ঢাকা, বুধবার, ৫ আষাঢ় ১৪২৬, ১৯ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হাঁটতে হাঁটতে ধর্ষিতা হওয়া মেয়েটি

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৯-২৪ ৩:৩৬:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:১০:৩২ এএম
Walton AC 10% Discount

|| সাব্বির জাদিদ ||

বাসায় ফিরে টেবিলে ব্যাগ রাখার সময় পাওয়া গেল না, তার আগেই হড়হড়ানি বমিতে বেসিন ভাসিয়ে দিলো অর্পিতা। বমির সময় কপালে হাত রাখতে হয়। কেঁপে ওঠা পিঠে হাত বুলাতে হয়। বমি শেষ হলে চোখে মুখে পানির ছিটা দিতে হয়। বেশি অসুবিধায় মাথায় পানি ঢালতে হয়। অর্পিতা একটি কোমল হাতের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করল, যে-হাত এখন তার কপাল স্পর্শ করবে। এবং সেই হাতটা অবশ্যই হতে হবে তার মায়ের।

অর্পিতার মা নেই। মা মারা গেছেন পাঁচ বছর। অর্পিতা সেবার সেভেনে পড়ছে। ছোটভাইটা মাত্র থ্রিতে। ছেলেমেয়ে মানুষ করে সংসার গুছিয়ে তোলার সময় তখন। এই বড় দরকারি মুহূর্তে চলে যান সেলিনা। ছেলেমেয়ের সুখের কথা ভেবে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি আসলাম সাহেব। যদিও শরীরের প্রয়োজনে বিয়েটা তার দরকার ছিল। এই জায়গায় এসে বাবাকে খুব শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা করে অর্পিতার। করেও শ্রদ্ধা। বাবা যখন বাসায় থাকেন, বাবার খুঁটিনাটি সব কাজ গুছিয়ে দেয় অর্পিতা। সময়মতো ওষুধ খাওয়ানো, সময়মতো ঘুম, গোসল সবকিছুর তদারকি করে অর্পিতা। এত অল্প বয়সে মেয়ের এই নিখুঁত সেবাযত্নে, সচেতনতায় মুগ্ধ হয়ে যান আসলাম সাহেব। তার মায়ের পুনর্জন্ম যেন।

আসলাম সাহেব ডাক্তার মানুষ। সকাল বেলা সনো টাওয়ার এবং সন্ধ্যায় ডক্টরস চেম্বারে রোগি দেখেন। এই দেশে ডাক্তারের ছেলেমেয়ে ডাক্তার হবে এটা ধরাবাঁধা নিয়ম হয়ে গেছে। অর্পিতার যে মেধা, একটু খাটলে মেডিকেলে তার চান্স হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সে সায়েন্স নিয়ে পড়ল না। তার যুক্তি— সায়েন্সে পড়াশোনার প্রচুর চাপ। ঘরে মা নেই। এত চাপের ভেতর সে বাবার দেখভাল করতে পারবে না। আসলাম সাহেব কিন্তু মেয়ের সিদ্ধান্ত একবাক্যে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেছেন, তোর বিয়ে হয়ে গেলে তখন কে আমার দেখভাল করবে? অর্পিতা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলেছে, সে তখন দেখা যাবে। শেষপর্যন্ত মেয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন আসলাম সাহেব। অর্পিতা কমার্সে পড়ছে।

সকালে সাদা ভাতের সাথে এক টুকরো ভাজা মাছ খেয়ে কলেজে গিয়েছিল অর্পিতা। খাবারদাবারে অর্পিতা শুচিবায়ুগ্রস্ত। ঝোলের তরকারি তার অপছন্দ। পুইশাক-বেগুন-শিমের তরকারি খাবে না। ওসব নাকি কোন খাবারই না। পায় না বলে মানুষ ওসব খাবারের মেনুতে ঢুকিয়েছে। দুধ-ডিমের ধারেকাছে যাবে না। গন্ধ। খাওয়ার ভেতর মাছ ভাজা আর এক কি দুটুকরো মাংস— এই হলে তার খাওয়া চুকে যায়। বেসিনে সকালের ভাজা মাছ আর সাদা ভাতের বিকৃত বমি দেখে অর্পিতার গা ঘিনঘিন করতে লাগল। বাথরুমে গিয়ে সে ভালো করে হাতমুখ ধুলো। গামছার প্রান্ত ভিজিয়ে মুখ মুছতে মুছতে টলায়মান পায়ে ঘরে এসে ধপাস করে শুয়ে পড়ল নিজের বিছানায়।

লিখন ল্যাপটপে ভিডিও গেম খেলছে। সামনের বার সে এইটে উঠবে। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল, অথচ ছেলেমানুষি গেল না এখনো। পড়াশোনায় মন নেই। সুযোগ পেলেই ল্যাপটপ খুলে বসে যায়। অর্পিতা এতক্ষণ ধরে বমি করল, লিখন যেন জানেই না। তার উচিত ছিল আপুর কাছে এসে দাঁড়ানো। কিন্তু এই বয়সী ছেলেরা কোনটা উচিত আর কোনটা অনুচিত এসব বুঝতে চায় না।

ওয়াপদা রোডের ঘটনা ভেবে অপমানে কাঁদতে লাগল অর্পিতা। তখন রুমে এলো শান্তা। শান্তা অর্পিতাদের কাজের মেয়ে। অর্পিতার বয়সী। পড়াশোনা করলে এতদিন সেও কলেজে উঠত। সেলিনা মারা যাওয়ার পর থেকে শান্তা এই বাসায়। অর্পিতার ছোট খালা গ্রাম থেকে পাঠিয়েছেন শান্তাকে। ধারালো মেয়ে। রান্নাবাড়া থেকে শুরু ঘরের সব কাজ করে। বিশ্বস্তও। দিনের বেলার একটা সময় বাসায় শান্তা ছাড়া কেউই থাকে না। অর্পিতার কলেজ আছে। আসলাম সাহেবের দুই জায়গায় দুটো চেম্বার। কত ব্যস্ততা। স্কুল প্রাইভেট নিয়ে লিখনও ব্যস্ত। ফাঁকা বাসায় আজ  পর্যন্ত একটা জিনিস খোয়া যায়নি। শুধু মাঝে মাঝে এটাসেটা কাচের জিনিস ভাঙা পড়ে। তা এটা তো চুরি নয়, দুর্ঘটনা। শান্তার পৈতৃক নাম চপলা। নামের মতোই অস্থির সে। এই বাসায় প্রথম যেদিন আসে, হুড়োহুড়িতে কাচের দুটো গ্লাস আর একটা প্লেট ভাঙে। তখনই অর্পিতা ঘোষণা দেয়— এই নাম তোমরা চলবে না। তোমার নাম আজ  থেকে শান্তা। নামের মতো তোমার স্বভাবটাকেও চেঞ্জ করতে হবে।

নাম পরিবর্তন হলেও স্বভাব বদলায়নি শান্তার। সে আগের মতোই চপলা। বেসিনে বমি এবং অর্পিতার বিছানায় ধপাস আওয়াজ পেয়ে সে দুমদাম শব্দ তুলে ছুটে এসেছে অর্পিতার ঘরে। অর্পিতা তখন কাহিল। বাঁ হাতে কপাল চেপে শুয়ে আছে কাত হয়ে। ওয়াপদা রোডের ঘটনা কিছুতেই তাড়াতে পারছে না চোখ থেকে। ওয়াপদা রোড তার কাছে এক আতঙ্ক এখন।

শান্তা দুপুরের তরকারি রাঁধছিল। হাতে ঝোলমাখা খুন্তি নিয়েই সে চলে এসেছে রান্নাঘর থেকে। খুন্তির মাথায় জমা হওয়া ঝোল গোলাকার বল হয়ে ঝরে পড়ার উপক্রম। শান্তা বলল, আপামণির শরিল খারাপ?
মেয়েদের শরীর খারাপ হওয়া বিরল কোন ঘটনা নয়। সব মেয়েই মাসে অন্তত একবার এই ঘটনার মুখে পড়ে। অর্পিতাও পড়ে। যদিও তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা স্বাভাবিকতা নিয়ে শেষ হয় না। তীব্র পেটব্যথা আর শারীরিক দুর্বলতা পেয়ে বসে প্রতি মাসের কয়েকটা দিন। অর্পিতার এই দুর্বল দিনগুলো শান্তা বেশ উপভোগ করে। সে সকাল বিকাল অর্পিতার খবর নেয় আর  গলা নামিয়ে কুৎসিতভাবে জিজ্ঞেস করে— আপামণির শরিল খারাপ? খুব ব্যাতা? কোন জাগায় ব্যতা? মালিশ করে দেব?

আজ  যেমন সে ঘরে ঢুকেই বলে বসল শরীর খারাপের কথা। যদিও আজ  অর্পিতার শরীর খারাপ করেনি। বমি হওয়া এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণ ওয়াপদা রোডের সেই ভয়ঙ্কর গা গোলানো ঘটনা, তবু অর্পিতা রাগত গলায় শান্তার দুর্নিবার কৌতূহল মেটায়— হ, শরীর খারাপ।
শান্তাকে এবার ঠেকায় কে! সে দুই পা এগিয়ে এসে কৃত্রিম অন্তরঙ্গ গলায় বলে— খুব ব্যতা? মালিশ করে দেব?
বিছানার কাছে এগিয়ে আসায় এবং কিছুটা সময় অতিক্রান্ত হওয়ায় শান্তার হাতে ধরা খুন্তির মাথা থেকে এক ফোঁটা ঝোল অর্পিতার সাদা জামায় পড়ে। পতিত জায়গার সত্ত্ব নিতে হলুদ ঝোল সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করে বৃত্ত। সেদিকে তাকিয়ে অর্পিতার রাগটা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সে বর্ষার যমুনার মতো ফুঁসে উঠে শান্তার গালে একটা চড় মারে। ভয় পেয়ে এবং ব্যথা পেয়ে শান্তা তাড়াতাড়ি ঘর থেকে পালায়। আর সাথে সাথে অর্পিতার রাগ পড়ে গিয়ে মন খারাপ হয়। তার মনে পড়ে, পাঁচ বছরে আজই  প্রথম সে শান্তার গায়ে হাত তুলল। এবং এও মনে পড়ে, কলেজ থেকে ফেরার পথে ওয়াপদা রোডের ঘটনাও এই প্রথম তার জীবনে ঘটল।

দুপুরে অর্পিতা কিছুই খেলো না। আসলাম সাহেব তিনটার দিকে বাসায় আসেন। লাঞ্চ সেরে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে পাঁচটার দিকে আবার বেরোন। সন্ধ্যাটা তিনি ডক্টরস চেম্বারে রোগি দেখেন। লাঞ্চ আওয়ারে যখন বাসায় আসেন, সবসময় দরজা খোলে অর্পিতা। বাবার ডাক্তারি ব্যাগটা দখলে নিয়ে লুঙ্গি এগিয়ে দেয় সে। আসলাম সাহেব ফ্রেশ হতে হতে টেবিলে খাবার সাজানো হয়ে যায় অর্পিতার। আজ  দরজা খুলেছে শান্তা। আসলাম সাহেব ব্যাগটা শান্তার হাতে দিয়ে কিছুটা বিস্মিত গলায় বললেন, অর্পিতা কলেজ থেকে ফেরেনি এখনো?

শান্তা সেই আগের ঢঙে বলল, ফিরছে। আপামণির শরিল খারাপ, শুয়ে আছে। বেসিন ভরে বমিও করছে।
আসলাম সাহেব উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, বমি হয়েছে কেন? কী ফুড খেয়েছে? বলতে বলতে তিনি দ্রুত পায়ে অর্পিতার ঘরে চলে আসলেন। অর্পিতার শুয়ে ছিল তখনো। চোখের পানি শুকিয়ে গালের উপর চটচটা আঠা হয়ে আছে। তার চেহারার সব আলো যেন শুষে নিয়েছে কেউ। বাবাকে আসতে দেখে সে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফেলল ওড়নায়। আসলাম সাহেব মেয়ের মাথার কাছে চেয়ার টেনে বসলেন। অর্পিতার মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন, কী হয়েছে, মা? এমন দেখাচ্ছে কেন? বুয়া বলল বমি করেছিস, কলজে বন্ধুদের সাথে ভাজাপোড়া খেয়েছিলি?

অর্পিতা ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, চিন্তা করো না, বাবা। কলেজে কিছু খাইনি। হঠাৎ পেটের ভেতর খারাপ লাগছিল তাই বমি হয়েছে। মাঝেমধ্যে বমি হওয়া খারাপ কিছু না। তুমি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও। বুয়াকে আমি খাবার দিতে বলছি।
আসলাম সাহেব বললেন, তুই খাবি না?
—খেতে ইচ্ছে করছে না এখন। ভালো লাগলে পরে খাবো। তুমি খেয়ে নাও।
আসলাম সাহেব অন্তরঙ্গ গলায় বললেন, মারে, আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছিস না তো!
—তোমার কাছে আমি কোনদিন কিছু লুকিয়েছি! তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছ।

আসলাম সাহেব মেয়ের ঘর ছেড়ে চলে আসলেন। অনেকদিন পর তিনি খুব তীব্রভাবে স্ত্রীর অভাব অনুভব করতে লাগলেন। মেয়েদের কতরকম জটিল-কঠিন ব্যাপার থাকে। বাবা হয়ে এসব তিনি কীভাবে সামলাবেন!
বিকেলে অর্পিতার প্রাইভেট ছিল। অসুস্থতার বাহানায় প্রাইভেটে গেল না সে। বিকেলটাও কাটল দুপুরের মতো বিছানায়। তবে সন্ধ্যার পর বৃষ্টি শেষে সবুজ ঘাসের মতো ঝরঝরা হয়ে উঠল সে। বাবা ফিরলে সে দরজা খুলল। ব্যাগ নিয়ে লুঙ্গি এগিয়ে দিলো। নিজ হাতে কফি বানাল। বাবা, সে আর লিখন টিভি দেখতে দেখতে কফি খেলো। অথবা কফি খেতে খেতে টিভি দেখলো। চ্যানেলের ভাগাভাগিতে ভাইবোনে রিমোট নিয়ে কতক্ষণ কাড়াকাড়ি করল। দুজনেই নানা যুক্তিতর্কে অপরের চ্যানেলের খারাপ দিক তুলে ধরল। মাঝখান থেকে আসলাম সাহেব আবদার করলেন, তাকে যেন একটু নিউজের চ্যানেল দেখতে দেয়া হয়। মাত্র পনেরো মিনিটের দাবি। বাবার ক্ষুদ্র দাবি ভাইবোন মিলে পূরণ করে দিলো। এতকিছুর পরও কিন্তু ওয়াপদা রোডের ঘটনা একেবারে মুছে গেল না অর্পিতার স্মৃতি থেকে। কাল সকালেই তো আবার কলেজ। আবার সেই ওয়াপদা রোড। সেই জঘন্য ঘটনা।

অর্পিতার কলেজ আর  আসলাম সাহেবের চেম্বার একই সময়ে। সকালে নাস্তা সেরে মেয়েতে বাবাতে তাই একসাথে বেরোয়। আসলাম সাহেব মোটরসাইকেলে মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে আসেন কলেজের গেটে। তারপর চেম্বার, সনো টাওয়ার।  কিন্তু ফেরাটা একসাথে হয় না। অর্পিতার কলেজ আগেই শেষ হয়ে যায। দুপুর একটার পরপর। বাসা থেকে দুটো গলি পার হলেই কলেজের বড় রাস্তা। এতটুকু পথ যে রিকশায়ও ওঠা যায় না। অর্পিতা তাই হেঁটেই বাসায় ফেরে কলেজ ছুটি হলে। আজ  ফেরার সময় তার হাত-পা অল্প অল্প কাঁপতে লাগল। সামনেই ওয়াপদা রোডের গলিটা। এই একটার অলস দুপুরে যে গলিটা নির্জন পড়ে থাকে ক্লান্ত সাপের মতো। অর্পিতার বন্ধু সংখ্যা যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান।

দু’একটা বন্ধুর বাসা তাদের পাড়ায় হলে ভালো হতো। সবাই একসাথে গল্পে-হাসাহাসিতে গলিটা পার হয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু কারো বাসাই এদিকে না। সবাই উল্টো দিকে থাকে। অর্পিতার নিজের উপরই রাগ হয়। মা কেন অসময়ে চলে গেল! এখন কার কাছে এসব শেয়ার করে সে! এইসব কথা তো বাবাকে বলা যায় না। জানলে বাবা হয়তো তাকে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে বাসায় রেখে আসবে কলেজ শেষে। অথবা মা থাকলে সে বলতে পারত— ছুটি হলে তুমি কলেজে থেকে আমাকে আনবে। আমি এইসব চিপা গলি একা একা পার হতে পারব না।

দেখতে দেখতে অর্পিতা রবিউল স্টোরের কাছাকাছি চলে এলো। কোন খদ্দের নেই দোকানে। মাঝবয়সী দোকানী চেয়ারে পা তুলে ঝিমোচ্ছে। নাকের সামনে উড়ছে সবুজ রঙের ডুমো একটা মাছি। দোকানি ঘুমের ভেতরেই হাত মেরে মাছি খেদাচ্ছে। দোকান পার হয়ে পঁচিশ গজ এগোলে সেই চিকন জামগাছ। এই গাছের নিচেই গতকাল সে রিকশাটা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। আজ  সে প্রবলভাবে কামনা করতে লাগল— রিকশা যেন না থাকে। কিন্তু দশ পা মারার পরেই সে জামগাছের নিচে সেই রিকশা এবং রিকশাওয়ালাকে দেখতে পেল। পথেঘাটে চলতে অর্পিতা দৃষ্টিকে সংযত রাখে। তার পোশাকও শালিন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া সে এদিকওদিক তাকায় না। কাল যখন সে এই রিকশাটা অতিক্রম করছিল, রিকশাওয়ালা খুব নোংরাভাবে বলেছিল, যাবে নাকি! সে এমনভাবে বলল, যেন তার সাথে শুতে যাওয়ার আহবান। রাস্তায় পাশ থেকে কেউ সাউন্ড করলে তার দিকে আপনাতেই নজর চলে যায়। অর্পিতারও গিয়েছিল। মুহূর্তে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে কান দিয়ে গরম বাতাস বেরিয়েছিল। রিকশাওয়ালা তার পুরনো হয়ে যাওয়া লুঙ্গিটার সামনের অংশ কোমর পর্যন্ত তুলে বাঁহাত দিয়ে নেড়ে যাচ্ছে নেংটি ইঁদুরের মতো কালো বিশ্রী যন্ত্রটা। ভয়ে-লজ্জায়-অপমানে অর্পিতার হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। এক মুহূর্তের জন্য সে মাটিতে শেকড় পোঁতা বৃক্ষ হয়ে গেছিল। তারপরই সামলে নিয়ে একদলা ওয়াক থু ফেলে হনহন পায়ে ছুটে এসেছিল বাসায়। তারপর থুতুর চূড়ান্ত পরিণতি  বেসিন ভাসানো বমি।

আজও  নির্জন গলির বিষণ্ণ জামতলায় একাকি রিকশায় বসে আছে লোকটা, সেই রিকশাচালকটা। অর্পিতার হাত-পা কাঁপতে লাগল। লোকটা যদি কিছু করে বসে! সে সিদ্ধান্ত নিলো, যা কিছু হয়ে যাক সে মাথা তুলবে না। মাটিতে চোখ কামড়ে সে পার হয়ে যাবে গলিটা। গেলও তাই। কিন্তু মেয়েদের চোখ তো শুধু সামনে নয়, চারপাশেই তাদের চোখ। সেই পাশের চোখ দিয়ে সে দেখতে পেল গতদিনের পুনরাবৃত্তি। সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করতে লাগল। কারেন্টের তারের উপর একটা কাক কা কা করে দুপুরটাকে আরো বিষণ্ণ করে তুলছে। কাকের ডাক অর্পিতার কানে ঢুকল না। তার কান দিয়ে এখন ঝাঁই ঝাঁই করে গরম বাতাস বেরোচ্ছে। অর্পিতা বুঝে গেল, এই সমাজে, তাকে, তার মতো মেয়েদেরকে হাঁটতে হাঁটতে ধর্ষিতা হয়ে যেতে হবে প্রতিনিয়ত।



লেখক : গল্পকার। জন্ম ১৯৯৪, কুষ্টিয়ায়।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫/তাপস রায়

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge