ঢাকা, বুধবার, ২ কার্তিক ১৪২৫, ১৭ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

দেশীয় পণ্যে আস্থা বাড়ছে

অগাস্টিন সুজন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০৭ ১১:৫৩:৪৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৭ ২:২২:৪১ পিএম
ভ্যানে করে ওয়ালটন ফ্রিজ যাচ্ছে ক্রেতার ঘরে। এমন চিত্র এখন দেশের সর্বত্রই চোখে পড়ে। ছবি: রেজাউল করিম

অগাস্টিন সুজন : তখন ঈদুল আজহার একদিন বাকি। মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। সঙ্গে স্ত্রী। ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ। প্রচণ্ড জ্যাম আর ফেরিঘাটের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পেরিয়ে ভাঙ্গা চৌরাস্তায় পৌঁছে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এবার চারপাশে নজর দেওয়ার ফুরসত পাওয়া গেল। পরের দিন কোরবানির ঈদ। তাই অনেকেই ভ্যানে করে নতুন ফ্রিজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। স্ত্রীকে বললাম, চলো গুণে দেখা যাক, যাওয়ার পথে রাজৈর পর্যন্ত কয়টি ফ্রিজ চোখে পড়ে এবং সেগুলো কোন ব্র্যান্ডের।

যেমন কথা, তেমন কাজ। কাউন্ট ডাউন শুরু। নতুন ফ্রিজ বহনকারী একটা করে ভ্যান চোখে পড়ে, আর আমরা চিৎকার করে উঠি, ওই একটা। এটা অমুক ব্র্যান্ডের। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মাদারিপুরের রাজৈর পর্যন্ত মোটামুটি ২৮ কিলোমিটার পথ। বাইকে এই পথ পাড়ি দিতে ৪০ মিনিটের মতো সময় লাগল। এ সময়ে মোট আটটি ফ্রিজবাহী ভ্যান চোখে পড়ল। এসবের মধ্যে ছয়টি ফ্রিজই ওয়ালটনের। একটি মার্সেলের। অন্যটি ইউনিটেকের। অর্থাৎ সবগুলো ফ্রিজই দেশীয় ব্র্যান্ডের।

ফ্রিজ গুণে দেখার বিষয়টা অনেকের কাছে ছেলেমানুষি মনে হতে পারে। তবে আমাদের বেশ ভালো লাগল। ‘আমাদের দেশপ্রেম কেবল মুরগির ক্ষেত্রে। মুরগি খেতে গিয়ে আমরা দেশিটা খুঁজি। আর বাকি সব জিনিসই চাই বিদেশি।’ অনেকের মুখেই এ রকম কথা শুনেছি। কিন্তু এইটুকু পথ পাড়ি দিতে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখেছি। যা দেশীয় শিল্প ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে দারুণ আশাব্যঞ্জক। দেশীয় শিল্পের উজ্জ্বল ভবিষ্যত ও সম্ভাবনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

আজ থেকে কয়েক বছর আগেও দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজার পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। ঘরে ঘরে ছিল বিদেশি ব্র্যান্ডের টিভি, ফ্রিজ, এসি। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারের সিংহভাগ দখল দেশীয় কোম্পানিগুলোর। আর এক্ষেত্রে সবার আগে থাকছে ওয়ালটনের নাম। ‘আমাদের পণ্য’স্লোগান নিয়ে ওয়ালটন দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন খাতে বলা যায় বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। ঘরে ঘরে এখন শোভা পাচ্ছে ওয়ালটনের তৈরি ইলেকট্রনিক্স পণ্য। দেশীয় ব্র্যান্ড এবং দেশেই তৈরি বলে টিভি, ফ্রিজ, এসির মতো ইলেকট্রনিক্স পণ্য এখন সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে এসেছে। শহরের সুরম্য অট্টালিকায় বাস করা ধনীর গৃহকোণ ছাড়িয়ে এসব পণ্য এখন প্রয়োজন মেটাচ্ছে গাঁয়ের কৃষক পরিবারেরও।

আমার নিজের গ্রামও অনেকটা প্রত্যন্ত এলাকায়। একটা সুঁই কিনতেও যেতে হয় দুই কিলোমিটার দূরের বাজারে। বাজারের নাম রাধাগঞ্জ। অবস্থান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়া উপজেলায়। এই বাজারে চায়ের দোকানি টুকু কাজী। বয়সে আমার চেয়ে বছর দশেকের বড় হবেন। পরিশ্রমী ও সদালাপী মানুষটি বই পড়তে ভালোবাসেন। প্রায় ২০ বছর আগে চা-বিস্কুট দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখন বাজারে তার দুটি বড় মুদির দোকান। ব্যবসার পরিধি বাড়লেও চা বেচা বন্ধ করেননি। যতবারই বাড়ি যাই, একবার অন্তত তার দোকানে বসি। শুরুর দিনগুলোতে তার দোকানে চা-বিস্কুট খেতাম। এটা সেটা কিনতাম। এখনো তার সঙ্গে সেই সম্পর্ক অটুট আছে।

এবারও গিয়ে বসি তার দোকানে। ইদানিং একটা ব্যাপার হয়েছে। যেখানেই যাই, সেখানেই লক্ষ্য করি টিভি, ফ্রিজ বা এসিটা কোন ব্র্যান্ডের। দেশীয় ব্র্যান্ডের হলে বেশ ভালো লাগে। এর আগে কখনো লক্ষ্য করিনি, কিন্তু এবার দেখলাম টুকু কাজীর দোকানে একটা ডিপ ফ্রিজার। একটা নরমাল রেফ্রিজারেটর। আর একটা টেলিভিশন আছে এবং সবগুলোই দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটনের। ডিপ ফ্রিজারের ওপরটা বহুল ব্যবহারে কিছুটা মলিন হয়েছে।

কতদিন ধরে ফ্রিজটা চলছে, টুকু কাজীকে জিজ্ঞেস করি।



তা প্রায় বছর দশেক তো হবেই, জানান টুকু কাজী।

এতদিনে কোনো সমস্যা পেয়েছেন? না। প্রায় সাথে সাথে উত্তর দিয়ে তিনি বলতে থাকেন, বেশ ভালো জিনিস। এতদিন ধরে চলছে। কোনো সমস্যা পাই নাই। নরমাল ফ্রিজটার বয়সও প্রায় ১২ বছর হতে চলল। দারুণ চলছে। আর টিভিটার বয়স প্রায় ১৬ বছর। এখনো একদিনের জন্যও কোনো সমস্যা হয়নি। আপনি তো দেখেছেন।

হ্যাঁ। সেই ২০০২ সালের দিকে আমি তখন কলেজে পড়ি। প্রায়ই আসতাম টুকু ভাইয়ের দোকানে। গ্রামে তখন নতুন এক চল হয়েছে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে চায়ের দোকানগুলোতে রঙিন টিভিতে ভিসিডি প্লেয়ারের মাধ্যমে রাতদিন সিনেমা চলত। সিনেমা দেখার সঙ্গে খাওয়া হতো চা-বিস্কুট আর সিগারেট। বিক্রিও হতো খুব। কিন্তু সেই টেলিভিশনটা যে ওয়ালটনের, তা কখনো লক্ষ্য করিনি।

ভাই, আমার ঘরেও সব ইলেকট্রনিক্স পণ্য ওয়ালটন ব্র্যান্ডের। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন টুকু কাজী।

তার সঙ্গে আলাপে জানা গেল, গ্রামে ওয়ালটন ব্র্যান্ডের পণ্য খুব ভালো চলছে। ঘরে ঘরে এখন দেশীয় ব্র্যান্ডের টিভি-ফ্রিজ। দেশীয় কোম্পানি বলে সাশ্রয়ী দামে ভালো মানের পণ্য পাচ্ছেন সবাই। তার মতে, দেশেই বিশ্বমানের পণ্য তৈরি হলে সাশ্রয় হবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী হবে।

আমি তাকে জানালাম, ওয়ালটনের পণ্য এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। শুনে দারুণ খুশি হলেন তিনি। তার ভাষায় ‘দ্যাশের একটা কোম্পানির জিনিস বিদ্যাশেও যাচ্ছে জেনে ভালো লাগল ভাই।’

ভালো লাগাটা ছড়িয়ে পড়ে আমার মধ্যেও। যে রাষ্ট্রকে একদিন তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের আজ নতুন অভিধা দক্ষিণ এশিয়ার এমার্জিং টাইগার। খেলাধুলা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলার সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হয়ে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। দেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পখাতে ঘটেছে বিপ্লব। বিদেশি নয়, দেশীয় পণ্যের প্রতি আস্থা বাড়ছে সবার। আর এ খাতে সামনে থেকে পথ দেখাচ্ছে ওয়ালটন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭/সুজন/রফিক

Walton Laptop
 
     
Walton