ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ মাঘ ১৪২৩, ১৭ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:

সোনা মিয়ার বেজোড় দিবস

খান মো. শাহনেওয়াজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৬ ১০:২০:১০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৮ ১১:০৮:৪৮ এএম
গ্রাহকের অপেক্ষায় সোনা মিয়া (ছবি: খান মো. শাহনেওয়াজ)

খান মো. শাহনেওয়াজ: গলির রাস্তার ওপর মাছ নিয়ে বসেছেন সোনা মিয়া। প্রসন্ন মুখমণ্ডল। গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রাজধানীর মোহম্মদপুরে বাঁশবাড়ি আবাসিক এলাকার প্রধান সড়কে গলির মোড়ে তাকে দেখা যায়।

সোনা মিয়া মাছ বিক্রি করেন বাঁশবাড়ি এবং বছিলা এলাকায়। বাঁশবাড়িতে মাঝে মাঝেই দেখা যায় তাকে। খাড়িতে করে মাছ নিয়ে এসে গলির মোড়ে বসে বিক্রি করেন। যখন আসেন, প্রতিদিন আসেন না। আসেন বেজোড় সংখ্যার তারিখে। অর্থাৎ ১, ৩, ৫, ৭, ৯, ১১ এমন বেজোড় তারিখে। বেজোড় সংখ্যার দিনকে সোনা মিয়া বলেন বেজোড় দিবস। তিনি বিশ্বাস করেন বেজোড় সংখ্যায় তার ভাগ্য বাধা। জোড় সংখ্যার দিনগুলোতে অর্থাৎ ২, ৪, ৬, ৮ এমন জোড় তারিখে তিনি মাছ বিক্রি করেন না। জোড় সংখ্যার তারিখের দিনকে তিনি বলেন জোড় দিবস।

সোনা মিয়ার বদ্ধমূল বিশ্বাস, জোড় দিবস তার জন্য মঙ্গলজনক নয়। তার ভাগ্য প্রসন্ন থাকে বেজোড় দিবসে। তিনি বলেন, ‘যখন ব্যবসায় নামি তখন থেকেই দেখেছে একদিন আমার ব্যবসা ভালো যায় তো পরের দিন মন্দা য়ায়। আবার তার পরের দিন ভালো যায় তো পরদিন মন্দা। আমার মনে হোতো রাশির গুন। প্রথমদিকে বুঝতে পারিনি; ব্যবসায় লাভ লোকসান পিঠাপিঠি মনে করে সান্তনা পেয়েছি। কিন্তু এভাবে মাস শেষে দেখা যেতো লাভের হিসেবটা শূন্য। খুব মন খারাপ হয়ে যেতো। এক মাসের পরিশ্রমকে মনে হোতো পণ্ডশ্রম হয়ে গেল।’

সোনা মিয়া বলেন, ‘লোকসান দিতে দিতে বছর দেড়েকের মধ্যেই ঋণের বোঝা বেড়ে গেল। মহাজনের কাছে বাকি আর কর্জ মিলে ১২ হাজার টাকা ঋণ হয়ে গেল। ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করলাম। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবি কি করা যায়। এলাকার এক ভাইকে দেখে দিন শ্রমিকের কাজ বাদ দিয়ে শুরু করেছিলাম মাছ বিক্রি। এখানে পরিশ্রম কম, পুঁজি কম। কিন্তু দেখি, লাভ হলে ভালোই হয় আর লোকসান গেলে ভালোই যায়। তারপরও লাভের হিসেবটা করেই টেনেটুনে দিন চলছিলো কিন্তু ওতে পোষানো যাচ্ছিলো না। দেড় বছর মাছ বিক্রি করেছি! মনকে কোনভা্বেই বোঝাতে পারছিলাম না। সে সময় মাছ বিক্রি করতাম দক্ষিণ কেরনিগঞ্জে বসতবাড়ি এলাকায়। গরীব এলাকা, কখনও কখনও বাকিও যেতো। দিনে মাছ বিক্রি করি আর রাতে দুশ্চিন্তা গ্রাস করে। এভাবেই হঠাৎ এক রাতে মনে হলো, যদি হিসেব রাখি কোন কোন বারে লাভ হয় আর সেই বার অনুযায়ী যদি মাছ নিয়ে বসি তো কেমন হয়! চাঁদ-সুরুজের ওপর নির্ভর করে নদীতে জোয়ার-ভাটা হয়, আমার কপালেও কি তাই? একদিন পূর্ণিমা, একদিন আমাবশ্যা!’

সোনা মিয়া বলে চলেন, ‘দক্ষিণ কেরাণিগঞ্জে থাকতেই হিসেবটা রাখা শুরু করলাম কি কি বারে আমার লাভ আসে। যদি সোমবারে লাভ হয় তো খেয়াল রাখি পরের সোমবারে লাভ হয়, না লোকসান হয়। কিন্তু সোমবার-মঙ্গলবার অর্থাৎ বার হিসেব করেও লাভের হিসাব মিলাতে পারিনি। এদিকে দিন যায় কিন্তু ব্যবসা বড় হয় না।

আগে আমি বাংলা সন, পৌষ-মাঘ হিসেব করে চলতাম। কিন্তু ঢাকার মাছের আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ইংরেজি মাস হিসেব করেন। তাই মাছ বিক্রিতে নেমে আমিও বাংলা ছেড়ে ইংরেজি হিসেবেই চলা শুরু করি। ভাগ্য কোন কোন দিনে ভালো থাকে অর্থাৎ কোন কোন তারিখে ভালো থাকে সেটা খুঁজতে খুঁজতে দেখি বেজোড় তারিখে আমার লাভ হয়। এরপর একদিন বিকেল বেলা বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে বসে মনস্থির করি প্রতি বেজোড় তারিখে মাছ বিক্রি করবো। সেই থেকে আমি এভাবেই ব্যবসা করছি।’

সোনা মিয়া বলেন, ‘দক্ষিণ কেরানিগঞ্জে পাওনাদার আমার কাছে প্রায় প্রতিদিনই টাকা চাইতেন। তাই দক্ষিণ কেরানিগঞ্জ ছেড়ে বছিলা এলাকায় আসি এবং সেখান থেকে জায়গা বদল করে মোহম্মদপুরে এই বাঁশবাড়িতে এলাকাবাসীর খেদমত করে চলেছি। মাছের আগের মাহাজন বাকি টাকার জন্য কড়া কথা বলতেন। তাই তার কাছ থেকেও মাছ নেওয়া বন্ধ করি এবং মোহম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের মাছবাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাছ নেওয়া শুরু করি। এই ব্যবসায়ী মাছ ঢাকায় আনেন সাতক্ষীরা থেকে। প্রতি বেজোড় তারিখে মাছ নিয়ে বিক্রি করতে আসি, বিক্রি ভালোই হয়। আগের মহাজনের বাকি আর ঋণ পরিশোধ হয়ে গেছে।’

সোনা মিয়া পড়ালেখা করেছেন চতুর্থ শ্রেণি পর্য়ন্ত। কিন্তু সুন্দর কথা বলেন, গুছিয়ে। তার বাড়ি কুষ্টিয়া, শুধু এটুকু জানালেন। স্ত্রী ও সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী ছেলে নিয়ে তার সংসার আছে। তিনি যা কিছু করেন তা বেজোড় দিবস হিসেব করে করার চেষ্টা করেন। কোথাও বেড়াতে গেলে বেজোড় তারিখেই যান। গত কোরবানি ঈদে কাপড় কিনতে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে মার্কেটে গেছেন বেজোড় তারিখেই। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, তার জীবনের যা কিছু সুন্দর তা নিহিত আছে ওই বেজোড় তারিখের মধ্যেই।

প্রতিবেদকের বক্তব্য : সোনা মিয়া তার এই বেজোড় দিবসের বিষয়টি কেবল স্ত্রী ও মা’য়ের সঙ্গে আলাপ করেছেন। তার ভাষায় আমি তৃতীয় জন যাকে তিনি এ কথা বলেছেন। তিনি টেলিভিশনে সাংবাদিকদের দেখেন এবং বিশ্বাস করেন, সাংবাদিকের কাছে অনেক কিছু খুলে বলা যায়। বেজোড় সংখ্যা বিষয়ে তার মনের কথা পত্রিকায় লিখব বলে তার কাছে অনুমতি নিয়েছি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সোনা মিয়া আগে দক্ষিণ কেরানিগঞ্জে বসতবাড়ি এলাকায় মাছ বিক্রি করতেন। ওই এলাকায় মূলত নিম্নবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষের বাস। সোনামিয়া মাছের ব্যবসায় ছিলেন নতুন। তিনি যেখান থেকে পাইকারি মাছ কিনতেন তা ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকার মাছ। ঋণের চাপে তিনি ব্যবসার স্থান পরিবর্তন করেছেন। মোহম্মদপুরে যে এলাকায় বসেন সেখানে স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের বাস। আর বর্তমানে যে মহাজনের কাছ থেকে মাছ পাইকারি কেনেন তা সাতক্ষীরা অঞ্চলের মাছ যা ঘেরের মাছ এবং উন্নতমানের। ফলে তার মাছ আগের চেয়ে বিক্রি হয় বেশি, লাভও আসে।

‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর …।’

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ জানুয়ারি ২০১৭/শাহনেওয়াজ