল। তবে যুদ্ধের সময় এর প্রচার আরো বেড়েছিল। এই একটি কবিতা লিখেই আমি একদম তারকা বনে গেছি। আমার সম্মানও বাড়তে থাকে। ঐ যে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতো। হা হা হা... তারপর তো কতো যুদ্ধ হলো। জীবন যুদ্ধ। টিকে থাকার যুদ্ধ। যুদ্ধ আমি এখনও করছি। মজার বিষয়, যুদ্ধে আমি হারতে হারতে জিতে যাই। এই যুদ্ধ এখন ভালো লাগে।

 

জব্বার আল নাঈম : আহমদ ছফা নাকি তখন আপনাদের সবার গুরু ছিলেন?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। ছফা ভাই আসলে প্রতিভা চিনতেন। যাঁর ভেতর মেধা আছে তিনি তাদের নার্সিং করতেন। সময় দিতেন। আড্ডা দিতেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামে ডাকতেন। কখন কোন বই পড়তে হবে বলতেন। বই সংগ্রহ করে দিতেন। কোন লেখাটা পড়া জরুরী তাও বলতেন। তিনি আমাদের অনেক দিক দিয়ে হেল্প করতেন। এটা সবাই করতে পারে না। ছফা ভাই অনেক বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। লেখক হিসেবেও বড় মানের।

 

জব্বার আল নাঈম : কার বই কখন বের হবে তাও সিলেক্ট করে দিতেন?

হেলাল হাফিজ : সিলেক্ট করতেন মানে কী? এমনও হয়েছে কেউ একজন ভালো লিখেছে। সে বই প্রকাশ করতে চায়। কিন্তু প্রকাশক পাচ্ছে না। ছফা ভাইও  প্রকাশক পাচ্ছেন না। তখন এমনও হয়েছে ছফা ভাই পকেট থেকে অর্ধেক টাকা দিয়েছেন। বাকি অর্ধেক প্রকাশক দিয়েছে। তাঁর অসাধারণ গুণ; ঐ যে বললাম, মেধাবী এবং প্রতিভাবানদের তিনি চিনতেন এবং মূল্যায়ন করতেন।

 

ঘটনা হয়েছে কী, আমি যখন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখলাম তখন ছফা ভাই আর হুমায়ূন কবীর ভাই কবিতা নিয়ে তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় গিয়েছিলেন। পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব। খুব পরিচিত সম্পাদক। ছফা ভাইয়ের সাথে আমিও গিয়েছিলাম। আহসান হাবীব ভাই কবিতা পড়েন আর আমার দিকে তাকান। বলে রাখি, ওটা তখন সরকারি কাগজ। আর ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ হলো সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। একটা সংগ্রামের আহ্বান। তো বুঝতেই পারছ। এই কবিতা ছাপলে পরের দিনই তার চাকরি যাবে। এমনকি কাগজটি বন্ধ হয়ে যেতে পারত। সুতরাং তিনি ছফা ভাইকে বললেন, ও তো বাচ্চা ছেলে, মনে কষ্ট পাবে। লেখাতো ছাপা যাবে না। ছাপলে কালকের কাগজ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে একটা কথা বলে রাখি, হেলাল অমরত্ব পেয়ে গেছে। ওর আর কবিতা না লিখলেও চলবে। তখন আসলেই বুঝতে পারিনি। এখন বুঝি।

 

জব্বার আল নাঈম : এখন আপনার কবিতাটিকে কবিতার চেয়ে বেশি স্লোগানে ব্যবহার করা হয় এবং অনেকেই স্লোগান বলেই মানে।

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। এটি আগে কবিতা না আগে স্লোগান এ নিয়ে তর্ক আছে। এই তর্ক আমি উপভোগ করি। আমার ভালো লাগে। এটা কবির জন্য গৌরবেরও। মানুষের মুখে মুখে আমার সৃজন নিয়ে বিতর্ক- হোক না, হতে থাকুক।

 

জব্বার আল নাঈম : আপনার কর্মজীবনের কথা শুনতে চাই। কবে কোথায় কীভাবে শুরু?

হেলাল হাফিজ : অবজারভার হাউস থেকে দৈনিক পূর্বদেশ নামক একটি পত্রিকা বের হয়। পূর্বদেশের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আমি জয়েন করলাম। ১৯৭২ সালের কথা। তখনও আমি ছাত্র। চাকরি করি, পড়াশোনাও করি। কিন্তু কবিতার নেশা তখন প্রবল। অথচ আমার সমসাময়িক কবি বা বয়সে সামন্য বড় তাদের বই ততদিনে প্রকাশিত হয়েছে। নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, আবুল হাসান। যদিও গুণ বয়সে আমার থেকে তিন-চার বছরের বড়। স্বাধীনতার আগেই তার ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ বেরিয়ে গেছে। আমিও তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বই করার।

 

জব্বার আল নাঈম : সেই প্রস্তুতিটা শেষ হয় ১৯৮৬ সালে?

হেলাল হাফিজ : মনে মনে তৈরি হচ্ছিলাম ঠিকই কিন্তু বিষয় হলো আমি আজন্ম-অলস। আলস্য আমার কাছে নারীর চেয়েও প্রিয়। বুঝতে পারছ, আমি কতটা অলস? আমি আমার প্রিয় আলস্যের কারণে কম লিখি। তখন লিখছি আবার লিখছি না, চাকরি করি, আড্ডা দেই, এদিক-সেদিক যাই। এভাবে কাটতে থাকল আমার সময়। কিন্তু একটা জিনিস আমি ভালোভাবে খেয়াল করলাম। এখন তো এক মেলায় হাজার বারোশ কবিতার বই বের হয়। আর তখন বের হতো একশ বা দেড়শ বই। দুঃখের বিষয় মেলা শেষে পরদিন থেকে কোনো বইয়ের নাম কারো মুখে আর নেই। কেউ কোনো বইয়ের খোঁজও করে না। আমি এটা নিয়ে খুব ভাবতে থাকলাম। চিন্তা করলাম, তাহলে আমাকে ব্যতিক্রম কিছু করতে হবে। না হয় আমার অবস্থাও তাদের মতো হবে। তখন আমার ভেতরে এক ধরনের জেদ চাপে, আমি এমন একটা বই করতে চাই, যেটা মেলা শেষেও হারিয়ে যাবে না। পারব কিনা জানি না, তবে ভেতরে ভেতরে একটা জেদ কাজ করতে থাকল। একটা ইগো তৈরি হলো। এটা মাথায় রেখে দীর্ঘ ১৭ বছর কবিতা লেখার পর ১৯৮৬ সালে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হয়। আজকাল যারা কবিতার বই বের করে তাদের সিংহভাগ বই কিন্তু কবি নিজে টাকা দিয়ে বের করে। এটা তো জানো? আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। অথাৎ প্রকাশক আমাকে টাকা দিয়ে পাণ্ডুলিপি নিয়েছে।

 

জব্বার আল নাঈম : পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতির সময় আপনি কোন বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন?

হেলাল হাফিজ : ৮০-৮১ সালের দিকে শ দেড়েক কবিতা নিয়ে ম্যানুস্ক্রিপ্ট করি। ভেবে দেখলাম, যদি চার ফর্মার বই করি তাহলে ৫৬ টি কবিতা লাগবে। আমার সেখানে আন্দোলনের কবিতা আছে, দ্রোহের কবিতা আছে, বাকিগুলো প্রেম ও বিরহের কবিতা। আসলে সবই আমার ব্যক্তিগত দর্শন। আমার মনের কথা, বিরহের কথা, চেনাজানা পরিবেশের কথা। কবিতাগুলো রচনা করার সময় এই বিষয়গুলো আমার করোটিতে ছিল-আমার ব্যক্তিগত কথা যেন সর্বজনীন হয়। সকলেই যেন ভাবে আরে এটা তো আমারই কথা। ধরো, এই তো শাহবাগে যে আন্দোলন হলো সেখানেও সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে আমার কবিতা। আশির দশক শেষে নব্বই দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও উচ্চারিত হয়েছে আমার কবিতা। আবার তরুণ-তরুণীরা প্রেম করলেও আমার কবিতা খোঁজে। ছ্যাকা খাওয়ার পরও আমার কবিতা খোঁজে। হা হা হা ... একে কি আমি আমার বিরাট সৌভাগ্য বলব না? কবিতায় হয়ত আমি আমার শব্দ ব্যবহার করেছি কিন্তু এই আমি আসলে সবাই। সবাই ভাবে তাকে কেন্দ্র করেই কবিতা। আবার পড়ার সময় সবাই ভাবে, এটা হেলাল হাফিজের কবিতা না-এটা আমার পরম সৌভাগ্য।

 

আমার মনে আছে, সেখান থেকে কবিতা বাছাই করতে আমি সময় নেই প্রায় ছয় মাস। আমার বইয়ে দেখবে প্রতিটি কবিতার তারিখ আছে। সেই তারিখ দেখলে বিশ্লেষণ করা যাবে কবিতাটি কেন লিখেছি? এভাবে বাছাই করতে গিয়ে আমি বেশ অসুবিধায় পরলাম। আজকে হয়ত আমি ৫৬টি কবিতার লিস্ট করলাম। রাতে বাসায় গিয়ে মনে হলো, আরে আমি তো ওই আন্দোলনের সময় ৬ লাইনের একটি কবিতা লিখেছিলাম। ওটা তো দেওয়া হলো না। আবার পরদিন আরেকটি কবিতার লিস্ট করি। আবার দুইদিন পরে মনে হলো, আরে! ওই মেয়েটির সাথে ফস্টিনস্টি করার সময় বলেছিলাম, আমি তোমার জন্য এই কবিতাটি লিখেছি। কিন্তু ওটা তো দেওয়া হয়নি। সুতরাং আবার লিস্ট পাল্টাই। এভাবে কত বার যে লিস্ট পাল্টিয়েছি আমি!

 

জব্বার আল নাঈম : আপনি বলছেন, ফর্মার হিসাব করে ৫৬টি কবিতা সিলেক্ট করেছেন। শুনেছি আপনি নাকি বলেছেন, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ মাথায় রেখে ৫৬টি কবিতার ভাবনা?

হেলাল হাফিজ : ফর্মার হিসাবেই ৫৬টি কবিতা। যেহেতু আমার দীর্ঘ কবিতা নেই, সেই হিসাবে প্রতি পৃষ্ঠায় একটি করে কবিতা। চার ফর্মা মানে ৬৪ পৃষ্ঠা। সেখানে ৫৬টি কবিতা আর বাকি ৮ পৃষ্ঠা ইনার। এখন আবার তুমি যে কথাটি বললে, এটা চালু হয়ে গেছে যে, ৫৬টি কবিতা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের জন্য সাজানো। একে আমি খারাপ বলব না। আসলে সাহিত্যে আমার কপাল বেশ ভালো। সব কিছুই আমার লাক ফেভার করে।

 

জব্বার আল নাঈম : হেলাল ভাই, আপনার নিয়তি সত্যি খুব ভালো। জীবদ্দশায় এমন সম্মাননা খুব কম কবিই পায়।

হেলাল হাফিজ : আমি নির্মোহভাবে বলতে পারি, আমার কবিতার চেয়ে অনেক ভালো কবিতা আছে। আবার আমার অনেক সিনিয়র আছেন কিংবা অনেক জুনিয়র আছে আমার চেয়ে ভালো কবিতা লিখে। আমি তো একজন পাঠকও। আমি সমসাময়িক কবিতা পড়ি। পড়ার চেষ্টা করি। এবং এই সময়ের বা সমকালের অনেকের কবিতাও আমি পড়ি। তোমার ভেতর কী কাজ করছে। একটি মেয়ের বুকে জন্মাবধি কী কাজ করছে আমি তা কীভাবে বুঝব? আমাকে তো তাদের কবিতা পড়ে জানতে হবে। সেখান থেকে তাদের আমি নতুনভাবে আবিষ্কার করব। চিনতে পারব। যেমন আগে মেয়েদের বয়স জিজ্ঞাসা করাকে অভদ্রতা মনে করা হতো। এখন মেয়েরা বয়স লুকায় না। একটা মেয়ের সাথে আমার নিবিড় বন্ধুত্ব হলো। বয়সের দিক বিবেচনা করলে সে আমার মেয়ের মতো। যাহোক বন্ধুত্বের জন্য বয়স লাগে না। যে কোনো বয়সেই বন্ধুত্ব করা যাবে। সে আমার কবিতা পছন্দ করে। আমি ছাড়া তার আর অন্য কোনো প্রিয় কবি নেই-এরকম সম্পর্ক। একদিন নিবিড়ভাবে আড্ডা দিচ্ছি। সে বলল, এখন কিন্তু অনেক মেয়েরাই তাদের বয়স হাইড করে না। হাইড করে কী জানো? ওজন। মেযেরা তার ওজন কখনো বলবে না। উল্টো বলবে, তুমি কি আমাকে বহন করবে? বুকের উপর বহন করব তো আমি।

কথা হলো, আমি যদি ঐ তরুণীর সঙ্গে না মিশতাম তাহলে এই তথ্য আমার অজানা থেকে যেত।

 

জব্বার আল নাঈম : তরুণদের সাথে মেশা বা তাদের লেখার সাথে পরিচিত হওয়ার সুবাদে আপনার জানার কথা- এখনকার কবিতা কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে?

হেলাল হাফিজ : তরুণরা ভালো লিখছে কিন্তু আলাদা যে একটা কণ্ঠস্বর হবে তা এখনও হয়ে ওঠেনি। তুমি খেয়াল করলে দেখবে, ষাটের একটা স্বর আছে। রফিক আজাদের আলাদা স্বর আছে, নির্মলেন্দু গুণের কবিতা আলাদা, হেলাল হাফিজের একটা ঘরানা, আবুল হাসানের কবিতার আলাদা কণ্ঠস্বর আছে। আবুল হাসানের নাম উঠিয়ে দিলে সত্যিকারের কবিতাপ্রেমী যারা তারা ঠিকই বলতে পারবে এটা আবুল হাসানের কবিতা। হেলাল হাফিজের কবিতাও তাই। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তারপর সত্তরের দিকে এসে একটু দাঁড়াচ্ছিল রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তাও দাঁড়ানোর আগেই চলে গেল। অকালপ্রয়াত। তারপর আর কই? আশিতে এসেও কেউ আলাদা কণ্ঠ তৈরি করতে পেরেছে? অর্থাৎ রুদ্রর পরে তুমি আর কাউকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারবে না। কিন্তু ভালো লিখছে অনেকে। হয়ত আরো সময় নেবে। একটা সময় বেরিয়ে আসবে। সবাই একই সময়ে শনাক্ত হয় না।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ নভেম্বর ২০১৬/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC