ঢাকা, সোমবার, ১৩ চৈত্র ১৪২৩, ২৭ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

সুলতান সুলেমান বনাম আমরা || ফিরোজ আলম

ফিরোজ আলম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২৭ ৩:০২:৪২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-১৩ ২:০১:৪৫ পিএম

একটি চিত্র যদি হাজার শব্দের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়, তবে একটি চলমান চিত্র কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার প্রমাণ পাচ্ছি আমরা ‘সুলতান সুলেমান’ নামের হালের একটি ডাবিং সিরিয়াল থেকে। ‘মেরাল ওকেয়’ ও ‘ইয়িল্মাজ শাহীন’ রচিত ইতিহাসনির্ভর তুর্কি টিভি সিরিয়ালটিতে এমন কী আছে যে, দর্শককে মোহগ্রস্ত করে ফেলেছে? এর নির্মাণ কি অনেক সুন্দর, নাকি ব্যয়বহুল? সুন্দরের সংজ্ঞা আপেক্ষিক হলেও সিরিয়ালটি যে ব্যয়বহুল, এটা নিশ্চয় সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন।

 

শুধু ব্যয়বহুল হলেই নিশ্চয় একটি টিভি সিরিয়াল জনপ্রিয় হয় না। জনপ্রিয়তার আরো কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান নিশ্চয়ই এতে আছে। প্রাথমিকভাবে বলা যায়, যেকোনো রাজপরিবারের অন্দর মহলের প্রতি সাধারণ মানুষের ব্যাপক কৌতূহল থাকে। আমাদের দেশের সিংহভাগ মুসলিম হওয়ায় ওসমানীয় রাজবংশের প্রতি কিছুটা বাড়তি আগ্রহ যোগ হয়েছে। এই আগ্রহ বাংলাদেশে এই সিরিয়াল জনপ্রিয় করার পেছনে কাজ করেছে।

 

এখানে ভাবার বিষয় হলো, ‘সুলতান সুলেমান’ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় একটি ধারাবাহিক। এটি বিশ্বের পঞ্চাশটিরও বেশি দেশে এরই মধ্যে প্রচারিত হয়েছে। এই তালিকায় চীন, আমেরিকা, রাশিয়া, ইতালি, হাঙ্গেরি ও ইসরায়েলের মতো দেশও আছে। সিরিয়ালটি প্রথমে 'মুহতেশেম ইউজিয়েল’ শিরোনামের তুরস্কের ‘শোটিভি’তে সম্প্রচার হয়। পরবর্তীকালে তুরস্কের ‘স্টারটিভি’-তে সম্প্রচার স্থানান্তরিত হয়। বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘দীপ্ত টিভি’ ২০১৫ এর ১৮ নভেম্বর উদ্বোধনের দিন থেকে ধারাবাহিকটি সম্প্রচার শুরু করে। বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির কারণে সিরিয়ালটি কিছু কাটছাঁট ও দৃশ্য পরিমার্জন করা হয়। ইউরোপীয় নির্মাণকে এ দেশের উপযোগী ও বাংলা ভাষায় ডাবিং করে সপ্তাহের ছয় দিন নির্দিষ্ট সময়ে সিরিজটি প্রচার শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায়। পথচলার মাত্র দুই মাসেই সুলতান সুলেমানের কল্যাণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসে বিনোদনমূলক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘দীপ্ত টিভি’।|

 

সিরিয়ালটি এক বছর নির্বিঘ্নে চললেও এখন এটি বন্ধের জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছে। একদিকে এই সিরিয়াল বন্ধের জন্য আন্দোলন হচ্ছে, অপরদিকে এর দর্শকরাও সিরিয়ালটির পক্ষে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধন করছেন। কোনো টিভি সিরিয়াল নিয়ে এমন পরিস্থিতি ইতিপূর্বে দেখা যায়নি।

 

প্রায় ৭০০ বছর ধরে তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের রাজত্ব ছিল পৃথিবীজুড়ে। সুলতান সুলেমানের নেতৃত্বে ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী এই সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ ছিল। ‘সুলতান সুলেমান’ নির্মিত হয়েছে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ব্যাপী রাজত্ব বিস্তারকারী এই সুলাইমানের প্রাসাদের ভেতরের জীবন নিয়ে। যেখানে প্রাধান্য পেয়েছে রাজতন্ত্রের ষড়যন্ত্র ও পারিবারিক সংঘাত। এই চরিত্রে অভিনয় করেন তুর্কি অভিনেতা ‘খালিদ এরগেঞ্চ’। তুরস্কে ব্যাপক জনপ্রিয় এই অভিনেতা অসংখ্য চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সিরিয়ালের আরেকটি অন্যতম চরিত্র সুলতানের দ্বিতীয় স্ত্রী ‘হুররাম খাতুন’। গল্পটি এগিয়ে গেছে সুলতানের প্রিয়তমা এই স্ত্রী হুররাম সুলতানার ওপর ভিত্তি করে, যে হেরেমের ক্রীতদাসী হয়েও পরবর্তীকালে তার প্রধান স্ত্রী বা সুলতানা হিসেবে সম্মানিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। ‘মারিয়াম উজারলি’ নামের এক তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান অভিনেত্রী এই চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। হুররাম সুলতানা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি সমালোচকদের প্রশংসা পান ও গোল্ডেন বাটারফ্লাই পুরস্কার লাভ করেন।

 

এই সিরিয়ালের পরিচালক ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেঞ্চুরি’খ্যাত সুলতান সুলেমানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের চেয়ে তার পারিবারিক জীবনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। সুলেমান যতটা সুশাসক ছিলেন তার কমই এই সিরিয়ালে প্রকাশিত হয়েছে। তাই খোদ তুরস্কেও এই সিরিয়াল প্রচারের পর কিছু কিছু দর্শক ধারাবাহিকটি বন্ধের দাবি তোলেন। তারা এই সিরিয়ালে তুর্কি সুলতানকে অসম্মানিত, অশ্লীল এবং ফুর্তিবাজ হিসেবে চিত্রায়িত করার অভিযোগ তোলেন। এই দাবির পক্ষে মত দেন  তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নিজেও। তিনি ধারাবাহিকটি তরুণ প্রজন্মের কাছে তাদের ইতিহাসকে নেতিবাচক আলোকে প্রদর্শন করার একটি  প্রচেষ্টা হিসেবে নিন্দা করেন। তুরস্কের সর্বোচ্চ বেতার ও টেলিভিশন পরিষদ আরটি ইউকের কাছে সিরিজটির বিরুদ্ধে ৭০ হাজার অভিযোগ জমা পড়লে কর্তৃপক্ষ একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের গোপনীয়তাকে ভুলভাবে প্রদর্শনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার জন্য সিরিজটির নির্মাতাদের নির্দেশ প্রদান করেন। এরপরও টিভি সিরিয়ালটি বিশ্বের বায়ান্নটি দেশের কোটি কোটি দর্শকের কাছে সম্প্রচারিত হয়। এবং সব দেশেই সিরিয়ালটি ব্যাপক জনপ্রিয়তার মাধ্যমে উচ্চ রেটিং লাভ করে।

 

গত এক বছরে বাংলাদেশে সিরিয়ালটি যখন তার অবস্থান বেশ পোক্ত করে নিয়েছে তখন দেশের সিংহভাগ অভিনয়শিল্পী ও নাট্যনির্মাতা এটি বন্ধ করার জন্য আন্দোলন করছেন। বলাবাহুল্য, এই আন্দোলন শুধু সুলতান সুলেমানকে ঘিরেই নয়। আন্দোলন মূলত সব বাংলা ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়ালের বিরুদ্ধে। তবে অন্য সিরিয়ালগুলো নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য শোনা না যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে যে, একটি সিরিয়াল একাই যদি আমাদের ভিত নাড়িয়ে দেয়, তাহলে আমাদের শক্তিটা কোথায়? আমাদের এতগুলো গুণী মানুষ যদি একটি সিরিয়ালের সাথে লড়াই করতে থাকেন, তাহলে আমাদের কোনো সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাচ্ছে না তো?

 

সরকারি নীতির লঙ্ঘন হয়ে থাকলে অবশ্যই ‘সুলতান সুলেমান’ বন্ধ করা উচিত নতুবা একটি সিরিয়াল নিয়ে হতাশ না হয়ে এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কাজ শুরু করার সময় হয়েছে। ভালো কাজের জন্য চাই ভালো বাজেট- কথাটি সত্য। আমাদের এখানে এমন কিছু ভালো নির্মাতা আছেন যারা চাইলে চ্যানেল উচ্চ বাজেট দিতে পিছপা হন না। তারা যদি উদ্যোগ নেন, তবে খুব কঠিন হবে না এসব ভিনদেশি সংস্কৃতির অনুষ্ঠানকে পেছনে ফেলতে। এখন সময় হয়েছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে আমরা কি শুধু বন্ধ করব নাকি পরিবর্তন করব। আশার বিষয়, ইতিমধ্যে কিছু গুণী নির্মাতা তাদের জনপ্রিয় সিরিয়ালগুলোর সিক্যুয়াল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। কেউ কেউ আগের চেয়ে যত্নবান হয়ে নতুন সিরিয়াল বানানোর কাজ শুরু করেছেন। খারাপ সময়গুলোতে আমাদের দেশের মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা পরীক্ষিত। তাই এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, খুব শিগগির আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিয়ালটি হবে আমাদের নিজেদের নির্মাণ। অপেক্ষায় রইলাম।

 

 

 রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা/এএন

Walton Laptop