ঢাকা, সোমবার, ৮ কার্তিক ১৪২৪, ২৩ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সাহিত্যে বেদনার বছর ২০১৬

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২৫ ৫:০১:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৪৫:১৯ পিএম
অলংকরণ : আরিফ আহমেদ

সাইফ বরকতুল্লাহ :  আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে..তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’।  রবীন্দ্রনাথের এ গানের মতোই যেন কেটে গেছে এ বছরের সাহিত্যাঙ্গন। বিশেষ করে কবি রফিক আজাদ, বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম, বিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি, হাজার চুরাশির মা খ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী, কবি শহীদ কাদরীর মৃত্যু যেন সাহিত্যাঙ্গনে বয়ে গেছে বিরহ বাতাস। বছরের শেষের দিকে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ও কবি মাহবুবুল হক শাকিলের মৃত্যু বাংলাদেশের সাহিত্যঙ্গনে শোকের পরিমাপ যেন সবকিছু ছাপিয়ে যায়। এসব নিয়েই সাজানো হয়েছে শিল্প সাহিত্যঙ্গনের ধারাবাহিক সালতামামি-২০১৬ এর ২য় পর্ব।

 

কায়সুল হক :  পঞ্চাশের দশকের বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক কায়সুল হক ১৩ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। কায়সুল হক ১৯৩৩ সালে অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলায় মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এর মধ্যে অধুনালুপ্ত শৈলী, অধুনা, সবার পত্রিকা ও কালান্তর উল্লেখযোগ্য।

 

রফিক আজাদ :  কবি রফিক আজাদ ১২ মার্চ মারা যান।  তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি 'ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাব' কবিতা দিয়ে খ্যাতিমান হন। ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা সলিম উদ্দিন খান ছিলেন একজন সমাজসেবক। আর মা রাবেয়া খান ছিলেন গৃহিণী। কবি রফিক আজাদ বাংলা একাডেমির মাসিক সাহিত্য পত্রিকা 'উত্তরাধিকার'র সম্পাদক ছিলেন।  রোববার পত্রিকাতেও সম্পাদনার কাজ করেছেন। তিনি টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের বাংলার লেকচারার ছিলেন। ১৯৭১ সালে কাদের সিদ্দিকীর সহকারী হিসেবে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন। তার লেখা অসংখ্য কবিতা ও বইয়ের মধ্যে রয়েছে- অসম্ভবের পায়ে, সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে, চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি, প্রেমের কবিতাসমগ্র, বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে, বিরিশিরি পর্ব, রফিক আজাদ শ্রেষ্ঠকবিতা, রফিক আজাদ কবিতাসমগ্র, হৃদয়ের কী বা দোষ, কোনো খেদ নেই, প্রিয় শাড়িগুলো প্রভৃতি।

 

উমবার্তো ইকো :  খ্যাতিমান ইতালীয় ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সমালোচক উমবার্তো ইকো ১৯ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। উমবার্তো ইকোর জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ জানুয়ারি ইতালিতে। তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, ইউরোপের মধ্যযুগ গবেষক, নকশা ও সংকেত বিশারদ, দার্শনিক ও সাহিত্য সমালোচক।

 

ইমরে কারতেজে :   ২০০২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হাঙ্গেরির লেখক ইমরে কারতেজের (৮৬) জীবনাবসান হয়েছে। ৩১ মার্চ তার মৃত্যু হয়। ইমরে কারতেজ ১৯২৯ সালে বুদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মানির নাৎসী বাহিনীর গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া কিশোর ছিলেন তিনি। সাহিত্যকর্মে নাৎসীদের গণহত্যার সত্যচিত্র তুলে ধরায় ২০০২ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

 

নূরজাহান বেগম :  ভারতীয় উপমহাদেশের নারীদের প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম ২৩ মে ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত এবং সাহিত্যিক নূরজাহান বেগম। তিনি ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিনের কন্যা। ভারত উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’ পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকে এর সম্পাদনার কাজে জড়িত এবং ছয় দশক ধরে বেগম পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। নূরজাহান বেগম ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুর জেলার চালিতাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

 

হিল জিওফ্রে :  হিল জিওফ্রে একজন ইংরেজি কবি। ৮৪ বছর বয়সে গত ৩০ জুন মারা যান। হিল জিওফ্রে ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক অধ্যাপক। বিংশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন তিনি।  জিওফ্রের অধিকাংশ কবিতায় জীবন, নৈতিকতা এবং বিশ্বাস ফুটে উঠেছে। ১৯৩২ সালে ইংল্যান্ডের ওরচেস্টারশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে `কিং লগ` (১৯৬৮), মারসিয়ান হামস (১৯৭১)।

 

এলভিন টফলার :  এলভিন টফলার ২৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসে নিজ বাসায় মারা যান। তিনি একজন মার্কিন লেখক। জন্ম ১৯২৮ সালের ৪ অক্টোবর। তিনি পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বই লিখেছেন৷  দ্যা থার্ড ওয়েভ বা তৃতীয় ঢেউ- গ্রন্থ লিখে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন।

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামি :  বিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি ৭৬ বছর বয়সে ৫ জুলাই ফ্রান্সে  চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান। স্বর্ণপামসহ বিশ্বের অনেক সেরা পুরস্কারজয়ী এ পরিচালক দ্য টেস্ট অব চেরি, ক্লোজআপ, সার্টিফায়েড কপির মতো অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চলচ্চিত্র জগতে পেয়েছেন স্থায়ী আসন। বিশ্ব সিনেমা অঙ্গনে যে কজন প্রভাবশালী আর গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম আব্বাস কিয়ারোস্তামি। যাকে বিশ্ব সিনেমা অঙ্গনে ইরানি সিনেমার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে মনে করা হয়। আব্বাস কিয়ারোস্তামি ১৯৪০ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন।

 

 

জেনি ডিস্কি :  ব্রিটিশ লেখক জেনি ডিস্কি ২৮ এপ্রিল মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৬৮  বছর। দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভুগছিলেন। জেনির এ পর্যন্ত ১৮টি উপন্যাস বের হয়েছে। তিনি উপন্যাস, নন-ফিকশন, ফিচার, ছোট গল্প, স্মৃতিকথা, ভ্রমণ লিখতেন। লন্ডন রিভিউ অব বুকস-এ তিনি নিয়মিত লিখতেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে ক্যানসার-জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তার ‘ইন গ্রাটিটিউড’ বইটি। ১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই লন্ডনে  জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

 

মহাশ্বেতা দেবী : মহাশ্বেতা দেবী ২৮ জুলাই ৯০ বছর বয়সে দক্ষিণ কলকাতার বেলভিউ নার্সিংহোমে মারা যান। ‘হাজার চুরাশির মা’ তার বিখ্যাত উপন্যাস। ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের এক খ্যাতনামা পরিবারে তার জন্ম। মহাশ্বেতা দেবীর বাবা মনীশ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং তার চাচা ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক। তার ছেলে নবারুণ ভট্টাচার্য কথাসাহিত্যিক ছিলেন।

 

শহীদ কাদরী :  একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি শহীদ কাদরী ২৮ আগস্ট ইন্তেকাল করেন। কবির বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। জন্ম ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট। তিনি পঞ্চাশ দশকের বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও তিরিশের পঞ্চপাণ্ডবের হাত বেয়ে এবং বিভাগোত্তর মধ্য চল্লিশের দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক কবিতার যে চর্চা শুরু হয়, তারই পরবর্তী দশকের কাব্য-তুর্কিদের অন্যতম একজন তিনি। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ এবং ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে রচিত কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’।

 

দারিও ফো :  নোবেল বিজয়ী ইতালীয় নাট্যকার, অভিনেতা দারিও ফো ১৩ অক্টোবর ইতালির মিলানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। বিশ শতকের  রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক নাটকের এক প্রধান নাম দারিও ফো। তার সেরা কাজগুলোর মধ্যে আছে ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ অব অ্যান অ্যানার্কিস্ট’ এবং ‘ক্যান্ট পে ওন্ট পে’। ১৯২৬ সালে ছোট্ট শহর লেক মাগজোরের সান জানোতে জন্মগ্রহণ করেন ফো। ফো ইতালির নানা উপভাষা, নানা লাতিন বুলি ব্যবহার করে রম্য ধারার মাধ্যমে জটিল জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন তার লেখায়।

 

ইভেস বোনেফয় :  ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় সমকালীন কবি ইভেস বোনেফয় ১ জুলাই মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। তার লেখা শতাধিক বই ৩০টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। শেক্সপিয়ারের নাটক অনুবাদের জন্যই তিনি বিখ্যাত ছিলেন। এর পাশাপাশি ইয়েটস, পেট্রাচ ও তার বন্ধু জর্জ সেফেরিসের জন্যও কাজ করতেন। বোনেফয় ১৯২৩ সালে ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলীয় টুর্সে জন্মগ্রহণ করেন।

 

সৈয়দ শামসুল হক : সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ২৭ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন। ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প তথা সাহিত্যের সব শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়ে থাকে। ১৯৬৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান সৈয়দ শামসুল হক। এখন পর্যন্ত বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ লেখক তিনি। ১৯৫০-এর দশকে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস দেয়ালের দেশ। পরে খেলারাম খেলে যা, নিষিদ্ধ লোবান, সীমানা ছাড়িয়ে, নীল দংশন, বারো দিনের জীবন, তুমি সেই তরবারী, কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন, নির্বাসিতার মতো বিখ্যাত উপন্যাস উপহার দিয়েছেন। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে একদা এক রাজ্যে, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, পরানের গহীন ভিতর, অপর পুরুষ, অগ্নি ও জলের কবিতা। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন সৈয়দ শামসুল হকের বিখ্যাত কাব্যনাট্য।

 

মাহবুবুল হক শাকিল :  কবি মাহবুবুল হক শাকিল ৬ ডিসেম্বর মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর। মাহবুবুল হক শাকিল ১৯৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। সাবেক এই ছাত্রনেতা সাহিত্য অনুরাগী ও লেখক ছিলেন। তার প্রকাশিত বইগুলো হলো ‘খেরোখাতার পাতা থেকে’ ও ‘মন খারাপের গাড়ী’।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ ডিসেম্বর ২০১৬/সাইফ

Walton
 
   
Marcel