ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ ভাদ্র ১৪২৪, ২২ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

শিক্ষার মান নিয়ে কিছু কথা

লিটন কান্তি হালদার : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৩ ৮:৩২:২০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৪৬:৪৪ পিএম

লিটন কান্তি হালদার : সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা-২০০০ এর একটি লক্ষ্য ‘সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন’। বর্তমান সরকারের  আন্তরিক প্রচেষ্টায় সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের এই অর্জন বিশ্বের কাছে হয়েছে প্রশংসিত। তবে শিক্ষার মান নিয়ে সমালোচনা আছে। শিক্ষার প্রসঙ্গ উঠলেই অনেকে এর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কেউ কেউ বলে থাকেন-শিক্ষার মান একেবারে নিচে নেমে গেছে। এ প্রসঙ্গে কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানের একটি বক্তব্য আমার খুব ভালো লেগেছে। তার বক্তব্যে ছিল ‘শিক্ষার মান কমেনি, তবে যে মাত্রায় উন্নয়নের কথা ছিল সে মাত্রায় উন্নয়ন ঘটেনি।’

 

আমি তার এ বক্তব্যের সাথে একমত। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জিত হয়নি কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কেউই এক কথায় দিতে পারবেন না।

প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তার জীবন ও দেশের চাহিদা অনুযায়ী সুশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যেমন শিক্ষকদের কর্তব্য, তেমনি সন্তানদের সার্বিক বিকাশের প্রতি সচেতন হওয়া অভিভাবকদের কর্তব্য। শিক্ষক ও অভিভাবকের যৌথ দায়িত্ব ও কর্মতৎপরতায় শিশুর সার্বিক বিকাশ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাবে। কিন্তু যে অভিভাবক পরীক্ষার আগের রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সন্তানের হাতে তুলে দেন, আবার পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন না, তিনি কি তার সন্তানের কাছে সেই শিক্ষা দাবি করতে পারেন, যা তার সন্তানের সার্বিক বিকাশের ধারা অব্যাহত রাখবে? যে বাবা ১০ লাখ টাকা দিয়ে সন্তানকে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করার জন্য প্রশ্ন কিনে দেন, তিনি শুধু তার সন্তানকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছেন না, জাতিকে একজন অসৎ ও অযোগ্য ডাক্তারের কবলে ফেলছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস যেমন জঘন্য অপরাধ, তেমনি যারা এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের ক্রেতা বা ব্যবহারকারী সবাই সমানভাবে অপরাধী।

 

শিক্ষার মান নিয়ে আমি কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা বলেছি। তাঁদের প্রথম কথাই হলো ‘সরকার চাচ্ছে সবাই পাস করুক, তাই আমরা সবাইকে পাস করানোর ব্যবস্থা করছি।’ আমি যখন বললাম, সরকার তো চাইতেই পারে, কারণ সরকার শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে, শিক্ষকদের আগের চেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে, প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় একবারে কম নয়, স্বল্প হলেও শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বোপরি বোর্ডের নিয়মানুযায়ী শিক্ষার্থীর ক্লাসে উপস্থিতি ৭৫ শতাংশ বা তার বেশি না হলে এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস না করলে তাকে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় না। যে শিক্ষার্থী নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করবে সে বোর্ড পরীক্ষায় সাধারণত ফেল করবে না। তাহলে সরকারের চাওয়াতে দোষের কি আছে?

যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল স্তম্ভ শিক্ষক, মূল কেন্দ্র শিক্ষার্থী। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক সক্রিয়তা, সহযোগিতা এবং সহমর্মিতার মাধ্যমেই শিক্ষাপ্রক্রিয়ার যাবতীয় কর্মতৎপরতা সুষ্ঠু, সুন্দর ও স্বার্থকভাবে এগিয়ে  যেতে পারে। শিক্ষাবিদ গিলবার্ট হাইটের মতে, একজন ভালো শিক্ষকের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হলো- ১. ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি প্রীতি; ২. বিষয় প্রীতি এবং ৩. নিজ পেশার প্রতি ভালোবাসা। মানুষ গড়ার কারখানায় নিত্যদিন যারা সেবাব্রতে নিমগ্ন, যাঁদের কাজ শিশুদের মন-মননের পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ জীবনের দিকনির্দেশ দেওয়া, সেই শিক্ষকদের অবশ্যই সুক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন আদর্শ ব্যক্তি হতে হবে।

শিক্ষাকে এখন কেউ কেউ একটি লাভজনক ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে গণ্য করছে। পরীক্ষার হলে উত্তর বলে দেওয়া, শিক্ষার্থীকে নকল করতে সহায়তা করা, পরীক্ষার খাতায় অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া, শিক্ষার্থীকে কোচিং-এ যেতে বাধ্য করা, শিক্ষার্থীর সাথে দুরত্ব বজায় রেখে চলার মতো অশিক্ষক সুলভ আচরণ না করা ইত্যাদি আমাদের শিক্ষার মান অর্জনের পথে বড় বাধা।

 

বোর্ডের উত্তরপত্র বিতরণের সময় প্রধান পরীক্ষকের প্রতি একটি অলিখিত নির্দেশনা দেওয়া থাকে, যাতে বলে দেওয়া হয় কাউকে ফেল করাবেন না, লিখলেই নম্বর দেবেন, নম্বর তো আর বাড়ি থেকে এনে দিতে হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। অতিরিক্ত নম্বর না দিলে পরীক্ষকদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠানো হয়। এই নির্দেশনা না মানার সাহস সবার থাকে না। যারা মানতে ইচ্ছুক নন, তারা পরে আর উত্তরপত্র মূল্যায়নের আগ্রহ দেখান না। উত্তরপত্রের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হয় না, ফলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায় না। এখন প্রশ্ন হলো সমাজে নানা অনিয়মের স্রোতে একজন শিক্ষক নিজেকে ভাসিয়ে দেবেন কেন? বরং শিক্ষিতরাই সমাজের সেই অনিয়মের লাগাম টেনে ধরবেন। আমরা যারা শিক্ষক তাঁরা সে দায়িত্ব কতোটা পালন করছি?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘উত্তম শিক্ষক হবেন উত্তম ছাত্র; যেখানে অধ্যাপকগণ জ্ঞানের চর্চায় স্বয়ং প্রবৃত্ত, সেখানেই ছাত্রগণ বিদ্যাকে প্রত্যক্ষ দেখতে পায়।’ মঞ্জুশ্রী চৌধুরী তাঁর ‘সুশিক্ষক’ গ্রন্থের ৭৯ পৃষ্ঠায় বলেছেন, ‘শিক্ষকের প্রথম দায়িত্ব ছাত্রের প্রতিই নিয়োজিত হবে। ছাত্রের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ না থাকলে তিনি স্কুলের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কর্মময় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভূক্ত হয়ে শিক্ষকতার মতো শিল্পীজনোচিত নৈষ্ঠিক কর্মে সার্থক হতে পারবেন না। ... শিক্ষার্থীর ব্যক্তি মানস গড়ে ওঠার সুবর্ণ সময়ে শিক্ষককে তাঁর মনোবিজ্ঞানী দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাগত নিষ্ঠা ও নৈপূণ্য, মৌলিক ও অর্জিত জ্ঞান-অভিজ্ঞতার পূর্ণ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী অনুকূল পরিবেশে তার আচার-আচরণে বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধন করতে সক্ষম হয়।’

শিক্ষকের দক্ষতা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অনিয়মের মাধ্যমে অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আমিও এ বিষয়ে একমত। যার জন্ম অনিয়মের মধ্যে, তার কর্ম নিয়ম মাফিক হবে কি করে? সরকারি বাজেটে শিক্ষায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয় না। শিক্ষকরা সংসার চালানোর মতো পর্যাপ্ত বেতন ভাতা পান না। প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা এবং সুন্দর পরিবেশ নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। ভালো শিক্ষক শুধু বিষয়-বিশেষজ্ঞই হবেন না: একটি বিষয় কত বার কত রকম দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ও শোনা যায় তার কলাকৌশলও জানতে হবে।

সর্বোপরি ঘন ঘন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা শিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধির পথে বড় অন্তরায়। শিক্ষাক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যার সমাধান না করে শিক্ষার হার শতভাগ এবং কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে চাওয়া কি যৌক্তিক?


লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 
 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ জানুয়ারি ২০১৭/টিআর/শাহনেওয়াজ/তারা

Walton Laptop