ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ কার্তিক ১৪২৪, ১৯ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

৭১-এ ভারতে ১০ লাখ শরণার্থী মারা গেছে : জাফরুল্লাহ

আরিফ সাওন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-১১ ৬:০৩:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-১২ ১:৫৫:৩০ পিএম

আরিফ সাওন: একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে অন্তত দশ লাখ শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে। খাবারের অভাবে ও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তারা। এদের বেশিরভাগ শিশু ও বৃদ্ধ।

এই তথ্য জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজের বাসভবনে এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে এই তথ্য জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন রোগে মৃত্যুবরণকারী এই দশ লাখ শরণার্থীর কোন হিসেব বাংলাদেশ বা ভারত সরকারের কাছে আছে বলে মনে হয় না।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন তিনি ছিলেন ব্রিটেনে। ১৯৭১ সালের মে মাসে তিনি এবং ডা. এম এ মোবিন ব্রিটেন থেকে চলে আসেন। উদ্যোগ নেন মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করার। ওই সময়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্সোসিয়েশন এবং যুক্তরাজ্য যৌথভাবে ডা. এম এ মোবিন ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ভারতে পাঠায়। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় বিশ্রামগঞ্জে নির্মিত হয় ৪৮০ শয্যার অস্থায়ী ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। সেখানের পরিচালক ছিলেন সেনা কর্মকর্তা ও চিকিৎসক সিতারা রহমান। চিকিৎসক ছিলেন ডা. নাজিম ও ডা. আক্তার।

কোথায় কোথায় শরণার্থীরা ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মংডু এলাকা থেকে শুরু করে সর্বত্র শরণার্থী ছিলো। ওখানে ছিলো, ত্রিপুরাতে ছিলো, আসামে ছিলো, পশ্চিমবঙ্গে ছিলো, মনিপুরে ছিলো, এমনকি মধ্যপ্রদেশ রাজ্যেও ছিলো। মধ্যপ্রদেশ ভারতের মাঝখানে। সেখানে পর্যন্ত রিফিউজি ছিলো। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের এক কোটি রিফিউজি ছিলো।’

এই চিকিৎসক বলেন, ‘৯ মাসে রিফিউজি ক্যাম্পে কমপক্ষে ১০ লাখ রিফিউজি মারা গেছে। বেশিও হতে পারে। মারা গেছে নিউমোনিয়ায়, ডায়রিয়ায়, কলেরায়, পুষ্টিহীনতায়, খাওয়ার অভাবে, ঠাণ্ডায়। বেশিরভাগ মারা গেছে শিশু আর বয়োবৃদ্ধরা। তারা নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস- এসব রোগে আক্রান্ত হতো। মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে শীত বেশি, কিন্তু শরণার্থীদের শীতবস্ত্রের অভাব ছিলো।’

 


‘একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, নজরুল ইসলাম। তার স্ত্রী হাজেরা ঢাকার কোন একটা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। নজরুলের নামে একটা রাস্তা আছে। ওনার সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া হয়েছিলো। আমরা তার ঔষুধ জোগাড় করতে পারিনি। সেরিব্রাল ম্যালেরিয়ার ইনজেকশন ও ভাল ওষুধ পাওয়া যেত না। আমরা যুক্তরাজ্য থেকে তা আনতে আনতে ভদ্রলোক মারা যান।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, মতিন নামের একজন মেজর ছিলেন। তার ছেলে নিউমোনিয়ায় মারা যায়। মেজর মতিনের পরিবারের ইচ্ছে ছিলো যে, বাচ্চাটার কবর বাংলাদেশে হবে। সেই রাতেই মুক্তিযোদ্ধারা তাকে নিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে এসে কবর দেন।

ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘তখনকার দিনে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট আজকের দিনের মতো এতো ভাল ছিলো না। বর্তমানে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত উন্নত পর্যায়ে; আমরা ইমিডিয়েটলি মুভ করতে পারি। রোহিঙ্গারা আসছে, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হয়েছি দেখতে। কোথায় কি করা যাবে, না যাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হাজির হয়েছে। তারা হিসেব রাখছে কত আসছে যাচেছ। ১৯৭১ সালে শরণার্থীদের খবর রাখার ব্যবস্থা এতো উন্নত ছিলো না।’

এই চিকিৎসক বলেন, ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, আজকে আমরা জাতি হিসেবে স্বাধীনতার কথা বলি কিন্তু এই যে ভারতে দশ লাখের মত লোক মারা গেছে তার তালিকা আজ পর্যন্ত হয়নি। বাংলাদেশ সরকারও করেনি, ভারতীয়রাও দেয়নি। এই যে আমরা ত্রিশ লাখ, ত্রিশ লাখ করছি, এই শহীদদের কারো কোন নাম ঠিকানা নেই। কিন্তু আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা, তারা তো জানতে চাইবে।

তিনি বলেন, ‘তালিকা থাকলে সেই তালিকায় যদি কেউ তার স্বজনের নাম দেখতেন তাহলে তারাও গর্বিত হতেন।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ জানুয়ারি ২০১৭/আরিফ সাওন/শাহনেওয়াজ

Walton
 
   
Marcel