ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:
ফিল্ম রিভিউ

নারী ও নদীর সার্বজনীন গল্প নিয়ে হালদা

জেনিস আক্তার : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৪ ৩:৪৫:৪১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৫ ১:৩৭:৩৩ পিএম
‘হালদা’ সিনেমার একটি দৃশ্য

জেনিস আক্তার: নদী ও নারীর সংযোগের মাধ্যমে মিতালী করে আজাদ বুলবুলের গল্প চিত্রনাট্যে রূপ দিয়েছেন তৌকির আহমেদ। প্রতিটি দৃশ্যে ধরা দিয়েছে নদীর মতো নারীর কথা বলা, চালচলন এবং আচার-আচরণ। ব্যাঙের বিয়ে, হালদার কৃষ্টি, গ্রাম্য-সংস্কৃতি, জেলেজীবন, মাছ ধরার কৌশল, নদী ও নদীর গতি-প্রকৃতি, নদীর ক্ষয় ও নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন প্রবাহ ও জটিলতা, পালা ও কবি গান, মাইজভাণ্ডারী গান, কুস্তি খেলা, নৌকা বাইচ ও জীবন সংগ্রাম নিয়েই এগিয়ে গেছে গল্প।

গল্পটা আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছেন তিশা, মোশাররফ করিম, জাহিদ হাসান, ফজলুর রহমান বাবু, দিলারা জামান, রুনা খান, মোমেনা বেগম আর শাহেদের মতো শক্তিমান অভিনেতারা। এখানে জাহিদ হাসান ও ফজলুর রহমান বাবুর সম্পর্কের অংশটা ছবিতে দেখা যায়। ফজলুর রহমান বাবু মা-মাছ মেরে পাপবোধের কান্না আর শঙ্কায় ঘুমহীন রাত কাটান ঝুম বৃষ্টির মতোই বুকের গহীনে একাকিত্ব নিয়ে। অন্যদিকে জাহিদ হাসান ইটের ভাটার মাধ্যমে পরিবেশ নষ্ট করে, কারখানার বর্জ্য দিয়ে নদীর পানি নষ্ট করে। কিন্তু এতে তার বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই। বরং দ্বায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার উৎকোচের বিনিময়ে সে হাত কচলে যায়।  অপরদিকে নদীতে স্লুইচ গেইট, ড্রেজার বসিয়ে নদী দূষণের ঘটনাও আমরা দেখি। যে কারণে সময় চলে গেলেও মা-মাছ ডিম দেয় না। যদিও হালদা পাড়ের মানুষ জানে, মাছেরা পেটে ডিম নিয়ে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অমাবস্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে হালদাকে ‘মায়ের বাড়ি’ বানিয়ে ডিম ছাড়তে আসে। কিন্তু যখন তাদের দেখা যায় না তখন উচ্চরিত হয় সেই প্রশ্ন- ‘এবার কি মাছ ডিম ন দিব?’

এই গল্পের নায়িকা হাসু (তিশা)। হাসু আর হালদা একই সূত্রে বাধা। তিশার উচ্চারিত ‘আঁর বাইচ্ছা বাঁচিবো কোয়ানে?’ কথাটার পরেই ক্যামেরা ঘুরে যায় নদীতে ভেসে যাওয়া পশুর লাশ, পাড়ে মরা গাছ, অভিশপ্ত চিমনি আর শূণ্য ট্রলারের দিকে। সব কিছুই একটা প্রশ্ন তোলে নীরবে এবং সরবে- ‘আঁর বাইচ্ছা বাঁচিবো কোয়ানে?’ তখন সময়জুড়ে কেবলই মনে হয়েছে- এই প্রশ্নটা কি সার্বজনীন নয়? এটাই কি বাস্তবতা নয় গ্রাম এবং শহরের; বিশেষ করে ঢাকার? ‘হালদা’ আরও একবার মনে করিয়ে দিলো- প্রতিটি মানুষ তার সন্তানের আততায়ী।

হালদার গ্রামীণ উৎসবে হাসুর গায়ের গন্ধ মাখা উষ্ণতা, যিনি কানে শোনেন না, চোখে দেখেন না তার অপেক্ষা, বাবা-মেয়ের দৃশ্য, হলুদ সর্ষে ক্ষেতে হাসু-বদির অনুচ্চারিত ভালোবাসা, মোমেনা বেগমের নারীসুলভ সুখী মনোবাসনায় চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত, সুরত বানু নাম উচ্চারণের মধ্য দিয়ে নারীর পরিচয়, শ্বাশুড়ী আর বউয়ের সম্পর্ক, সতীনের সাথে সতীনের সম্পর্ক, সংসারের ক্ষমতার লোভ, মালিকের সাথে চাকর-বাকরের সম্পর্ক, বংশ রক্ষার যোগ্য কিংবা অযোগ্যের সন্তান, হাসু আর বদির একক সংসারের স্বপ্ন, হিংসার আগুনে প্রেম পুড়ে যাবার রসায়ন, বংশ রক্ষার জন্য নতুন করে জাহিদ হাসানের স্বপ্ন এবং তার ওপর  হাসুর কোমলগান্ধার সুর বন্ধ হয়ে যাওয়া- সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি হয়ে উঠেছে আধুনিক, সমসাময়িক এক নতুন মাত্রার চিত্রে। এতেই বুঝা যায় হালদা শুধু নদীতে সীমাবদ্ধ নেই, এ যেন আমাদের চারপাশের পরিচিত এক ছবি, জীবনের প্রতিচ্ছবি।

সিনেমায় দেখা গিয়েছে সমাজতন্ত্রের এক সুন্দর আখ্যান। জয়শ্রী কবিরের ‘ওরা silent majority যেদিন ওরা জাগবে কেউ রুখতে পারবে না’ কথাটা ফুটে উঠেছে। স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছে দখলদার পুঁজিবাদী শ্রেণির সাথে শ্রমিক শ্রেণির দ্বন্দ্ব। নির্যাতিত শ্রেণির সংগ্রাম এবং তা পুঁজিবাদী শ্রেণির বিপরীতে এটাও সিনেমায় স্পষ্ট। শ্রমিক বিপ্লবী হয়ে উঠলে সমাজতন্ত্রের জয় হয়। মোশাররফ করিম-তিশার একক সংসারের স্বপ্নে 'ইউটোপিয়া'র ব্যবহার আছে যাকে বলা হয় স্বপ্নরাষ্ট্র। মার্ক্সবাদের কাজ শ্রমিক শ্রেণিকে স্বপ্ন দেখানো এবং 'ইউটোপিয়ান রাষ্ট্র' তারই একটা চেতনা দেখতে পাই কাহিনির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অভিনেতা অভিনেত্রীদের মেকাপ, কস্টিউম এতোটাই ন্যাচারাল ছিল যে বোঝাই যায়নি সিনেমা নাকি বাস্তব! এজন্য ধন্যবাদ দেয়া যেতে পারে সামিউন জাহান দোলাকে। যার জন্য কাজল ও লিপস্টিক ছাড়াই তিশা অনন্যা হয়ে উঠেছিল আমার চোখে। সেই সাথে দারুণ অভিনয়শৈলী দিয়ে। তিশার উচিত পরিবারের বাইরে গিয়ে এমন ছবিতে অভিনয় করা।

সেইসঙ্গে সিরাজগঞ্জ কিংবা পুরনো ঢাকার ভাষা ভুলে খাঁটি চট্টগ্রামের ভাষায় নিজেকে ঢেলে দিয়ে অভিনয়ের যাদু দেখিয়েছেন জাহিদ হাসান। রেগে গিয়ে তার গালের মাংস কাঁপা, তার হাতে রুনা খানের থাপ্পড় খাওয়া এতোটাই প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। ক্যামেরার কাজ নিখুঁত। ক্যামেরার কাজ অনেক কথা বুঝিয়ে দিয়েছে ডায়ালগ ছাড়াই। আলো আঁধারের ব্যাপারটা ক্যামেরায় বাস্তবের মতো ধরা পরেছে, যেখানে রোদের প্রয়োজন কিংবা অন্ধকার ঠিক সেটাই দেখানো হয়েছে। কখনো মনে হয়নি কৃত্রিম। সিনেমাটোগ্রাফি খুব রিয়েলিস্টিক। প্রকৃতির প্রায় সব সৌন্দর্য উঠে এসেছে সেই সাথে মাছের ডিমও ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি। এডিটিংও শার্প। এজন্য আলাদাভাবে ধন্যবাদ পেতে পারেন এনামুক হক সোহেল, অমিত দেবনাথসহ কৌশিক রায়। পিন্টু ঘোষের ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক ছাড়িয়ে গেছে গতানুগতিক চলচ্চিত্রের আবহ, এখানে নায়ক-নায়িকা দিয়ে ঠোঁট নড়ানো ছাড়াই নতুন এক মাত্রা পেয়েছে গানে। কুকুরের ডাক, ঢেউয়ের শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, কোলাহল, চারপাশের পরিচিত শব্দগুলো যেন আলাদা করে অনুভব করা যায় সে বিষয়েও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন রিপন নাথ।

যেহেতু হালদা শুধু হালদা নদীর সিনেমা না সেহেতু সাব টাইটেল শুধু ইংরেজিতে না দিয়ে প্রমিত বাংলায় দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করি। কারণ তিশা মার খাওয়ার পর শ্বাশুড়ীর সান্ত্বনাবাণী, জাহিদ হাসানের মায়ের সাথে বংশ রক্ষা আর যোগ্য সন্তান নিয়ে আলোচনা, তিশার বাবার বাড়িতে এসে বৃষ্টিতে ভিজে মোশাররফের সাথে চট্টগ্রামের ভাষায় কথকতার রহস্য অনেকে ধরতে পারবেন না। ইংরেজি দেখে বুঝতে বুঝতেই পর্দা থেকে দৃশ্য চলে গেলে দর্শক কিছুটা বিব্রত হতে পারেন। তারপরও তৌকির আহমেদ এই গল্পের মাধ্যমে আমাদের প্রতিবেশ, পরিস্থিতি ভাবাতে বাধ্য করেন। এখানে তিনি মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন শতভাগ। সিনেমা দেখে মনে হবে, এ যেন আপনার কথা, আমার কথা এবং দেশের কথা, দশের কথা। দেশ ও দশের কথা নিয়েই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বর্তমানকে দারুণভাবে চপেটাঘাত করল ‘হালদা’। দেশ-দশ-আমার-আপনার যে ভাবাতে পারে, বর্তমানকে যে তুলে আনতে পারে সেই তো সার্থক নির্মাতা। ‘হালদা’ই হবে আপনার সার্বজনীন চিন্তার বাংলাদেশ।

লেখক: কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel