ঢাকা, সোমবার, ৩ পৌষ ১৪২৫, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

স্বকৃত নোমানের সাক্ষাৎকার : শেষ পর্ব

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৩-২৪ ৪:১২:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৫-০৬-১৫ ১০:৩৮:১৫ এএম

আমি লিপিকার মাত্র, সময়কে লিখে যাই : স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান উদীয়মান ঔপন্যাসিক। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে ইতিমধ্যে তিনি দৃষ্টিগ্রাহ্য মাত্রা সংযোজন করেছেন। জ্ঞান অন্বেষণ ও শিল্পসৃষ্টিকে জীবনের অন্যতম কাজ বলে মনে করেন তরুণ এই লেখক। তার উপন্যাসে একাঙ্গ হয়ে থাকে গ্রামবাংলার বিচিত্র মানুষ, প্রকৃতির বিপুল বৈভব, ইতিহাস, সমকাল, পুরাণ, বাস্তবতা ও কল্পনা। ‘রাজনটী’ উপন্যাসের জন্য ২০১২ সালে এইচএসবিসি-কালি ও কলম কথাসাহিত্য পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। লেখালেখির নানা বিষয় নিয়ে এই সাক্ষাৎকারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক কথা বলেছেন। আজ সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব প্রকাশিত হলো।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অলাত এহসান।


এহসান : বর্তমান সময়ে গল্পের ভাষাগত বা আঙ্গিকগত যে পরীক্ষা-নীরিক্ষা বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? আপনার কাছে গল্পের ভাষা কেমন?

স্বকৃত নোমান : প্রথমত বলে নিই, গল্পের ভাষা আর কাব্যের ভাষা দু’টোই আলাদা। এটা যখন কেউ গুলিয়ে ফেলেন তখন বুঝতে হবে তিনি গল্প ও কবিতার ফর্ম সম্পর্কে না বুঝেই লিখতে এসেছেন। ‘সময়ের দাবি’ এটা বাজে কথা। পরীক্ষা-নীরিক্ষা অতীতেও ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। গৎবাঁধা নিয়মে তো আর সাহিত্য হয় না। লেখক প্রতিনিয়ত ভাঙচুর করবেন। আমার কাছে গল্পের ভাষা বলতে, যে ভাষায় গল্প লেখা হয় সেটাই। একেক গল্পকার একেক ভাষায় লিখবেন। প্রত্যেকের ভাষা হবে নিজস্ব।ভাষার, আঙ্গিকের নীরিক্ষাকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। কিন্তু নীরিক্ষার নামে জগাখিঁচুড়ি পাকানোটাকে আমি গুরুত্ব দেই না।

এহসান : ভালো গল্প বলতে আপনি কোনগুলোকে বোঝেন? মানে আপনার চোখে কোন গল্পগুলো ভালো?

স্বকৃত নোমান : যেসব গল্প আমার অর্ন্তজগৎ নাড়িয়ে দেয়, যে গল্প পড়ে নিজেকে একটা নেংটো, নাকে সিকনিঝরা অবোধ বালক মনে হয়, যেসব গল্প পড়ে একটা মহাসমুদ্রের সামনে নিজেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কীটপতঙ্গ মনে হয়, সেসব গল্পই আমার কাছে ভালো গল্প।

এহসান : আপনার গল্প-উপন্যাসে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ আছে।আপনি ইতিহাসনির্ভর সাহিত্য-গল্প-উপন্যাস লেখা কতটা জরুরি বলে মনে করেন?

স্বকৃত নোমান : ইতিহাস হচ্ছে বর্তমানের ভীত। এই ভীত বা শেকড় অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের ইতিহাস এত বেশি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় যে, এসব নিয়ে হাজার হাজার উপন্যাস লেখা সম্ভব। সেই তুলনায় বাংলাদেশে ইতিহাসভিত্তিক কটি উপন্যাস লেখা হয়েছে? খুব বেশি নয়। ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস লেখা সহজ নয়। শুধু ঐতিহাসিক তথ্য ও ঘটনাপঞ্জী সাজিয়ে দিলেই ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ হয়ে যায় না। ঐতিহাসিকের মুখ্য কাজ তথ্য উপস্থাপিত করা, ব্যাখ্যা করা। কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার প্রধান কর্তব্য ঐতিহাসিক কল্পনাবোধের দ্বারা বিশেষ যুগের সর্বস্তরের নর-নারী, তাদের বিপুল সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের বেগ, দৃশ্য ও ঘটনাকে জীবন্তু করে তোলা। নিজেকে বর্তমানের পটভূমি থেকে সরিয়ে নিয়ে সেই অতীত যুগের সংবেদনশীল দর্শকে রূপান্তরিত হওয়া। এ জন্য দিনের পর দিন ইতিহাসের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হয়; পাছে কোনো তথ্য ভুল হয়ে যায়! কেননা তথ্যবিকৃতির কোনো অধিকার ঔপন্যাসিকের নেই।

ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা অনেক। বর্তমানকে বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। আমাদের তো এখনো ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোটা, ইতিহাসটাকে দেখে ওঠাটাই শেষ হয়নি; বর্তমানকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা আমরা আশা করতে পারি কীভাবে? বর্তমানকে বুঝতে হলে ইতিহাস বোঝা জরুরি। ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এটা সময়ের দাবি। ইতিহাসের প্রচলিত মতকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। গতানুগতিক ইতিহাস শুধু সামনে থেকে আলো ফেলেছে। এখন শুধু সামনে থেকে নয়, আলো ফেলতে হবে পেছন থেকে, উপর থেকে, নিচ থেকে, ডান থেকে, বাঁ থেকে। ইতিহাস যে বাজে বিষয়গুলো মহৎ করে তুলে ধরেছে, যে বিষয়গুলো গোপন করেছে বা এড়িয়ে গেছে, সেগুলো খুঁড়িয়ে বের করে আনতে হবে। আপনি বলতে পারেন, এটা তো ঐতিহাসিকের কাজ, ঔপন্যাসিকের নয়। আমি বলব, ঐতিহাসিক উপন্যাস ইতিহাসের প্রতিপক্ষ নয়, ইতিহাসের পরিপূরক। সুতরাং ইতিহাসের ফায়সালা আগে করতে হবে। ইতিহাসের ফায়সালা আমরা এখনো করে উঠতে পারিনি। ইতিহাসের ফায়সালা না করলে আমাদের মেরুদণ্ড সিধা হবে না। কোনোভাবেই না। যেদিন ইতিহাসের ফায়সালা শেষ হবে সেদিন রচিত হবে সমকালের ভীত। এবং সেদিনই শুরু হবে আমাদের বর্তমানের জয়যাত্রা। তখন হয়ত আর ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস রচনার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।

এহসান : সমাজের প্রশ্নে, রাজনীতির প্রশ্নে, সর্বপরি সাহিত্যের প্রশ্নে লেখকের একটা রাজনৈতিক-দর্শনগত অবস্থান থাকতে পারে।আপনি এতে কীভাবে লিপ্ত থাকেন?

স্বকৃত নোমান : দেখুন, সমাজ রাজনীতির বাইরে নয়। একজন লেখককে আগে রাজনৈতিক প্রশ্নে ক্লিয়ার হতে হবে। আপনি লেখক, কোনোভাবেই আপনি পশ্চাৎপদ কোনো রাজনৈতিক দল সমর্থন করতে পারেন না। আপনার রাজনৈতিক দর্শন হবে প্রগতিশীল। তেমন কোনো দল না থাকলে অপেক্ষাকৃত যে দলটির মধ্যে প্রগতিশীলতার চর্চা আছে আপনি তাকে সমর্থন দেবেন। লেখক কখনো নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। নিরপেক্ষতা একটা ফালতু শব্দ। লেখককে অবশ্যই রাজনীতি সচেতন হতে হবে। যেসব লেখক নিরপেক্ষতার কথা বলে তারা আসলে পলায়নপর, লেখক হওয়ার কোনো যোগ্যতাই তারা রাখেন না।

এহসান : আপনার গল্পে ধর্মীয় মিথের ব্যবহার আছে। দেশে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা আছে। আবার লেখকদেরও ব্যর্থতা আছে এটা বিশ্লেষণ-উপস্থাপনে। আপনি কীভাবে দেখেন?

স্বকৃত নোমান : ধর্ম একটা বাস্তবতা। আমি এ দেশের লেখক। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ ধার্মিক। আমি যদি এই মানুষদের নিয়ে লিখতে চাই, তাহলে ধর্ম উপেক্ষা করে লিখতে পারব না। তাই আমার লেখায় ধর্ম আসবেই। একজন মানুষ ধার্মিক হবেন, তাতে আমি কোনো অসুবিধা দেখি না। অমি একজন ঔপন্যাসিক বা গল্পকার, মানে সৃজনশীল লেখালেখি করি। ধর্ম নিয়ে ডিসকোর্স হাজির করা আমার কাজ নয়। গল্প-উপন্যাসের প্রয়োজনে ধর্ম যেটুকু আসার দরকার ঠিক সেটুকুই আমি আনি। ধর্ম এড়িয়ে যারা সাহিত্য রচনার কথা বলেন, সেটা কী সাহিত্য হবে জানি না। সেটা সম্ভবত বায়বীয় সাহিত্য হবে। আধুনিক সাহিত্য মানুষ থেকেই উৎভব হয়।  

প্রকৃত ধর্মচর্চার পরিবর্তে জঙ্গীবাদের এই উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক ব্যর্থতা যে আছে তাতে আমি সন্দেহ করি না। দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও আছে। এসব ষড়যন্ত্রের কথা অনেকেই  জানে। লেখকদের ব্যর্থতাও আছে বৈকি। লেখকরা তাদের লেখার মধ্য দিয়ে যে ফাইটটা দেওয়ার দরকার ছিল, সেটা তারা যথাযথভাবে দিতে পারছেন না কিংবা দিতে ভয় পাচ্ছেন।

সাম্প্রদায়িকতার উত্থান রোধ করতে হলে আমাদের সংস্কৃতির দিকে ফিরে তাকাতে হবে। বাংলা-ভারতের ইতিহাস বুঝতে হবে। আপনি দেখুন, সুলতানরা এই বাংলা-ভারত শাসন করেছেন, মোগলরা করেছেন, মুসলিম নবাবরা করেছেন। একমাত্র আওরঙ্গজেব ছাড়া তাদের সময়ে কি এই ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ছিল? ছিল না। আওরঙ্গজেব সাম্প্রদায়িকতার এই বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রথম। ইংরেজরা এসে এটাকে আরো উস্কে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার এই বিষবাষ্প দূর করতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে শেকড়ের দিকে। কিন্তু মানুষ তো ফিরে তাকাবে না। তাহলে কারা ফিরে তাকাবেন? অবশ্যই লেখকরা। লেখকরা তো হ্যামিলনের  বাঁশিওয়ালা। তারা যে সুরে বাঁশি বাজাবেন মানুষ সে সুরেই মজবে।

এহসান : এ দেশে লেখালেখির বাণিজ্যমূল্য খুবই কম। তাহলে পেশাদারিত্বের সঙ্গে জীবন মেলাবেন কীভাবে? কিংবা লেখালেখির বাণিজ্যিক মূল্য থাকাটাই বা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

স্বকৃত নোমান : বাংলাদেশে লেখালেখিতে পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠেনি, এটা লেখকদের দোষ নয়, দোষ রাজনীতির, রাজনীতিকদের। এই দেশে ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। কেউ আরবি মাধ্যমে, কেউ ইংরেজি মাধ্যমে আর কেউ বাংলা মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘শিক্ষিত’ হচ্ছেন। মাদ্রাসায় যারা পড়েন তারা কি গল্প-উপন্যাস-কবিতা পড়েন? ইংরেজি মাধ্যমে যারা পড়েন তারা কি বাংলা ভাষার গল্প-উপন্যাস-কবিতা পড়েন? তাহলে শুধু লেখালেখি করে এ দেশে বেঁচে থাকা তো সম্ভব নয়। শিক্ষাব্যবস্থা একমুখী হোক, দেশের মানুষগুলো প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, দেখবেন, হাজার হাজার বই বিক্রি হচ্ছে। শুধু রয়েলটির টাকায় একজন লেখক ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবেন তখন।এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কোনো কিছুই বাণিজ্যের বাইরে নয়। লেখালেখিও বাণিজ্যের অন্তর্ভূক্ত। লেখালিখির বাণিজ্যিক মূল্যকে আমি খারাপভাবে দেখি না।

এহ্সান : বলা হচ্ছে একদিন সবকিছু ভার্চুয়াল বা কৃত্রিম জগতের আয়ত্বে চলে আসবে। এর মাঝে বইয়ের ভবিষ্যত সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

স্বকৃত নোমান : একদিন এই পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য একদিন সবকিছু প্রযুক্তির আওতায় চলে আসবে। কিন্তু তাতে বইয়ের কিছু হবে না। মুদ্রিত বই জ্ঞানের চিরায়ত একটা মাধ্যম। প্রযুক্তি যতই উৎকর্ষতা লাভ করুক, বইয়ের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

এহ্সান : লেখার ধারা সব সময়ই বদলায়। এখন বিশ্বসাহিত্যের যে জনপ্রিয় ধারা তার সঙ্গে সমসাময়িক বাংলাসাহিত্যের পার্থক্যটা কোথায়?

স্বকৃত নোমান : পার্থক্য অনেক গভীর। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। এ বছর নোবেলবিজয়ী প্যাত্রিক মদিয়ানোর চেয়ে আমাদের বাংলা ভাষার লেখক দেবেশ রায়, হাসান আজিজুল হক অনেক ভালো লেখেন। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় অনেক ভালো লিখেছেন। শুধু বাংলা ভাষার কারণে এসব লেখা গ্লোবালি পৌঁছায়নি। এটা ভাষার সাম্রাজ্যবাদীতা। এটা উচিত নয়। ইংরেজিতে লিখলেই শুধু নোবেল প্রাইজ দেওয়া হবে এমনটা উচিত নয়। নোবেল কমিটিতে সকল ভাষাভাষী সদস্য রাখা হবে না কেন? আমাদের বাংলা সাহিত্য কোনো অংশে পিছিয়ে নেই, অনেক অগ্রসর। শুধু ভাষার কারণে পিছিয়ে রয়েছে, অন্য কোনো কারণে নয়।

এহসান : লেখালেখিতে বাংলাদেশে অল্প হলেও কিছু পুরস্কার দেওয়া হয়। সেগুলোর অর্থমূল্য বা প্রক্রিয়া আদৌ সম্মানজনক কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

স্বকৃত নোমান : শুনুন, আপনাকে একটা গল্প বলি। আমার চতুর্থ উপন্যাস ‘রাজনটী’র জন্য আমাকে ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম’ কথাসাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। পত্রিকাটিতে ইতিপূর্বে আমার কোনো লেখা ছাপা হয়নি। জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে যেদিন আমাকে পুরস্কার দেওয়া হবে সেদিন আবুল হাসনাতের কাছে আমি জানতে চাইছি, ‘আচ্ছা, এখানে আবুল হাসনাত কে?’ বুঝুন তাহলে বিষয়টা।
অন্য পুরস্কারগুলোর কী অবস্থা আমি আসলে ঠিক জানি না। এসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। তবে লেখকের জন্য পুরস্কার খারাপ কিছু নয়। আবার এটাও ঠিক লেখকের জন্য পুরস্কার খুব গুরুত্বপূর্ণ এটা আমি মনে করি না।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ মার্চ ২০১৫/তাপস রায়

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC