ঢাকা, রবিবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ মে ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

জেলেজীবনে বৈশাখ || হরিশংকর জলদাস

হরিশংকর জলদাস : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-১১ ৮:২৬:২৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-২২ ১১:৪৭:৪৬ এএম
জলরঙ ছবি: সারফুদ্দিন আহমেদ

জেলেরা জন্মগতভাবে ব্রাত্য, অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা, রাজনৈতিকভাবে অনুল্লেখ্য এবং সাহিত্যাঙ্গনেও আজ তারা অবহেলিত বৈদিকযুগ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত, দু’একটা ব্যতিক্রম ছাড়া জেলেরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কুরুরাজ শান্তনু মৎস্যগন্ধা ওরফে সত্যবতীকে পাওয়ার জন্যে মহাভারতীয় যুগে একবার দাশরাজা অর্থাৎ জেলেরাজার দ্বারস্থ হয়েছিলেন। আরবার রামপালের রাজত্বকালে (১০৭২-১১২৬ খ্রিস্টাব্দ) কৈবর্তরা বিদ্রোহ করেছিল। দিব্যোক, ভীম এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কৈবর্তবিদ্রোহ বাংলার সামাজিক ইতিহাসে প্রবল গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। পাল রাজাকে পরাজিত করে কৈবর্ত দিব্যোক বরেন্দ্রভূমিতে কৈবর্তশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পালরা বৌদ্ধ রাজা। তাঁদের রাজত্বকালে জাতপাত ও শ্রেণীবিভাজন প্রশ্রয় পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু এই বৌদ্ধরাও কৈবর্তদের উত্থান মেনে নিতে পারেননি। কৃষিজীবী ও মৎসজীবীরা শাসক হবেন, প্রজার প্রশংসা পাবেন-এই ঔদ্ধত্য বৌদ্ধরাজারা ক্ষমা করতে পারেননি। সেদিন নিরেট শ্রেণীস্বার্থে রামপালের সঙ্গে অন্যান্য সামন্ত রাজারা যোগদান করেছিল। এই যৌথবাহিনী ডমর নগরকেন্দ্রীক কৈবর্তশাসনে আঘাত করেছিল। সেই আক্রমণে টিকে থাকতে পারলে আজকের বাংলার সংস্কৃতির ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখিত হতো। মনু-পরবর্তীকালে (আনুমানিক ২০০খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) ‘ব্রাত্য’ শব্দটির অর্থ দাঁড়িয়েছে অবনতিবাচক বা নেতিমূলক। অর্থাৎ ‘ব্রাত্য’ শব্দের দ্বারা বোঝানো হয় তাদেরকে, যারা ব্রত থেকে চ্যুত বা ভ্রষ্ট। বৈদিক সাহিত্য, রামায়ণ ও মহাভারতে যারা পতিত ব্রাত্য শ্রেণী, আজকের দৃষ্টিতে তারা কোণঠাসা নিম্নবর্গ, হরিজন দলিত, ছোটলোক ইত্যাদি। প্রাচীন সাহিত্যে রজক, চর্মকার নট, বরুড়, মেদ, ভিল্ল ও কৈবর্ত-এই সাতটি শ্রেণী অন্ত্যজ বা ব্রাত্যরূপে উল্লিখিত। সময়ভেদে এবং অঞ্চলভেদে কৈবর্তের নানা নাম। যেমন মৎসঘাতী, মৎস্যজীবী, মাছধরা, মাছমারা, জেলে, পাতর, ধীবর, রাজবংশী, কেওট, কৈবর্ত, দাশ, মালো, মল্লবর্মণ, গাবর, মেছো, মাউছ্যা, জইল্যা, জলদাস ইত্যাদি।

‘জলদাস’ মানে জলে ভৃত্য। জলের অপর নাম যদি জীবন হয়, তাহলে জেলেরা জীবনের গোলাম, অন্য কারো নয়। ‘জ’ দিয়ে জন্ম ‘ল’ দিয়ে লয়, তাহলে ‘জল’ শব্দটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে জন্ম এবং মৃত্যু। এদিক বিবেচনা করে বলা যায়-জন্ম এবং মৃত্যুর অধীন যারা, তারাই জলদাস। জেলেরা জলপুত্র। জলের খেয়াল খুশির ওপর এদের বাঁচা মরা। জলাশয়ে জল ফুরিয়ে গেলে এদের নিদানের শুরু, জলধারা যৌবনবতী হয়ে উঠলে এদের জীবনে সুদিনের সূচনা। বৈশাখ থেকে চৈত্র এই বারো মাসকে ঘিরে জেলেদের জীবন আবর্তীত। তাদের কাছে এক একটি ঋতুর এক এক রং। ফাগুন-চৈত্র-বৈশাখ- এই তিনটি মাস জেলেরা দুঃসহ জীবন যাপন করে। সমুদ্র-নদী, খাল-বিল এসময়ে জলশূন্য হয়ে পড়ে। খাল-বিলের তলদেশে ফাটল ধরে। জেলেজীবনে খাদ্যাভাব চৈত্রের শেষে এমন রূপ নেয় যে, একে দুর্ভিক্ষও বলা যেতে পারে। পুরুষরা নিষ্কর্মা দিন কাটায়। বাচ্চাকাচ্চারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ঘনঘন মায়ের মুখের দিকে তাকায়। এরকম দুঃসময়ে জেলে জীবনে পহেলা বৈশাখ আসে। পহেলা বৈশাখের আগে আসে চৈত্রসংক্রান্তি।

চৈত্রের শেষে দিনে অনুষ্ঠেয় চৈত্রসংক্রান্তি জলপুত্রদের জীবনে বেঁচে থাকার প্রাণরস যোগায়। বর্ণহিন্দুদের দুর্গাপুজো, মুসলমানদের ঈদের মতো জেলেদের কাছে গঙ্গাপুজো, মনসাপুজো ও চৈত্রসংক্রান্তি সমান গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

চৈত্রসংক্রান্তির এক-দুদিন আগে বাঁশের খোপে জমানো টাকা স্বামীর হাতে তুলে দেয় জেলেনারীরা। সেই টাকা দিয়ে গেঁয়োবাজার থেমে শিমবিচি, সিদ্ধচাল, খৈ-এর ধান, গুড়, নারকেল, কাঁচাবাদাম কিনে নিয়ে আসে জলপুত্ররা। ঠাকুমারা, মায়েরা, পিসিরা সারারাত জেগে মুড়ি-খৈ ভাজে, মোয়া-নাড়ু বানায়, আটকড়ইয়া তৈরি করে।

চৈত্রের শেষদিন অর্থাৎ ৩১ চৈত্রের সকালে প্রত্যেক জেলে পরিবারের উঠানে আগুন জ্বালানো হয়। কিসের আগুন? এর ইতিহাস ভিন্নতর। এই ইতিহাস উচ্চবর্ণীয় সামাজিক ইতিহাস থেকে ভিন্ন, কিন্তু বৈদিক-প্রথা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। অথর্ববেদকে ব্যাসদেব ২০টি কাণ্ডে, ৭৩১টি সূত্রে বিন্যস্ত করেছেন। অথর্ববেদ ৬হাজার মন্ত্রের সমষ্টি। অথর্ববেদের বিষয় হলো- ভেষজবিদ্যা, মাঙ্গলিক ক্রিয়াকাণ্ড, শত্রু বধের উপায় প্রভৃতি। এই অথর্ববেদের দিক-নির্দেশনাগুলোর আচরণগত চিহ্ন ছড়িয়ে আছে জেলেদের প্রথা-সংস্কারে। এই কথা অনুমান করা ভুল হবে না যে, সেদিনের জলপুত্র ব্যাসদেবের বিন্যস্ত অথর্ববেদের নির্দেশনাগুলোই আজকের জলপুত্ররা এখনো আচরণ করে যাচ্ছে।

৩০ চৈত্রের বিকেলে জেলে-সন্তানেরা দলবেঁধে নানা গাছের লতাপাতা, ডাল, শিকড় সংগ্রহে নেমে পড়ে। বেতের আগা, বটের পাতা, পাতাসুদ্ধ আমের ছোট্ট ডাল, কেয়ার ঝোপ, নিমপাতা, থানকুনিপাতা, বাঁশের ডগা, বাসকপাতা ইত্যাদি সংগ্রহ করে উঠানের ঠিক মাঝখানে স্তূপ করে রাখে তারা। চৈত্রসংক্রান্তির ভোরসকালে প্রত্যেক সন্তানবতী জেলেনি তার সন্তানদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় স্তূপীকৃত সংগ্রহশালায় পূর্বমুখী হয়ে ভক্তিভরে আগুন দেয়। একে বলা হয় ‘যাক দেয়া’। জেলেনারীরা কাকডাকা ভোরে শয্যা ত্যাগ করে সন্তানদের একে একে বিছানা থেকে তোলে। সবাইকে এনে স্তূপীকৃত সংগ্রহের পাশে দাঁড় করায়। তারপর নারীরা আগুন দেয় সেই ‘যাকে’। অল্প সময়ের মধ্যে ‘যাক’ থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরোতে থাকে। যাকের পাশে দাঁড়ানো সন্তানদের চোখে মুখে, সমস্ত শরীরে যাক থেকে নির্গত ধোঁয়া লাগে। এ সময় জেলেনারীরা উচ্চস্বরে বলে-

‘যাক্‌রে যাক্‌ যত আপদ বালাই আছে,

বিয়াগ্গিন হাত দইজ্যা পারই যাক।

যত টিঁয়া পয়সা ধন-দৌলত আছে,

বিয়াগ্নিন আঁর পোয়ার সিন্দুকত থাক্।

যত রোগবালাই আছে, যত শত্রু আছে,

বিয়াগ্গিন হাত দইজ্যা পারই যাক্।’

এই কথাগুলোর মধ্যে জেলেনারীর নিবিড় কামনা ঝরে ঝরে পড়ে। নারীরা কামনা করে নিজের পুত্র, তার সন্তান-সন্ততির যে বিপদ-আপদ, রোগ-বালাই, শত্রু আছে সেগুলো যেন ‘হাত দইজ্যা’ অর্থাৎ সাত সমুদ্র পার হয়ে সুদূরে চলে যায়। পৃথিবীর যত ধনসম্পত্তি আছে, তার সবগুলো যেন তাদের সন্তানের সিন্দুকে ওঠে। একজন অভাবী নারীর এই আকাঙ্ক্ষা কখনো পূরণ হয় না। রোগবালাইও জেলে-সন্তানদের ছাড় দেয় না, অভাবের রুক্ষ কঠিন পথে হাঁটতে হাঁটতে টুপটাপ করে জেলেরা মরে যায়। তারপরও জেলেনারীরা বছর বছর চৈত্রসংক্রান্তিতে তাদের আকূলতা-আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়ে যায়। জেলেসমাজ বহু প্রাচীন। প্রচীনতর অথর্ববেদীয় ভেষজবিদ্যার প্রয়োগ ও শত্রু দমনের লোকজপদ্ধতি জেলেসমাজে এখনো ‘যাক’ এর প্রতীকে প্রচলিত আছে।

চৈত্রসংক্রান্তির দিন দুপুরে প্রত্যেক জেলে পরিবারে রাঁধা হয় পাঁচন। পাঁচন হলো হরেক রকম তরকারির সমষ্টি। কাঁচা কাঁঠাল, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, কলমি শাক, বিলাতি আলু, মিষ্টি আলু, সজনে ডাঁটা, ডুমুর, লতি, বরবটি অর্থাৎ বাজারে ও পাড়াগাঁয়ের গাছ-গাছড়ায়, মাঠে-ঘাটে ভক্ষণযোগ্য যত ফল-ফলাদি, লতাপাতা পাওয়া যায় তার প্রায় সবগুলো দিয়ে জেলেনিরা পাঁচন রাঁধে। রান্না শেষে জেলেরা তাদের বাড়িতে বন্ধু-আত্মীয়দের ডেকে আনে। মা-ঠাকুমারা সেই অভ্যাগতদের পাতে পাঁচন, নাড়ু, খৈ ও গুড় দিয়ে সিদ্ধকরা শিমের বিচি দেয়। এভাবে ঐ দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে উদরপূর্তি করে জলপুত্ররা।

জেলেজীবনে পহেলা বৈশাখ শুরু হয় আযানভোরে। আজকাল পহেলা বৈশাখ নিয়ে শহুরে বাঙালিদের মধ্যে নানা উচ্ছ্বাস, নানা ওপর-চালাকি। হরেক রকম রঙদার ভঙি ও মেকি আচরণে শহুরে-বৈশাখ আজ জর্জরিত। এই বৈশাখেই লেখা হয়-বৈশাখ আমার নবান্নের ঘোষণাকারী, বৈশাখ আমার অস্থিরতার তুমুল গভীরে স্বস্তির শিশির বিন্দু। বৈশাখ আমার আনন্দমেলার ঝুমঝুমি, রত্মখচিত সৌন্দর্য। এই কথামালা দিয়ে শহুরে-বৈশাখ উদ্‌যাপিত হয়। এই উচ্ছ্বাস একদিনের, এ ভালোবাসা ক্ষণিকের। কিন্তু গাঁ-জীবনে বাঙালির বৈশাখ ক্ষণিকের নয়। জেলেজীবনেও বৈশাখ আসে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। বৈশাখকে বরণ করার জন্যে জেলে সম্প্রদায়ের চৈত্রজুড়ে প্রস্তুতি চলে।

পহেলা বৈশাখের সকালে জেলেনারীরা ঘুম থেকে উঠে নিমপাতার সঙ্গে কাঁচাহলুদ বেটে নারকেলের মালায় রাখে। সন্তানদের তাড়া দেয় পুকুর থেকে স্নান করে আসতে। স্নান করার আগে সেই নিমপাতা-হলুদবাটা দিয়ে ভালো করে শরীরের উন্মুক্ত অংশ রগড়িয়ে নিতে হয়। মা-ঠাকুমাদের একান্ত বিশ্বাস যে, এতে সারা বছর আর ঘাঁ-পঁচড়া হবে না। খোস-পঁচড়া অত সহজে ছাড় না দিলেও মা-ঠাকুমার বিশ্বাসে এখনো এতটুকু চিড় ধরেনি। স্নান সেরে বাড়িতে এলে জেলেনারীরা তোরঙ্গ থেকে কখনো নতুন জামা, কখনো বাংলা সাবানে ধোয়া পুরাতন জামা সন্তানদের দিকে এগিয়ে দেয়। সেই জামাকাপড় পরে বয়স-নির্বিশেষে জলপুত্রকে দুই হাতের মুঠিতে খৈ নিয়ে ঘাটার আগায় গিয়ে দুই কাঁধের পাশ দিয়ে, দুই উরুর নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে নেই খৈ উড়িয়ে দিতে হয়। জেলেদের এই বিশ্বাস যে, খৈ বাতাসে যেভাবে উড়ে যায়, শত্রুও সেরকম করে দূরে বহুদূরে অদৃশ্য হয়ে যাবে। এই অবশ্যকরণীয় কাজটি শেষ করে জেলেসন্তানরা, মধ্যবয়সীরা এমনকি বয়োজ্যেষ্ঠরাও তাদের চেয়ে বয়স্কদের প্রণাম করতে বের হয়। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য! সারা বাড়ি বাড়ি যায় এবং তাদের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের কখনো পা ছুঁয়ে, কখনো সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। প্রণাম গ্রহণকারীরা তখন প্রাণ খুলে আশীর্বাদ করে। শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ ভুলে পহেলা বৈশাখে জেলেরা প্রণামের এই প্রক্রিয়াটি সূর্যাস্ত পর্যন্ত চালিয়ে যায়।

জলপুত্রদের বৈশাখ উদযাপন ন্যাকামিতে পূর্ণ নয়, বরং প্রাণের ছোঁয়ায় উজ্জীবিত। জেলেদের মধ্যে ঐদিন পান্তাভাত খাওয়ার ধুম পড়ে না, বরং সারা বছর পান্তাভাত গলাধঃকরণের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চায় তারা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ মে ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC