ঢাকা, বুধবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প: তেলাপোকা

হুমায়ূন শফিক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-২৭ ৬:৩১:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-২৭ ৬:৫১:১৩ পিএম

হুমায়ূন শফিক​: আমি ঠিক করলাম, বুড়িগঙ্গা নদীই আমার জন্য একমাত্র বসবাসের যোগ্য। কারণ নিজের জন্য অন্য কোনো আবাস এখন কল্পনা করতে পারছি না। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে গেছি। পথে কাদার আস্তরণে কতবার যে নিজেকে সপে দিতে হয়েছে বলা মুশকিল! ভয়ে বুক কেঁপে কেঁপে উঠেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। এই পৃথিবীতে আমার আর এক দণ্ড থাকতে ইচ্ছে করছে না। ওপারে গিয়ে কি হবে জানার জন্য উদ্বিগ্ন নই। হয়ত বীভৎস জীবন আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এই সব ভাবতে ভাবতে আমি জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলাম। যখন ভাবলাম আহা কি করলাম; দেখি আমি পিচঢালা ব্রিজেই দাঁড়িয়ে আছি। কেউ আমার ঘাড় চেপে ধরেছে।

এর কি কোনো দরকার আছে? লোকটি গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল।

আমি খুবই বিস্মিত হয়ে পিছন দিকে ঘুরে তাকালাম। মনে মনে খানিকটা খুশিই হয়েছিলাম। দেখতে পেলাম, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ছোটখাটো মধ্যবয়সী লোক। তাকে দেখে যে কেউ বিদেশী বলে ভুল করবে নিশ্চিত। তার শরীরে মলিন কাপড়। মুখে একগুচ্ছ দাড়ি। মুখে গাম্ভীর্য।

তুমি কী করতে যাচ্ছিলে ধারণা আছে? কোনো এক মহাপুরুষের মতো বলে তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন। তোমার কী  সমস্যা, আমাকে বলো। আমি সমাধান করার চেষ্টা করব।

আমি চুপ করে সব শুনলাম। কিছু বলতে পারছিলাম না। সে আমাকে তার সাথে যেতে বলল। কোনো কিছু না ভেবে তার পিছু নিলাম। একটা সরু পথ ধরে হেঁটে চলেছি। রাস্তাটির আশপাশে থুপথুপে কাদা যা আমার জুতাতে লেগে যাচ্ছিল। ইটের রাস্তা। জায়গায় জায়গায় ইট উঠে গেছে। আলগা ইটে পা পরলেই কাদা-মাখা পানি এসে আমার দামি প্যান্ট ময়লা করে দিয়ে হাসছে, যেন উপহাস করছে। আশপাশের দালানগুলো পুরনো। দেয়ালে শ্যাওলা জমে সবুজ রং ধারণ করেছে। দেয়ালের জায়গায় জায়গায় খাওয়া খাওয়া- যেন বাচ্চারা খামছে উঠিয়ে ফেলেছে কারও চামড়া। এমন সংকীর্ণ পথে চলতে চলতে এক সময় আমরা দুজনে একটা মাঝারি আকৃতির প্রাচীরের সামনে এসে থামলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, চলো এটা আমার বাড়ি। জানি ভালো লাগবে না। কিন্তু তোমার জন্য এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা করতে পারব না।

সমস্যা নেই। জীবনে এমন অভিজ্ঞতার দরকার আছে। চলুন চলুন। ভিতরে যাই। আমি চাচ্ছি ভিতরে ঢুকে আগে কিছু গলধঃকরণ করি।

ভাঙা দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে আমার টি-শার্টের একটা অংশ ছিঁড়ে গেল। কিন্তু আমলে নিলাম না। এগিয়ে চললাম। ছোট বাড়ি। এ বাড়িতেও শ্যাওলার অভাব নেই। অসচেতনভাবে চলতে গেলে হোঁচট খাওয়া অস্বাভাবিক নয়। দেয়ালের অবস্থা একেবারে করুণ। ভাঙন লেগে গেছে তার প্রত্যেকটা অংশে। ভূমিকম্পের মাত্রা যদি ১ অথবা ২ হয় তাতেই এই দেয়াল ভেঙে যাবে নিশ্চিত।

খানিকটা হেঁটেই রুমে প্রবেশ করলাম। একটা ‍সুন্দর গন্ধে ভরে উঠল চারদিক। একটু আগে কেউ হয়ত কোনো ব্র্যান্ডের এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করেছে এই ঘরে। মনটা ভরে গেল। এই সুগন্ধী এমনই পাগল করা যে, আমি একটু আগে কী করতে যাচ্ছিলাম বা কী হয়েছিল ভুলে গেলাম। লোকটা আমাকে একটি কাঠের চেয়ারে বসতে বলে ভিতরে চলে গেল।

আমি রুম পর্যবেক্ষণ করে যা দেখতে পেলাম। প্রথমত ঘরটা খুব ছোট, বড়জোর পাঁচ জন বসতে পারবেন। ডানে জানালার পাশে একটি টেবিল। টেবিলেও ওপর কোনো কাপড় নেই। কালো রং দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। চকচক করছে পূর্ণিমার আলোয়।

টেবিল থেকে দূরে দুটি চেয়ার, একটি ঠিক আমার সামনাসামনি, অন্যটিতে নিজে বসে আছি। ঘরের প্রতিটি কোণায় কেন যেন লাল রং মেখে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম কোণা থেকে দুটি তেলাপোকা হরহর করে বের হয়েই আমার দিকে আসতে থাকল। তখন লোকটা এসে হাজির হলো। সে তেলাপোকাদের দেখে বলে উঠল, যা যা। শয়তানগুলো ভাগ বলছি। না হলে কিন্তু খবর আছে! তার কথা শুনে যেন তেলাপোকাগুলো ভয় পেল। সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে গিয়ে অদৃশ্য হলো।  

লোকটা আমার মুখোমুখি হয়ে বলল, তোমার নাম কী?

আমি ডাক নাম বললাম।

এখন লোকটা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে এসেছে। বৃষ্টিতে হালকা শীত করছে। আমার শরীরও শীতে আড়ষ্ট। সে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, তুমি এখনও ছোট, যা করতে গিয়েছিলে তা কিন্তু জঘন্য রকম খারাপ কাজ। তবে বীরের কাজ।

তার ঠান্ডা হাতের স্পর্শে আমার শরীর কেঁপে উঠল। সে খুব দ্রুত নিঃশ্বাস নিয়ে কথা বলছে।

শোনো, ফাতাউর। সুন্দর তার উচ্চারণ ভঙ্গি।

তোমার সমস্যাটা বলো এবার। তারপর দেখি কিছু করতে পারি কিনা।

আমি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলাম- আমার বাবা বিশাল ব্যবসায়ী। আমাদের পূর্বপুরুষদের আভিজাত্য থাকা সত্ত্বেও সে শুধু অর্থের লোভে একের পর এক খারাপ কাজ করে যাচ্ছিল। আমি তাকে বাধা দেই কিন্তু সে আমাকে গ্রাহ্য করে না। আমার মা ছোট থাকতেই মারা গিয়েছিলেন। তাই মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত এক শিশু আমি। ভেবেছিলাম বাবা আবার বিয়ে করেননি, নিশ্চয় আমাকে সৎ মায়ের কাছে যাতে হেস্তনেস্ত হতে না হয় সে জন্য। অনতিবিলম্বে আমি আবিষ্কার করলাম যে আমার ধারণা ভুর। এ সবই লোক দেখানো ভালোবাসা।

তাকে বিভিন্ন সময় একেক ধরনের মহিলার সাথে দেখতে পেয়ে আমার সন্দেহ জাগল। বাবাকে জিজ্ঞাসা করায় সে উত্তর দিল, ব্যবসার কাজে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে হয়। কিন্তু কিছুদিন পর যখন এক কাকার সাহায্যে জানতে পারলাম বাবার কুকর্মের কথা তখন সবচেয়ে যে বিষয়টা আমাকে ব্যথিত করল...

থামলে কেন? বলে যাও।

জানতে পারলাম আমার বাবা মাকে খুন করেছে। মা জানতে পিরেছিল সব ঘটনা। তারপর বাবাকে তো আর খুন করা যায় না। তাই নিজেকেই শেষ করতে বুড়িগঙ্গায় ছুটে গিয়েছিলাম। 

আমি কথাগুলো শেষ করে করুণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, এমন অবস্থায় আমার কিই বা করার ছিল বলুন?

হ্যাঁ, আমি তোমার হতাশার কারণ বুঝতে পারছি। জানো তো, কাজে ডুবে থাকলে তোমাকে আজ এখানে বসে থাকতে হতো না।

তাহলে এখন কী করব আমি?

সমাধান একটাই, তুমি আমার সাথে কাজে লেগে যাও। দেখবে সব হতাশা কেটে যাবে।

কী কাজ?

আমি যা করি।

কী কাজ করেন?

আমার শখ আত্মাদের ধরে ধরে তেলাপোকায় পরিণত করা।

শুনেই ঝাকি খেলাম। লোকটা পাগল নাকি? লোকটি এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে শিখিয়ে দেওয়া হবে কীভাবে আত্মা ধরা যায়।

আমি কি পারব? এবার রেহাই পাওয়ার জন্য বললাম।

আরে, পারবে পারবে। তোমাকে দিয়ে হবে। আজ রাতটা বিশ্রাম কর। কাল রাত থেকে শুরু হবে তোমার কাজ।

তার কথা শুনে আমার বমি বমি ভাব হলো। এর চেয়ে বরং মরণ যেন ভালো ছিল। আত্মা নিয়ে কারবার করতে হবে। ভূত শুনলেও হাসবে। আবার ঝপঝপ করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। বৃষ্টির শব্দগুলোও আমার কাছে দুর্বোধ্য। যেখানে বৃষ্টি নামলে মনে কবি কবি ভাব চলে আসত। মাঝে মাঝে বৃষ্টির দিন দুই-চার লাইন কবিতা লিখেছিলাম মনে পড়ে।

শোনো, আজ এমনিতেই বৃষ্টির দিন আত্মারা বের হবে না। কিছু কি খেয়েছো?

প্রচন্ড ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও বললাম, আমার ক্ষিধে নেই। আসলে এইসব পাগলাটে কথা শোনার পর ক্ষুধাও মরে ভূত হয়ে গেছে।

সে তার রুমে চলে গেল। আমাকে একটা কাঁথা আর বালিশ এনে দিয়ে বলল, তুমি এখানেই শুয়ে পর। কাল দেখা হবে। আমি সুবোধ ছেলেটির মত চুপচাপ শুয়ে পরলাম।

ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দুধেল আলো আমার শরীরে এসে খোঁচাতে আড়ম্ভ করল। বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত না উঠে থাকতে পারলাম না। কিন্তু উঠতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। চেষ্টা করেও উঠতে পারছি না। নিজের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে সফল হলাম না। ফলে চিত হয়ে শুয়েই ভাবতে লাগলাম- এসব কী হচ্ছে আমার সাথে?

একটু পর দৈত্যকায় একজোড়া পা আমার দিকে আসতে দেখলাম। পায়ের নখগুলো বিশাল কোদালের মতো। স্বপ্ন! না স্বপ্ন না।

লোকটার মুখ ঠাহর করতে পারছি না। অস্পষ্ট। তবু কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। মৃত্যর কাছাকাছি পৌঁছে বেঁচে ফিরে এসে কি আবার সেই মৃত্যুপুরীতে ঢুকে পরলাম।

আগের মতোই শুয়ে আছি। একটু ঘুরবার চেষ্টা করছি। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। সামনের দিকে যতদূর দেখতে পাচ্ছি তেলাপোকার ৮টি পা। ঠিক আমার বুকের উপর।

দৈত্যটির হাত এবার আমার দিকে আসছে। বিশাল লোমশ হাত। আঙুলগুলোও কেমন যেন ফ্যাকাশে। গতকাল যেমন লোকটির ফ্যাকাশে আঙুল ছিল।

আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে তার দুই আঙুল দিয়ে আমাকে তুলে বলল, হ্যালো ছোট বন্ধু রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো? আমি কথা বলার জন্য মুখ খুললাম কিন্তু বলতে পারলাম না। আমাকে সে বোতলবন্দী করে রেখে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, তোমাকে ভালো করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যাতে আত্মাদের তুমি তেলাপোকায় পরিণত করতে পারো।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ নভেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel