ঢাকা, বুধবার, ১২ মাঘ ১৪২৩, ২৫ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:

সবচেয়ে বেশি শীত যেখানে

স্বপ্নীল মাহফুজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-১২ ৮:২০:২৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-১২ ২:১১:০৮ পিএম

স্বপ্নীল মাহফুজ : মানুষের জন্মগত ভাবেই পরিশ্রমী। সম্ভবত এর প্রমাণ মিলবে রাশিয়ার ক্ষুদ্র গ্রাম ওইমিয়াকন এর বাসিন্দাদের দেখলে। এটিই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শীতল এলাকা।

আমাদের দেশে যেখানে আমরা ৭-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই শীতে কাবু হয়ে যাই, সেখানে ওইমিয়াকনে শীতকালে গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এখানের রেকর্ডকৃত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৯২৪ সালে ছিল মাইনাস ৯৬.১৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (মাইনাস ৭১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।

অভিযাত্রী এবং ফটোগ্রাফার আমোস চ্যাপেল রাশিয়ার ওইমিয়াকন গ্রাম এবং তার নিকটতম শহর কেন্দ্র ইয়াকুতস্ক ভ্রমণ করেছিলেন। চ্যাপেল এখানে পাঁচ সপ্তাহ কাটান। এখানকার আবহাওয়া এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন।

চ্যাপেল ইয়াকুতস্ক দিয়ে তার যাত্রা শুরু করেন, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাশিয়ার ইয়াকুট অঞ্চলের রাজধানী। এটাকে সাধারণত বিশ্বের সবচেয়ে শীতলতম রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়। এই শহরের জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ। শীতের সময় গড় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (মাইনাস ৩৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। চ্যাপেল শহরটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, শহরটি চমৎকার এবং অসাধারণভাবে সাজানো গোছানো ।

এখানকার লোকেরা কিভাবে ঠাণ্ডার সঙ্গে লড়াই করে এমন প্রশ্নের জবাবে চ্যাপেল বিজনেস ইনসাইডারকে জানান, ‘তারা রাসকি চা, যা আক্ষরিক অর্থে রাশিয়ান চা পান করেন, যা তাদের জন্য ভদকার মতোই।’

চ্যাপেল স্থানীয়দের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন এবং তাদের আমন্ত্রণে তাদের গেস্টহাউসে অবস্থান করেন। চ্যাপেল বলেন, আমি তাদের জন্য রান্না করার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু এতো শীতের মধ্যে রান্না করা যথেষ্ট কষ্টের ব্যাপার ছিল। হীরা বাণিজ্যের কারণে এই শহরটি অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী এমনটাই জানান চ্যাপেল।

ইয়াকুতস্ক এর পর চ্যাপেল ওইমিয়াকন গ্রামে ভ্রমণে যান, সেখানকার বাসিন্দাদের জীবনযাপন প্রত্যক্ষ করার জন্য। ওইমিয়াকনের প্রবেশ পথেই কমিউনিস্ট যুগের স্মৃতিস্তম্ভ চোখে পড়বে। যেখানে এই স্থানের রেকর্ডকৃত সর্বনিম্ন তাপমাত্রার উল্লেখ আছে। এখানে সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘ওইমিয়াকন, ঠাণ্ডার মেরু’।

শীতকালে এ অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এখানে চ্যাপেল ঠাণ্ডার প্রচন্ড প্রকপে হতচকিত হয়েছিল। ওয়েদার চ্যানেলকে চ্যাপেল জানান, ‘আমার মনে আছে, আমার এমন অনুভব হচ্ছিল যেন ঠাণ্ডা আমার পা দুটিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। আরেকটা আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে, আমার নিজের লালা ঠাণ্ডায় জমে সুচ এর মতো হয়ে গিয়েছিল, যা আমার ঠোটে ফুটছিল।’ তিনি বলেন, ‘এই আবহাওয়ায় পুরো দিন থাকা খুবই বিরক্তিকর ও ক্লান্তিকর।’


ক্যামেরায় ছবি তোলাটাও কঠিন। চ্যাপেল বলেন, ‘এখানের কুয়াশায় শ্বাস নিলেই সিগারেটের ধোয়ার মতো ধোয়া তৈরি হয়, তাই ছবি তোলার সময় আমাকে শ্বাস বন্ধ রাখতে হতো। এখানে ক্যামেরায় ফোকাস করাটাও খুব কষ্টসাধ্য হয়ে দাড়ায় ঠাণ্ডার কারণে।’

এখানকার মাটি সম্পূর্ণ রূপে বরফে জমা যার ফলে গ্রামের ঘরগুলোতে পানির পাইপ নেয়া অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। ঘর থেকে বাথরুমে পানি নেওয়াটাও কষ্ট সাধ্য। মাটির ওপর জমে থাকা বরফের কারণে ওইমিয়াকনে মৃতদের সমাহিত দেয়াও কঠিন হয়ে যায়। সমাহিত করার পূর্বে, মাটি উষ্ণ করার জন্য বড় দাবানল তৈরি করা হয়।

চ্যাপেল ভেবেছিলেন গ্রামবাসী নতুন অতিথিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আগ্রহী হবে কিন্তু সেখানে মানুষের দেখা পাওয়াই কঠিন।

যেহেতু এখানে মাটি বরফে জমে থাকে তাই এখানে সবজি চাষ করা সম্ভব হয় না। তাই এখানকার লোকেরা পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই কাজ তাদের খাদ্যাভ্যাসকে প্রভাবিত করে। তারা হিমায়িত কাঁচা মাছ, স্যালমন, রুপালি মাছ খায়। এছাড়াও তারা ঘোড়ার কলিজা খায়। মূলত তারা মাংসের স্যুপ খেয়েই বেঁচে থাকে। এই অঞ্চলের ঘরবাড়িগুলো তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে।


চ্যাপেল বলেন, ‘এখানে স্বাভাবিকভাবেই জীবন চলতে থাকে কিন্তু থার্মোমিটারে চোখ দিলে দেখা যায় যে সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তার নিচে।

বিশ্বাস করুন কিংবা না করুন এখানে গরমের সময় তাপমাত্রা বেশ সহনীয়। সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা প্রায় ৯৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। তবে গরমের মাস স্বল্পস্থায়ী হয় আর নিষ্ঠুর শীত যেন অনন্তকাল ধরেই চলতে থাকে।

 

তথ্যসূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ জানুয়ারি ২০১৭/ফিরোজ