ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা এবং মুরাকামির গল্পপাঠ

মোজাফ্‌ফর হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-১৭ ৮:৩১:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-১৭ ৮:৩৪:১০ পিএম

মোজাফ্‌ফর হোসেন
পরাবাস্তববাদ হলো সংগঠিত শিল্প-আন্দোলন (Art-Movement)। এটি শুরুতে চিত্রকলা হয়ে অনন্যা শিল্পমাধ্যমে প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে আলোচনায় আসে। ফর্মাল মুভমেন্ট হিসেবে ১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর দিকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরাবাস্তববাদে চেতন (conscious) এবং অবচেতনের (subconscious) একটা বন্ধন গড়ে ওঠে। অন্যকথায়, স্বপ্নের সঙ্গে জাগতিক বিষয় যুক্ত হয়ে স্বপ্নবাস্তবতার সৃষ্টি করে। ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব থেকে জানা যায়- মানুষের মনের সিংহভাগই থাকে অবচেতনের দখলে। মনের অবচেতন-ভাগ মানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেখান থেকে নানা ভাবনা মানুষের চেতনার জগতে চলে আসে। বিষয়টা ভীষণভাবে ব্যক্তিগত। কিন্তু জাদুবাস্তবতার বিষয়টি যতটা না ব্যক্তিমুখী তার চেয়ে বেশি সমাজমুখী। জাদুবাস্তবতায় বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি তৈরি করে তার ভেতর জাদু-উপকরণের (magical elements) প্রবেশ ঘটানো হয়। এই দুয়ের সম্মিলন ঘটানোর উদ্দেশ্য হলো বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধীতে আনা।

পরাবাস্তব এবং জাদুবাস্তব উভয় ক্ষেত্রে জাদু ও বাস্তবতার মিশেল থাকে। কিন্তু পার্থক্য হলো, একটা জগত আমাদের মনের ভেতর তৈরি হয়, অন্যটা তৈরি হয় আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলে। জাদুবাস্তবতায় আমাদের চারপাশের চেনাজানা জগতে হঠাৎ করেই অচেনা বা কল্পলোকের কোনো বিষয় উপস্থাপন করা হয়। বলার স্বর (tone) থাকে খুবই স্বাভাবিক, যেন সত্যিই এমনটা ঘটছে, যেন এমনটি ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পাঠক তাতে আশ্চর্য হলেও গল্পের চরিত্ররা আশ্চর্য হয় না। কারণ, এখানে সবকিছুই সম্ভব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্যারিস রিভিউয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাতিন জাদুবাস্তবতার অন্যতম ওস্তাদ গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর লেখনী-রহস্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন: যখন আপনি বলবেন, হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, ৪২৫টি হাতি আকাশে উড়ছে। লোকজন আপনাকে বিশ্বাস করলেও করতে পারে।

অর্থাৎ মার্কেস যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন সেটা হয়ত, অবাস্তব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার ভেতর চলে যেতে হবে। পাঠক তখন ধরে নেবেন বিষয়টি সত্যিই ঘটছে বা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে মার্কেসের ‘অ্যা ভেরি ওল্ড ম্যান উইথ ইনরমাস উইংস’, নিকলাই গোগলের ‘দ্য নোজ’, মুরাকামির ‘দ্য এলিফেন্ট ভ্যানিশেস’ গল্পগুলোর কথা বলা যেতে পারে। প্রথম গল্পে বাস্তবজীবনে হঠাৎ করেই হাজির হয় ডানাওয়ালা মানুষ। গ্রামের মানুষ ভিড় করে দেখতে থাকে। দ্বিতীয় গল্পে এক ব্যক্তি হঠাৎ করে উপলব্ধি করেন তার নাক উধাও হয়ে গেছে। এরপর সে বিভিন্ন জায়গায় নাকের সন্ধান চালাতে থাকে। একদিন দেখে, তার নাক অফিসের পোশাক পরে অফিস করতে যাচ্ছে। নাক একেবারে ব্যক্তির মতো চলাফেরা করছে। অন্যদিকে যে ব্যক্তির নাক হারিয়েছে তাকে দেখে মনে হচ্ছে না কোনোদিন তার নাক ছিল। হাতি উধাও গল্পে, হঠাৎ কড়া প্রহরায় থেকেও একটা জলজ্যান্ত হাতি উধাও হয়ে যায়। কোথাও সন্ধান মেলে না। মুরাকামির সবুজ রাক্ষসটা গল্পে একটা গাছ গোড়া থেকে উঠে এসেছে বাগানের মালকিনকে প্রেম নিবেদন করতে। এসব গল্পে এই জাদুতুল্য ঘটনার উপস্থাপন করা হয়েছে সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু বিষয় ইঙ্গিত করে।

অন্যদিকে, পরাবাস্তবতার আরেক নাম স্বপ্নবাস্তবতা। কাজেই পরাবাস্তব সাহিত্যে এমন পরিপাটি করে কোনোকিছু থাকে না। একটা স্বপ্নময়তা থাকে ভাষা ও চেতনায়। স্বপ্নে যেমন ঘটে যাওয়া ঘটনার ভেতর কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক বা বিন্যাস থাকে না, এবং সবকিছু কেমন বিবর্ণ মনে হয়, তেমনি এখানেও ঘটনা ও ভাষায় সেই অযৌক্তিকতা থাকে। অনেক সময় ন্যারেটিভে সেটিং (টাইম+স্পেস) বলে কিছু থাকে না। অর্থাৎ কাঠামো বা অবয়বহীনভাবে উপস্থাপিত হয় গল্পটি।

উদাহরণ হিসেবে এস টি কলরিজের ‘কুবলা খান’ অথবা জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। দুটি কবিতাতেই পরাবাস্তব উপাদান আছে। জীবনানন্দ দাশ বলছেন-‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,/ সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে/ অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে/ সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;/ আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,/ আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।’

কলরিজ বলছেন-‘In Xanadu did Kubla Khan / A stately pleasure-dome decree: / Where Alph, the sacred river, ran / Through caverns measureless to man/ Down to a sunless sea.’

কবিতাজুড়ে আমরা এমনই স্বপ্নবাস্তবতার ছোঁয়া পাই। আক্ষরিক অর্থেই কলরিজ এই কবিতাটি স্বপ্নে পান। কলরিজ আফিমখোর ছিলেন। এটা ছিল তার আফিম ড্রিমের ফসল। ঘুম থেকে উঠে তিনি তাড়াহুড়ো করে লিখতে বসেন যাতে ভুলে না যান। কিন্তু কয়েক প্যারা লেখার পর একজন অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি চলে আসেন। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কবিতার সিংহভাগ স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। পরাবাস্তব কবিতা বা শিল্প এমনই- খুব পরিকল্পনা করে লেখা যায় না। নির্দিষ্ট ঘোর বা পরিস্থিতির ভেতর এটা আসে। পরাবাস্তব গল্পের ক্ষেত্রে দেবেশ রায়ের ‘পায়ে পায়ে’, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘রূপ সাগরে ডোবে না, ঈভ’ গল্প দুটির কথা বলা যায়। পরাবাস্তব সাহিত্যের দুর্দান্ত উদাহরণ হতে পারে জাহানারা নওশিনের ক্ষুদে-উপন্যাস ‘পিতামহীর পাখি’। জার্মান ভাষায় লেখা সুইস লেখক ফ্রেডরিক ডুরেনমাটের ‘দ্য টানেল’ বা সুড়ঙ্গ গল্পটির কথাও বলা যায়। এই গল্পে এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য রোজকার মতো মেট্রো ট্রেনে চড়ে বসে। একটা ছোট্ট সুড়ঙ্গের ভেতর গিয়ে ট্রেনটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে যেতে থাকে। অন্ধকার থেকে আর বের হয় না। ছাত্ররা অস্থির হয়ে পড়ে। কিন্তু অন্য যাত্রীরা শান্ত হয়ে বসে থাকে যেন তারা আসন্ন বিপর্যয় দেখতে পাচ্ছে না বা চাচ্ছে না। লাতিন সাহিত্যের বোর্হেস ইউরোপীয় সুরিয়ালিজম আর্ট মুভমেন্ট দ্বারা বিশেষভাবে প্রবাহিত হন।

জাদুবাস্তবতার বিষয়টি সাহিত্যের আধুনিক ডিসকোর্স হিসেবে দেখা হলেও জাতকের গল্প, ইশপের গল্প, আরব্যরজনীর গল্পসহ আদি ফেবল বা প্যারাবলে জাদুবাস্তবতার প্রাথমিক শিল্প বা কলাকৌশলের প্রয়োগ ঘটেছে। যেমন কার্পেন্তিয়ের-রুলফো-য়োসা-মার্কেস-বোর্হেস-এর বহু আগের গল্প হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।

ছোটগল্পকার মুরাকামি
জাপানি কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামি বর্তমান সময়ের শুধুমাত্র নিরীক্ষাধর্মী ঔপন্যাসিকই নন, সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদেরও একজন। বিশ্বব্যাপী তাঁর বই এখন লাখ লাখ কপি বিক্রি হচ্ছে। অনূদিত হচ্ছে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সব ভাষাতেই। মুরাকামির উপন্যাস বাস্তব এবং কল্প-জগতের সন্ধিক্ষণে আবাস গাড়ে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ও অপরাধ জগত দাঁড়িয়ে থাকে এক সরলরেখায়। মুরাকামির জগত রূপকাশ্রিত বা এলিগরিক্যাল। প্রতীক ও চিত্রকল্প অতি পরিচিত কিন্তু তার অর্থের মুখটা শেষঅবধি আটকানো থাকে।

মুরাকামির জন্ম জাপানের কিয়োটো শহরে। বাবা জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। দাদা ছিলেন বৌদ্ধসন্ন্যাসী। মুরাকামির বয়স যখন দুই তখন তাঁর পরিবার বন্দর শহর কবেতে চলে আসে। এখানে মুরাকামির সাথে আমেরিকান নাবিকদের সাক্ষাৎ ঘটে। জাপানি সংগীত, শিল্প ও সাহিত্য ছেড়ে মুরাকামি পশ্চিমের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বর্তমানে মুরাকামি জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তবে অন্তর্মুখী মুরাকামি নিজেকে লুকাতে বেশ কিছুদিন থেকে দেশের বাইরে বাস করছেন। তিনি ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাস করে আসছেন। জাপানে সাহিত্যে যত পুরস্কার আছে তার প্রায় সবগুলো বগলদাবা করেছেন মুরাকামি। জাপান থেকে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকাতেও উঠে এসেছে তাঁর নাম। তিনি পরিশ্রমী অনুবাদকও বটে। তাঁর বদৌলতে জাপানি পাঠক বেশ কিছু উচ্চমার্গীয় সাহিত্য পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

পরাবাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতা হলো মুরাকামির সাহিত্যের প্রধানতম অনুষঙ্গ। জাপানি সাহিত্যের ঐতিহ্য থেকে দূরে থাকার কারণে তাঁকে নিজ দেশে সমালোচনার শিকারও হতে হয়েছে। তাঁকে বলা হয়েছে অ-জাপানি, পশ্চিম-প্রভাবিত লেখক। কাফকা থেকে মুরাকামি সচেতনভাবে এলিনেশনের বিষয়টা নিয়েছেন। এসব কারণে তাকে উত্তরাধুনিক কথাসাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর বেশিরভাগ সাহিত্যকর্ম প্রথম পুরুষের বয়ানে লেখা। তাঁর সাহিত্যের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো হিউমার এবং পাথোজের মিশ্রণ ঘটানো। যেমন তাঁর গল্প সংকলন ‘আফটার দ্য কোয়াক’-এ ‘সুরাপ-ফ্রগ সেভস টোকিও’ গল্পে ছয় ফুট উচ্চতার একটা ব্যাঙ প্রটাগনিস্টকে বলে, এককাপ চায়ের কারণে টোকিও ধ্বংস হবে। গল্পের সিরিয়াস মুডের সাথে যোগ হয়েছে পরিস্থিতিগত হাস্যরস।

এ পর্যন্ত মুরাকামির চারটি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দি এলিফেন্ট ভ্যানিশেস’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। ১৭টি গল্প স্থান পায় এখানে। এখানে সুরিয়ালিজম এবং জাদুবাস্তবতার নিরিখে বেশ কটি গল্প বিশ্লেষণ করার সুযোগ আছে।

এই সংকলনের ‘দ্য লিটল গ্রিন মনস্টার’ গল্পটি ‘ক্ষুদে সবুজ রাক্ষুসটা’ শিরোনামে বিশদভাবে গদ্যের শেষাংশে আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় গল্পসংকলন ‘আফটার দি কোয়াক’ প্রকাশিত হয় জাপানি ভাষায় ২০০০ সালে এবং ইংরেজিতে ২০০২ সালে, জে রবিনের অনুবাদে। এখানে মোট ছটি গল্প স্থান পায়। ১৯৯৫ সালে মুরাকামির জন্ম শহর কোবেতে বড় একটা ভূমিকম্প হয়ে যায়। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। মুরাকামি ভীষণভাবে আহত হন। তিনি এই দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে রচনা করেন গল্পগুলো। এই গ্রন্থের প্রতিটা গল্প তৃতীয় ব্যক্তির বয়ানে বলা, যেটা মুরাকামির লেখার সহজাত বৈশিষ্ট্য না। এখানে একটা মাত্র গল্পে ‘সুপার-ফ্রগ সেভস টোকিও’ সুপারন্যাচারাল উপাদান আছে।

তৃতীয় গল্প সংকলন ‘ব্লাইন্ড উইলো, স্লিপিং উইমেন’ প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে, ফিলিপ গ্যাবরিয়েল এবং জে রবিনের অনুবাদে এখানে ২৪টি গল্প আছে। এই গ্রন্থের ভূমিকাংশে মুরাকামি জানান, ‘I find writing novels a challenge, writing stories a joy. If writing novels is like planting a forest, then writing short stories is more like planting a garden.’

চতুর্থ গল্পসংকলন ‘মেন উইদাউট উইমেন’ প্রকাশিত হয় জাপানি ভাষায় ২০১৪ সালে এবং ইংরেজিতে ২০১৭ সালে। এই সংকলনে ৭টি গল্প আছে।

গল্পপাঠ ‘ক্ষুদে সবুজ রাক্ষুসটা’: এই গল্পে মুরাকামির লেখনীর প্রধানতম বৈশিষ্টগুলো বিদ্যমান। গল্পটি ফার্স্ট পারসন ন্যারেটিভে লেখা। পরাবাস্তব গল্প। জাদুবাস্তবতার নিরিখেও ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে। অ্যাবস্ট্রাকট এবং ন্যারেটিভের সংমিশ্রণ আছে এখানে। গল্পের প্রধান চরিত্র নারী। এলিনেশন বা একাকীত্বের বিষয়টিও এখানে আছে। গল্পের প্রধান চরিত্র সারাদিন একাই থাকে। প্রতিবেশীদের বাড়িগুলো তার বাসা থেকে বেশ দূরে দূরে। 

পরিবেশবাদ সমালোচনা বা ইকোক্রিটিসিজম: এখন সাহিত্য বা শিল্পকর্মকে পরিবেশবাদি আন্দোলনের অংশ হিসেবেও পাঠ করা হয়। এই রীতি ইকোক্রিটিসিজম নামে পরিচিত। এই গল্পকে সেই জায়গা থেকে পাঠ করার সুযোগ আছে। গল্পের ন্যারেটর একজন বৃক্ষপ্রেমী নারী। তিনি নিজ হাতে তার বাড়ির বাগানে একটি বৃক্ষ রোপণ করেছিলেন। তখন তিনি ছোট। গাছটি গল্পকথকের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে ওঠে। গল্পকথক মমতাময়ী দৃষ্টিতে গাছটি দেখেন। যেহেতু গল্পকথকের সংসারে স্বামী ছাড়া আর কেউ আছে বলে জানা যায় না। ধরে নেওয়া যেতে পারে তাদের সন্তান হচ্ছে না, বা এখনও হয়নি। কাজে, গাছটিকে নিজের সন্তানের মতো দেখেন বললেও ভুল বলা হবে না। এই গাছটির গোড়া থেকে মাটি ফুঁড়ে খানিক সময় নিয়ে অদ্ভুত চেহারার এক জীব বের হয়ে আসে। তার গায়ের রং গাছের পাতার রঙের মতো। জীবটাকে আমরা গাছের আত্মা বা গাছটির প্রাণীরূপ হিসেবে ধরে নিতে পারি। যেহেতু গল্পকথক নারী গাছটিকে বন্ধু বা প্রেমিকের মতো ভালোবাসে, তাই গাছটিও তার পাল্টা অনুভূতি জানাতে এসেছে। সে বলতে এসেছে যে, সেও ঐ নারীকে ভালোবাসে। কিন্তু সমস্যা হলো তার বেশ। সে যে রূপে এসেছে সেটি গল্পকথকের মনে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। গল্পকথক তাকে কোনো হরর চরিত্র ভেবে ভয় পেয়ে গেছেন। ভয় থেকে বাঁচার জন্যে তিনি যাকে ভালোবাসেন, যার সঙ্গে কথা বলেই তার দিনের সিংহভাগ কেটে যায়, তাকেই তিনি শেষপর্যন্ত খুন করেছেন।

পরিবেশবাদি চেতনায় পৃথিবীর প্রতিটা জীবই সমান গুরুত্বপূর্ন। বিশে^র পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটা প্রাণীর কমবেশি ভূমিকা আছে। গল্পকথক বৃক্ষপ্রেমি। কিন্তু তাকে সার্বিকভাবে পরিবেশপ্রেমী বলা যাবে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি কোনও প্রাণীর চেহারা বদসুরত বলে তাকে খুন করতে বা অগ্রাহ্য করতে পারেন না। এভাবে যদি আমরা আমাদের অপছন্দের প্রাণীদের হত্যা করি তাহলে পৃথিবীর ইকো সিস্টেমে গলদ দেখা দেবে।

আখ্যানরূপক বা এলিগরি: গল্পটিকে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মোরাল এলিগরি হিসেবে দেখা যেতে পারে। গল্পের দুটি চরিত্রের ভেতর ইতিবাচক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার অন্যতম কারণ ভাষাগত সমস্যা বা একটি ইউনিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রতিষ্ঠিত না হওয়া। আমরা জানি, গল্পকথক প্রকৃতিপ্রেমী দরদীচরিত্র। তার ভেতর কোনো ধরনের হিংস্রতা নেই। তারপরও সে সবুজ অদ্ভুত দেখতে প্রাণীটাকে খুন করার কথা ভাবতে পারে। কারণ সে ভেবেছে ঐ প্রাণীটা তাকে খুন করতে এসেছে। সারভাইবাল অব দ্য ফিটেস্ট, অর্থাৎ তাকে এখন বাঁচতে হলে প্রাণীটাকে খুন করতে হবে। অন্যদিকে সবুজ জীবন রাক্ষসের মতো দেখতে হলেও সে আসলে হিংস্র জীব নয়। সে এসেছে গল্পকথক নারীকে প্রেম নিবেদন করতে। গল্পকথক ভয় পেলে দৈত্যরূপী গাছটি বলে, ‘অবশ্যই আমি আপনাকে খেয়ে ফেলবো না। না না না। আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি, ক্ষতি করতে আসিনি, ক্ষতি করতে আসিনি।... ম্যাডাম ম্যাডাম ম্যাডাম, আপনি বুঝতে পারেননি? বুঝতে পারেননি? এখানে এসেছি আপনাকে প্রেম নিবেদন করতে। একেবারে হৃদয়ের গভীর গভীর থেকে গভীর গভীর’ [অনুবাদ : বর্তমান আলোচক]

এখানে সমস্যা হলো, কেউ কারও অনুভূতি একটি ইউনিক ভাষার মধ্য দিয়ে আদান-প্রদান করতে না পারা। গল্পকথকের ভাষা সবুজ জীবটা বোঝে না, আবার সবুজ জীবটার ভাষা গল্পকথক বোঝে না। সমস্যাটা এখানেই। গল্পটিকে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক এলিগরি বলছি এই কারণে যে, আমাদের সমাজে সব ধরনের সমস্যার প্রধান কারণ হলো পরস্পরকে বুঝতে না পারা। সাদারা কালোদের বোঝে না। চলে আসে বর্ণবৈষম্যের কথা। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষকে বোঝে না, চলে আসে জাতিগত বৈষম্যের কথা। ধনী গরিবের ভাষা বোঝে না, চলে আসে শ্রেণিবৈষম্যের কথা। সব সমস্যার প্রধান কারণ- ভাষা। সঠিকভাবে পরস্পর পরস্পরকে চেনার সমস্যা। কাফকার মেটামরফোসিসে দেখেছি, গ্রেগর সামছা যখনই পোকা হলো অর্থাৎ ভাষাহীন হলো তখনই সমাজে তার কদর কমে গেল। সে করুণ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেল। 

পরাবাস্তব ও জাদুবাস্তবতার উপাদান: মুরাকামির বর্তমান গল্পটিকে পরাবাস্তব এবং জাদুবাস্তব, এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই পাঠ করা যায়। গল্পের কথক তার জীবনে ঘটে যাওয়া যে ঘটনাটির বর্ণনা দিচ্ছে সেটি তার জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো দুঃস্বপ্নের মতো শোনাচ্ছে। একটি অদ্ভুত জীব তার বাসার ভেতর প্রবেশ করেছে। জীবটির যে শারীরিক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের জীব বাস্তব পৃথিবীতে নেই। অর্থাৎ স্বপ্নজগতে এ ধরনের প্রাণির সাক্ষাৎ মেলা সম্ভব। তারপর বলা হচ্ছে, জীবটি মানুষের মতো কথা বলছে। সে আবার গল্পকথকের মনের কথা পড়তেও পারছে। এমন অতিক্ষমতাসম্পন্ন (সুপার পাওয়ার) প্রাণির সাক্ষাৎ এ জগতে এখনও মেলেনি। তারপর গল্পকথক যেভাবে তাকে অত্যাচার করে কাবু করেছে, সে তরিকাটিও বেশ অভিনব। সব মিলিয়ে গল্পটিকে মনে হয়, স্বপ্নলোক বা কল্পলোকে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা। এর কোনো বাস্তবভিত্তি নেই। সেদিক দিয়ে এটি অবশ্যই পরাবাস্তব গল্প।

গল্পটি পরাবাস্তব হলেও জাদুবাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখার সুযোগ আছে। লেখক যেভাবে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, যতটা ডিটেইলে তিনি গেছেন, তাতে করে একবারও মনে হয়নি সত্যি সত্যি এমনটি ঘটছে না বা ঘটা সম্ভব না। কিছুটা সময়ের জন্য আমরা পুরো ঘটনাটা বিশ্বাস করি। বাস্তবভিত্তির ওপর লেখক মুরাকামি তার জাদুটা প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ এখানে অদ্ভুত কিছিমের প্রাণিটা বাদে বাকিসব আমাদের চেনাজানা পরিবেশ। ‘এলিস ইন দি ওয়ান্ডারল্যান্ড’ কিংবা ‘নারনিয়ার’ মতো অন্য কোনো জগতে মুরাকামি আমাদের নিয়ে যাননি। তিনি বরং আমাদের জগতেই টেনে এনেছেন অন্য জগতকে। এবং এই দুই জগতের মিশেলে আমরা তৃতীয় একটা জগত পেয়েছি যেটা কোনো না কোনোভাবে আমাদের জীবনের গল্পই তুলে এনেছে। তাই গল্পটিতে জাদুবাস্তবতার উপস্থিতি আছে, সেটা বলা চলে। 

আয়রনি: যদি ক্ষুদে সবুজ রাক্ষসটাকে আমরা গল্পকথকের প্রিয় গাছটিরই আরেক রূপ ধরি, তাহলে গল্পকথকের হাতে সবুজ প্রাণীটার নিধনকে আইরনি বলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিষয়টা ড্রামাটিক আইরনি। কেননা, পাঠক শুরু থেকেই বুঝতে পারে প্রাণীটা গল্পকথকের কোনো ক্ষতি করতে আসেনি। কিন্তু গল্পকথক তার ওপর আস্থা রাখতে পারে না। প্রকৃতিপ্রেমী গল্পকথকের হাতেই প্রকৃতির এক নিষ্পাপ সৃষ্টি প্রাণ হারায়। এটিকে সিসুয়েশনাল আইরনি বলা চলে। আবার গল্পকথক নিজেই বলছেন যে, তিনি গাছটিকে বন্ধুর মতো ভালোবাসেন, কিন্তু গাছটির আত্মা একটা অবয়ব নিয়ে তাকে প্রেম নিবেদন করতে আসলে তিনি তা বিশ্বাস করেননি। এটাকে বলা যায়, ভার্বাল আইরনি।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ নভেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel