ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মিসির আলির ছায়া

এনামুল রেজা : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-১১ ৫:৩৪:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-১৪ ২:২১:৩৬ পিএম
ছবি: মাসুদ আকন্দ

এনামুল রেজা: বাংলা সাহিত্যে রহস্য উপন্যাসের যে প্রতিষ্ঠিত ধারা, তাকে হালকা চালের ক্রাইম ফিকশন গোত্রে ফেলা যেতে পারে। বাঙালি পাঠকের কাছে খুব জনপ্রিয় দুই চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সী এবং ফেলুদাকে বিশ্লেষণ করলে তেমনটাই অনুমান হয়। দুজনের মাঝে প্রাথমিকভাবে শার্লক হোমসের অনুপ্রেরণা থাকলেও যার যার স্বদেশীয়ানা আর কুশলতায় তারা বিশ্বসাহিত্যে নিজেদের মৌলিক আসন দাবি করার যোগ্য। মূলত ফেলু মিত্তির বা সত্যান্বেষী কেউই সরকারি চাকরিজীবি গোয়েন্দা না, রহস্য সাহিত্যের ট্রেডিশন মেনেই এরা হলেন প্রাইভেট আই। তারা ঘটনা ঘটার পর অকুস্থলে পৌঁছান কিংবা কেউ তাদের কাছে এসে কেস সঁপে যান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব কেসের সমাধান হয় ‘হু ডান ইট’ সূত্র মেনে, অর্থাৎ অপরাধটা কে করেছে, তাকে খুঁজে বের করার মধ্য দিয়ে। যদিও তুলনামূলকভাবে ব্যোমকেশের কাহিনিগুলো প্রাপ্তমনস্কের, কিছু গল্প-উপন্যাসে মানব চরিত্রের অন্ধকার দিকগুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা আছে, সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্য আছে, থাকার কথাও; ব্যোমকেশের সময়টা তুলনামূলক রাজনৈতিক সংঘাতে পরিপূর্ণ যেহেতু তার শুরু দেশভাগের পূর্বকালে। সে তুলনায় ফেলুদা আরও আধুনিক, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, রহস্য সাহিত্যের এস্কেপিজম তার মাঝে ষোলো আনা বিদ্যমান।

এদের আগে পরে আরও রহস্য উপন্যাস লেখা হয়েছে বাংলায়। ঐতিহ্যের বাইরে কাউকেই যেতে দেখা যায়নি। বরং ধীরে ধীরে সাহিত্যের এ ধারা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মতো এদেশেও ঝুঁকেছে অ্যাকশনের দিকে, যেখানে মগজের খেলার চেয়ে প্রাধান্য পায় পেশিশক্তি, মারমার কাটকাট। পূর্ববাংলায় এক্ষেত্রে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল দ্বিতীয় ধারাটি। ষাটের দশকে মাসুদ রানা তুমুল জনপ্রিয়তা পায় পাঠকের কাছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও বাংলাদেশে মূল ধারার কোনো লেখক রহস্য উপন্যাসের দিকে আর ঝোঁকেন নি। সুতরাং মাসুদ রানার জনপ্রিয়তা অব্যাহত থাকে। ব্রিটিশ স্পাই জেমস বন্ডকে আদর্শ ধরে সৃষ্ট এ চরিত্রটি দিন দিন হয়ে ওঠে বিদেশী কাহিনির সরল এডাপ্টেশন।

মিসির আলিকে নিয়ে আলাপের পূর্বে এই কথাগুলো বলে নেয়া গেল নিজের যুক্তিগুলোর ভারসাম্য দিতে। যেহেতু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রটি একজন মনোবিদের ছদ্মবেশে রহস্য উপন্যাসেরই নায়ক। বেশভূষায় বড় সাধারণ হয়েও পাঠকের চোখে দারুণ স্মার্ট এক মধ্যবয়সি ভদ্রলোক। তার সফলতা ও খুঁতগুলো কোথায় কোথায়?

প্রথমত মিসির আলিকে প্রাইভেট আই কিংবা সরকারি গোয়েন্দা কোনোভাবেই পরিচয় করে দেয়া হয় না পাঠকের সামনে। পেশা জীবনে তিনি শিক্ষক। মনোবিদ্যা পড়ান, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান তা অবশ্য জানার উপায় নেই। নির্ঝঞ্ঝাট নিরুপদ্রব জীবন কাটাতে ভালোবাসেন। যদিও তার এই যাপনের সংবাদ আমরা পাই পরের দিকের কাহিনিগুলোয়। আশির দশকের মাঝামাঝি, মোটামুটি ভৌতিক একটা উপন্যাসে (দেবী) একজন সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। এবং তিনি পেশেন্টের ভূতুড়ে সংকটের চমৎকার সমাধান দেন। এই শুরুর ধারাটা পরবর্তীকালে খুব অল্পই ভেঙেছে। মূলত কিছু মনস্তাত্ত্বিক সংকটের আগমন, তার সংক্ষিপ্ত ও চমকপ্রদ বিশ্লেষণ, অতঃপর সমাধান- সরলাঙ্কে এভাবেই রচিত হয়েছে মিসির আলির বইগুলো।

চরিত্রটির জন্ম প্রক্রিয়া সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ কিছুটা আমাদের জানিয়েছিলেন। সে জানানোটা এরকম: ‘কল্পনার বকুলগন্ধী তরুণী পাশে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছি এমন সময় এক কাণ্ড কানে এলো ডিম ভাজার শব্দ। প্রতিটি রুম তালাবদ্ধ। বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। এর মধ্যে একটা ঘরের মধ্যে ডিম ভাজা হচ্ছে, এর অর্থ কী?... যে রুম থেকে ডিম ভাজার শব্দ আসছে আমি তার সামনে দাঁড়ালাম। চামচের টুংটাং শব্দ। পায়ে হাঁটার শব্দ। আমি দরজায় টোকা দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সব শব্দের অবসান। কিছু রহস্য অবশ্যই আছে। রহস্যটা কী? আমি নিজের ঘরে ফিরে গেলাম। রহস্যের কিনারা করতে হবে। (পাঠক মিসির আলির জন্মলগ্ন।) রহস্য সমাধান করলাম। এখন সমাধানের ধাপগুলো বলি-

ওই ঘরে একজন বাস করে। তাকে লুকিয়ে রাখতে হয় বলেই বাইরে থেকে তালা দেওয়া।

সে ঘরেই খাওয়া-দাওয়া করে। ডিম ভাজার শব্দ তার প্রমাণ।

সে বেশ কিছুদিন ধরেই ওই ঘরে আছে। ঘণ্টা দুয়েকের জন্য বাস করলে ডিম ভেজে খেত না।

চামচের টুং টাং শব্দ থেকে মনে হয় সে একজন মেয়ে। মেয়েদের চামচের শব্দের ভঙ্গি আলাদা। পুরুষ জোরে শব্দ করে।

তাকে কেউ আঁটকে রাখেনি। আমি দরজায় টোকা দিয়েছি, সে চুপ করে গেছে। বন্দি কেউ হলে নিজেকে ঘোষণা করত।’ (মাতাল হাওয়া)

লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এ চরিত্রের জন্ম, লেখকের জবানীতেই তা জানা যায়। এবং উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, প্রতিষ্ঠিত রহস্য উপন্যাসের যে ঐতিহ্য, তার থেকে মিসির আলি ভিন্ন ধরণের। তার কাছে আসা সমস্যাগুলো হত্যা, ডাকাতি কিংবা হুমকি- এ ধরণের নয়। যেন এক মনঃচিকিৎসকের কেস স্টাডিগুলোর ধারাবাহিক বর্ণনা। তার হাতে আসা সাধারণ সব মানুষের অদ্ভুতুড়ে মানসিক সংকটগুলো কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে, সেসবের ক্রনিকলস। এ সমস্ত কারণে আবির্ভাব থেকেই মিসির আলির অবস্থান মৌলিক ও বিচ্ছিন্ন।

কমবেশি উনিশটির মতো উপন্যাস ও একটি গল্পের বইয়ে মিসির আলির দেখা পাই আমরা। এসব বই, উপন্যাস হয়ে উঠেছে কিনা সে বিষয়ে সংশয় আছে কি? আছে অথবা নেই। আসুন আমরা কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের আখ্যানে না গিয়ে সামগ্রিকভাবে তার কেস স্টাডিগুলোর দিকে তাকাই, তার কার্যক্রম ও চরিত্র বিশ্লেষণের চেষ্টা করি।

মানুষ হিসেবে মিসির আলি দারুণ যুক্তিবাদি। এ কারণেই তার সঙ্গে ঘটতে থাকা ঘটনাগুলোয় প্রাথমিকভাবে কোনো যুক্তি থাকে না। তার কাছে যে সমস্ত মানুষ সমস্যা নিয়ে আসে, তাদের মোটাদাগে নিচের শ্রেণীগুলোতে ভাগ করা যায়: সিজোফ্রেনিক রোগী, যৌন বিকারগ্রস্থ ব্যক্তি, অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে থাকা লোকজন যারা ঘন ঘন দুঃস্বপ্ন দেখে, সংসার জীবনে অসুখী দম্পতি, অটিস্টিক শিশু বা অটিজম নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রাপ্তবয়স্ক, ভালো মানুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো কোনো ভয়ানক অপরাধী।

প্রথমে যে সব সমস্যা ভূতুড়ে বা সমাধানের অযোগ্য মনে হয়, দেখা যায় মিসির আলি পরপর কিছু পর্যবেক্ষণ আর টুলসের সহায়তায় সেসবের মিমাংসা করে ফেলছেন। টুলসগুলো কী? মূলত তার কাছে উপস্থাপিত তথ্যগুলোর অসংগতিই সমাধানের প্রধানতম চাবি। তার কাছে ভুক্তভোগি যে সাক্ষাতকার দিচ্ছে, চিঠি লিখছে কিংবা গল্প করছে, সেসব বিশ্লেষণ করেই মিসির আলি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। তাহলে কি ভিক্টিমের সঙ্গে আক্রান্ত পরিবার বা স্থান দর্শনে তিনি যান না? ঘরে বসেই সব কিছুর সমাধান করেন? কিছু কিছু বইয়ে আমরা দেখেছি, মিসির আলি ব্যক্তিগতভাবে ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন, তার জীবন সংশয় দেখা দিয়েছে। এ ধরণের কাহিনিগুলোতে দেখা যায় চরিত্রটির বুদ্ধিমত্তা চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন কোনো এন্টি চরিত্রের আবির্ভাব ঘটিয়েছেন লেখক। অর্থাৎ প্রথাগত রহস্য কাহিনির উপাদান এসব বইতে মিলেছে এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী জয় হয় নায়কেরই।   

যদিও নায়োকোচিত কোনো কিছুই মিসির আলির চরিত্রে মেলে না। অনুমান করা যায় তার বয়স পঞ্চাশের উপরে। অবিবাহিত। একা বসবাস করেন, পরিবারের কোনো সদস্যের কথা জানা যায় না। সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে তার দেশে ও বিদেশে খ্যাতির বিবরণ মেলে। বিখ্যাত লোক হিসেবেই দেখা যায় অনেকে তার সঙ্গে দেখা করতে এসে নানা ধরণের সমাধানের অতীত এমন রহস্যময় ঘটনা বলেন।

বইগুলোর প্লট মূল ঘটনার উপরে এক সময় এতটাই ফোকাসড হয়ে যায় (বিষয়টিকে আমি লেখকের এক ধরণের সফল কৌশলই বলব) চরিত্রগুলো জমে না ওঠা সত্ত্বেও পাঠক তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠেন, এবং যথারীতি তৃষ্ণা নিবারণে সিদ্ধহস্ত হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলিকে ব্যর্থ করেন না। কিন্তু এই আচমকা সমাধান বা যে কোনো সংকট আরও ঘনিভূত না হয়ে প্রতিটি বইয়ে সমাধানের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যে যায়, উপন্যাস হয়ে উঠবার ক্ষেত্রে এই শেষের দিকে ঝুঁকবার প্রবণতাই আখ্যানগুলোকে বাধা দেয়।

রহস্য সাহিত্যের বিবেচনায় মিসির আলির রহস্যগুলোকে ‘হু ডান ইট’ বা ‘হোয়াই ডান ইট’ কোনো গোত্রেই সরাসরি ফেলা যায় না। এগুলোকে বরং মানব চরিত্রের অজানা দিকগুলো (যা আপাত দৃষ্টিতে রহস্যময়) অনুসন্ধানের একটা প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে।  বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে গোটা ব্যাপারটাই ছিল নতুন যখন মিসির আলির আবির্ভাব হয়। কিন্তু যে সম্ভাবনা নিয়ে চরিত্রটির যাত্রা, পরবর্তীকালে তা খুব বিকশিত হয়েছে বলা যাচ্ছে না। কেননা একই ফর্মুলার ব্যবহার পরবর্তীকালের বইগুলোকে করে ফেলেছিল প্রেডিক্টেবল। চরিত্রটি জনপ্রিয় হয়ে যাবার পর সেটা নিয়ে যে ফের নতুন করে ভাবা যেতে পারে, সে সম্ভাবনা আর জাগিয়ে তোলেননি হুমায়ূন।

কতটা সম্ভাবনাময়, তার ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যেতে পারে ‘বৃহন্নলা’ নামের একটা বড় গল্প থেকে।  যেখানে এক সাধু ধরণের চিরকুমার লেখককে শোনান নিজের জীবনের এক অব্যাখ্যাত গল্প। লোকটি নাস্তিক ধরণের এবং ভূতপ্রেতে তার বিশ্বাস নেই। একটি মৃত কিশোরী তাকে এক ভূতুড়ে রাতে একপাল পাগলা কুকুরের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। লেখক যখন শহরে ফিরে মিসির আলিকে এই গল্প করেন, নিশানাথ নামক ঐ লোকটি, যে মোটামুটি সন্তরূপে পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে (লক্ষ্য করুণ, এই গল্পে চরিত্র নির্মাণ হয়েছে নিখুঁত), মিসির আলির ব্যাখ্যায় সেই নিশানাথই হয়ে ওঠেন এক ভয়ংকর অপরাধী, তার ব্যাখ্যা এতই অসাধারণ যে মিসির আলিকে বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না। আবার নিশানাথের সম্পর্কে বর্তমান ধারণা মেনে নিতে পাঠক দোটানায় ভোগেন!

চরিত্র হিসেবে মিসির আলির সবচেয়ে বড় সফলতা আমাদের নিত্য যাপিত জীবনের নানান মানসিক সংকট নিয়ে ভাবনার উস্কানী মেলে সেখান থেকে। আবার ঐ একই যায়গায় দাঁড়িয়ে জাদুমন্ত্রের মতো সকল সমস্যার সমাধান করে ফেলাটা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে চরিত্রটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
সফলতা ও ত্রুটি মিলিয়েই বাংলা সাহিত্যে এখন পর্যন্ত মিসির আলি অদ্বিতীয়। বাঙালি পাঠকের বারান্দায় সন্ধ্যার আলো আঁধারে কিংবা গভীর রাতে নির্জন ড্রয়িংরুমে তার কায়া ছায়াবিস্তারি।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ নভেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel