ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

গল্পের দৃষ্টিভঙ্গি, বয়ান নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছি: কাজুও ইশিগুরো

মাহামুদ হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৯ ৮:২০:১৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-০৯ ১২:০০:৪৭ পিএম

সাহিত্যে নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো। তার ভূমিকা সংবলিত এই সাক্ষাৎকার প্রথম প্রকাশিত হয় প্যারিস রিভিউ’য়ের, স্প্রিং ২০০৮ ইস্যু, ১৮৪ সংখ্যায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুজানাহ হানওয়েল। সাক্ষাৎকারটি প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করে প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর করেছেন মাহামুদ হাসান

এক ইংরেজ বাটলারের (খানসামা) নিখুঁত বয়ানে যে মানুষটি ‘দি রিমেইনস অফ দি ডে’ লিখেছেন, নিজে তিনি বিনয়ীদের একজন। লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রীনে নিজ বাড়িতে শুভেচ্ছা জানানোর পরপরই তিনি আমাকে চা-পানের প্রস্তাব দেন। যদিও দেয়ালের কাপবোর্ডে সাজানো তার পছন্দের কাপ-পিরিচ দেখে তাকে নিয়ম করে বিকাল ৪ টায় চা-পানকারীদের একজন বলে মনে হবে না। দ্বিতীয়বার আমি যখন সেখানে যাই, খাতির করে চা-পানের বিষয়টি তখন অনানুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। ধীরে ধীরে তিনি তার জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বলতে শুরু করেন। সে বর্ণনায় নিজের তরুণ সময়টার প্রতি সবসময় এক আমুদে সহনশীলতা বজায় থাকে। বিশেষ করে গিটার বাদকের যাযাবর জীবন, তখন কলেজের রচনাগুলোতে তিনি আগা-মাথা বিহীন বাক্যাংশগুলো ফুলস্টপ দিয়ে আলাদা করে লিখতেন। আফ্রিকা থেকে আগত বেশ রক্ষণশীল এক প্রভাষক ছাড়া বাকী অধ্যাপকরা এমনটা করতে উৎসাহিত করতেন- তিনি স্মরণ করেন। যদিও তিনি ছিলেন নিপাট ভদ্রলোক। তিনি বলতেন, ‘মিস্টার ইশিগুরো, তোমার রচনাশৈলীতে সমস্যা আছে। আর এগুলো যদি পরীক্ষার খাতায় লিখে আসো, সন্তোষজনকের নিচের গ্রেডটা দেয়া ছাড়া আমার কিছু করার থাকবে না।’

কাজুও ইশিগুরো ১৯৫৪ সালে জাপানের নাগাসাকিতে জন্মগ্রহণ করেন। তারপর পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সাথে ইংল্যান্ডের দক্ষিণে ছোট্ট শহর গিল্ডফোর্ড চলে আসেন। পরবর্তী ২৯ বছর তিনি জাপানে যাননি। জাপানিজ ভাষায় তার দক্ষতা ভয়ঙ্কর রকমের খারাপ বলে তিনি মনে করেন। ২৭ বছর বয়সে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ (১৯৮২) প্রকাশিত হয়, যা নাগাসাকি শহরের উপর লিখিত এবং প্রায় সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। দ্বিতীয় উপন্যাস, ‘অ্যান আর্টিষ্ট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’ (১৯৮৬), ব্রিটেনের সন্মানজনক হুইটব্রেড পুরস্কার পায়। আর তার তৃতীয় উপন্যাস, ‘দি রিমেইনস অফ দি ডে’ (১৯৮৯), বিশ্ব সাহিত্য দরবারে তার স্বীকৃতি নিশ্চিত করে। দশ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়, বুকার প্রাইজ জিতে নেয় এবং মার্চেন্ট আইভরি প্রডাকশনের ব্যানারে অ্যান্থনি হপকিন্স অভিনীত একটি চলচ্চিত্রে রূপ নেয়। ছবির চিত্রনাট্য লেখেন রুথ প্রওবার জাবালা। হ্যারল্ড পিন্টারের করা একটি চিত্রনাট্য আনেক আগেই করা ছিল। কিন্তু ইশিগুরো বলেন, সেখানে অনেক কিছু বাদ দেয়া হয়েছিল। ইশিগুরোকে ‘অফিসার অব দ্য অর্ডার অব দি ব্রিটিশ এম্পায়ার’ খেতাবে ভূষিত করা হয়, এবং সে কারণে ১০ নাম্বার ডাউনিং স্ট্রীটে কিছুদিনের জন্য তার ছবি টাঙানো হয়েছিল। পরবর্তী উপন্যাসে, ‘আনকসোলড’ (১৯৯৫), তিনি পাঠকদের চমকে দেন। যেখানে পাঁচশ’র বেশি পৃষ্ঠাজুড়ে তিনি নদীর প্রবাহের মতো করে চেতনার কথা বলেন। আর তাতে হতবুদ্ধি হয়ে অনেক সমালোচক এর কড়া সমালোচনা করেন; জেমস উড লেখেন: ‘ফালতু কাজের আলাদা একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে’। কিন্তু অন্যরা এটাকে স্বাগত জানান; অনিতা ব্রুকার তার প্রাথমিক ঘোর কেটে ওঠার পর এটাকে মাস্টারপিসের কাছাকাছি কিছু একটা বলে রায় দেন। আরো দুটো প্রসিদ্ধ উপন্যাস, ‘হোয়েন উই অয়্যার অরফানস’ (২০০০), এবং ‘নেভার লেট মি গো’ (২০০৫), ছাড়াও ইশিগুরো চিত্রনাট্য, টেলিভিশন প্লে, এবং গানও লিখেছেন। সম্প্রতি তিনি খ্যাতিমান অ্যামেরিকান জ্যাজ গায়িকা স্টেসি কেন্টের জন্য গান লিখেছেন। স্টেসির সাথে করা তার গানের সিডি ‘ব্রেকফাস্ট অন দি মর্নিং ট্রাম’ ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত জ্যাজ অ্যালবাম হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

চমৎকার সুসজ্জিত যে বাড়িটিতে ইশিগুরো তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে, নাওমি এবং স্ত্রী লরনার, যিনি সাবেক সমাজসেবী; সাথে বসবাস করেন, সেখানে ঝকঝকে ৩টা ইলেক্ট্রিক গিটার এবং অত্যাধুনিক একটি মিউজিক সিস্টেম আছে। উপরতলার ছোট্ট যে অফিসটাতে তিনি লেখালেখি করেন সেটি তার নিজের চাহিদামাফিক সাজানো; মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উজ্জ্বল কাঠ বিছানো, নানা রঙের কোড ব্যবহার করে তৈরি করা এবং নিপুণ করে সাজানো চৌকোণ বাক্স। যার একটাতে তার উপন্যাসগুলোর পোলিশ, ইতালিয়ান, মালয়েশিয়ান অনুবাদ। অন্যগুলোতে গবেষণার জন্য বিভিন্ন বই, যেমন টনি জুডের ‘এ হিস্টোরি অফ ইয়োরোপ সিনস’ ১৯৪৫, এবং এডিস্টোন সি. নেবেলের ‘ম্যানেজিং হোটেলস ইফেক্টিভলি’।

সুজানাহ: শুরু থেকেই আপনার ফিকশনগুলো দারুণ সফলতা পেয়েছে কিন্তু আপনার তরুণ বয়সের এমন কোনো লেখা কী আছে যা প্রকাশিত হয়নি?

ইশিগুরো: বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে যখন পশ্চিম লন্ডনের হোমলেস মানুষদের সাথে কাজ করছিলাম, তখন আমি রেডিওর জন্য আধা ঘণ্টার একটি নাটক লিখে বিবিসি’তে পাঠিয়েছিলাম। সেটা বাতিল হয়েছিল, কিন্তু আমি উৎসাহ ব্যঞ্জক উত্তর পেয়েছিলাম। ব্যাপরটা বিস্বাদ, কিন্তু সেটা ছিল তরুণ বয়সের প্রথম লেখা, যা মানুষকে দেখাতে মোটেও লজ্জাবোধ করি না। এর নাম ছিল ‘পোটাটোস অ্যান্ড লাভারস’। যখন পাণ্ডুলিপি জমা দেই তখন পোটাটোস বানান ভুল করে লিখেছিলাম (potatos)। এটা ছিল ফিস-অ্যান্ড-চিপস ক্যাফেতে কাজ করা দুজন তরুণকে নিয়ে। দুজনেই অস্বাভাবিক রকমের ট্যারা এবং তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে। কিন্তু কিছুতেই স্বীকার করে না যে তারা ট্যারা। এমনকি তারা এটা নিয়ে কথাও বলে না। গল্পের শেষে তারা বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্ণনাকারীর আজব এক স্বপ্ন দেখার মাধ্যমে গল্পটি শেষ হয় যেখানে সে সমুদ্রপাড়ের বাঁধ ধরে একটা পরিবারকে তার দিকে হেঁটে আসতে দেখে। পরিবারটির বাবা-মা ট্যারা, বাচ্চারা ট্যারা এবং কুকুরটিও ট্যারা। এই স্বপ্ন দেখে সে বলে, ‘ঠিক আছে, আমরা বিয়ে করছি না।’

সুজানাহ: কী মনে করে আপনি সেই গল্পটি লিখেছিলেন?

ইশিগুরো: এটা সেই সময়ের কথা যখন আমার কর্মজীবন কী হবে সেসব নিয়ে আমি ভাবছিলাম। সঙ্গীতজগতে আমি কিছু করতে পারিনি। এজেন্ট এবং রেকর্ডিংয়ের অনেকের সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। দুই সেকেন্ডের মাথায় তারা বলতো, ‘ভাই, তোমার দ্বারা এটা হবে না’। তাই আমি রেডিও নাটকের দিকে চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

তারপর প্রায় হঠাৎ করে একদিন ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়াতে ম্যালকম ব্র্যাডবারির তত্বাবধানে সৃজনশীল লেখালেখির উপর এম.এ. ডিগ্রীর একটা বিজ্ঞাপন দেখালাম। এখন এটি একটি বিখ্যাত কোর্স। কিন্তু তখনকার দিনে সৃজনশীল লেখালেখির কোর্স বিষয়টাই ছিল একটা হাসির খোরাক। অ্যামেরিকায় এসব উদ্ভট কাজ-কারবার হয়। আরো আবিষ্কার করলাম যে, খুবই অল্পসংখ্যাক আবেদন পরার কারণে গত বছর এই কোর্সটা বন্ধ ছিল! কেউ একজন আমাকে বলেছিল যে, ইয়ান ম্যাকইওয়ান, যাকে আমার কাছে সে-সময়ের তরুণ লেখকদের মধ্যে অন্যতম মনে হতো, বছর দশেক আগে সে এই কোর্সটি করেছিল। কিন্তু সরকারি অনুদানে এক বছর ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারা, এবং বছর শেষে মাত্র ৩০ পৃষ্ঠার একটা গল্প জমা দেয়ার বিষয়টা ছিল আমার কাছে প্রধান আকর্ষণের বস্তু। আর তাই আমার আবেদনপত্রের সাথে আমি রেডিও প্লেটা ম্যালকম ব্র্যাডবারির কাছে পাঠিয়েছিলাম। সুযোগ পাওয়ায় আমি কিছুটা পিছুটান দিয়েছিলাম কারণ হঠাৎ করে বিষয়টা সত্যে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম ওখানকার লেখকরা আমার কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে আর সেটা বেশ অপমানজনক হতে যাচ্ছে। কর্নওয়াল থেকে বেশ দূরে একটা কটেজ ভাড়া পাওয়ার ব্যাপারে একজন বলেছিল আমাকে যা কিনা পূর্বে মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতো। তাদের ফোন করে বললাম যে, আমার এক মাসের জন্য একটা থাকার জায়গা দরকার কারণ আমি লেখালেখি শিখতে চাই। ১৯৭৯ সালের সেই গ্রীষ্মে আমি এসবই করেছিলাম। সেবারই প্রথম আমি ছোটগল্পের গঠন-কাঠামো নিয়ে ভেবেছিলাম। গল্পের দৃষ্টিভঙ্গি, কীভাবে গল্পটা বয়ান করা যায়, ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছি। শেষে দেখানোর মতো দুটো গল্প দাঁড় করাতে পেরেছিলাম যা আমাকে আরো ভরসা দিয়েছিল।

সুজানাহ: ইস্ট অ্যাংলিয়াতে থাকার বছরটাতেই কি আপনি প্রথম জাপান নিয়ে লেখেন?

ইশিগুরো: হ্যাঁ। তখন আমি আবিষ্কার করলাম যে, বর্তমান চারপাশ থেকে দূরে গেলে আমার কল্পনাগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। যখন কোনো গল্প শুরু করার চেষ্টা করতাম: ‘ক্যামডেন শহরের টিউব স্টেশন থেকে বের হয়ে আমি ম্যাকডোনাল্ডসে ঢুকলাম, আর সেখানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু হ্যারিকে পেয়ে গেলাম,’ -এরপর লেখার মতো আর কিছু খুঁজে পেতাম না। অপরদিকে আমি যখন জাপান নিয়ে লিখে ফেললাম, তখন মনে হলো যেন কোনো বন্ধ তালা খুলে গেল। ক্লাসে একটা গল্প উপস্থাপন করেছিলাম যার কেন্দ্র নাগাসাকি শহর, ঠিক বোমা পরার সময়টাতে; আর এক তরুণীর চোখ দিয়ে সে ঘটনা দেখার চেষ্টা ছিল। গল্পটার জন্য আমার সহপাঠীদের কাছ থেকে ব্যাপক উৎসাহ পেয়েছিলাম। তারা সবাই বলেছিল, জাপানের বিষয়গুলো বেশ উত্তেজনাকর, এবং তুমি ভিন্ন ভিন্ন জায়গা দেখছো। তারপর ফাবের’র কাছ থেকে চিঠি পেলাম। তাতে লেখা ছিল যে, তাদের ইন্ট্রোডাকটরি সিরিজের জন্য আমার তিনটা গল্প বাছাই করেছে, আর এই সিরিজটার বেশ সুনামও ছিল। আমি এটাও জানতাম যে, টম স্টপার্ড এবং টেড হিউজেসকে মানুষ এভাবেই চিনেছিল।

সুজানাহ: এটা কি সেই সময় যখন আপনি ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ লেখা শুরু করেছিলেন?

ইশিগুরো: হ্যাঁ। আর ফাবের’র রবার্ট ম্যাকক্রাম আমাকে আমার জীবনের প্রথম অগ্রিম টাকা দিয়েছিল যাতে করে আমি ওটা শেষ করতে পারি। করনিশ শহরকে কেন্দ্র করে আমি একটা গল্প লিখতে শুরু করেছিলাম। সেটা ছিল এক তরুণী ও তার অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে। সেই তরুণীটির ছিল আবার এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীত। মনে মনে আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, এই মেয়েটি দুটো দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যাবে। এক, বাচ্চাটির প্রতি আমি আমার সমস্ত মনোযোগ দেব; আর দুই, আমি এই মানুষটির প্রেমে পড়েছি, আর বাচ্চাটা একটা ঝামেলা। হোমলেস মানুষদের সাথে কাজ করার সময় আমি এরকম অনেক মানুষের দেখা পেয়েছি। কিন্তু ক্লাসমেটদের কাছ থেকে যখন জাপানিজ ছোট গল্পগুলোর বিষয়ে অভাবনীয় সাড়া পেলাম, তখন কর্নওয়ালকে কেন্দ্র করে লেখা গল্পটি নিয়ে আবার ভাবলাম। আর আমি বুঝতে পারলাম যে, এই গল্পটাকে যদি জাপানের প্রেক্ষাপট থেকে বলি তাহলে গল্পের সকল সংকীর্ণতাগুলো কেটে যাবে এবং ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিধ্বনিত হবে।

সুজানাহ: পাঁচ বছর বয়স থেকে আপনি আর জাপানে যাননি, কিন্তু আপনার বাবা-মা কি অন্য জাপানিজদের মতোই ছিল?

ইশিগুরো: আমার মা তাঁর সময়ের অন্যদের মতোই একজন জাপানিজ মহিলা ছিলেন। তাঁর কিছু কিছু বিশেষ ব্যাপার ছিল- আজকের দিনের মাপে যাকে প্রি-ফেমিনিস্ট বলা যায়। পুরনো দিনের জাপানিজ সিনেমা দেখার সময় অনেক মহিলাকে দেখতে পাই যারা একদম আমার মায়ের মতো কথা বলছে বা আচরণ করছে। ঐতিহ্যগতভাবে জাপানিজ মহিলারা পুরুষদের জন্য জাপানিজ ভাষার আলাদা এক ধরনের সাধু রূপ ব্যবহার করতেন যা আজকাল আর তেমন একটা দেখতে পাওয়া যায় না। আশির দশকে আমার মা যখন জাপানে বেড়াতে যেতেন, ফিরে এসে তিনি বলতেন যে, জাপানিজ তরুণীদের পুরুষদের ভাষায় কথা বলতে দেখে তিনি অবাক হয়েছেন।

নাগাসাকিতে যখন পারমাণবিক বোমা পরেছিল আমার মা তখন সেখানে ছিলেন। কৈশোর পেরোনোর কাছাকাছি ছিল তাঁর বয়স। তাঁর বাড়িটি বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং কেবল বৃষ্টি হওয়ার পর তারা ধ্বংসের মাত্রা বুঝতে পেরেছিল। ছাদের সব জায়গা থেকে পানি পড়ছিল, যেন কোনো টর্নেডো বয়ে গেছে ওটার ওপর দিয়ে। বাবা-মা আর চার ভাইবোনের মধ্যে বোমার কারণে আমার মা শুধু আহত হয়েছিল। ধ্বংসযজ্ঞের কিছু একটা উড়ে এসে তাকে আঘাত করে। তিনি যখন বাড়িতে থেকে সুস্থ হবার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁর পরিবারের সবাই শহরের অন্য জায়গাগুলোতে মানুষকে সাহায্য করতে বেরিয়েছিল। কিন্তু তিনি বলেন, যুদ্ধের কথা ভাবলে পারমাণবিক বোমা তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর মনে হয়নি। তিনি যে কারখানায় কাজ করতেন বিমানের বোমা বর্ষণ থেকে বাঁচতে সেখানকার বাঙ্কারে আশ্রয়ের দিনগুলির কথা মনে করেন। অন্ধকারে তাঁরা সবাই লাইন হয়ে থাকতো আর ঠিক তাদের মাথার উপর বোমাগুলো পড়ত। তাঁরা ভাবতো যে তাঁরা মরতে যাচ্ছে।

আমার বাবা মোটেও অন্য জাপানিজদের মতো ছিলেন না। কারণ তিনি সাংহাইতে বড় হয়েছেন। চাইনিজদের একটা বৈশিষ্ট তাঁর মধ্যে ছিলো। তা হলো, খারাপ কিছু ঘটলে তিনি হাসতেন।

সুজানাহ: আপনার পরিবার ইংল্যান্ডে কেন এলো?

ইশিগুরো: শুরুতে এটা ছোট্ট একটা ভ্রমণের মতো হওয়ার কথা ছিল। আমার বাবা ছিলেন একজন সমুদ্রবিদ। ব্রিটিশ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ওসেনোগ্রাফির প্রধান ঝড়-তরঙ্গের গতি প্রকৃতি বিষয়ক তাঁর আবিষ্কার বিষয়ে কাজ করার জন্য আমার বাবাকে আমন্ত্রণ জানান। আমি আসলে কখনো বিষয়টা বুঝতে পারিনি। স্নায়ু-যুদ্ধের সময় ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ওসেনোগ্রাফি গড়ে তোলা হয়, এবং এর গোপনীয়তা নিয়ে বাতাসে গুঞ্জনও ছিলো। আমার বাবা বন-জঙ্গলের ভিতর সেই অফিসে কাজ করতে যেতেন। মাত্র একবার আমি সেখানে গিয়েছিলাম।

সুজানাহ: জাপান থেকে ইংল্যান্ডে যাওয়ার বিষয়ে আপনার অনুভুতি কেমন ছিল?

ইশিগুরো: আমার মনে হয় না যে আমি এই চলে যাওয়ার কার্যকারিতা সম্পর্কে কিছু বুঝি। নাগাসাকির একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে দাদুর সাথে আমি চমৎকার একটা খেলনা কিনতে গিয়েছিলাম -একটা মুরগির ছবি এবং সাথে বন্দুক আছে, আর আপনি মুরগিটাকে গুলি করছেন। ঠিক জায়গায় নিশানা লাগাতে পারলে একটা ডিম বের হয়ে আসবে। কিন্তু আমাকে সেই খেলনাটা কিনে দেয়া হয়নি। আর আমি সেটা নিয়েই বেশি হতাশ ছিলাম। বিওএসি জেটে চড়ে সেটা ছিল তিন দিনের ভ্রমণ। জ্বালানি নেবার জন্য প্লেনটা যখন থামছিল, একটা চেয়ারে আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম। আর তখন মানুষগুলো আঙুরফল নিয়ে এসে আমাকে জাগিয়ে তুলেছিল। তারপর উনিশ বছরে পা দেয়ার আগে আমার আর প্লেনে চড়া হয়নি।

ইংল্যান্ডে আমি কখনো অসুখী ছিলাম বলে মনে পড়ে না। তখন যদি আমি বড় হতাম, তাহলে হয়তো বিষয়টা বেশি কষ্টকর হতো। তাছাড়া যদিও আমি তার আগে ইংরেজি শিখিনি, তারপরও ভাষা নিয়েও খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি আমাকে। ‘কাউবয়’ সিনেমা আর টিভি সিরিয়ালগুলো ছিলো আমার সবচেয়ে পছন্দের। আর আমি সেখান থেকেও কিছু ইংরেজি শিখেছি। রবার্ট ফুলার এবং জন স্মিথের সাথে ল্যারামি ছিল আমার পছন্দের তালিকার শীর্ষে। ‘দি লোন রেঞ্জার’ দেখতাম, যেটা জাপানের খ্যাতি পেয়েছিলো। কাউবয়গুলোকে আমি আদর্শ ভাবতাম। তারা ইয়েস বলার বদলে বলতো- শিওর। আর আমার শিক্ষক বলতো, কাজুও, শিওর বলতে তুমি কি বোঝ? লোন রেঞ্জার আর কোরিমাস্টার আলাদাভাবে কথা বলতো, আর আমাকে সেটা বুঝতে হয়েছে।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel