ঢাকা, রবিবার, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ২২ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

একচক্ষু হরিণীরা : শেষ পর্ব

রাসেল রায়হান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-২৩ ৮:২৩:০১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-২৩ ১:০৩:২৬ পিএম

ভাত খেতে খেতে শুনতে পেলাম আহিরের ছুড়ে দেওয়া প্রথম প্রশ্ন, সাত লক্ষ আঠারো বার ফোন দিয়েছি। ফোন ধরো না কেন?
আমি কিছু না বলে ভাত খেতে লাগলাম। পাশের লোকটির গরুর মাংস খাওয়া দেখে তাকিয়েছিলাম দেখে আহির গরুর মাংস দিতে বলেছে। স্বর্গীয় স্বাদ টের পেতে পেতে খাচ্ছি। জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না।
আহির আবার বলল, জবাব দাও।
আমি বললাম, সাত লক্ষ উনিশতম কলটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ওটা আসলেই ধরতাম। কিন্তু আসেনি।
আহিরের স্বর নরম হয়ে এল। কী হয়েছে তোমার?
আমি মাথা নাড়লাম। জোর করে মুখে হাসি এনে বললাম, কই কিছু হয়নি তো।
আহির তাকিয়ে রইল। দীর্ঘসময়ের নীরবতা। আমিও খেতে লাগলাম। আহিরই নীরবতা ভাঙল, তুমি কি চাও না আমি বিয়েটা করি?
আমি হেসে বললাম, কেন চাইব না?
তুমি চাও না। আমি বুঝতে পারি। আমিও চাই না। কিন্তু কিছুই করার নেই। বাবার অমতে কিছু করা সম্ভব না আমার। কোনোদিন না।
আমি কি বলেছি কিছু করতে?
মুখে বলোনি, কিন্তু মনে মনে বলেছ। বলছ।
ধ্যাত! তুমি আবার মনে মনের কথা কবে থেকে বুঝতে পারছ? মাইন্ড রিডার হয়ে গেলে নাকি?
শুধুমাত্র তোমার মনে মনের সব কথা বুঝতে পারি আমি। বিষয়টা অদ্ভুত। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারি।
আমি যেমন তোমার বাবার মনের কথা স্পষ্ট বুছতে পারি?
আহির হাসল। বলল, এমন ছেলেমানুষি কোরো না আর। তুমি যদি আমায় না বুঝতে পারো, শেষ পর্যন্ত কার কাছে আসব আমি?
আমি মাথা ঝুঁকিয়ে রাখলাম। এর মানে হ্যাঁ, নাকি না, আমি নিজেই জানি না।
আহির মাথায় হাত রাখল, এবার খাও। আরেকটু গরুর মাংস আনাবো? খাবে?
লাগবে না।
আমি চলে যাব। বাবার শরীর ভালো না। আচ্ছা।
তুমি বের হয়ে কই যাবে?
আছে এক জায়গায়। ছোট্ট একটা কাজ আছে।
আহির কৌতূহলি দৃষ্টিতে তাকাল, কই বলো তো? তার দৃষ্টিতে শঙ্কা ফুটে উঠছে।

বসুন্ধরা সিটিতে। মুনিয়া আসবে। আজ দেখা করব। দেখা না করলে মেয়েটা আমায় পাগল করে ফেলবে। ফোনে বাজে ব্যবহারের চূড়ান্ত করেছি। কিছুতে কিছু হয় না। সে হাসে। সেই হাসিতে আমার পৃথিবী এলোমেলো হয়ে যায়।
আহত বাঘের মতো তাকাল আহির। আমি তাকে আহতই করতে চেয়েছি। হোক আহত। আমি জানি কাজটা ঠিক হচ্ছে না। তবু মাঝে মাঝে বেদনা দিতেও ভালো লাগে।
আহিরকে আমি কথা দিয়েছিলাম, মুনিয়ার সঙ্গে কোনোদিন দেখা করব না। জীবনেও না। বিনিময়ে সে আমাকে একটি উপহার দিয়েছে। সারাজীবন স্মৃতিচারণ করা যাবে, এমন উপহার। সত্যি কথা হলো আমি দেখা করবও না। মিথ্যে মিথ্যেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কথাটা। গুলি একবার বের হয়ে গেলে ফেরত আনার মানে নেই।
আমাকে খাইয়ে দিয়ে আহির বাসায় গেল। যাওয়ার আগে পকেটে পাঁচশ টাকার দুইটা নোট গুঁজে দিয়ে গেল। বলল, মুনিয়াকে টাকা খরচ করতে দিও না। সেটা ভালো দেখাবে না।

সেদিন রাতে ফোন পেলাম। আহির হাসপাতালে। কেউ একজন অ্যাসিড মেরেছে জানালা দিয়ে। তিনতলায় উঠে কেউ কীভাবে অ্যাসিড মারল কে জানে। ছুটে হাসপাতালে গেলাম।
হাসপাতালে আহিরের সাথে দেখা হয়নি। ওর বাবা আর ভাই বসে আছে। আমাকে দেখে ওর বাবা এমনভাবে তাকালেন, আমি কুকড়ে গেলাম। তার মনের কথা সত্যিই আমি বুঝতে পারি। কিংবা দৃষ্টি পড়তে পারি। এই মুহূর্তে তার দৃষ্টি বলছে, আমার মেয়েকে অ্যাসিড মেরে এখন আবার দেখতে আসা?
আমিও মনে মনে বললাম, ভুল বুঝবেন না। আহিরের ক্ষতি করার ক্ষমতা আমার নেই। দুর্ভাগ্য, আমার চোখ তিনি পড়তে পারেন না। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
একবার ভেবেছিলাম, আমি সোজা গিয়ে আহিরের বাবাকে বলব, আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই। আপনার আপত্তি থাকলেও শুনব না। বলা হয়নি। সব কিছু বলা হয় না। সবাই বলতে পারেও না।
আহিরের ফোন বন্ধ ছিল এক মাসের মতো। ওর বাবার নম্বর নেওয়া হয়নি। নিলেও ফোন দিতে সাহস হতো না। আহির নিজে থেকে যোগাযোগ করলেই ভরসা। ওর সাথে কথা বলার আগে ওর বাসার সামনে যেতেও সাহস পাচ্ছি না। ওর বাবার দৃষ্টি আমি ভয় পাই। কিন্তু আহির ফোন দিচ্ছে না। সেও আবার তার বাবার মতো এই ভেবে বসে নেই তো যে আমি অ্যাসিড মেরেছি? কে জানে!
আহিরের নম্বর থেকে ফোন এল একদিন হঠাৎ। টানা কিছু ঘটনা ঘটে গেছে এর মধ্যে। আহিরের বিয়েটা ভেঙে গেছে। কোনো কারণ দেখায়নি। বলেছে, পাত্র নাকি দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এসে বিয়ে করবে। নতুন একটা প্রস্তাবও এল বিয়ের। সেই ছেলে, যে আহিরের পেছনে পেছনে ঘুরত। শ্যাওড়াপাড়ার। আগের বিয়েটা ভেঙে যাওয়ার পর আহিরের বাবা খুব ভেঙে পড়েছিলেন। এক কথায় মেনে নিলেন।
এখন আবার আগের মতো আনন্দে আছেন আহিরের বাবা। বিয়ের জোগাড়যন্তরে ব্যস্ত। কেনাকাটা তো আগেই ছিল। কথা বলতে বলতে আহির বলল, মজার একটা ব্যাপার হয়েছে, জানো?
আমি বললাম, এর মধ্যে মজার ব্যাপারও হয়?
আহির বলল, হয় তো। শোনোই না। হাসপাতাল থেকে ফিরলাম টানা পনেরো দিন পর। খুব বেশি পোড়েনি। একপাশ পুড়েছে। পোড়া মুখ নিয়ে বারান্দায় বসে থাকি। তো হুট করে বিয়েটা ভাঙার খবর পেলাম। দুদিন পর খেয়াল করে দেখি, প্রজাপতি দুইটা আর নেই। কোথাও নেই। এমন হয়নি আগে। ভাবলাম, হয়তো কোনো কারণে কোথাও গেছে। কিংবা কিছুতে মেরে খেয়ে ফেলেছে। মজার ব্যাপরটা হলো, নতুন বিয়ের প্রস্তাবটা যেদিন এল, দেখি কোত্থেকে প্রজাপতি দুইটা আবার ফিরে এসেছে। উড়ছে বারান্দাজুড়ে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ভালো। তোমার বিয়ে কবে?
সামনের রবিবার। তুমি আসবে না?
আমি বললাম, না।
আচ্ছা, আজ আসবে একবার? খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
আমি ফোন রেখে দিলাম।
আহিরের সঙ্গে দেখা হলো প্রায় এক মাস পর। দেখা না হওয়াই ভালো ছিল। এই মুখ আমি কোনোদিন দেখতে চাইনি।

ষোল
বাবা মুকুল,
আমি জানি না, এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না। অনেকদিন তোমার কোনো খোঁজ নেই। আগের নম্বর বন্ধ। ভেবেছিলাম তুমি বেঁচে নেই। তোমার ভার্সিটিতে খোঁজ নিয়েছি, কেউ জ্নে না, তুমি কই। শুনেছি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছ, তবে বেঁচে যে আছ সেই নিশ্চয়তা তোমার বন্ধুরা দিয়েছে। তারা বলেছে তোমাকে নাকি অনেকে এখন চেনে। কবিতা লেখো।
আমি জানি না তুমি কেন বাড়ির সাথে সম্পর্ক পরিত্যাগ করেছ। আমাকে নাহয় ভুলে গিয়েছ, কিন্তু তোমার আব্বাকে কি একবারও মনে পড়ে না? কীভাবে ভুলে গেলে তাকে? তোমার কি মনে নেই অন্ধ বাবার পিঠে উঠে ঘোড়ায় চড়ার কথা? মনে নেই, তোমায় ঘোড়া চড়াতে গিয়ে একদিন তারা মাথা জোরে ঠুকে গেল কাঠের দেওয়ালে, তোমার বাবা অজ্ঞান হয়ে গেল!  
তোমার এক বন্ধু আমাকে তোমার একটি বই দিয়েছে। সেই বই তোমার বাবা বুকের মধ্যে রেখে দেয়। মাথার কাছে রেখে ঘুমায় রোজ। আমাকে সেখান থেকে জোরে জোরে কবিতা পড়ে শোনাতে হয়। কবিতা পড়ার নিয়মকানুন আমি জানি না। চোখের পানি মুছতে মুছতে আমি রিডিং পড়ে যাই, আর তোমার বাবা শিশুদের মতো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদেন।

সে যেন শিশু হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। কতটা শিশুসুলভ ভঙ্গিতে তোমার গল্প সব জায়গায় বলে বেড়ায়, যদি দেখতে! আর আমার হয়েছে উল্টোটা। আমি ক্রমাগত বৃদ্ধ হচ্ছি। তোমায় খোঁজার জন্য দুদিন দুটি পত্রিকা অফিসে গিয়েছি, তারাও কোনো ঠিকানা দিতে পারেনি। তোমাকে খুঁজে বের করার জন্য যে পরিশ্রম আমায় দিতে হতো, যে শক্ত আমায় খাটাতে হতো, তা আর অবশিষ্ট নেই। তোমাকে খুঁজতে গিয়েই টের পেলাম যে বয়স আমার উপরে থাবা বসিয়েছে। আমি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি।
তোমার বাবা হয়তো তোমাকে বলেছে যে আমি চাই তোমার একটি চোখ তাকে দাও। সেজন্য তুমি পালিয়ে চলে গেলে! তুমি জানো না, কোন পর্যায়ে আমি চেয়েছি আমার সন্তান তারা পিতাকে একটি চোখ দিক।
ভাবছি, রোজ একটু একটু করে তোমায় একটি চিঠি লিখব। অন্তত এটা জানা উচিত তোমার, কোন পর্যায়ে এসে একজন মা তার সুস্থ সন্তানের একটি চোখ চান।
এটা একজন স্বার্থপর প্রেমিকার চিঠি তোমার কাছে। সত্যিকার অর্থে আমি একজন স্বার্থপর পেমিকা, কিন্তু স্বার্থপর মা নই। এই চিঠিতে এমন কিছু কথা বলব, যেটা সন্তান হিসেবে তোমার শোনা উচিত নয়। তবু বলতে হচ্ছে। যেটুকু না বললেই নয়, সেটুকুই বলব। বাকিটুকু তুমি ধারণা করে নিও। তুমি বুদ্ধিমান ছেলে, বুঝতে পারবে।
তুমি হয়তো জানো না, আমাকে তোমার দাদু কুড়িয়ে পান। তিনি আমাকে কন্যাবৎ বড় করেছেন। তার শুধু একটাই ইচ্ছা ছিল, তার একমাত্র অন্ধ ছেলেকে যেন আমি বিয়ে করি। আমি তার বিশ্বাস ভেঙেছিলাম। অন্য এক পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আবার আমাকে ফিরে আসতে হয়। তোমার দাদু আমাকে একটা কটুবাক্য বলেননি এই প্রসঙ্গে। তিনি বাস্তবিক অর্থেই আমায় কন্যার মতো বড় করেছিলেন। অথচ আমি তার যোগ্য ছিলাম না।
যা-ই হোক, ফিরে আসার পরেও তিনি মাহমুদের সঙ্গে আমার বিয়ে দেন। আমাদের যখন বিয়ে হয় তখন তুমি আমার পেটে। আমি যার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলাম, সে আমার গর্ভে একটি বীজ রেখে যায়। সেই বীজ তুমি। তবু মাহমুদ তোমার বাবা হতে পেরেছিল। সে তোমাকে গ্রহণ করেছিল। শুধু বিয়ের রাতে তোমার বাবা একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, আহা, আমাকে যদি তিনি একবার দেখতে পারতেন। তখন থেকে আমি ঠিক করি, আমি নিজেকে তার সামনে উপস্থাপন করব, পৃথিবীর সব থেকে রূপবতী নারী হিসেবে।
হ্যাঁ, আমি নিজে তাকে একটি চোখ দিতে পারতাম। তোমার পিতা মহামানব। বিশ্বাস করো, তাকে দুটি চোখ দিতেও আমার আপত্তি ছিল না। কিন্তু স্বার্থপরের মতো আমি তার সামনে নিখুঁত দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম, তাকে মুগ্ধ করব। বিয়ের রাত থেকে সারাজীবন আমি চেয়েছি তাকে মুগ্ধ করে আসতে। তার পেশাব-বাহ্যি পরিষ্কার করতে আমার সামান্যতম ঘেন্নাও জাগেনি। যেমন জাগেনি তোমার পেশাব-বাহ্যি পরিষ্কার করতে। আমি শুধু একটি জিনিসই চেয়েছিলাম, সে মুগ্ধ হোক। আমায় দেখে মুগ্ধ হোক। বার বার প্রেমে পড়ুক আমার। এটুকু তার পাওনা ছিল।
তোমার প্রতি তোমার বাবার ভালোবাসা কতটা গাঢ় ছিল, তা নিশ্চয়ই তোমার বুঝতে পারার কথা। আজকের আগে পর্যন্ত তুমি জানতে পর্যন্ত পারোনি যে সে তোমার পিতা নয়। যেখানে আমি স্বার্থপর হয়েছিলাম, চেয়েছিলাম তোমার একটি চোখ নিতে, সেখানে তিনি তোমায় বারণ করলেন বাড়িতে যেতে। যা-ই হোক, তোমার প্রতি তোমার পিতার ভালোবাসার প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন আমি বোধ করছি না। তিনি চাননি তোমার চোখ। কিন্তু আমি চাই। এখনো চাই।
তোমার বাবা কিছুদিন ধরে ভয়াবহ অসুস্থতার ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন। তার ক্যানসার ধরা পড়েছে। ডাক্তার বলেছে, আর হয়তো বছরখানেক বাঁচবেন। দিনের পর দিন তোমার পড়াশুনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সামান্য সামান্য করে আমি কিছু টাকা জমিয়েছিলাম, তোমার বাবার চোখের অপারেশন-খরচ চালাব দেখে। সেই টাকা তার চিকিৎতৎৎৎসাতেই খরচ হয়ে গেছে।
আমি কিছুদিন আগে আবার ঢাকায় এসেছিলাম তোমার খোঁজে। তুমি আমার সন্তান। তবু তোমার পা ছুঁয়ে অনুরোধ করতাম, এই স্বার্থপর নারীর একটি অনুরোধ তুমি রাখো। একটি চোখ তুমি তোমার বাবাকে দিয়ে যাও। আমি চাই মৃত্যুর আগে একবার অন্তত সে মুগ্ধ হোক আমায় দেখে। একবার। তারপর বলুক, বাহ্!
তোমাকে পাইনি। তবে একজন একটি পত্রিকার ঠিকানা দিল। বলল, এই অ্যাড্রেসে চিঠি লিখলে তুমি পাবে। জানি না পাবে কি না। যদি পাও, তাহলে যথাসম্ভব দ্রুত চলে আসো বাড়িতে। শুনেছি তুমি পুরস্কার হিসেবে বেশ কয়েক জায়গা থেকে টাকা পেয়েছে। আসার সময় অপারেশনের খরচ জোগাড় করে নিয়ে এসো।
-ভালোবাসাসহ, ইতি তোমার মা।

চিঠি পাঠানোর চারদিনের মাথায় মাহমুদ আলী মারা যান। যাওয়ার আগে তিনি মিহিস্বরে আক্ষেপ করেছিলেন, পারুল, তোমাকে দেখে যাওয়া হলো না আমার। আচ্ছা, তুমি কি জানো, অন্ধ মানুষ পরকালেও অন্ধ থাকে কি না। তেমন হলে পরকালে আমি পুনরায় বেঁচে উঠতে চাই না। কোনোদিন না। আর যদি দেখতে পাই, আমি তোমায় একবার দেখব। একবার মুকুলকে দেখব। তারপর আবার অন্ধ হলেও আমার আপত্তি নেই।
পারুল শেষ পর্যন্ত স্বামীর হাত নিজের গালে ঠেকিয়ে ছিলেন। চোখের পানি গড়িয়ে মাহমুদ আলীর হাত ভিজিয়ে দিচ্ছিল, এবং সম্ভবত সেই আর্দ্রতা অনুভব করার ক্ষমতা মাহমুদ আলীর তখন ছিল না। তেমন হলে সমস্ত পৃথিবীর আর্দ্রতাকে উপেক্ষা করে তিনি মরে যেতে পারতেন না।

সতেরো
চিঠিটা পড়ে আহির জিজ্ঞেস করল, কবে পেয়েছ এই চিঠি?- ভেজা চোখ আর ভেজা গাল মুছতে মুছতে আহির জিজ্ঞেস করল।
গতকাল। দুমাস ধরে পড়ে ছিল। বার বার ফোন দিয়েছে পত্রিকা থেকে। আমি যাইনি। তোমাদের ঐ পত্রিকায় যেতে আমার একদম ভালো লাগে না আর। কিন্তু মায়ের চিঠি বুঝতে পারলে ঠিকই যেতাম। বুঝতেই পারিনি । অনেক চিঠি তো আসে। খামের উপরে প্রেরকের জায়গায় শুধু পারুল লেখা ছিল। এই ইমেইল ফেসবুকের যুগেও কিছু কিছু চিঠি পাই আমি। ওরা ভেবেছিল কোনো পাঠকের চিঠি। আমিও তাইই ভেবেছিলাম।
বাড়ি যাবে কবে? আহির জিজ্ঞেস করল।
কালই যাব।
আচ্ছা, আমি যদি বাবাকে একটি চোখ দিই, তোমার আপত্তি আছে?
ধুর। কী বলো! তুমি কেন দেবে চোখ? আমিই দেবো। একটি চোখ তো। আর এক চোখে পৃথিবী দেখা যাবে।
তাই তো বলছি। এক চোখে আমিই দেখব পৃথিবী। তুমি আমাকে নিয়ে চলো। আমি চোখ দেবো একটি।
তুমি একদম ছেলেমানুষের মতো কথা বলছ। আমার বাবাকে তুমি কেন চোখ দেবে?
তোমার বাবা তো বলিনি আমি। আমি বলেছি, বাবাকে চোখ দেবো।
আমার মা এসব মেনে নেবেন না। তাকে আপাতদৃষ্টিতে যতটা স্বার্থপর মনে হয়, তিনি তার এক বিন্দুও না। তবে জেদি।
মাকে আমি দেখব।
আহির, আমি নিজেও চাই না এসব।
কিন্তু আমি চাই। তুমি যাচ্ছ কবে, বলো? আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। আহির কোমল হয়ে আসে।
আমি কাল যাব। সেটাই তোমাকে জানাতে এসেছিলাম। তুমি আমার সাথে যেতে পারো। কিন্তু চোখ দেবে- এসব পাগলামি কথাবার্তা বললে একদম না।
আমি তোমার সঙ্গে যাব। ব্যস!
...আহিরের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে টপ টপ করে। সে ওড়না দিয়ে চোখ মুছল। ভেজা গাল মুছল। তাও কেমন চিকমিক করছে এখন। বাইরে থেকে রোদ এসে পড়ছে গালে। আমি আলগোছে তার গালে হাতের উলটো পিঠ রাখলাম। বিশ্রিভাবে পুড়ে আছে অন্য পাশ।
আহির আমার হাত চেপে ধরল গালে। আমি বলি, তোমার বিয়ে না কাল? আত্মীয়স্বজন কেউ আসেনি?
আহির বলল, আমার আত্মীয়স্বজন নেই। তোমাকে কোনোদিন যে কথাটা বলা হয়নি, সেটা হলো তোমার মায়ের মতো আমাকেও ছোটবেলায় কুড়িয়ে পায় বাবা।
আমি চমকে উঠলাম।
আহির বলতে লাগল, আমাকে কখনো আলাদা করে দেখননি বাবা। কন্যাস্নেহে বড় করেছেন। আমি এজন্য জেনে-বুঝে কখনোই তার বিরুদ্ধে যাইনি। আজ যাব। তোমার বাবাকে একটি চোখ দিতে চাই আমি।
কাল তোমার বিয়ে।
মুকুল, আমি বিয়ে করছি না। আমি পালিয়ে যেতে চাই। তুমি আমায় নিয়ে চলো এখান থেকে।
কী বলছ তুমি? কাল তোমার বিয়ে। এখন এসব বলছ কেন?
আহির যেন আগের কথার খেই ধরেই বলতে লাগল, দেখেছই তো, আমার মুখ আর নিখুঁত নয়। যে পাশ পুড়ে গেছে সে পাশের একটা চোখও পুড়ে যেতে পারত। চোখটা বেঁচে গেছে। এই চোখটি আমি দিতে চাই। তুমি আমার পোড়া মুখের দিকে প্রথমবার যেভাবে তাকিয়েছিলে, একটি চোখ দেওয়ার পর নিশ্চয়ই তার থেকে ভয়ার্তভাবে তাকাবে না। হয়তো কোমলভাবেই তাকাবে তখন। আর ভয় নেই। তোমায় আমাকে বিয়ে করতে হবে—সে দাবি কোনোদিন করব না আমি। আমি নিখুঁতভাবে তোমার কাছে আসতে পেরেছি- এই তৃপ্তিই আমায় আরও একশ বছর অন্তত বাঁচিয়ে রাখবে। আমি শুধু বাবাকে একটি চোখ দিয়েই চলে যাব। তুমি প্লিজ না কোরো না। আমায় নিয়ে যাও এখান থেকে।
আমি আসলে কী বলব, বুঝতে পারছিলাম না। ফিসফিস করে বলি, তুমি পালিয়ে যেতে চাও কেন?
কেন? কারণ আমি জানি, আমাকে কে অ্যাসিড মেরেছে।
আমি হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকাই। তুমি জানো! কে?
যার সাথে কাল আমার বিয়ে।
মানে? আশফাক না কি যেন নাম, সে?
হ্যাঁ, সে-ই। সে করেছে, যাতে অন্য কোথাও আমার বিয়ে না হয়। যেদিন আংটি পরাতে এসেছিল, সেদিনই বুঝেছি।
আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। কীভাবে বুঝলে? কে বলল তোমায় এই কথা? এটা হতেই পারে না!
মুকুল, আগে বলেছি কি না, আমি তোমায় স্পষ্ট বুঝতে পারি। তোমাকে বলা হয়নি, আমি এই ছেলেটাকেও স্পষ্ট বুঝতে পারি। তার চোখ আমার কাছ থেকে কিছু লুকাতে পারে না। জেনেশুনে আমি এই ছেলেকে জীবনেও বিয়ে করব না। তোমার থেকে বেশি ভালোবাসলেও না। তুমি আজ নিয়ে চলো আমাকে। দুমিনিট টাইম দাও, আমি আসছি।

আমার মতামতের তোয়াক্কা না করে আহির চলে যায়। আমি বসে থাকি বারান্দায়। আচমকা চোখ চলে যায় পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ বাড়িটার দীর্ঘ সবুজ লনে। একটি হরিণ দৌড়ে বেড়াচ্ছে। দূর থেকে তার বাদামী শরীর ধূসর মনে হয়। হরিণটির দৌড়ে বেড়ানোটা কেমন যেন খাপছাড়া। মনে হলো, তার একটি চোখ অন্ধ। আমার মাথায় অতি পরিচিত দুটি লাইন খেলে যায়-
বাঁপাশে সমুদ্র আর ডানপাশে মরুভূমি, হায়!
একচক্ষু হরিণীরা তবু কেন মরে পিপাসায়?

হলুদ প্রজাপতি জোড়া উড়ে এসে আমার দুই কাঁধে বসে। আমি চমকে উঠি। আজকের পরেও কি তারা থাকবে বারান্দায়? কে জানে!
হরিণটা এলোমেলো ছুটছে এখনো। আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন আমার কাছেই গন্তব্য তার।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel