ঢাকা, সোমবার, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

রোহিঙ্গা সমস্যা, আগুনে ঘি ঢালছে রাজনীতি || অজয় দাশগুপ্ত

অজয় দাশগুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১১-২৫ ৮:১৩:০৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৬ ১:৩৪:৩৩ পিএম

কিছু কিছু নেতা থাকে যাদের কাজ দলের বারোটা বাজানো। সব দলে সব জায়গায় এদের দেখা মিলবে। সরকারী দলে এমন নেতা এখন ভুরি ভুরি। দলে শুধু নয়, উড়ে এসে জুড়ে বসারাও আজ উচ্চস্বরে কথা বলছে। আজকাল নেতাদের কাজ করতে হয় না। কথাই কাজের বাপ এখন। সাথে আছে চটজলদি লিখে হয় মিডিয়ায়, নয়তো ফেইসবুকে ধরিয়ে দেওয়া। বামদলের প্রধান যেভাবে রেগুলার কলাম লেখেন, হররোজ ফেইসবুকে হানা দেন, মনে হবে এটাই রোজকার রুটিন। জাসদখ্যাত এখনকার জোট মন্ত্রীও সমানে তা করে যাচ্ছেন। ঘোরতর বিপদে থাকা বিএনপির নেতা গয়েশ্বর বাবুও মুখর। দলের হাল ধরার লোক না থাকলেও বচনের কমতি নাই।

 

দেখলাম তাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট দেশত্যাগী বিতর্কিত তারেক জিয়ার জন্মদিন পালনের ভাষণে গয়েশ্বর রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। অযাচিতভাবে হোক আর যেভাবেই হোক এ বিষয়ে তার বক্তব্য পরিবেশকে আরো ঘোলাটে করবে মাত্র। বিবেচনাহীনভাবে সীমান্ত খুলে দেওয়ার কথা বলায় মানবিকতার সস্তা ভাবনা থাকলেও রাজনীতি নেই। দেশে সমস্যার অন্ত নাই। ডিজিটাল দেশে হিন্দু- সাঁওতাল উদার মুসলিমের জীবন আছে শঙ্কায়। দাউ দাউ আগুনে পোড়া সাঁওতালদের বাড়ি দেখে মন জাগলো না, বিবেক কথা বললো না কেন? কোন রাজনীতি তাদের অভয় দিতে গিয়েছিল? নিজের বাড়ির আগুনে পোড়া আলু খাওয়া মানুষের প্রতিবেশী প্রেম কেমন জানি মেকী মনে হয়।

 

এটা বুঝি যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের হাল খুব খারাপ। আমরা দুয়ার খুলে দিলেই কি তা ভালো হয়ে যাবে? এর আগেও তারা ঢুকেছিল। ঢোকার পর চাটগাঁর একাংশকে জামাতের স্বর্গ বানিয়ে ছেড়েছে এরা। আমি মানুষের শরণার্থী হবার ঘোরবিরোধী। এরা মোহাজের বাঙালি বা রোহিঙ্গা যাই হোক না কেন, নিজেরা উদ্বাস্ত বলে নিপীড়িত বলে যে দেশে যায় সে দেশেরও বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। কারণ সেসব দেশের ভূমিসন্তান নয় বলে তাদের কোনো টান থাকে না। ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি কিছুই জানে না বলে এরা হয়ে ওঠে বিধ্বংসী। রামুর হামলার পেছনে এদের নাম জড়িয়েছে তাই।

 

ফলে সমাধানের কূটনৈতিক দিকটি ভাবতে হবে। হুজুগে বাঙালি এর মধ্যে পাহাড়ি আদিবাসীদের খেদিয়ে এদের আনবার খোয়াব দেখছে। নিজ দেশে এতবড় বিপদ ও অঘটন টেনে আনার নাম মানবিকতা?
নেতা নামধারীদের উস্কানী এই আগুনে আরো ঘি ঢালবে। প্রয়োজন কূটনীতিক চাল। নোবেলজয়ীদের ভূমিকা রাখতে বাধ্য করা। আমাদের দেশের বিজয়ীও যেন বাদ না পড়েন। তবেই সমাধানের পথ খুঁজে পাবে। মিয়ানমার কি এবং কেমন সেটা না জানলে এর উত্তর মিলবে না।

 

মনে রাখা প্রয়োজন দশকের পর দশক এই দেশ ছিল সামারিক জান্তার বুটের তলায়। গণতন্ত্র কি জিনিস এখনো তারা বুঝে উঠতে পারেনি। অং সান সু চীর অতীতটাও মনে রাখুন। বেচারী তার স্বামীকেও দেখতে যেতে পারেননি। গেলে ফিরে আসতে না পারার কারণে দেশ ছাড়েননি তিনি। গৃহবন্দি ছিলেন অনেক বছর। আমাদের নোবেলজয়ী একদিনের জন্যও নজরবন্দি ছিলেন? না তার আসা যাওয়া থাকা অনিশ্চিত? তবু তিনি মুখ খোলেন না। সু চীর দেশের জান্তা প্রকাশ্যে না থাকলেও তাদের ছায়া কায়ার চাইতেও ভয়ংকর। বলছি না সে ভয়ে গুটিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু এটাই বাস্তবতা।

 

রোহিঙ্গা সমস্যাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নতুন করে নিজের বিপদ ডেকে আনা হবে। মিয়ানমার বলপ্রয়োগে বিশ্বাসী। আরো একবার নৌ-সীমানা নিয়ে বিভেদ দেখা দিয়েছিল। সে সময় অস্ট্রেলিয়ায় হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী। তিনি ছিলেন আমাদের জেনারেল। তিনি ছক কেটে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মাথা গরম করে লাভ নেই। যেকোন সংঘাত আমাদের বিপদ বাড়িয়ে তুলবে। তখন রাগ হলেও এখন বুঝি তার হিসাব ছিল সঠিক। আজকের যুগে হট হেডেড দেশ বা মানুষ কেউই টেকে না। আমাদের আয় উন্নতির কালে পরের বোঝা নিজের ঘাড়ে নেওয়ার নামকে মানবতা বলা যায় না।

 

রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের সৃষ্ট নয়। তাদের ভেতর থেকেই এর সমাধান আসতে হবে। বছরের পর বছর নিজেদের আলোহীন রাখা দেশ ও সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ এবং ঘৃণার শিকার হয়ে তারা এখন দিশেহারা। দেশত্যাগ সমাধান নয়। কূটনীতি মনে করিয়ে দেয়, আমাদের পার্বত্য জনপদের সমস্যার সময় মিয়ানমার কোনো দুশমনের ভূমিকা পালন করেনি। করলে অনেক কিছু ঘটতে পারতো।

 

মানবিকতার বাইরে আমাদের বাড়াবাড়ি করার সুযোগ নেই। এই জনগোষ্ঠীর দায় সেদেশের সরকারকেই নিতে হবে। আমাদের সরকার ও রাষ্ট্র এখন অবদি যা করছে সেটাই সঠিক। হুজুগে বাঙালি আর উন্মাদনাকারীদের কথা শুনলে বিপদে পড়ার আশঙ্কা বাড়বে বৈ কমবে না।

 

দল দেশ মানুষের কথা না ভেবে গয়েশ্বর বাবু ও তার বিএনপি এগুলো বলছে সস্তায় বাজীমাত করতে। তারা নিজেরা কি রাজী আছেন পরিবার প্রতি একজন করে রাখতে? রেখে দেখুন কতদিন পারেন সামলাতে। আমি বিদেশেও এদের উগ্রতা দেখেছি।

 

নিঃসন্দেহে শিশু ও নারীরা নিরাপরাধ। অপরাধ করেনি বেশীরভাগ পুরুষ। তাই এর বিহিত করতে হবে দুনিয়ার মোড়লদের। যারা মানবতার নামে গলা ফাটায় বোমারু বিমান, সাঁজোয়া যান নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা নিয়ে তাদের নীরবতা বলে দেয় কতটা ভণ্ড এরা।

 

বিশ্ববিবেক জাগ্রত করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেখভাল করার পথটা কীভাবে তৈরি হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 
 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ নভেম্বর ২০১৬/তারা

Walton Laptop