ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ কার্তিক ১৪২৪, ২৪ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প : অনুজ

ফিরোজ আলম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-২১ ৭:১৯:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-২২ ২:০১:৪২ পিএম
অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

|| ফিরোজ আলম ||

দক্ষিণ ওয়ারীতে ছোট ছিমছাম বাড়ি। বাড়ির পেছন দিকে একটি সুন্দর দোতলা ভবন, সামনে পুরোটা ফাঁকা। সেখানে নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ শোভা পাচ্ছে। একপাশে ছোট একটু সবুজ ঘাসে ঢাকা লন। শীতকালে সেখানে ব্যাডমিন্টন খেলার আয়োজন করা হয়। সাদা রঙের গেটটার ঠিক পাশেই বিশাল এক কদম গাছ। বর্ষাকালে ওয়ারীর এই এলাকায় যে আসে সে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বাড়িটি মুগ্ধ নয়নে দেখে। বাড়িটি একসময় ‘উকিল সাহেবের বাড়ি’ নামে পরিচিত হলেও এখন ‘বাদলদের বাড়ি’ নামেই সবাই চেনে। এ বাড়ির ছোট ছেলে বাদল পাড়ার ক্লাবের সেরা ক্রিকেটার। এলাকার কারো বিপদ হলে সবার আগে যাকে পাওয়া যায় সে হলো বাদল। সবাই বাদলকে খুব ভালোবাসে। পাড়ার তরুণদের কাছে বাদল আদর্শ। বাদলরা তিন ভাই। বড় ভাই নামকরা ব্যারিস্টার আর মেজ ভাইয়ের কাগজের জমজমাট ব্যবসা আছে। বাদল একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মের মাঝারি কর্মকর্তা। বাদলের বাবা আজহার উদ্দিন সাহেব ছিলেন ঢাকা শহরের জাদরেল অ্যাডভোকেট। এক সময় দেদার টাকাপয়সা আয় করেছেন। তবে বড় ছেলের বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি আর মেজ ছেলের কাগজের ব্যবসার মূলধন যোগান দিয়ে আজহার সাহেব নিঃস্ব প্রায়। ব্যাংকে অল্প কিছু টাকা স্থায়ী আমানত আর নিচ তলায় দুটো ফ্ল্যাটের ভাড়া- এটুকু আছে বলেই রক্ষা। তা না হলে শেষ বয়সে ছেলেদের কাছে হাত পাততে হতো। সেটা তার পক্ষে খুব লজ্জাজনক হতো। যদিও কোমরের হাড়ক্ষয় রোগের কারণে তার হাঁটাচলা প্রায় বন্ধ। তবুও আত্মসম্মান আগের মতই মজবুত।


বাদলদের ছয় কাঠার বাড়ি বড় দুই ভাইয়ের চাপে বাবা সম্প্রতি তিন ভাইয়ের নামে লিখে দিয়েছেন। তারা তাদের চার কাঠার ওপর সাত তলা আধুনিক বাড়ি বানাচ্ছে। ভাইয়েরা বাড়ির কাজ শুরুর আগে বাদলকেও বলেছিল লোন করে তাদের সাথে যৌথভাবে বাড়ি করতে। ছয় কাঠায় বাড়ি করলে নাকি ডিজাইনটা আরো ভালো হতো। কিন্তু এত টাকা বাদলের পক্ষে জোগার করা সম্ভব হয়নি। তাই তারা নিজেদের মতো করে চার কাঠার উপর বাড়ি করছে। তবে বড় ভাই হিসেবে তারা বাদলের জন্য অপেক্ষা করেছে বেশ কিছুদিন। শেষ পর্যন্ত বাদল যখন টাকার জোগার করতে পারেনি তখন বড় ভাই ব্যারিস্টার আশরাফ উদ্দিন একদিন বাদলকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে গেলেন। বড় ভাবি তাকে দেখেই অনেক যত্ন করে বসালেন। বাদল দেখলো, মেজ ভাই আশফাক উদ্দিনও বসে আছেন। চা-নাস্তা খাওয়ার পর ভাবি ভেতরে চলে গেলেন। তিনি ভেতরে গেলে আশরাফ উদ্দিনই প্রথম মুখ খুললেন। খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা-মা কেমন আছেরে?

বাদল মাথা নিচু করে বসে ছিল। সে বড় ভাইদের সামনে চোখ তুলে কথা বলতে পারে না। বিশেষ করে বড় ভাইজানের সামনে। ছেলেবেলা থেকেই সে দেখে এসেছে এই ভাইটিকে নিয়ে বাবা-মায়ের খুব গর্ব। বড় ভাইজানের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ হঠাৎ এত নরম! কোমল কণ্ঠে তাকে প্রশ্ন করতে দেখে বাদল একটু ঘাবরে গিয়ে বললো, আব্বা-আম্মা ভালোই আছেন। বাবার প্রেশারটা একটু বেড়েছে। আর আম্মা বলছিলেন তোমাদের অনেকদিন দেখে না। আমি বলেছি তোমরা ব্যস্ত থাকো, সময় পেলে ঠিকই যাবে।

অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনাটা আশরাফ সাহেবের ছেলেবেলার অভ্যাস। আইন ব্যবসায় নামডাক থাকলেও তিনি এখনো আদালতে শুনানির সময় প্রতিপক্ষের সব বক্তব্য চুপচাপ শোনেন। অন্যের বলা শেষ হয়েছে বুঝলে তবেই তিনি সাধারণত কথা বলেন। আজও আশরাফ সাহেব কথাগুলো চুপচাপ শুনলেন। তারপর বললেন, তোকে কিছু জরুরি কথা বলার জন্যই আজ আমরা ডেকেছি। দেখ নিজেদের বাড়ি থাকতেও আমরা দু’ভাই ফ্ল্যাট কিনে আলাদা থাকছি। কারণটা যে শুধু ওই পুরোনো বাড়িটা আমাদের স্ট্যাটাসের সাথে যায় না সেটা নয়। বড় কারণ হলো ওই দোতলা বাড়ির নিচতলার ভাড়াটা যাতে বাবার কাজে লাগে। আমি কিংবা আশফাক সাধ্যমত বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেছি। তুই এখন বড় হয়েছিস, চাকরি করছিস। তোরও তো এখন বাবা মায়ের জন্য কিছু করা উচিৎ।

বাদল মৃদু স্বরে বললো, জ্বি ভাইয়া।

শোন দোতলা বাড়িটার অংশটুকু আমরা তোকে দিয়ে দিচ্ছি। বড় ভাই পুনরায় বলতে শুরু করলেন- অন্য অংশে আমরা দুই ভাই মিলে বাড়ির কাজ শুরু করবো আগামী মাস থেকে। তুই সাথে থাকলে ভালো হতো। তিন ভাই মিলে ছয় কাঠার একটা সুন্দর বাড়ি করতে পারতাম। কিন্তু তুই তো আর আমাদের কথা শুনলি না। ‘মা’ বলছিল তোর অংশটা একটু পেছনে হয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই তোকে ‘মা’ একটু বেশিই ভালোবাসেন। যাই হোক বড় ভাই হিসেবে তোকে তো আর ঠকাতে পারি না। তুই বাবার দোতলা বাড়িটা আর সাথের সব ফার্নিচার একাই পেলি।

এটুকু শুনে বাদল চোখ তুলে বড় ভাইয়ের দিকে একটু দেখলো। এই সামান্য এক সেকেন্ডের চাহনিতেই আশরাফ সাহেবের কথা বন্ধ হয়ে গেল।


বড় ভাইকে চুপ হতে দেখে মেজ ভাই আশফাক কথা বলতে শুরু করলেন, আমরা চলে আসার পর দোতলার অর্ধেকটা তো ফাঁকাই পড়ে আছে। একটু ভেঙেচুরে আলাদা একটা ফ্ল্যাট করলে তুই তিনটি ফ্ল্যাটের ভাড়া পাবি সেটা কিন্তু মন্দ না। তুই তো এখনো বিয়ে করিসনি। নির্ভেজাল মানুষ। বাবা-মা তোর সাথেই থাকবেন। মা ছাড়া তুই থাকতে পারবি না, আবার মা তোকে ছাড়া। বলেই মেজ ভাই অদ্ভুত এক ধরনের হাসি দিলেন। বাদল মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলে উঠে দাঁড়ালো।

বড় ভাইজান তার সামনে চৌহদ্দি জমা-ভাগের একটি দলিল মেলে ধরে বললেন, তাহলে একটা সই দিয়ে যা ভাই। বুঝিসই তো সব লেখাপড়া করে রাখা ভালো।

বাদল আবার বসলো। কাগজটাতে সই করতে করতেই বড় ভাবি ঘরে ঢুকলেন। হাসিমুখে বললেন, আজ তোমার পছন্দের মুড়িঘণ্ট রেঁধেছি। রাতে না খেয়ে যাবে না কিন্তু।

বাদল হেসে বললো, না ভাবী আমার একটা জরুরি কাজ আছে। শুনে ভাবী বললেন, কাজ থাকলে আটকাবো না, তবে তোমার বান্ধবী জেরিনের বাসার ঠিকানাটা দিয়ে যেও।

আচ্ছা ভাবী বলে ঠিকানাটা একটি কাগজে লিখে দিয়ে বাদল বিদায় নিল। ঠিকানা ও ফোন নম্বরটা লিখে মনে মনে এক অজানা আনন্দ হলো তার।


এর পরের মাসেই বাদলদের বাড়ির কাজ শুরু হয়ে গেল। বাদলদের বললে কথাটা ভুল হয়ে যায়। কথাটা হবে বাদলের বড় ভাইদের বাড়ির কাজ শুরু হয়ে গেলো। তবুও এলাকার ছোট ভাইয়েরা বাদলকে দেখলেই এই উপলক্ষে মিষ্টি খেতে চায়। বাদলও হাসিমুখে খাওয়ায়। এলাকার মুরুব্বিরা বলে, বড় ভাই পাইছো মিয়া, কত বড় বাড়ি কইরা দিতাছে। তা পুরান বিল্ডিংটা কি স্মৃতি হিসাবে রাইখা দিলা? বাদল হাসি মুখেই চুপচাপ সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে দ্রুত সটকে পড়ে। রোজ অফিসে যাবার পথে ভাইদের বাড়ির কাজের অগ্রগতি দেখে। ভালোই লাগে তার। বাবার খুব শখ ছিল অনেক বড় বাড়ি করার। একজন আর্কিটেক্ট দিয়ে বাড়ির নকশাও করেছিলেন। কিন্তু জমানো টাকার অনেকটা বড় ভাইয়ার ব্যারিস্টারি পড়ার পেছনে চলে গেল। বাকিটা গেল মেজ ভাইয়ের কাগজের ব্যবসার মূলধন হিসেবে। তাই আজহার সাহেবে আর বড় বাড়ি করা হয়ে ওঠেনি। তবে যেই করুক, বড় বাড়ি তো একটা হচ্ছে এটাই কম কি।


আজ অনেকদিন পর জেরিন ফোন করেছিলো বাদলকে। এরপর থেকে মহা আনন্দে আছে বাদল। সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে সহপাঠী জেরিনকে সে ভালোবাসে, হয়তো জেরিনও। তবে কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা বলেনি। বাদল কয়েকবার বলতে চেয়েছিল কিন্তু জেরিনের যা মেজাজ সাহসে কুলোয়নি। তার উপর জেরিন সবসময় বলে ক্লাসমেটদের সাথে কেউ প্রেম করে? তোদের দেখলেই তো ছোটভাই, ছোটভাই লাগে। এরপরও বাদলের মনে হয় জেরিন তাকে ভালোবাসে। আজকাল সেটা আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। বাদলের ভালো একটা চাকরি হবে কবে সেটা নিয়ে কারণে-অকারণে ঝগড়া বাঁধায়। একের পর এক বিয়ে ভেঙে দিয়ে বাদলকে আপডেট দেয়। এসব যোগ-বিয়োগ করে বাদল বুঝে নিয়েছে জেরিন তাকে ভালোবাসে হয়তো। জেরিন মাসখানেক আগে রাগ করে বলেছিল ভালো চাকরি না পেলে যেন বাদল তাকে ফোন না করে। এরপরও বাদল কয়েকবার তাকে ফোন করেছিল কিন্তু জেরিন রিসিভ করেনি। কিন্তু আজ জেরিন নিজেই ফোন করে বললো, বড় ভাবী নাকি ওর বাবাকে ফোন করেছিল। আগামী শুক্রবার বড় ভাইয়া, ভাবী জেরিনের বিয়ের কথা বলতে আসবেন।

প্রথমে জেরিন কপট রেগে বাদলকে বললো, কিরে তুই কি আমাকে বিয়ে করতে চাস? বাদল থতমত খেয়ে বললো- কই নাতো!

জেরিন বললো, তাহলে তোর বড় ভাবী ফোন করে আগামী শুক্রবার আমাদের বাসায় আসতে চাইলো কেন?

কথাটা শুনে বাদলের শূন্যে লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে করেছিলো। কোনো মতে নিজেকে সামলে বললো, ভাবী বোধহয় এমনি বেড়াতে যাবে। শুনে জেরিন বললো, সেটা হলেই ভালো। তোর ভাবী যদি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে তবে তোর নাক ভাঙবো আমি।


বাদলের চাকরির বেতনে মোটামুটি চলে যায়। কিন্তু এই আয়ে বিয়ে করার কথা ভাবাও কষ্টের। ওর এক বিত্তশালী বন্ধু ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম করার চিন্তা করছে। ওকে রোজ ফোন করে পার্টনার করতে চাচ্ছে। কিন্তু পার্টনার হওয়ার জন্য যে টাকা লাগবে সেটা বাবার কাছে চাইতে পারবে না বাদল। আর চাইবেই কিভাবে? ও জানে তার বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা আর আগের মতো নেই। বড় ভাইয়ারা চাইলেই দিতে পারে। তবে দেবে বলে মনে হয় না। বাদল যেহেতু ইভেন্টের কাজ ভালো বোঝে তাই বন্ধুটি ওকে ওয়ার্কিং পার্টনার করতে চাইছে। কিন্তু ইনভেস্টমেন্ট ছাড়া পার্টনার হতে বাদলের আত্মসম্মানে লাগছে। তবুও তার মনের গহীনে স্বপ্ন আছে- নিজের ফার্ম করার। আর সেটি হলে নিজেকে জেরিনের মোটামুটি যোগ্য বানাতে পারবে। এরপর তার সামনে গিয়ে বলবে মনের কথা। বাদল তার ভালোবাসার কথা কাউকে না বললেও বড় ভাবীকে বলেছিল। আসলে বড় ভাইয়ার সাথে বয়সের অনেক পার্থক্য থাকার কারণে তেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না হলেও বড় ভাবী এই বাড়ির বউ হয়ে আসার পর তার সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তখন ওরা সবাই ওয়ারীর বাসাতেই থাকতো। বাবা তখন নামকরা অ্যাডভোকেট আর বড় ভাই এলএলএম শেষ করে বাবার সাথেই প্র্যাক্টিস করে। পরে অবশ্য বাবা তাকে ব্যারিস্টারি পড়তে বিদেশ পাঠান। এরপর ভাইয়া ব্যারিস্টারি শেষ করে দেশে এসে কিছু দিনের মধ্যেই বেশ নাম করে। ওদিকে মেজ ভাই কাগজের ব্যবসা শুরু করে ক্রমেই ফুলে ফেঁপে উঠছিলেন। অল্প বয়সে কাঁচা টাকা ছেলেকে নষ্ট করে দেবে ভেবে বাবা মেজ ভাইয়াকে বিয়ে করালেন। সবাই মিলে এক বাড়িতে তখন অনেক অনন্দেই ছিল ওরা। সেই দিনগুলো বাদল খুব মিস করে। এরপর বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে প্রথমে বাড়ি ছাড়েন বড় ভাই। এর ছ’মাস পর মেজ ভাইও ফ্ল্যাট কিনে অন্যত্র চলে যান। ভাইয়া-ভাবীরা চলে যাওয়ার পর থেকে বাবা-মা কেমন যেন মন মরা হয়ে থাকে। ঠিকমত কথা বলে না, হাসে না। এসব নিয়ে বাদলের অনেক অভিমান ছিল। কিন্তু বড় ভাবী জেরিনদের বাসায় যাচ্ছে বিয়ের কথা বলতে সেটা শোনার পর থেকে বাদলের সব অভিমান কর্পূরের মত হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।


পরদিন অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে কেবল টাইটা খুলেছে বাদল। এর মধ্যেই মায়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে তাদের ঘরে গেল। দেখলো বাবা মেঝেতে পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি তাকে পাঁজাকোলে তুলে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলো। দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বাদলকে এ অবস্থায় দেখে পাড়ার ছেলেরা একটা সিএনজি ডেকে দিলো। পাশের বাসার রাতুল আগে উঠে বসে বললো, দিন, বাদল ভাই চাচাকে আমার কোলে তুলে দিয়ে আপনিও উঠে পড়ুন। হাসপাতালে পৌঁছালে সেখানকার ডাক্তার সব দেখে ভর্তি করতে বললেন। বাদল দুই ভাইকেই ফোন করলো কিন্তু কেউ ফোন ধরলো না। পরদিন এনজিওগ্রাম করে আজহার সাহেবের হার্টে তিনটি মেজর ব্লক পেলো ডাক্তার। দ্রুত করোনারি স্ট্যান্ট বা হার্টে রিং পড়ানোর পরামর্শ দিলেন তিনি। একটু থিতু হয়ে বড় ভাইয়াকে আবার ফোন করলো বাদল। সব শুনে ভাইয়া খুব রাগ করলেন। কেন তাদের না জানিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। আর করেছেই যখন তখন এত দ্রুত এনজিওগ্রাম করার কি প্রয়োজন ছিল। আজকাল ডাক্তাররা এমন বলেই। ওষুধ খেলে আর বিশ্রামে থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বয়সে বাবার অপারেশনের ঝক্কি কুলোবে না। অহেতুক টাকা নষ্ট করে বাবার বিপদ আনার কোনো মানে হয় না। বাদল বড় ভাইয়ের সাথে আর তর্ক না করে মেজ ভাইকে ফোন করে সব জানালো। সব শুনে বড় ভাই কি বলেছে তা জানতে চাইলো মেজ ভাই। বড় ভাইয়ের কথাগুলো শুনে মেজ ভাই তার সাথে একমত পোষণ করলে বাদল রেগে গেল। বললো, তার মানে বাবার কোন চিকিৎসা হবে না? মেজ ভাই আমতা আমতা করে বললো, আসলে বাড়ির কাজ শুরু করায় আমাদের দু’জনেরই টাকার টানাটানি যাচ্ছে। তুই বাবাকে আপাতত হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে বাসায় নিয়ে যা। আমরা টাকাপয়সা ম্যানেজ করে কিছুদিন পর অপারেশনটা করাই।


বাদল ফোনটা কেটে দিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে গেলো। ডাক্তার যে হিসাব দিলো তাতে প্রায় আট-দশ লাখ টাকার বিষয়। তার দু’ভাই এখনো বাবাকে দেখতেই আসেনি। টাকা দেবার ভয়ে আর আসবেও না বোধহয়। কোথা থেকে টাকা জোগার করবে সেটা ভেবে বাদল যখন দিশেহারা তখন জেরিনের ফোন। মোবাইলের স্ক্রিনে জেরিনের নাম দেখে বাদলের মনে পড়লো আজ শুক্রবার। ভাবীদের জেরিনদের বাসায় যাওয়ার কথা। বাবার এই অবস্থায় নিশ্চয়ই ভাইয়া-ভাবী যেতে পারেনি তাই জেরিন ফোন করেছে ভেবে বাদল ফোনটা তারাতারি ধরলো। ধরেই বললো, সরি বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটোছুটি করছি বলে জানাতে পারিনি। ভাবীরা বোধহয় আজ তোদের বাসায় যাবে না।

জেরিন রেগে কী বলতে গিয়ে বাবার অসুখের কথায় চুপসে গেলো। বললো, কী হয়েছে চাচার?

বাদল তাকে সব খুলে বললো। সব শুনে জেরিন বললো তোর বড় ভাইয়াটা লেখাপড়া শিখলেও মানুষ হয়নি দেখছি।

বাদল একটু রেগে বললো, জেরিন প্লিজ, এভাবে বলিস না। তিনি আমার বড় ভাই। বাবার খবর পেয়ে হয়তো তিনি আপসেট, তাই যাননি। তাদের হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি।

জেরিন এবার ঝাঁজালো কণ্ঠে বললো, বাদল তোর ভাইয়া-ভাবী আসেনি বলে আমি একথা বলছি না। তারা না এলেই আমি বেশি খুশি হতাম।

বাদল এটা শুনে কিছুটা কষ্ট পেল। মাঝে মাঝে মানুষ এমন পরিস্থিতে পড়ে যে, কোনো কাজ হলেও কষ্টের, না হলেও কষ্টের। কিন্তু এরপর জেরিন যা বললো তা শুনে বাদল এমন আঘাত পেল যে, দাঁড়ানো অবস্থা থেকে হাসপাতালের সিঁড়িতেই বসে পড়লো। ভাইয়া-ভাবী জেরিনের বাসায় গিয়েছিল ভাবীর ছোট ভাই তমালের সাথে জেরিনের বিয়ের কথা বলতে। তমাল বাদলেরই সমবয়সী। ভাইয়া লন্ডনে থাকতে তমালকে পড়াশোনা করাতে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। দুলাভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বিলেতি পাত্র হয়ে আজ তার ভালোবাসার মানুষকে কেড়ে নিতে এসেছে। তমাল কিছু না জানলেও ভাবী তো জানে সে জেরিনকে ভালোবাসে। তারপরও কেন এমন করলো ভাবী। হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে লেকের অন্ধকার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাদল ভাবছিল তার দুটো বড় ভাই না থেকে যদি বোন থাকতো!


জেরিন বিষয়ক ভাবনাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না বাদলের। তার মাথায় তখন দশ লক্ষ টাকার চিন্তা। কোথায় পাবে এত টাকা! অনেক ভেবে সে ওয়ারীর তার অংশের দুই কাঠা জমি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিল। পাশের বাসার হাসমত চাচাকে ফোন করে বললো, চাচা বাবা খুব অসুস্থ। আমার টাকা লাগবে। আপনারা বোধহয় জানেন না। ওয়ারীর বাড়ি বাবা আমাদের তিন ভাইয়ের নামে লিখে দিয়েছেন। আমি আমার অংশটুকু বিক্রি করে দিতে চাই। যেহেতু আমাদের বাড়ির পাশেই আপনার বাড়ি তাই আপনাকেই আগে জানালাম। হাসমত সাহেব সব শুনে বললেন, টাকার জন্য বাপের জমি বেঁচবা? তোমার ভাইদের তো কোটি কোটি টাকা। দশ লাখ টাকা কি কোন বিষয়। বাদল বললো, বাড়ির কাজ করতে গিয়ে ভাইয়াদের হাত একেবারে খালি। হাসমত সাহেব আগামী কাল জানাবো বলে ফোন রেখে দিলেন। পরদিন সকালে বাদলের ঘুম ভাঙলো বড় ভাই আশরাফ উদ্দিনের ফোন পেয়ে। ফোন ধরতেই তিনি রেগে বললেন, তুই নাকি জমি বেঁচতে চাচ্ছিস?

বাদল বললো, ঠিকই শুনেছো ভাইয়া। আশরাফ উদ্দিন বললেন, বাবার জমি অন্যের হাতে গেলে আমাদের সম্মান থাকে? বাদল ভেতরে ভেতরে তেতে উঠছিলো। তবুও শান্ত গলায় বললো, ভাইয়া তোমাদের মান সম্মানের চেয়ে বাবার জীবন আমার কাছে বেশি মূল্যবান।

আশরাফ উদ্দিন বললেন, তোর কথায় মনে হচ্ছে আমরা বাবাকে ভালোবাসি না। আমরা বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেই। তোর মত আবেগে চলি না। যাই হোক জমি অন্য কারো কাছে বেঁচতে হবে না। আমি আর আশফাক ধারটার করে টাকা জোগার করেছি। অন্য কারো কাছে বেঁচলে হয়তো আরেকটু বেশি দাম পাবি কিন্তু তাতে বাবার অসম্মান হবে। তুই কাল সকালে রেজিষ্ট্রি অফিসে এসে জমি লিখে দিয়ে টাকাটা নিয়ে যাস। বাবার ট্রিটমেন্টের পরও তোর কাছে অনেক টাকা থেকে যাবে। সেগুলো উড়িয়ে নষ্ট করিস না। কোনো কাজে লাগাস। আর বাবার কেবিন নাম্বারটা দিস ড্রাইভার আব্দুলকে দিয়ে তোর ভাবী কিছু খাবার পাঠাবে।

বাদলের খুব বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল যে, ওড়ানোর মত কোনো টাকা কি তোমরা কোনদিন আমার হাতে দিয়েছো? বাবার জমি বেঁচলে তোমাদের সম্মান চলে যায় কিন্তু চিকিৎসা শেষ না করে বাবাকে বাসায় ফিরিয়ে আনতে বলতে তোমাদের লজ্জা করে না। কিন্তু কিছুই বললো না বাদল। আপনজনের মুখের উপর সব কথা বলা হয়ে ওঠে না কখানোই।


পনেরো দিন যমে মানুষে টানাটানি করে মোটামুটি সুস্থ বাবাকে নিয়ে বাদল বাড়ি ফিরলো। বাড়ি বলতে ওদের ওয়ারীর বাড়ি নয়। বাড্ডার দুই রুমের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট। বাবা ঢুকেই বললো, কিরে এ কার বাসায় নিয়ে এলি আমায়? আমাদের ওয়ারীর বাড়িতে যাবো না? মা আঁচলে চোখের জল লুকিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন। বাদল বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, তুমি তো হাসপাতালে ছিলে তাই জানো না। ভাইয়ারা পুরোনো বাড়িটা ভেঙে সবটা জুড়েই সুন্দর বাড়ি করছে। শুনে বাবা খুব খুশি হলেন। যাক তাহলে তোরটুকু বাদ দিয়ে শুধু ওদের টুকুতেই নতুন বাড়ি হচ্ছে না। টাকা দিতে পারবি না বলে যখন তোকে বাদ দিয়ে ওরা শুধু ওদের অংশটুকুতে আলাদা বাড়ি করছিল তখন খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। তবে আমি জানতাম তোর বড় ভাইয়ারা তোকে ঠকাতে পারে না। আমি নিজেই তো বাড়ির কাজটা করতে পারতাম। কিন্তু বড় খোকাকে ব্যারিস্টারি পড়াতে অনেক টাকা চলে গেল। এরপর মেজ খোকা ব্যবসার টাকার যোগান দিয়ে আমি প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেলাম। অথচ তুই সরকারি স্কুল-কলেজ আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলি। পড়া শেষ না করতেই আবার কিসের চাকরি করছিস। তোর অন্য দুই ভাইয়ের মত কোটি টাকা তো তোর পেছনে ব্যয় করতে হয়নি আমার। ওরা সেটা বুঝবে না? যাক শেষ পর্যন্ত ওদের বিবেক জেগে উঠেছে।বাবার কথা শেষ হতেই চোখের জল লুকোতে বাদল বারান্দায় চলে গেল।

বাবার বলা বিবেক শব্দটা ওর কানে বড্ড ধাক্কা দিচ্ছিল। বিবেক! সত্যি কি এমন কিছু আছে পৃথিবীতে? নাকি অনেক কিছুর মতই এটা শুধুই কল্পনা।


বাবাকে বাসায় নিয়ে আসার পর ভাইয়া ভাবীরা বাবাকে দেখতে এলেন। গলিতে বড় ভাইয়ার গাড়ি ঢোকাতে গিয়ে অনেক কষ্ট হয়েছে। এখানে আসতে গিয়ে মেজ ভাইয়ার গাড়ির পেছনের দিকে একটু রং চটে গেছে। যতক্ষণ ছিলেন ভাবী সেই আক্ষেপ করছিলেন বারবার। চলে যাওয়ার আগে বাদলকে বড় ভাবী বারান্দায় ডেকে নিয়ে বললেন, তোর বান্ধবীটা তো খুব বেয়াদব। আমার সাথে শুরুতে ভালোভাবে কথা বললেও কিছুক্ষণ পর অহেতুক খারাপ ব্যবহার করতে লাগলো। বলে কি বিয়ে করলে বাদলকেই করবো তমালকে নয়। তোকে বিয়ে করবে ভালো কথা কিন্তু তমাল তো আর ফেলনা পাত্র নয়। এভাবে কেউ মুখের উপর অপমান করে। ভুলেও ওই মেয়েকে বিয়ে করিস না। তার কথা শুনে বাদল দৃঢ় কণ্ঠে বললো, ভাবী বিয়ে যদি করতে হয় জেরিনকেই করবো।

বাদলকে এত শক্ত করে কথা বলতে দেখে বড় ভাবী কিছুটা অবাক হয়ে গেলো। এরপর বললো, সেটা করলে আমাদের সাথে তোর আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না মনে রাখিস।

বাদল হেসে বললো, এখনো কি সেটা আছে নাকি? থাকলে আমি যাকে ভালোবাসি তার সাথে নিজের ছোট ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাব দিতে না।

ভাবী বললো, মেয়েটাকে আমার পছন্দ আর ওর ভালো চাই বলেই সেটা দিয়েছি। তুই কোন দিক দিয়ে তমালের সাথে তুলনাযোগ্য শুনি?

বাদল বললো, তোমার স্বামী যদি আমার ভাই না হয়ে আমার বোন হতো তাহলে আমিও আজ এমন যোগ্য হতাম।

কথাটা শুনে কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে আশরাফ সাহেবের হাত ধরে টেনে নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলেন।


পরদিন বাদল তার বন্ধুকে ফোন করে যৌথভাবে ইভেন্ট ফার্ম খোলার প্রস্তাবে রাজি আছে সেটা জানালো। তার বাবার চিকিৎসার খরচের পরও অনেক টাকাই তার হাতে রয়ে গেছে। বন্ধু তার প্রস্তাব শুনে মহাখুশি। এরপর দুই বন্ধু মিলে শুরু করে দিলো নতুন যুদ্ধ। সবাই দূরে চলে গেলেও জেরিন তার বিশ্বস্ত বন্ধুর মতই পাশেই রইলো। বাদল তার নিজের প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত সময় কাটাতে লাগলো। সততা আর কর্মনিষ্ঠা দিয়ে খুব তারাতারিই সে ছোট হলেও দেশের অন্যতম সেরা ইভেন্ট ফার্ম দাঁড় করিয়ে ফেললো। শুধু ওয়ারীর দিকে গেলে তাদের বাড়ির রাস্তাটা এড়িয়ে চলে সে। কারণ বাড়িটা আর আগের মত নেই, যেমন নেই বাড়ির মানুষগুলো। মমতাহীন আধুনিক এক অট্টালিকা দেখে বাদলের বুক থেকে বেড়িয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস। সে মনে মনে ভাবে বাবা-মা এ বাড়িতে থাকতে পারেনি। ভাইয়ারা কি পারবে? বাদল ঠিক করেছে বাদল যে বাড়ি করবে সেখানে ভাইয়াদের জন্য আলাদা কক্ষ রাখবে। বুড়ো বয়সে আবার সবাই এক সাথে ব্যাডমিন্টন খেলবে।


বছর দুয়েক অমানুষিক পরিশ্রম করে বাদল নিজেদের প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশের এক নম্বর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলো। এরপর যেদিন ১২ কোটি টাকা বাজেটের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এক্সপোর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পেলো সেদিন জেরিনকে ফোন করলো বাদল। বললো আগামীকাল মাকে নিয়ে তোদের বাসায় আসবো। অনেক ভেবে দেখলাম যে, আমি নাক হারাতে পারবো তোকে না। কথাটা শুনে জেরিন খুব হাসলো।

পরদিন ওর বন্ধু আর মাকে নিয়ে জেরিনদের বাসায় গেলো। আজ আর ভীরু বাদল নয়। প্রত্যয়ী বাদল। বাদলরা হেরে যেতে জানে না। কখনো কখনো ভালোবাসার কাছে হার মানলেও ভালোবাসার মানুষগুলোকে হারিয়ে যেতে দেয় না। অনুজ হয়েও বাদলরা পথ দেখায় অগ্রজদের।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel