ঢাকা, সোমবার, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

‘ওরা এখন ক্রিকেটে অনেক শিক্ষিত, স্মার্ট, পেশাদার’

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-০৯-০৩ ২:০০:৪১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৩ ৪:১৫:২৯ পিএম

আজহার হোসেন সান্টু, বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক আক্ষেপের এক নাম! তার প্রতিভা নিয়ে কেউ কোনো দিন প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু খুব দ্রুত হারিয়ে গেছেন তিনি। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন এক কীর্তি গড়েছেন সান্টু, যা অনন্তকাল মনে রাখবে ক্রিকেটপ্রেমীরা। বাংলাদেশের ওয়ানডের প্রথম হাফ সেঞ্চুরিয়ান ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান।

১৯৯০ সালে শারজাতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৪ রান করেছিলেন সান্টু। পরবর্তী সময়ে তারই ভাতিজা মেহরাব হোসেন অপি ৯ বছর পর প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে তিন অঙ্কের ঘর স্পর্শ করেন। সব মিলিয়ে চাচা-ভাতিজা বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন কীর্তি গড়েছেন, যা ইতিহাসের পাতায় আজীবন অক্ষত থাকবে।

৫২ বছর বয়সি সান্টু ওয়ালটন মাস্টার্স ক্রিকেট কার্নিভাল দিয়ে আবারও মাঠে ফিরলেন। যদিও ঢাকা বিভাগ মাস্টার্সের ড্রেসিং রুমেই অলস সময় কাটিয়েছেন তিনি। এরই ফাঁকে তার মুখোমুখি রাইজিংবিডির ক্রীড়া প্রতিবেদক ইয়াসিন হাসান। কথোপকথনে সোনালি দিনের ক্রিকেট রোমাঞ্চে ফিরে গেলেন প্রাক্তন এই ক্রিকেটার। সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো:

রাইজিংবিডি: বয়সটা যদি ২০-২২ হতো তাহলে খুব ভালো হতো না কি?
আজহার হোসেন সান্টু:
(হাসি) সেটা হলে তো আজও ক্রিকেট খেলতাম। এ যুগের ক্রিকেট খেলতাম। মনে তো হয় অনেক ভালোই খেলতাম। কারণ আমার সতীর্থরা সব সময় বলত আমি যদি টেস্ট খেলতাম তাহলে ভালো খেলতাম। কিন্তু কিছু তো করার নেই। ইনজুরিতে পড়লাম। ক্রিকেট ক্যারিয়ার ওখানেই শেষ।

 

রাইজিংবিডি : এ যুগের ছেলেদের খেলা কেমন লাগে?
আজহার হোসেন সান্টু:
এখনকার যুগের যে চাহিদা বাংলাদেশ এখন সেভাবেই ক্রিকেট খেলছে। আমরাও আমাদের সময়ে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রিকেট খেলেছি। যদি গভীরে যান তাহলে দেখবেন তেমন পার্থক্য নেই। চাহিদা পরিবর্তন হয় যুগের সাথে তাল মিলিয়ে। আমাদের পর যারা এসেছে তারা ওভাবেই খেলেছে। তাদের পর যারা এখন খেলছে তারাও একই ক্রিকেট খেলছে।

 

প্রশ্ন: কোনো পার্থক্য কি চোখে ধরা পড়ে না?
আজহার হোসেন সান্টু:
পার্থক্য তো অবশ্যই আছে। বর্তমান সময়ের খেলোয়াড় অনেক বেশি শিক্ষিত। শিক্ষিত বলতে আমি পড়াশোনার কথা বলছি না। ক্রিকেটের ব্যাপারে শিক্ষিত। তাদের ক্রিকেটের জ্ঞান অনেক সমৃদ্ধ। ক্রিকেট নিয়ে এরা এখন অনেক পড়াশোনা করে। ওরা এখন অনেক বেশি স্মার্ট, অনেক বেশি পেশাদার। মাঠে নামার আগে ওরা অনেক পড়াশোনা করে নেয়। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় সম্পর্কে জেনে নেয়। দুর্বল-শক্তির জায়গায়গুলো সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে মাঠে নামে। আমরা এতটা ছিলাম না।

 

রাইজিংবিডি : যদি এ সময়ের হতেন তাহলে তো মুশফিক-সাকিবদের মতোই খেলতেন
আজহার হোসেন সান্টু: 
এখন ওরা ভালো সুযোগ পাচ্ছে, ভালো সুবিধা পাচ্ছে। তাই ওরা আরো ভালো খেলার চেষ্টা করছে, আরো পেশাদারভাবে খেলার চেষ্টা করছে। আমাদের সময় একটু কম ছিল বলেই একটু পার্থক্য স্পষ্ট। আগে যেহেতু ভালো খেলেছি এখন ক্রিকেট খেললে এখনো ভালো খেলতাম। যেহেতু আমরা ন্যাচারাল ক্রিকেটার। সব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়া কষ্টের কিছু হতো না।

 

রাইজিংবিডি: বাংলাদেশের ওয়ানডের প্রথম হাফ সেঞ্চুরিয়ান আপনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ম্যাচটির কথা কি মনে আছে?
আজহার হোসেন সান্টু:
ওপেনিংয়ে নেমে ৫৪ করেছিলাম। আমাদের বিশাল এক টার্গেট ছিল (৩৩৯)। কিছু করার ছিল না। রান কম করলেও অনেক পরে আউট হয়েছিলাম। (১৭৫ মিনিট ক্রিজে থেকে ১২৬ বলে ৫৪ রান)

 

রাইজিংবিডি:  একটা সেঞ্চুরিও ছিল….
আজহার হোসেন সান্টু:
ওটার কথা আর বইলেন না। ঢাকা লিগে আমার প্রচুর ৭০/৮০-এর ঘরে রান আছে। আমার প্রচুর ৫০ আছে। কিন্তু কেন জানি ১০০টা হচ্ছিল না। যেদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে আমি প্রথম ১০০ করলাম, সেদিন রাতেই সরকার পতন হয়ে গেল, ওই খেলাটা পরে পণ্ড হয়ে যায়। এই জন্য আমার সেঞ্চুরিটি কাউন্ট হয়নি। (সেঞ্চুরিটি মোহামেডানের হয়ে কলাবাগানের বিপক্ষে)।

 

রাইজিংবিডি: আপনি কখনোই হাফ সেঞ্চুরির পর বড় ইনিংস খেলতে পারতেন না। কারণ কী?
আজহার হোসেন সান্টু:
আমি ফিফটি মার্কের খেলোয়াড় ছিলাম। আমার পায়ে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে, এটা রকিবুল হাসান ভালো বলতে পারবে। একটা বড় ইনিংস খেলার পথে আমার প্রায়ই কাফ মাসেলটা ক্রাম্প করত। আর তখন তো এত আধুনিক সুবিধা ছিল না। দেখা যেত এর কারণে বা কোনোভাবে আমি আউট হয়ে যেতাম। তবে সেদিনই সেঞ্চুরিটা করেছিলাম। এরপর আর ঢাকা লিগে সেঞ্চুরি হয়নি।

 

Sports

 

রাইজিংবিডি: আপনি তো সব সময় পারফেক্ট ক্রিকেট খেলতেন। বাজে বল ছাড়া মারতেন না। ভালো বল মূল্যায়ন করতেন
আজহার হোসেন সান্টু :
ক্রিকেট খেলাটাই তো এ রকম। জেন্টলম্যান গেম। আমি খেলাটা শিখেছি এখান থেকে। এরপর আমি খেলার জন্যই ইংল্যান্ড চলে যাই। আমি সেখানে ইংলিশদের খেলা দেখেছি। সেখানে গ্রামাটিক্যাল খেলা দেখেছি। ওরা সব সময় বেসিকটা ভালো, সোজা ব্যাটে খেলত। আমিও ওদের মতোই চেষ্টা করতাম। আমি একটু সময় নিতাম, একটু ধীরে খেলতাম, তবে খুব একুরেট খেলার চেষ্টা করতাম।

 

রাইজিংবিডি : এ কারণেই কি টেস্টের প্রতি বাড়তি নজর ছিল আপনার?
আজহার হোসেন সান্টু :
আমি প্রচণ্ডভাবে টেস্ট ক্রিকেট মিস করি। যারা আমাকে চেনে তারা সবাই বলে যদি টেস্ট খেলতে পারতাম তাহলে ভালো করতাম। সবাই বলত, ‘সান্টু টেস্ট খেললে খুব ভালো খেলত।’ আমারও মনে হয় এ সময়ে টেস্ট খেললে অনেক ভালো খেলতাম। কারণ, আমি একটু সোজা ব্যাটে খেলতাম। আমি এটা মিস করি। বড় ইনিংসের খেলা খেললামই না কখনো।

 

রাইজিংবিডি: ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি টুকটাক বোলিংও করতেন
আজহার হোসেন সান্টু : 
টুকটাক না! বল হাতে স্পিনটাও ভালো করতাম। যে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছি প্রতিটিতেই বল করেছি। উইকেটও পেতাম। (৪ উইকেট)।

 

রাইজিংবিডি: এখন অনেক অফ স্পিনার বোলিং অ্যাকশনের জন্য নিষিদ্ধ হচ্ছেন। কী কারণে এটা বেশি হচ্ছে বলে মনে করেন আপনি?

আজহার হোসেন সান্টু:
আমাদের সময় অফ স্পিনারদের এই দুসরা ছিল না। এখন যেমন অ্যাকশন করে দুসরাটা করা হয়। আমাদের সময় সিম ব্যবহার করে দুসরা করার চেষ্টা করতাম। অনেকটা স্ট্রেটার বলটা হতো, কিছুটা আউটসুইংয়ের মতো হতো। এখন যেমন দুসরা টার্ন করে উল্টা দিকে, আমাদের সময় এটা ছিল না। এখন যারা তরুণ অফ স্পিনার আছে ওরা প্রথমেই দুসরা শিখতে চায়। দুসরাটা হলো লেগ স্টাম্প থেকে অফ স্টাম্পের দিকে যাবে বা এর বাইরে যাবে। আর যখনই দুসরাটা করতে যায় তখনই ইউটার্নের বদলে আউটটার্ন করতে করতে অ্যাকশন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে চাকার হয়ে যায়। আমার ধারণা দুসরাটা না করে কেউ যদি পিউর অফ স্পিনার হতে চায় তাহলেও ভালো ফল পাওয়া যাবে। দুসরা করলে অফ স্পিনারের অ্যাকশন ঠিক রাখা খুবই কঠিন।

 

রাইজিংবিডি: আপনার পরে অপি ক্রিকেটে এসেছেন। আপনার তো তিন ছেলে। পরবর্তী সময়ে কেউ কি আসছেন?
আজহার হোসেন সান্টু :
দুঃখজনকভাবে তেমন কেউ নাই। আমাদের বাসায় অনেকগুলো ছেলে আছে অপির পরে। যুগটা বদলে গেছে, আমার যেমন তিনটা ছেলে। পড়াশোনায় ওদের এত চাপ যে আমি নিজেই বলতে পারি না ক্রিকেট খেলতে। তবে ওরা ক্রিকেট খেলে, ভালোবাসে কিন্তু ওই খেলা এখনকার যুগে চলে না। পেশাদার কোনো ক্রিকেট খেলে না। আমি জানি না ক্রিকেটার বা কেউ কোনো খেলোয়াড় হবে কি না। এখন যে পরিস্থিতি পড়াশোনার পাশাপাশি আরেকটা ভালো কিছু হওয়া খুব কঠিন।

 

রাইজিংবিডি: ওয়ালটন মাস্টার্স ক্রিকেট কার্নিভাল কেমন উপভোগ করছেন?
আজহার হোসেন সান্টু:
  খুবই উপভোগ করছি। অবিশ্বাস্য পরিবেশ, যারা এ প্রোগ্রামটা করেছে তারা পুরোপুরি সফল। খুবই ভালো একটা পুনর্মিলনী।

 

রাইজিংবিডি: পাঁচ বছর পর বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কোথায় দেখতে চান?
আজহার হোসেন সান্টু:
আগামী পাঁচ বছরে টি-টোয়েন্টি কিংবা ওয়ানডেতে আমরা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল বা ফাইনালে দেখতে পারব। চ্যাম্পিয়ন পরের কথা, সেটা তো একটি মাত্র ম্যাচের ব্যাপার। তবে আমরা অনেক ভালো করতে পারব।



রাইজিংবিডি/কক্সাবাজার/৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬/ইয়াসিন/পরাগ/এএন

Save

Walton Laptop