ঢাকা, শনিবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৭ মে ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

কে জন্মায়, হে বৈশাখ || পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১৭ ৭:১৪:৩০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১৭ ১০:৪৮:৫৪ এএম

মনে পড়ে আমার বেড়ে ওঠার ছোট্ট শহর কুমিল্লার পথে হাঁটতে গিয়ে কানে ভেসে আসত কোনো আবৃত্তি সংগঠনের কর্মীদের কণ্ঠে উচ্চরিত জয় গোস্বামীর কবিতা ‘কে জন্মায়, হে বৈশাখ’। আধুনিক কবিতা অনুধাবনের মর্মজ্ঞান তখনো তৈরি হয়নি কিন্তু অন্তরমহলে কী এক অজ্ঞেয় দোলা দিয়ে যেত বৈশাখ- অনুষঙ্গের সেই অমল কবিতা। আমি মিলিয়ে নিতাম আমার চারপাশটায় দেখে চলা বৈশাখের বিচিত্র জতুগৃহ। বলা ভালো, বৈশাখের সঙ্গে সঙ্গে অনিবার্যভাবে উদযাপনীয় ছিল চৈত্রসংক্রান্তিও।

চৈত্রসংক্রান্তিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তেতো শাকসবজি খাওয়া, ঘরদোর পরিষ্কার করে পুরোনো বছরের সঙ্গে পুরোনো জঞ্জাল সাফ করা, অবসন্ন গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়ে আসন্ন সুন্দর আগামীর প্রস্তুতি আর বৈশাখের ভোরের হাওয়ায় শহরের প্রধান-গৌণ সব সড়ক ধরে বসে যাওয়া মাছবাজার, কুমিল্লার কেন্দ্রস্থল টাউন হলে বৈশাখি মেলা, দশদিক থেকে ভেসে আসা গানের সুর, বাঁশির স্বর; সব মিলেমিশে এক সাজ সাজ রব পড়ে যেত। দোকানে দোকানে দেখতাম হালখাতার জোর আয়োজন। দোকানিরা পুরোনো হিসাবপত্র মেটানোকে কেবল যে অর্থনৈতিক বিষয় জানতেন তা কিন্তু নয়। তাই হয়তো প্রায় প্রতিটি দোকানে ঝুলতে দেখতাম বাহারি কাগজে লেখা রবীন্দ্রনাথ ‘ক্ষমা করো... পুরাতন বৎসরের সঙ্গে পুরাতন অপরাধ যত’।

বোঝা যেত হালখাতার রেওয়াজটা ভীষণ রকম সামাজিকও ছিল। এখন তো সব ছাপিয়ে পান্তা-ইলিশের পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক ঘনিয়ে উঠেছে; আজ থেকে মাত্র দুই দশক আগের যে বৈশাখের কথা বলছি তখন কিন্তু মিষ্টান্নের দাপটই ছিল বেশি।মিষ্টান্ন বলতে ঘরে পাতা কিংবা বাজার থেকে কিনে আনা দই। শাকপাতা থেকে মাছ যা-ই রান্না হোক না কেন, বৈশাখের দিনে বাসায় দই থাকা চাই-ই-চাই, বিষয়টা ছিল এমন। আর আমাদের মতো ছোটদের আকর্ষণ ছিল বৈশাখি মেলার উপচার কদমা-বাতাসা-মিষ্টি খই। শহরে বৈশাখি আয়োজন শেষ হয়ে যেত চৈত্রসংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখ, এই দুই দিনেই। কিন্তু একটু দূরে কুমিল্লার গ্রামের দিকে কাঠ বা লোহায় তৈরি নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের মেলা চলত বৈশাখের অনেকটা সময়জুড়ে। মা কাউকে দিয়ে সেই মেলা থেকে আনাতেন তার সাংবৎসরিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। এত কিছু ছাপিয়ে অবশ্য ফেলে আসা বৈশাখের যে কথাটি মনে বয়ে বেড়াচ্ছি সব সময় তা হচ্ছে তখনকার দিনে শেখানো বৈশাখি গুরুবাক্য ‘বছরের প্রথম দিনটিতে সত্য কথা বলবে, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে, গঠনমূলক কাজ করবে তাহলে সারা বছরই জীবন এমন শুভ ও সার্থক গতিতে চলবে’।

বলা যায় ছোটবড় সবাই আমরা অন্তত একটি দিন তা হুবহু মেনে চলার চেষ্টা চালাতাম। প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধন কোনো দিনসাপেক্ষ নয় জানি, তবে একটি দিন ঘোষণা দিয়ে তা পালন করাতেও ছিল আনন্দ অপার। আমাদের অনেক ধরনের বিগত সুকৃতির সঙ্গে এখন এই প্রত্যয়টিও যেন উঠে গেছে। কোনো শিশু-কিশোরকে আর অভিভাবকের কাছ থেকে এমন বাক্য শুনতে দেখি না বরং পাশের বাচ্চাটিকে ডিঙিয়ে কী করে সে প্রথম হবে- সে শিক্ষাই যেন এখন প্রধান হয়ে উঠেছে।

শিক্ষায় অনেক দূর এগিয়ে আসার পরও দেখি বৈশাখ উদযাপনে কেমন এক মানস-প্রতিবন্ধের চর্চা চলে চারদিকে। কেমন একটা কানাঘুষা, কেমন একটা ধোঁয়াশা। ‘বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি নয়’ এর মতো মূঢ় বাক্যের বাণও ছুড়তে দেখি কোনো কোনো তথাকথিত পণ্ডিতকে। না, এদের সঙ্গে তর্ক করারও কিছু নেই বৈশাখের। কারণ সংস্কৃতি বা উৎসব তো স্বচ্ছসলিলা প্রবহমান কিছুর নাম। ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে যারা বৈশাখি উৎসব রুখে দিতে চায় তারা কি দিনপঞ্জির শুরু থেকে ‘বৈশাখ’ মাসটিকে অদৃশ্য করে দিতে পারবে?

যা-ই হোক, তর্কে নেই উৎসবের প্রাণ, তাই বলতে চাই বৈশাখকে ঘিরে কিছু ভালোবাসার কথা। আমার কৈশোরের বৈশাখ কিন্তু পথের পাঁচালীর অপু-দুর্গার সঙ্গেও পালন করেছি একসঙ্গে। এক বৈশাখি দুপুরেই হাতে আসে বিভূতিভূষণের এই রূপছবিমাখা বইখানা। অসহ্য গরমে যখন ঘেমে নেয়ে উঠছি তখন নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের বৈশাখি রূপের কথা পড়ে আমার প্রত্যক্ষ বৈশাখ আরো বেশি উদযাপনীয় হয়ে যায়। অপু-দুর্গা যত রং মাখে বৈশাখি রোদে, হাওয়ায়-জলে তত নিজেও সাঁতার কেটেছি বৈশাখের রাঙা মেঘে-জলে-রোদে আর হাওয়ায় হাওয়ায় অফুরান।

বাংলাদেশের বড় নগরে-শহরে বৈশাখ আলাদা একটু। গত বছর ঠিক এমন সময়টায় কলকাতা ঘুরে দেখেছি বিপণিবিতানজুড়ে ‘চৈত্র সেল’ বিজ্ঞাপন আর ঢাকায় তো বৈশাখি ছাড়ের হুলস্থুল ছড়াছড়ি। মফস্বল শহরে গ্রামবাংলার পাড়া-মহল্লায় স্বতঃস্ফূর্ত মেলার আয়োজন চলে আর ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে কোমল পানীয় কোম্পানি যখন বৈশাখি মেলার আয়োজন করে তখন তাতে বিকিকিনি যাই থাকুক প্রাণটা থাকে না মোটেও।

এই তো সেদিনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমরা রাত জেগে দেয়ালিকা করেছি ‘রুদ্র বৈশাখ’ শিরোনামে। রাষ্ট্র ও সমাজক্ষমতায় যখন সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী গোষ্ঠী জাঁকিয়ে বসে, তখন আমরা কবি মুস্তাফা আনোয়ারের মতোই বলে উঠেছি ‘বৈশাখের রুদ্র জামা আমায় পরিয়ে দে মা’।

ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি বৈশাখ মানে রমনার বটমূল, বৈশাখ মানে ছায়ানটের বর্ষবরণ গান, বৈশাখ মানে গান আর কথার বিস্তারে ওয়াহিদুল হক কিংবা সন্‌জীদা খাতুন। কিন্তু সে শুনে আসাটাও একমাত্রিক থাকে না যখন একবার বৈশাখি সংবাদে যুক্ত হলো রমনায় বোমাবর্ষণের খবর। ভেবেছিল অনেকে, এই বুঝি রমনার পুরোনো বটগাছ থেকে ব্রহ্মদৈত্য এসে খেয়ে গেল এতকালের প্রাভাতিক বৈশাখি ঐতিহ্য। কিন্তু না, ‘আমি ভয় করব না, ভয় করব না, দুবেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না’ শুধু আক্ষরিক কথামালা তো নয় আমাদের বাঙালিদের জন্য। তাই পাকিস্তানি অন্ধকার সময়ে যেমন কালবৈশাখী হয়ে ওঠে নূতনের চিরউড্ডীন কেতনের নাম, ঠিক তেমনি বৈশাখ আজও আমাদের অভয়মন্ত্রের দীক্ষাদাতা।

এখনকার বৈশাখ যেমন হারিয়েছে পুরোনো ঐতিহ্য অনেক তেমনি যোগও করেছে নতুন কিছু। এই যেমন বৈশাখ এলে এখন আমরা বাংলাদেশে বাস করা আদিবাসী জনমানুষের কথাও ভাবি। দল বেঁধে যাই পাহাড়ে, যেখানে বিজু সাংগ্রাই। আদিবাসীদের বৈসাবি উৎসবের আনন্দে এক হয়ে বৈচিত্র্যের উৎস খুঁজি। বাঙালি মেয়ের পরনের বর্ণিল শাড়ি কিংবা আদিবাসী মেয়েটির চুলে গাঁথা বুনো ফুল বেয়ে ঐ তো আসছে একই আলোর বিভিন্ন বর্ণ বিচ্ছুরণ। ১৪২৪-এ সেই বৈচিত্র্যের রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নিই চলো।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ এপ্রিল ২০১৭/তারা

Walton Laptop