ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ বৈশাখ ১৪২৬, ২৬ এপ্রিল ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হারিয়ে যাওয়া ছানার জিলিপী ।। দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-১০-১৯ ৩:২৯:৩০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:৩৯ এএম

শীতের দুপুরটা সহজে ফুরিয়ে যায়। আমার সেই দুপুরটা যেন আরও দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছিলো। মা আর কাকীমা কিছুতেই বের হচ্ছিলেন না। আবার পাশের ঘর থেকে জেঠিমারও বের হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। অধীর হয়ে একবার এ-ঘর, একবার ও-ঘর করছিলাম। আমাদের দুটো ঘরের মাঝখানে বড় একটা উঠোন। উঠোনে ফুলের বাগানে বেড়া দেওয়া ছিলো।

 

বেড়ার পাশ থেকে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছি আর চিৎকার করছি, ‘এতো দেরী কেন! আমরা কখন যাবো?’

 

মায়ের কোনো উত্তর না পেয়ে আবার জেঠিমার ঘরের দিকে ছুট দিতে গিয়েই অঘটনটা ঘটলো। পড়ে গেলাম। হাতে বেশ লাগলো। শুরুতে ভেঙে গেছে মনে করে চারদিকে খুব ছোটাছুটি। শেষ ব্যাপারটা মচকানোতেই সীমবদ্ধ রইলো; সবাই হাফ ছাড়লো। কিন্তু আমি যে মচকে গেলাম। আমার পূজোয় বেড়ানো সে বছরের মতো মাঠে মারা গেলো।

 

সারা সন্ধ্যা শুয়ে শুয়ে ফুল বাগানের বেড়ার গুষ্ঠি উদ্ধার করছিলাম। কখন যেন চোখের পাতা ধরে এসেছে। হঠাৎ জেঠার কণ্ঠ শুনতে পেলাম, ‘ও জ্যাঠা, ছোট জ্যাঠা।’

 

আমি তো ছুটে বের হতে পারি না। আস্তে আস্তে বের হতে হতে শুনলাম, ‘এই নাও, তোমার ছানার জিলিপী।’

 

ব্যাস, আমার পূজোর আট আনা উসুল হয়ে গেলো।

 

হ্যাঁ, ছোট বেলায়, বলা ভালো বেশ বড় বেলা পর্যন্ত আমার পূজোর ষোলো আনার মধ্যে অন্তত চৌদ্দ আনা ছিলো এই ছানার জিলিপী আর নাগরদোলা। সারা বছর লোকে পূজোর অপেক্ষা করে নতুন জামা-প্যান্টের জন্য, মা দূর্গার মুখ দেখার জন্য; আমার অপেক্ষা ছিলো অশোক ময়রার দোকানে ছানার জিলিপী খাওয়া আর নাগর দোলায় চড়ার জন্য।

 

আমাদের সেকালের জীবন ছিলো রেডিও কেন্দ্রিক। গ্রামে টেলিভিশন ছিলো একমাত্র চেয়ারম্যান বাড়িতে।  বিনোদনের জন্য সেই আমলে মাইল দেড়েক হাঁটু কাঁদা পার হয়ে কেউ টেলিভিশন দেখতে যেত না। বিনোদনের সে দায়িত্বটা ছিলো রেডিওর ওপরে।

 

আমাদের বাড়িতে তিন ব্যান্ডের একটা রেডিও ছিলো। সারা বছর তার কাজ ছিলো সন্ধ্যা বেলায় বিবিসি বাংলা, রাতে আকাশবাণী বা খুলনা বেতারের নাটক এবং সারাদিন ধরে বিবিধ ভারতী ও বিজ্ঞাপন তরঙ্গের গান শোনানো। বছরে এই একটা সময়, আশ্বিনের আরম্ভকালে রেডিওটাকে ভোর রাতে ঘুম থেকে উঠতে হতো। মূলত কোনো একদিন সকালে আকাশবাণী কলকাতা থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মহোদয়ের জলদগম্ভীর কণ্ঠ জানিয়ে দিতো-পূজো আসছে।

 

মহালয়া, চণ্ডীপাঠ, শ্লোক, স্ত্রোত- এ সবের কোনো অর্থই তখন ছিল না আমার কাছে। শুধু বুঝতাম, ভোর রাতে ঘুম ভেঙে রেডিওতে মহালয়া শুনতে হবে। মা আগের সন্ধ্যা থেকে সাবধান করতেন, ‘তাড়াতাড়ি ঘুমা। ভোরে উঠে মহালয়া শুনবি।’

 

শুনতাম; শুনতাম বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র নামে এক ভদ্রলোক ভরাট গলায় কি যেন আবৃত্তি করে চলেছেন। আর তার সঙ্গে শব্দে শব্দ মিলিয়ে শ্লোক উচ্চারণ করে চলেছেন আমার বাবা-ইয়া দেবী সর্বভূতেষু...

 

আমার পরিবার পূজারী ব্রাহ্মণের পরিবার। বাবা-জেঠা দু’জনেরই চণ্ডীপাঠের গলা ছিলো দারুণ! ছোট বেলায় দেখেছি, ঠাকুরদাদা, বাবা, জ্যাঠা গ্রামের আশে পাশে তিনটে বড় মণ্ডপে প্রধান পুরোহিত হিসেবে পূজো করছেন। ফলে এলাকার পূজো মণ্ডপগুলোতে আমার দাপট ছিলো দেখার মতো। কোনো একটা মণ্ডপে গেলেই বাকী পুরোহিতরা, এলাকার লোকজন ছুটে এসে ফল-সন্দেশসহ মুঠো ভরে হাতে তুলে দিতো। আমার কাছেও মনে হতো, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি জীবনে আর নেই।

 

সব পূজো মণ্ডপের এই আকর্ষণের পরও আমার এবং আমাদের সেরা ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য ছিলো বাধাল পূজো মণ্ডপে যাওয়া। আর এখানেই আমার জিলিপি-নাগর দোলার মোক্ষ লাভ হতো।

 

বাধালে বিরাট একটা দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। আমাদের স্কুল মাঠেও পূজো হতো, পাশের গ্রামেও পূজো হত। কিন্তু বাধালের ওই বড় মেলাই ছিলো অষ্টমীর দিনে আমাদের গন্তব্য।

 

কয়েকটা ভ্যান ভরে আমরা দু’বাড়ির সব লোকেরা রওনা দিতাম বাধালে। আমার বড় দুঃখ ছিলো, আমাকে ভ্যানের মাঝে বসতে হতো। ভ্যানের চার পাশে বড়রা পা ঝুলিয়ে দিব্যি চারদিক দেখতে যেতে যেতে চলতো; আর আমাকে হয় মায়ের কোলে, নইলে মাঝে গুড়িসুড়ি মেরে বসে থাকতে হতো। একটু পা ঝুলিয়ে বসতে পেতাম না।

 

বাধাল মণ্ডপে পৌঁছে মায়েরা সব সারি বেধে ফুল-বেলপাতা হাতে নিয়ে মন্ত্র পড়তেন। এই মণ্ডপের প্রধান পূজারী ছিলেন আমার জ্যাঠা। তাই এখানেও সময়টা খারাপ কাটতো না। আমাদের হাতে তখন ফুল-বেলপাতার বদলে সন্দেশ গুঁজে দেওয়া হতো। কোনোক্রমে মণ্ডপ শেষ করেই মেলায় ছুট।

 

বিরাট মাঠের এ-মাথা থেকে ও-মাথা বিশাল মেলা। মেলায় আমার আকর্ষণ ছিলো দুটো- একটা গ্যাস বেলুন পাওয়া ও একটা-দুটো রঙ্গীন-বড় ছবি কেনা। মনে আছে একবার ইন্দিরা গান্ধী আর সুভাষ বোসের ছবি কিনেছিলাম। নেতাজী আর ইন্দিরা গান্ধীকে পাশাপাশি করতে পেরেছিলাম বোধহয় একমাত্র আমিই; বাড়ির কাঠের বেড়ায়।

 

একবার ইমরান খানের ছবি কিনেছিলাম; ভেবেছিলাম, নায়ক-টায়ক কিছু হবে। কতো কিছু ভেবে ছবি কিনেছি!

 

ছবি বাড়ি পর্যন্ত আস্ত থাকলেও গ্যাস বেলুন বেশীরভাগ বছর নাগরদোলা পর্যন্ত পৌঁছাতেই ফুটে যেতো। নাগরদোলাটা একটা মহা ব্যাপার ছিলো। একেবারে ছোট বেলায় আমাদের নাগরদোলায় চড়তে দেওয়া হতো না। আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে দাদা এবং তার বন্ধুরা নাগরদোলায় উঠতো।

 

একটু লায়েক হয়ে উঠতে নাগরদোলায় চড়ার সুযোগ এলো। যেন অ্যাপেলো-১১ তে চড়ার সুযোগ পেলাম-ষোলো ঘুল্লি এক টাকা!

 

নিচ থেকে আমাদের বসিয়ে দোলার চেয়ারগুলো আস্তে আস্তে মহাশূন্যে উঠে যেতো। অপেক্ষা চলতো বাকী চেয়ারগুলো ভরার। তারপর শুরু হতো এক ভয়ানক চক্কর। ঘুরছে তো ঘুরছেই, ঘুরছে তো ঘুরছেই। পাশে বসে থাকা দাদা ‘ঘুল্লি’হিসাব করতো। চক্কর ফুরিয়ে এলে সে কী আফসোস!

 

তবে আমাদের পূজোর এটা শেষ নয়; আরেকটা ব্যাপার আছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপারটাই বাকী-ছানার জিলিপী।

 

আমাদের অশোক কাকা সারা বছর কী সব কাজ করতো। আমাদের বাড়িতে খেজুর গাছ কেটেও রস বের করতো। কিন্তু পূজো এলেই সপরিবারে কাকা ময়রা হয়ে যেতো। অনেকগুলো ময়রার দোকান ছিলো। কিন্তু আমরা ঘুরে ফিরে অশোক কাকার দোকানেই যেতাম। মোহনভোগ, সীতাভোগ, কালো জাম, পাঁচ টাকার রসগোল্লা; কতোসব মিষ্টি। আমি নিশ্চিত সে মিষ্টিগুলো কিছুতেই সত্যিকারে মোহনভোগ বা সীতাভোগ ছিলো না। তারপরও রঙের বাহার ছিলো বলতে হবে।

 

কিন্তু আমাদের তো এসব বাহারি মিষ্টি চাই না। আমাদের চাই একটা ছানার জিলিপি। একটা স্টিলের প্লেট জোড়া একটা কালো ছানার জিলিপি। চকচকে দুটো চোখ নিয়ে হাসতে হাসতে অশোক কাকা আমার সামনে প্লেট রেখে বলতো-কাকা, এই তোমার ছানার জিলিপী।

 

কদিন খেয়াল করলাম, মায়ের কাছে এতো মিষ্টির দাম দেওয়ার টাকা নেই। অশোক কাকাকে ফিস ফিস করে কী যেন বললেন। অশোক কাকা হেসে মাথা ঝুকিয়ে সম্মতি দিলো। তারপরও আমার সামনে ছানার জিলিপী এলো।

 

মা সেদিন মারা গেলেন।

অশোক কাকা বুড়ো হয়ে গেছে। একটা লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছিলো। আমাকে দেখে হাউ মাউ করে কেঁদে জড়িয়ে ধরলো। প্রথমটায় চিনতে পারিনি। জড়িয়ে ধরেই বললো, ‘কাকা রে, কতোদিন তোরে ছানার জিলিপী খাওয়াই না। বৌদিও নেই, জিলিপীও নেই।’

 

ছানার জিলিপীগুলো এভাবেই চলে যায়।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ অক্টোবর ২০১৫/তারা

 

Walton Laptop
     
Walton AC
Marcel Fridge