ঢাকা, সোমবার, ৫ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

বাঙালিভাবনা || শরীফ আতিক-উজ-জামান

শরীফ আতিক-উজ-জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২২ ৮:০৯:৫১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-২৩ ২:১১:১৭ পিএম

বাংলার দুইজন কীর্তিমান সাহিত্যিক দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান পরবর্তী সময়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্তব্য করেছিলেন। একজন ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং অন্যজন ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় পরবর্তী সময়ে। বয়সে তাঁরা সমসাময়িক, একজনের জন্ম বরিশাল, অন্যজনের বিক্রমপুর। দুজনই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষিত। তবে একজন আরেকজন থেকে মৃত্যুতে অনেক এগিয়ে ছিলেন। জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) ও গোপাল হালদার (১৯০২-১৯৯৩) দুটি ভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে খণ্ডিত বাংলা ও বাঙালি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।

প্রথমজনের ভাবনার মধ্যেই বড়সড় গলদ ছিল, আর অন্যজনের আশাবাদ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে এবং তার অনেকটাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু তারপরও আমাদের মনের কোণে সর্বদা আশঙ্কার কালো মেঘ উড়ছেই যার সঙ্গত কারণ রয়েছে। ১৩৫৮ সালের ১৬ চৈত্র ‘সাপ্তাহিক দেশ’ পত্রিকায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘খণ্ডনের আগে বাংলাদেশ বড় ছিল; প্রায় তার এক-তৃতীয়াংশ এখন দাঁড়িয়েছে পশ্চিম বাংলা। পূর্ব বাংলায় যে সব হিন্দু-মুসলমান আছেন, তাঁরা এতদিন বাঙালি বলে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু এখন তারা নিজেদের খুব সম্ভব বাঙালি বলতে পারেন না। তাঁরা পাকিস্তানি। পশ্চিম বাংলার দেশীয় অধিবাসীরা অবশ্য বাঙালি।’ এক্ষেত্রে তাঁর জাতিসত্তার ধারণাটির সাথে শরৎচন্দ্রের ধারণার মিল রয়েছে যিনি ‘বাঙালি ও মুসলমান’ ছেলেদের মাঝে ক্রিকেট খেলার উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু ভূখণ্ড বদলে গেলে নাগরিকত্ব বদলে যেতে পারে, জাতিসত্তা নয়। তার মূল বৈশিষ্ট্য ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যমণ্ডিত জীবনাচরণ বদলে যায় না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এক বছর আগে লিখিত এই প্রবন্ধে তিনি বাংলা একমাত্র তো দূরের কথা, বরং উর্দুর সাথে আরেকটি রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে, আর সেইজন্যই সেখানে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি মারা পড়বে। ‘বাংলা যদি পূর্ব পাকিস্তান থেকে ক্রমে ক্রমে উঠে যায় তাহলে এ ভাষার, এর সাহিত্যের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হবে পশ্চিম বাংলা। পূর্ব পাকিস্তানের নতুন নিয়মোৎসারিত ভাষা উর্দুর থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে না- সেখানে বাংলা সাহিত্যের বিশেষ কোনো চাহিদা থাকবে না। দেশ বিচ্ছিন্ন হবার সঙ্গে সঙ্গেই টান কমে গেছে, কিন্তু সেটা হয়তো সাময়িক বিশৃঙ্খলার জন্য, অনেকটা টাকাকড়ির অব্যবস্থার জন্যে। কিন্তু উর্দু পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হলে বাংলা সাহিত্যের তেমন কোনো দরকার থাকবে না সেখানে। পূর্ব পাকিস্তান বা কোনো দেশের পক্ষেই দু-তিনটে ভাষা একসঙ্গে বরদাস্ত করা সহজ নয়। ইংরেজি উর্দু শিখে ও রাষ্ট্রে সমাজে ব্যবহার করে, পাকিস্তানের লোকজনের নিজ ভাষা হলেও বাংলা সেখানে ক্ষয় পেয়ে পশ্চিম বাংলার সক্রিয় ভাষার থেকে এত বেশি বিভিন্ন হয়ে পড়বে যে তখন তাকে চেনা কঠিন হবে।’ কিন্তু ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তার ভাবনায় এ সম্পর্কিত কী পরিবর্তন এসেছিল তা আর জানা যায় নি। তবে তার সেই ভবিষ্যৎবাণী যে ফলে নি তা আজ প্রমাণিত।

গোপাল হালদার স্বাধীন বাংলাদেশে শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। ‘বাংলাদেশ- ভাবী বাঙালির আবির্ভাব’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: ‘সমসাময়িক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একটা বিশেষ বিবর্তনের সম্ভাবনায় এসে দাঁড়াচ্ছে- কারণ ভাবী বাংলার জন্মবেদনায় আজকের বাংলা অস্থির। নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষায় বাংলা ও সাহিত্য সোনার বাংলার জন্য অপেক্ষমান।’ একইসাথে তিনি দেশভাগের পর থেকে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ‘কালান্তর’, ‘সংকটকাল- কালগ্রাসের বিভীষিকা’ বলেছেন। সেটা ঠিক। কিন্তু এই সময়ে ভাষা-শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে অর্জনটা যে নিছক কম নয় তা উল্লেখ করেন নি। এই সময়ের মধ্যেই এই ভূখণ্ডের বাঙালি সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ভাষার অধিকার অর্জন করেছে, নিজেদের প্রয়োজনেই নিষিদ্ধ রবীন্দ্রনাথকে মুক্ত করেছে, রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের আয়োজনের সূচনা করে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার বীজ বপন করেছে, ধর্মকে রাষ্ট্র পরিচালনার সীমানায় না আনার সংগ্রাম করেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন থেকে যে সংগ্রাম তার বাস্তবায়ন খুব সহজ নয়। সেটা তখনো অনেকে বুঝতে পারেন নি, এখনো পারেন না। কারণ এই দেশটি সুস্পষ্ট দুটি ভাগে বিভাজিত। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ মোটা দাগে, কিন্তু এছাড়াও সাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতার দ্বন্দ্ব, বাঙালি সংস্কৃতি গ্রহণ-বর্জনের সংকট, শিক্ষায়তনিক সনদধারীদের শিল্প-সাহিত্যের রসাস্বাদনের অক্ষমতা এই জনগোষ্ঠীর মাঝে সুস্পষ্ট এক বিভেদরেখা টেনে দিয়েছে। স্বাধীনতার সাথে সাথে যে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ প্রয়োজন এই ভূখণ্ডে তার ঘাটতি অনেকেই উপলব্ধি করেন না।

ইংরেজ শাসন ও সভ্যতার অভিঘাতে বাংলার জাগরণ ত্বরান্বিত হয়েছিল তা জোর করে অস্বীকার করা গেলেও একেবারে অসত্য বলে মানা যায় না। তবে তা একদা শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং তারা ছিলেন মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। বাংলাভাষী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে তা তাৎক্ষণিক পৌঁছাতে পারে নি। বাঙালি মুসলমানদের আরেকটি বিভ্রান্তি ছিল কোন শিক্ষা তাদের জন্য জরুরি তা নির্ধারণ করতে না পারা। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যখন উনিশ শতকের যুগধর্মকে আলিঙ্গন করলেন, আধুনিক ও ইংরেজি শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন তখন মুসলিম সম্প্রদায় আরবি-ফারসি ভাষার শিক্ষাকে সর্বস্বজ্ঞান করে যুক্তিবাদিতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকেছেন। এ বিষয়ে গোপাল হালদারের পর্যবেক্ষণ এমন: ‘ভারতের তথা বাংলাদেশের বুকে স্বাভাবিকভাবে যে ইসলাম বিকশিত হয়েছে তাতেও মনে হলো ইসলামের নীতি লঙ্ঘন- ভারতের ও বাংলদেশের দুয়ারে যখন আধুনিক যুগের ডাক এসে পৌঁছেছে হিন্দু শিক্ষিতরা তাতে জাগ্রত হয়েছেন- মুসলমান শিক্ষিতরা তখন তার প্রতি মুখ ফিরিয়ে দূরে বসে রইল... তাই বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দুই-তৃতীয়াংশ বাঙালির সুস্থ, প্রাণবন্ত ভাবনা ও চেতনা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসও থাকে খর্বিত।’ তিনি আরো দেখেছেন যে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে মুসলমান বাঙালি নতুন করে সচেতন হয়ে উঠল। বিভক্ত দেশে ভাষার অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে তুলে বিজয় ছিনিয়ে নিল। মানতে দ্বিধা নেই যে, বাঙালি জাতিসত্তার প্রাণভোমরা হলো বাংলা ভাষা। স্বাধীনতায় যদি একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠা ঘটে থাকে তবে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি হয়ে ওঠে তাঁর আত্মপরিচয়। তিনি যখন বলেন, ‘... বাংলাদেশে বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাঙালি সাধনা শ্রেণী সঙ্কীর্ণতার বাধা উড়িয়ে দিচ্ছে, সর্বজনীন ও প্রাণবন্ত সংস্কৃতি হয়ে উঠছে, উনিশ শতকের বাঙালির অসম্পূর্ণ জাগরণ বাংলাদেশে রক্তের অভিষেক আজ লাভ করেছে পরিপূর্ণতার দীক্ষা,’ তখন অহঙ্কারে আমাদের বুক ফুলে উঠবারই কথা, কিন্তু যখন তিনি এই অভিমত রেখেছিলেন তখন বাঙালি-সংস্কৃতির বিরুদ্ধচেতনার চোরাস্রোতটি তিনি অনুভব করতে পারেন নি। আজ তার ভয়ঙ্কর গতি দেখলে তিনি হয়তো আঁতকে উঠতেন। এই সংস্কৃতি প্রাণবন্ত বটে কিন্তু ‘সর্বজনীন’ নয়, ছিল না কখনো। এখনো শিক্ষিত ও অশিক্ষিত উভয় শ্রেণিরই একটা অংশ বাঙালি সংস্কৃতিকে নিজের মনে করতে শেখেনি। এখনো তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দু-সংস্কৃতির সমার্থকরূপে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে; বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্তবুদ্ধি, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকে ইসলাম ধর্ম বিরুদ্ধ আখ্যা দিয়েই নিষ্ক্রিয় থাকে না, বরং ভয়ঙ্কর একটি সাংঘর্ষিক জায়গা নির্মাণ করে তাদের শারীরিকভাবে বিনাশ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়; একমাত্র ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষাই এই ভূখণ্ডের মুসলিমদের জাতিগত আত্মপরিচয় নির্মাণ করবে এমন একটি বিভ্রান্তির মধ্যে থেকে সহজে উগ্রবাদি হয়ে ওঠে। বাঙালি নয়, মানুষ নয়, বরং শুধুমাত্র মুসলমান হতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় যখন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের প্রাণ চলে যায় তখন সেই পৈশাচিকতাকে বৈধতা দান করার চেষ্টা করা হয় ধর্মের দোহাই তুলে। যখন মুক্তবুদ্ধির উপাসকদের তালিকা তৈরি করে গুপ্তঘাতক আঘাত করে চলে তখন বারংবার আমাদের হোঁচট খেতে হয়। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোতে হয়। বাংলাদেশ নিয়ে যে আশাবাদ মনীষীরা ব্যক্ত করেছিলেন সে গতিপথ ক্রমশ পাল্টে যেতে থাকে। যতটুকু এগোই বলে মনে হয়, তারচেয়ে কম পেছোই না। ভাষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের সংগ্রাম সিসিফাসের মিথের মতো হয়ে ওঠে। বারংবার নতুন করে শুরু করতে হয়। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিল না। এই বাংলাকে নিয়েই বারংবার খ্যাতিমান লেখকরা আশাবাদী হয়েছেন। ২০০২ সালে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের অন্তর্গত বাংলা বিভাগে ‘বাংলা ভাষার আত্মপরিচয়’ শীর্ষক এক বক্তৃতাতে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন: ‘একসময় কিছু কিছু মুসলমান লেখকও সংস্কৃত শব্দে হিন্দুয়ানির গন্ধ পেয়ে যতদূর সম্ভব অপ্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ চালাবার চেষ্টা করেছিলেন। তাকেই বলা হতো মুসলমানি বাংলা। সেসব লেখায় গ্রন্থের বদলে ‘কিতাব’, সুন্দরের বদলে ‘খুবসুরৎ’ ইত্যাদি ব্যবহার করা হতে লাগল জোর করে। মীর মশাররফ হোসেন, এস ওয়াজেদ আলি প্রমুখ লেখকেরা এ ধরনের মৌলবী বাংলা থেকে বাংলাকে উদ্ধার করেন। পূর্ব পাকিস্তানেও এক সময় সামরিক শাসকেরা বাংলা ভাষা থেকে হিন্দুয়ানি গন্ধ তাড়াবার জন্য জোর করে বেশি বেশি উর্দু ও আরবি শব্দ মেশাবার জন্য ফতোয়া জারি করেছিল। কিন্তু ভাষা প্রবাহিত হয় স্বাভাবিক নিয়মে, জোর জবরদস্তি করে তা বদলানো যায় না। পূর্ব পাকিস্তানের লেখকরা এই ফতোয়া একেবারে মানেন নি, বরং উল্টোটাই হয়েছে বেশি, আমি লক্ষ করেছি, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখকদের ভাষায় বেশি বেশি সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ স্থান পেত, সেই তুলনায় পশ্চিম বাংলায় লেখকদের রচনায় অবাধ ছিল উর্দু ও আরবি শব্দ।’
 


স্বাধীন  বাংলাদেশে অনেকেই বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশের যে অপার সম্ভাবনা দেখেছিলেন তার সামনে যে বাধা ছিল ক্রমে ক্রমে তা আরো প্রবল হচ্ছে। কারণ অনেক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচির বোঝা ভারী হওয়ার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার ধারাটি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। সাহিত্যের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও সাহিত্যের পঠনপাঠন উপভোগ করেন না। আর দশটা কেজো বিষয়ের মতোই সাহিত্য একটি বিষয়, নির্দিষ্ট শিক্ষাবর্ষ শেষে উত্তীর্ণরা শিক্ষায়তনিক স্বীকৃতি নিয়ে চাকরির বাজারে প্রার্থী ঘোষিত হয় মাত্র। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বোধহীন একটি জাতি কতটা ভয়ঙ্কর তার প্রমাণ চতুর্দিকে। একসময় উগ্রবাদী হামলার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতদের দায়ী করা হতো যা অনেকাংশেই সত্য ছিল। কিন্তু এখন তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এই ঘটনাগুলো আমাদের কী বার্তা দেয়? বিশাল শিক্ষিত পেশাজীবী শ্রেণির দিকে দৃষ্টি ফেরালে যে চিত্র চোখে পড়ে তা-ই বা কতটা আশা জাগানিয়া! শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের রসাস্বাদনে তারা কী আশ্চর্য্য রকমের অক্ষম তা দৃষ্টি এড়ায় কি! ‘গান-টান, নাটক-ফাটক, কবিতা-টবিতা, নাচ-টাচ’ তারা কদাচিৎ শোনেন বা দেখেন অথবা শোনেন না বা দেখেন না। একবিংশ শতাব্দীর ধড়ের ওপর মধ্যযুগের একটি মস্তিষ্ক নিয়ে দাপটের সাথে চলে ফিরে বেড়াচ্ছেন। হালাল খাবারের প্রতি অনুরাগ সীমাহীন হলেও হালাল উপার্জনের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এখানে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, রাষ্ট্র কী ভূমিকা রাখছে? শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী যে শব্দগুচ্ছ সংযোজন করা হয়েছিল সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। বন্যজন্তুকে কেউ কেউ শখ করে গৃহে পালন করেন বটে, কিন্তু তার জন্য তাকে একসময় চরম মূল্য দিতে হয়। এদেশের শুভবোধ সম্পন্ন একটি গোষ্ঠী সর্বদা সেই আশঙ্কাই করেন।

ভাষার বিকৃতি নিয়ে উদাসীন থাকা আর কতকাল? কিছু কিছু গণমাধ্যমে বিকৃত বাংলা উচ্চারণ ভাষার মানের অবনমন ঘটাচ্ছে। এটা রোখা না গেলে একসময় ওটাই হয়তো একটি মানদণ্ড রূপে চিহ্নিত হবে। আঞ্চলিকতা ভাষার সৌন্দর্য, কিন্তু প্রমিত বা মানভাষা একটি থাকতেই হবে। তাকে শিক্ষিত বা অভিজাত শ্রেণির ভাষা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংস্কৃতির ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ তার নিঃস্বার্থ চর্চার জায়গাটিকে ক্রমেই সংকুচিত করে ফেলছে। শহুরে সংস্কৃতিকর্মীরা এখন আর নিজস্ব দায়বদ্ধতা থেকে কিছু করতে আগ্রহী নয়। কর্পোরেট হাউসগুলোর দরজায় হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহৃত হতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যক্তিগত লাভের কাছে নতি স্বীকার করেছে। সেক্ষেত্রে ভরসার জায়গাটি ছিল প্রান্তিক মানুষের মাঝে লোক সংস্কৃতি চর্চার প্রবাহমান ধারাটি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গায়ক খ্যাতির কাছে তার লেখক খ্যাতি ম্লান হয়ে আছে। কিন্তু কী অসাধারণ তাঁর কলমের জোর! ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ বেদন ও তার অন্তরের ভাষা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন: ‘বিদেশি ধরনের হাসি, কাশির অভ্যাস থেকে বহুদূরে বাংলার গ্রাম-সমাজ ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, অশিক্ষা, শত কুসংস্কারের বেড়াজালের বাঁধনের ভিতর থেকেও বাঁচিয়ে রাখল বাউল, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, চটকার মতো মাটির গন্ধমাখা অসংখ্য ছড়া ও গানের এক উদার সবল সংস্কৃতি। শরীরে ব্যাধি অথচ কণ্ঠে হার-না মানা সুস্থ জীবনের পদ্য, গান; হাত আর আঙুলের টানে জীবন্ত হয়ে ওঠা আলপনা, মাটি আর কাঠের পুতুল, পুতুলের নাচ, কথকতা আরো কত কী! সংঘাত তীব্রতর হলো যখন ইতিহাস-বিস্মৃত বাঙালির শিকড়কে অগ্রাহ্য করার, এমন কি ঘৃণা করার দুর্মতি হলো। নিজভূমে পরবাসী হওয়া থেকে বাঁচার তাগিদেই এখন তাই ইতিহাসের প্রেক্ষিতে ব্রাত্যজনের রুদ্ধবেদনের সঙ্গে সহমর্মিতা ভীষণ জরুরি, এদের নিত্যনিয়ত সাহচর্যেই যদি শাপমুক্তি ঘটে!’ খুব খাঁটি কথা!  কিন্তু সেখানেও উগ্রবাদের ভয়ঙ্কর থাবা। বাউল ও লোকশিল্পীদের ওপর ক্রমাগত আঘাতের মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষকে সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার আয়োজনে উগ্রবাদ বেশ সফল। আমাদের সংস্কৃতিকে এখন বাঁচাবে কে? সংগ্রাম কোথা থেকে শুরু করতে হবে? সবাই বলবেন শিক্ষা থেকে। সরকারি বেসরকারি নানা ধরনের শিক্ষার ভিতর দিয়ে কৌশলে মৌলবাদ ও উগ্রবাদের রোপন করা বীজ থেকে চারা গজিয়ে বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়ে এখন ফল দিতে শুরু করেছে যার মূলোৎপাটন খুব সহজ নয়। কিন্তু তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময়ও এটা নয়।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আজ বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তা এক অর্জন বটে। তাকে উদযাপন করতে কত আয়োজন! কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা কয় ধাপ এগোলাম, নাকি পেছোলাম? সেই সূচক আমরা নির্ধারণ করেছি কি? শরীরের একটা অঙ্গ বেড়ে যাওয়া স্বাস্থ্য নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি এদেশ যদি ভাষা-শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমানতালে এগিয়ে না যায় তাহলে এই উন্নয়ন ধরে রাখা কষ্টকর হবে। অর্থনীতি যদি উন্নতির ভিত্তি হয়ে থাকে, তবে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো তার আত্মপরিচয় নির্মাণ করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বাঙালির ভাষা-শিল্প-সংস্কৃতির ওপরই বারংবার আঘাত এসেছে। সাহসী মুক্তবুদ্ধির বাঙালি তার মোকাবেলা করেছে, কিন্তু আঘাত থেমে থাকেনি। তাই অবিরাম চলতে থাকে অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। আর তাতে জয়ী হওয়ার কোনো বিকল্প আছে কী?




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ এপ্রিল ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton