ঢাকা, বুধবার, ৫ পৌষ ১৪২৫, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ইট কারিগরদের কষ্টে ভরা জীবন

আমিনুর রহমান হৃদয় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৭-১১-১২ ৮:০৬:২৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-১৮ ৬:৩১:২৩ পিএম

আমিনুর রহমান হৃদয় : ‘জীবনে নিজের হাতে লাখ লাখ ইট বানালাম কিন্তু সেই ইট দিয়ে কখনো নিজের বাড়ি বানাইতে পারলাম না। আগে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমার নিজের তৈরি ইট দিয়ে বাড়ি বানাবো। কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছি এখন। যেখানে ৬ মাস কাজ করে নিজের সংসারের খাওয়া-খরচই পোষাতে পারছি না, সেখানে ইট দিয়ে বিল্ডিং বাড়ি তো স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই না। গরিবের স্বপ্ন দেখাও পাপ।’- কথাগুলো কষ্টের সঙ্গেই বলছিলেন ইট বানানোর কারিগর গেদু মিয়া।

তার বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায়। ২৪ ধরে ইট তৈরির কাজে নিয়োজিত গেদু মিয়া বলেন, ‘ছোট থেকে অভাবের সংসার ছিল আমাদের। বাবা মেন্টাল (মানসিক ভারসাম্যহীন) ছিল বলে লেখাপড়া করতে পারি নাই। গ্রামে মানুষের বাড়িতে কাজ করেও ভাত-কাপড় ঠিকমতো পাইনি। তখন ১৩ বছর বয়সেই ইটভাটায় প্রথমে জোগালির কাজ নিই। এরপর কারিগর হইছি। ২৪ বছর ধরে কাজ করেও পরিবারের অভাব কাটাইতে পারি না। এখন বড় ছেলেকেও ইট বানানোর কাজে নিয়ে আসছি। ৭ম শ্রেণীতে পড়তে ছিল ছেলেটা। ৬ বছর ধরে এখন বাবা-ছেলে মিলে একসঙ্গে কাজ করি।’ বড় ছেলেকে নিজের সঙ্গে ইট বানানোর কাজে নিয়ে আসলেও ছোট ছেলে ও মেয়েকে স্কুলে পড়াশোনা করাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি গাজীপুরের ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ইটভাটায় ইট বানানোর কাজে নিয়োজিত বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় রাইজিংবিডি ডটকমের। বছরে ৬ মাস ইটভাটাগুলোতে পুরোদমে কাজ করতে হয় এইসব শ্রমিকদের। আর বাকি ৬ মাস এদের কেউ কেউ রিকশা চালিয়ে, কেউ দিনমজুরি কাজ করে, আবার অনেকে রাজমিস্ত্রীর সঙ্গে জোগালির কাজ করেও অর্ধেক বছর কাটিয়ে দেয়।
 


শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইট বানানোর কাজ করতে হয় তাদের। এই কাজটি হয়ে থাকে চুক্তিতে। একজন শ্রমিক ৫ লাখ ইট বানিয়ে দিলে মজুরি হিসেবে তাকে দেয়া হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। পুরোদমে কাজ করলে একজন শ্রমিক ৪ মাসে ৫ লাখ ইট বানাতে পারে। ইটভাটায় কাজে আসতে হয় একজন সর্দারের মাধ্যমে। কাজ শুরু আগেই সর্দার কিছু টাকা দিয়ে রাখেন শ্রমিকদের। পুরো ৬ মাসের জন্যই চুক্তি করেন সর্দার। ৬ মাস কাজ করে যে টাকা পাবে শ্রমিকরা সেই টাকা থেকে জনপ্রতি আবার সর্দারকে খুশি রাখতে ২ হাজার টাকা করে দিতে হয়। টাকা না দিলে পরের বার আর কাজ জুটে না ওই শ্রমিকদের।

সরেজমিনে কয়েকটি ইটভাটা ঘুরে দেখা গেছে, তীব্র রোদ উপেক্ষা করেও খোলা আকাশের নিচে কাজ করছেন শ্রমিকরা। নির্দিষ্ট কোনো বাসস্থান নেই তাদের। ভাটার পাশে কোনো রকম ছাপড়া ঘর তুলে কোনোরকমে রাতে ঘুমিয়ে থাকেন তারা।

আনোয়ার হোসেন নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘৬ মাসের জেলে থাকতে হয়। এই ৬ মাসের একদিন আগেও বাড়ি যেতে পারি না। ফজরের আজানের সময় ঘুম থেকে উঠে এশার আজানের সময় পর্যন্ত ইট বানানোর কাজ করি। তাতে যে টাকা মজুরি পাই তা দিয়ে সংসারের খরচ জোড়াতালি দিয়ে চলে। কষ্ট হয় তারপরেও কাজ করি।’

১১ বছর বয়সি জুনায়েদ হোসেনও স্কুল ছেড়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে ইট বানানোর কাজে যোগ দিয়েছে তার বাবার সঙ্গে। সে বলে, ‘স্কুলে গেলে ভাত জুটে না। তাই বাবার সঙ্গে কাজ করে টাকা আয় করার জন্য চলে এসেছি।’
 


মজুরি বাড়ানোর দাবি করেও কোনো লাভ হয় না এমনটিই জানান মোহাম্মদ সুমন নামে এক শ্রমিক। তিনি বলেন, ‘আমরা রোদে পুড়ে কষ্ট করে ইট বানাই। সে ইট বিক্রি করে ইটভাটা মালিকরা কোটিপতি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা গরিব তো গরিবই থেকে যাই। সামান্য কিছু টাকা মজুরি বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেও কোনো লাভ হয় না। সরকার যদি আইন করে আমাদের ন্যায্য মজুরি পেতে সাহায্য করতো তবে আমাদের কষ্ট কিছুটা হলেও দূর হইতো।’

কাউসার মিয়া নামে আরেক শ্রমিক বলেন, ‘পড়াশোনা ভালোই লাগতো কিন্তু বাবার একার পক্ষে সংসারের খরচ চালানো কষ্টকর হচ্ছিল। ৭ম শ্রেণীতে উঠার পর আমিও বাবার সঙ্গে কাজে যোগ দিই। এখন আমি আমার ছোট ভাই ও বোনদের লেখাপড়া করাচ্ছি।’

‘মাটির সঙ্গে আমাদের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মাটিই আমাদের বুঝে আর আমরা মাটিকে বুঝি। মাটিকে কেটে পুড়িয়ে ইট বানাই। সেই ইট দিয়ে মানুষ বাড়ি বানায়। আমরা রোদে পুড়ে মাটিকে যে ইটে রুপ দিতে কষ্ট করি এটা আর কেউ না বুঝলেও মাটি ঠিকই বুঝে। আশায় আছি এই কষ্টের ন্যায্য মূল্য একদিন দিবে মহাজনরা।’ এইসব কথা বললেন ইউসুফ আলী।

ন্যায্য মজুরি বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নিবে এমনটাই আশা এইসব শ্রমিকদের।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭/ফিরোজ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC