ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ আষাঢ় ১৪২৪, ২৯ জুন ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

স্বাদ ও সাধের বিলম্বি

খান মো. শাহনেওয়াজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৫ ৯:০৮:১১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-১৯ ১১:৫৩:৩৮ এএম
রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরে সি ব্লকের ২ নম্বর সড়কে বাসার ছাদে বিলম্বি গাছ (ছবি: মামুন উর রশীদ)

খান মো. শাহনেওয়াজ : বাংলাদেশে টক জাতীয় যে কয়টি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে বিলম্বি অন্যতম। দেশের কিছু কিছু এলাকায় এটি বেশ জনপ্রিয় ফল।

 

সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় এই ফল বেশ পরিচিত। এটি দেখতে অনেকটা পটলের মতো। তবে পটলের চেয়ে আকারে ছোট। এর রঙ সবুজ এবং চোখ জুড়ানো। স্বাদও বেশ চমৎকার। এই ফল কাঁচা খাওয়া যায়। এ দিয়ে চাটনি ও আচার তৈরি হয়। তরকারি ও ডালে টক স্বাদ আনার জন্য বিলম্বি ব্যবহৃত হয়। এটি বিলেবু ও বিলম্ব লেবু নামেও পরিচিত।

 

দেশের বেশিরভাগ এলকায় বিলম্বি ফল তেমন পরিচিত নয়। রাজধানী ঢাকার বাজারে এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এই ফল একেবারেই চোখে পড়ে না। বৃহত্তর সিলেট এবং চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা এলাকায় বাড়ির আঙিনা বা উঠোনের কোনে বিলম্বি গাছ শোভা পায়। সেই গাছ থেকেই তারা প্রয়োজনীয় বিলম্বি তোলেন এবং পরিবারের চাহিদা পুরন করেন।                 

 

উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, অনেক উদ্ভিদ বিজ্ঞানীর মতে বিলম্বির উৎপত্তি ব্রাজিলে এবং পরে তা দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এর আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়া। ভারতীয় অঞ্চলে নাতিশীতোঞ্চ আবহাওয়া বিলম্বির জন্য খুবই অনুকুল। ভারতের মহারাষ্ট্র, কেরালা, তামিলনাডু ও গোয়ায় বিলম্বি অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং শ্রীলংকায় বিলম্বি পাওয়া যায়। এশিয়া মহাদেশের বাইরে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিলম্বি পাওয়া যায়। সেখানে বিলম্বি মিমব্রো নামে পরিচিত। এছাড়া জানজিবারেও বিলম্বি পাওয়া যায়।    

 

বিলম্বির ইংরেজি নাম বিলিম্বি। বৈজ্ঞানিক নাম এভেরহোয়া বিলিম্বি (Averrhoa Bilimbi)। এর গাছ ট্রি সোরেল (Tree Sorrel) নামেও পরিচিত। বিলম্বি গাছ দেখতে অনেকটা কামরাঙা গাছের মত ঝোঁপানো । এর পাতাও কামরাঙা পাতার মতই। গাছের উচ্চতা হয় মাঝারি আকারের অর্থাৎ পাঁচ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চে গাছে ফুল আসে। তবে ফল পাওয়া যায় প্রায় সারাবছরই। বিলম্বি ফল গাছে ধরে একেবারে ঝেকে ও ঝোপা বেধে। গাছের ডালে তো বটেই, কাণ্ড ঘিরেও ফল আসে। ফল তিন থেকে ছয় সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয়।

 

ডেমরার সারুলিয়ায় বৃক্ষপ্রেমী শামীম আহমেদের বাড়ির আঙিনায় লাগানো গাছে বিলম্বি ফল (ছবি: শামীম আহমেদের সৌজন্যে)

 

বিলম্বির পুষ্টিগুন অসাধারণ। এতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমান ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, আয়রন, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম। সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভিটামিন সি। এর টক স্বাদ জলপাইয়ের কাছাকাছি। এলাকা ও জাত ভেদে কামরাঙার মত স্বাদযুক্ত। এর আচার ও চাটনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সিলেট অঞ্চলে বিলম্বির আচার তৈরির কারখানা আছে এবং বাণিজ্যিকভাবে আচার তৈরি হয়। বিলম্বি ও এর আচার ব্রিটেনে পাঠানো হয়।

 

বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা এলাকার বাইরে অনেক আগ্রহী ব্যক্তি নিজেরা উদ্যোগী হয়ে বিলম্বি গাছ লাগিয়েছেন। এমনই একজন হলেন ঢাকা জেলার ডেমরার ব্যবসায়ী ও বৃক্ষপ্রেমী শামীম আহমেদ। তিনি ডেমরায় সারুলিয়া এলাকায় তার বাড়ির আঙিনায় লাগিয়েছেন বিলম্বি গাছ। তাতে ফলও এসেছে। শামীম আহমেদ জানান, তিনি সিলেটে বেড়াতে গিয়ে বিলম্বির সাথে পরিচিত হন এবং এই গাছ লাগানোর ইচ্ছে জাগে। তবে সে সময় চারা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে তিনি এর চারা সংগ্রহ করে লাগিয়েছেন। এতে ফল ধরেছে। এই ফল পেয়ে তিনি বেশ খুশী।

 

শুধু ডেমরা নয়, বিলম্বি ফলের গাছ শোভা পাচ্ছে খোদ  রাজধানী ঢাকায় ভবনের ছাদে। রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা, ছাদবাগানে সফল বৃক্ষপ্রেমী মামুন উর রশীদ তার ছাদবাগানে বিলম্বি গাছ লাগিয়েছেন। মিরপুর-২ নম্বরে সি ব্লকের ২ নম্বর সড়কে তার বাসার ছাদে বিলম্বি গাছটি বেশ বড় এবং এতে প্রচুর ফল এসেছে। তিনি নিজে খেয়েছেন, আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের দিয়েছেন।

 

বিলম্বি দিয়ে কয়েক রকমের আচার তৈরি হয়। এর মধ্যে টক, ঝাল ও মিস্টি স্বাদযুক্ত আচার বেশি জনপ্রিয়। তবে বিলম্বির কাশ্মীরী আচার স্বাদে অনন্য।  

 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বৃক্ষরোপনের যে তাগিদ পড়েছে তাতে বিলম্বি গাছও ব্যাপকভাবে লাগানো যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন কৃষিবিদ বিলাশ চন্দ্র পাল। তিনি বলেছেন, আমরা কামরাঙা, অরবড়ই, জলপাই, তেঁতুল গাছ লাগাই। এগুলো মৌসুমি ফল। এগুলোর পাশাপাশি বিলম্বি গাছও লাগানো যেতে পারে। বিলম্বি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল। এর গাছও বেশ দৃষ্টিনন্দন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই গাছ অন্য সব গাছের মতই উপযোগী। যেহেতেু সারা বছর গাছে ধরে তাই বিলম্বি ফল অর্থকরীও বটে। বাণিজ্যিকভাবেও এর চাষ করা যেতে পারে।   

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ জানুয়ারি ২০১৭/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop