ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৭ আষাঢ় ১৪২৫, ২১ জুন ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ভালোবাসার হালখাতা || মঞ্জু সরকার

মঞ্জু সরকার : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-১৭ ১০:৪৮:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-১৭ ১০:৪৮:১৬ পিএম

সৌদি আরবে শিক্ষকতা পেশা নিয়ে যেসব বাংলাদেশি এসেছে, তাদের মধ্যে হাসান-জোবায়দা দম্পতিকে দেখে বাঙালি ভাবা কঠিন। ধর্ম-পরিচয় তাদের কেবল নামের মধ্যেই ফোটে। জিজান বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ের লেকচারার তারা। হাসান ছেলেদের কলেজে, জোবায়দা মেয়েদের কলেজে। একই গাড়িতে যাতায়াত করে, থাকেও অভিন্ন বাড়িতে। এ দেশে আসার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী ছিল দুজন। ভালোবেসে বিয়ে করেছে। কিন্তু এতসব মিল সত্ত্বেও প্রবাসে দাম্পত্য জীবনে কতটা সুখী এবং সার্থক তারা, বাইরে থেকে বোঝা আরো কঠিন।

ঘরের বাইরে সে-দেশে মেয়েরা তো জাতি-বর্ণ এবং সুখী-দুঃখী নির্বিশেষে কালো বোরখায় আবৃত জীব, পুরুষচোখে বড়জোর মেয়েমানুষ। কে আর বুঝবে কার বোরখার নিচে শাড়ি আছে এবং কার চোখের ভাষা সোচ্চার হলে কণ্ঠ থেকে বাঙলা কি আরবি বেরুবে! হাসান নিজেও সুপার মার্কেটে বোরখাওয়ালিদের ভিড়ে একবার জোবায়দাকে চিনতে ভুল করেছিল। একইরকম আকৃতির একজনকে স্ত্রী ভেবে কাছে ডেকে গায়ে হাত দিয়েছিল প্রায়।  অচেনা দৃষ্টির অগ্নিবাণে দগ্ধ হওয়ার আগেই ‘সরি’ বলে তফাতে গেছে। হাসানের চেহারা এবং বেশভূষায় বাঙালিয়ানা ও  ধর্মের ছাপ নেই। সৌদিতে বাস করেও মাথায় টুপি চড়ায়নি  কোনোদিন। ক্ষুদ্র শিরবস্ত্রটি বাসায়ও নেই। চেহারা দেখে অনেক সৌদি তাকে ইন্ডিয়ান, তুর্কি কিংবা মিশরিয় ভাবে। পশ্চিমা পোশাকে কেতাদুরস্ত হয়ে কর্মস্থলে যায় সে। বাকি সময় ঘরে এবং গাড়িতেও গ্রীষ্মের উপযোগী  ঘরোয়া পোশাক। পরনে হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি, মাথায় কখনো-বা কাউবয় হ্যাট, আর চোখে বড় আকারের সানগ্লাস। ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রদের সঙ্গে যেমন, তেমনি স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় সময় কথা হয় ইংরেজিতে। একমাত্র সন্তান পাঁচ বছরের নীলকেও ইংরেজিতেই বকাঝকা করে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে নিজের ব্যতিক্রমী লাইফস্টাইল দেখাতে হাসান প্রতি সপ্তাহেই রেড সী’র লোনা ঢেউয়ে লুটোপুটি খায়। গাড়িসহ কোনো পাহাড়চূড়ায় উঠে  প্রকৃতি দেখে। মরুভূমির হাইওয়ে ধরে ১৪০ কি.মি. বেগে ছুটে চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সাপ্তাহিক ছুটির দুদিন বেশিরভাগ সময় গাড়িতেই কাটায় সপরিবারে। গাড়িতে কিংবা কোনো পার্কে বসে লাঞ্চ কি ডিনার খায়।

পুরনো গাড়ি পাল্টে নতুন ল্যান্ডক্রুসার কেনার পর থেকেই গাড়িপ্রীতি এবং বাইরের টান বেড়েছে তার।  জোবায়দাকে তার কলেজে এবং নীলকে স্কুলে দেয়া-নেয়ার দায়িত্ব ছাড়াও নিজের কলেজে যাতায়াত করতে হয় ঘড়ি ধরে। শ’ দুয়েক মিটার দূরে দোকানে যেতে হলেও গাড়িতে চড়ে যায়। তারওপর আছে ছুটির দিনে বেড়ানোর নেশা। ছেলেটাও হয়েছে বাপের মতো। বাসায় শতেক খেলনা নিয়ে একা থাকার বদলে বাপের কারে এসি ও মিউজিক ছেড়ে দিয়ে দুরন্ত গতির মধ্যেই থাকতে ভালোবাসে। অ্যাডভেঞ্চার ও বেড়ানোর আনন্দেই হয়তো-বা, বাপ-ছেলে দুজনে গাড়িতেই উৎফুল্ল থাকে বেশি। নীল মরুভূমিতে উট দেখে খুশি হয়, পাহাড়ে বানর দেখে খুশি হয়, সমুদ্রে পাখি দেখে খুশি হয়, রাস্তায় যানবাহনের স্রোতে নানা আকৃতির গাড়ি দেখেও খুশি হয়। খুশির ভাগ দেয়ার জন্য মায়েরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গাড়িতে উঠলে প্রায়ই মাথা ধরে জোবায়দার। আসলে তার বড্ড ভয় করে। ছেলেসহ তাকে সী-বিচে বসিয়ে হাসান সমুদ্রে নামলে রেডসীতে স্বামীকে হারিয়ে ফেলার ভয়টা চলকে ওঠে মনে। গাড়িতেও তেমনি দুরন্ত গতি সহসা থেমে যাওয়ার ভয়টা জাগে। গায়ের কালো বোরখার মতো খোলা মুখে বিষণ্নতা ঘন হয়ে ওঠে কখনো-বা। গাড়ি চালনায় সতর্ক হাসান কিংবা গতিময় বিশ্ব দেখতে মগ্ন নীল টের পায় না। কিন্তু জোবায়দা উইন্ডোগ্লাসে চোখ রাখলেও, অন্তহীন মরুভূমির উত্তাপ ও শূন্যতার মাঝে লীন হয়ে যাওয়ার ভয়ে আচ্ছন্ন থাকে অনেক সময়।

নিজেও বোঝে জোবায়দা, ভয়টা আসে দেশ এবং স্মৃতি থেকেও। আর দুর্ঘটনার ভয় তো অন্তরে সুপ্ত হয়ে আছেই। সৌদিতে আসার বছরখানেক পর তার ঘনিষ্ঠ এক কলিগ রোড-অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। এরপর দূরে কোথাও  যেতে নিজেদের পুরনো গাড়িতে উঠতেও ভয় করত। একবার পাহাড়ে ওঠার সময় অল্পের জন্য গহীন খাদে ছিটকে পড়েনি তাদের গাড়ি। বেপরোয়া হাসান সাহস দিয়েছে, অ্যাকসিডেন্ট হয় বলে একটি গাড়িও কি চলা থামিয়েছে?নতুন এ গাড়িটা কেনার সময় যুক্তি দিয়েছিল, দুর্ঘটনার ভয়টা কমবে অবশ্যই। সার্ভিসিং চার্জ লাগবে না, চার বছর গাড়ি কোনোরকম ত্রুটি দেখা দিলে কোম্পানি প্রয়োজনীয় পার্টস বদলে সারিয়ে দেবে। এ দেশে তেলের দাম যখন পানির চেয়েও সস্তা, এই সুযোগে বেড়ানোর শখটা মিটিয়ে নেয়াই উচিত। তাছাড়া আরবের বদ্ধ সমাজে গাড়ি দাবড়ানো আর সুপার মার্কেটের কেনাকাটা ছাড়া জীবনে ভালোলাগার মতো আর আছে কী ছাতা?

‘আমরা কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাতে এ দেশে এসেছিলাম হাসান।’

‘এ দেশে আমাদের ভবিষ্যৎ নেই। অনেক টাকা নিয়ে দেশে ফিরলে আমরা সুখে থাকব কি না,  তুমিও জানো না, আমিও জানি না। যে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, সেও জানে কি না আমার সন্দেহ আছে।’

গাড়িতে চালক স্বামীর সঙ্গে তর্ক করে না জোবায়দা। কিন্তু কথা বন্ধ রাখলেও ঝগড়াটা একতরফা মনের অশান্তি বাড়িয়ে চলে। এই ছেলে জোবায়দাকে বিয়ে করার জন্য নিজের পরিবার ত্যাগ করেছে। দেশে সরকারি চাকরির ভবিষ্যৎ তুচ্ছ করে, স্ত্রীর বেতনের উপর নির্ভরশীল হতে সৌদি আরবে ছুটে এসেছে। এখন হাসান স্ত্রীর সমান রোজগার করে। তার পক্ষে নিজের ভোগসুখে বৈচিত্র্য আনার জন্য ভালোবাসার স্ত্রীকেও ত্যাগ করাটা মোটেও কঠিন কাজ হবে না।

এটা ঠিক যে, সৌদি আরবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কি শিক্ষকের চাকরি করতে এসে গাড়ি সবাই কেনে। কিন্তু হাসানের গাড়ি দেখেও তার ভোগ-বিলাসিতা আঁচ করতে পারবে সবাই। নিজের বেতন ও লোনের টাকায় কুলায়নি, জোবায়দাকেও পঞ্চাশ হাজার রিয়াল লোন করতে হয়েছে। গাড়ি কেনার এক সপ্তাহ পর  স্ত্রীকে ওমরা করাতে মক্কায় ছুটে গেছে। নিজের ভবিষ্যৎ বা পরকালের কথা ভেবে আজ পর্যন্ত আল্লার পবিত্র ঘরে গিয়ে দু’রাকাত নফল নামাজও পরেনি, কিন্তু স্ত্রীকে ওমরা এবাদতের সুযোগ করে দিতে ছেলেকে নিয়ে হারামশরিফে ঘুরে বেড়িয়েছে হাসান।

মক্কায় গিয়ে একাধিকবার ওমরা করেও স্বামীকে ঘিরে ভয় কাটেনি জোবায়দার। রাস্তায় দুর্ঘটনার কথা ভাবে না আর। কিন্তু হাসানের বেপরোয়া সাংঘর্ষিক স্বভাব ঘরের শান্তি নষ্ট করে প্রতিদিন। সে বাসায় অচল শান্ত থাকলেই বরং জোবায়দার মনে অশুভ কিছু ঘটার ভয়টা সক্রিয় থাকে বেশি ।


দুই

গাড়ির মতো বাড়ির ব্যাপারেও বাড়াবাড়ি করেছে হাসান। আড়াইজন মানুষের ছোট পরিবার, কিন্তু চার রুমের বড় অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছে। প্রতি রুমেই এসি লাগানো। জিজান সিটির আবাসিক এলাকায় বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে বাড়িটাও দেখার মতো। গেটে সুদানি দারোয়ান থাকে সবসময়। গাড়ি থেকে নেমে বাসায় প্রবেশের সময় আরবের আবহাওয়া দু’এক মিনিটেই গায়ে যেন আগুন ধরিয়ে দিতে চায়। লিফটে তিনতলায় উঠে নিজেদের ফ্ল্যাটে ঢুকলে ভিতরের ঠান্ডা পরিবেশ গা জুড়িয়ে দেয় সত্য, কিন্তু একইসঙ্গে জোবায়দার ভয়-উদ্বেগও চাগিয়ে তোলে যখন-তখন। গাড়িতে থাকলে তবু পরিবারের সংহতি ও গতিশীলতা থাকে, কিন্তু নিজ বাসায় বন্দি কিংবা স্বাধীন হয়ে গেলেই যেন জীবন থমকে যায়। পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বলেই হয়তো সংসার লণ্ডভণ্ড হওয়ার ভয়টা জোবায়দার মনে প্রবল হয়ে ওঠে।

বাসায় ভয় ঝরানো নিস্তব্ধতা বিরাজের বড় কারণ অবশ্য নীলের বোবা নীরবতা। বোবা নয়, কিন্তু বোবার মতো চুপচাপ থাকে সে। একমাত্র কান্না ও রাগ-অভিমানের সময় মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে কিছুটা চিৎকার করে, বাকি সময় চুপ। আপন মনে সারাক্ষণ খেলে। এঘর-ওঘর ছোটাছুটি করে একা। আর ক্লান্ত হলে মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। বাবা-মায়ের দুর্বোধ্য বাংলা অগ্রাহ্য করে সাধারণত বডি ল্যাঙ্গুয়েজে নিজের ভাব প্রকাশ করে নীল।

বছর দুয়েক আগেও ছেলের প্রতিবন্ধী বোবা-কালা হয়ে যাওয়ার ভয়টা মানসিক অশান্তির বড় কারণ ছিল। প্রবাসী তিনটি পরিবারকে চেনে তারা, যারা এ দেশে বাচ্চা নিয়েছে, কিন্তু বাচ্চার বয়স চার-পাঁচ হওয়ার পরও কথা বলে না এখনও। নীল যাতে তাদের মতো না হয়ে যায়, সে জন্য প্রথমদিকে ছেলের কানে মাতৃভাষায় মেলা আগডম-বাগডম করেছে জোবায়দা। ছুটিতে দেশে গেলে আত্মীয়-স্বজনরাও তাকে কথা বলাতে চেষ্টা করেছে বিস্তর। কিন্তু বাংলায় সাড়া না দেয়ার ব্যাপারে নীলের পাকা সিদ্ধান্তটি পরিষ্কার হয়েছে অল্প সময়ে ইংরেজি বর্ণমালা ও কিছু শব্দ বিড়বিড় করে উচ্চারণের পরই। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছে, বাসায় ইংরেজিতেই ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়ার পর ছবির বই মেলে ধরে বিড়বিড় করে পড়ারও চেষ্টা করে।

ছেলের খেলার জন্য একটা ঘর বানানো হয়েছে। লাফানোর জন্য স্প্রিংবেড থেকে শুরু করে দোলনা, হাতি, ঘোড়া, বাঘসহ নানা আকার ও রঙের গাড়ি আছে অন্তত দুই ডজন। কিছু কিছু খেলার সাথী ব্যাটারির জোরে নিজেরাই চলাচলে সক্ষম। ফলে নীলের খেলার সাথীরা ছড়িয়ে আছে গোটা বাড়িতেই। কিছু খেলনা জীবন্ত খেলার সাথী ভেবে ওদের সঙ্গে ছোটাছুটি করে নীল বেশ মজা পায়। সমবয়সী খেলার সাথীর অভাব বাবা-মাও পূরণ করার চেষ্টা করে অনেক সময়। কিন্তু ছেলের সঙ্গে সব খেলাতেই পাঁচ-সাত মিনিটেই বড় হাঁপিয়ে যায় হাসান। ধৈর্যহারা হয়ে কখনো-বা প্রচণ্ড ধমক দেয়। গাড়িতে অনেক সময় দেয় বলে বাসায় এলেই নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে একা থাকতে ভালোবাসে। একা হওয়ার জন্য বাসার একটা ঘর স্টাডিরুম বানিয়েছে হাসান। জোবায়দা সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারে না।ছেলেকেও বাপের নানা বদভ্যাস থেকে মুক্ত রাখতে চায়। হাসান তাই স্টাডিরুমের দরজা বন্ধ করে বিষ পান থেকে শুরু করে যা খুশি তাই করতে পারে। স্টাডিরুমে একটা বইও নেই, বইপত্র পাঠের ক্ষুধা ও সামাজিকতা মেটায় ল্যাপটপে কি আইফোনের স্ক্রীন। দেশে ভাই-বোনকে ফোন করেও বাবা-মায়ের খোঁজ নেয়ার গরজ দেখায় না হাসান। তারপরও ফেসবুকে কিংবা ফোনে দীর্ঘসময় কার সঙ্গে যে সে চ্যাট করে, জোবায়দা এক বাসায় থেকেও জানতে পারে না। ঝগড়া হলে সারারাত স্টাডিরুমের বিছানায় একা ঘুমাতেও তার অসুবিধা হয় না।

স্বামী স্টাডিরুমে বিচ্ছিন্ন হলে জোবায়দা ছেলেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করে। খেলার সঙ্গী ও দর্শক হয়ে উৎসাহ যোগায়। নিজের হাতে খেতে পারে না নীল। খেলার সময় ছেলেকে খাওয়ানোর কঠিন কাজটি সম্পন্ন করে। নীল ঘুমিয়ে গেলেই হাসানের সঙ্গে দূরত্বটাও যেন আরো বেড়ে যায়। দূরত্ব সম্পর্কটা পোক্ত করতেই এ দেশে আসার পরই বাচ্চা নিয়েছে। দু’মাসী বাচ্চাকে নিয়ে কলেজে যাতায়াত করেছে। এ দেশে মেয়েদের কলেজে বেবিকেয়ারের ব্যবস্থা থাকে। মিশরিয় আরবিভাষী বেবিসিটারের দায়িত্বে, চার-পাঁচটি সৌদি বাচ্চার সঙ্গে নীলকে রেখে ক্লাস নিয়েছে জোবায়দা। ক্লাস নেয়ার ফাঁকে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাইয়েছে। এভাবে দু’বছর বয়স পেরুনোর পর, হাসানের কলেজ দুপুরের দিকে হওয়ায় ছেলেকে বাসায় নিজের দায়িত্বে রাখতে শুরু করেছিল সে। ফলে কথা শেখার বয়সে নীল মায়ের চেয়ে বাবার সান্নিধ্য পেয়েছে বেশি। কিন্তু বাপের অসহিষ্ণু রাগী স্বভাবের কারণেই কি না কে জানে, নীল আজীবন বোবা থাকার জন্য যেন পণ করেছে। বাচ্চার ভয় পাওয়া, শারীরিক কিংবা মানসিক আঘাতের বিষয়ে জানতে চেয়েছিল ডাক্তার। জোবায়দার সন্দেহ জেগেছে হাসানের উপর। কান্না থামাতে তার তীব্র ধমকই বাচ্চার ভয় পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় কি? রেগে গেলে স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে যে স্বামী, ছোট বাচ্চাকে ছুড়ে  দেয়াটাও তার জন্য অস্বাভাবিক নয়।

নীল ঘুমিয়ে গেলে টিভি দেখে কিংবা হাসানের মতো ফোন, ফেসবুক বা ইন্টারনেট ঘেঁটে এবং টিভি দেখেও রোজ সময় কাটায় জোবায়দা। বাধ্য হয়ে কিচেনেও যায়। প্রথমদিকে বেডরুমের পর রান্নাঘরটাই স্বামী-স্ত্রীর যৌথ কাজের জায়গা ছিল। কিন্তু এখন হাসান পারলে দু’বেলাই জিজানের নামকরা হোটেল থেকে খাবার কিনে আনবে, কিচেনে তবু ঢুকবে না। জোবায়দা কোনো রকমে চাল সিদ্ধ ডিম ভাজি ছাড়া রান্নার কাজটা ভালো পারে না। আর রান্নার ব্যাপারে হাসান যে স্ত্রীর চেয়েও হাজার গুণে পটু, চাকরি হওয়ার আগে নানারকম রান্না করে প্রমাণ দিয়েছিল। আজ কিচেনে ঢুকে জোবায়দা মরিচ-পেঁয়াজ কিছুই খুঁজে পায় না।

ডাকাতের মতো হিংস্র মেজাজ নিয়ে স্টাডিরুমের দরজায় ধাক্কা দেয় জোবায়দা। বাসায় মানুষ বলতে স্বামী-স্ত্রী, তারপরও স্টাডিরুমের দরজা লক করে রাখে হাসান। ভিতরে কোনো কুমতলব না থাকলে স্ত্রীর কাছ থেকে এমন আড়াল রচনা করে কোনো স্বামী? ভয় ছিল, দরজা খুলে হাসানও ধমক দেবে। ভয় জয় করা সাহসও তৈরি ছিল, হাসান মেজাজ দেখালে বাড়ির দুর্বিষহ নিস্তব্ধতা ভেঙে চুড়মাড় করার জন্য জোবায়দাও আজ গলা সপ্তমে তুলবে। কিন্তু হাসান কানে মোবাইল ধরে হাসি মুখে দরজা খুলে দেয়। ফোন এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘ঋতু কথা বলবে তোমার সঙ্গে।’

ঋতু দু’জনেরই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী এবং প্রবাসী ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নিকট পড়শি না হলেও একমাত্র তার সঙ্গেই যোগাযোগটা হয় নিয়মিত। তুই-তোকারি সম্পর্ক। তার বাচ্চার জন্মদিন আগামী শুক্রবার। নীলকে নিয়ে  অবশ্যই যেতে হবে।  বন্ধুর সঙ্গে কথাবার্তা বলে ফোন রেখে দিয়েই জোবায়দা ঋতুর সুতা ধরেই ক্ষিপ্ত মেজাজটা ফিরিয়ে আনতে চায় আবার।

‘আমাকে বলার আগেই তুমি ঋতুর দাওয়াত অ্যাকসেপ্ট করেছো কেন?’

‘ঋতুর ছেলের জন্মদিন, আমরা না গেলে কে যাবে? আমাদের দুজনের সমস্যা নিয়ে ঋতুর সঙ্গে আজ অনেক আলাপ হলো।’

‘কী সমস্যা আমাদের?’

‘এ দেশে এসে আমরা খুব অসামাজিক হয়ে গেছি। বিশে^র সব দেশে বাঙালিরা রাজনৈতিক দলাদলি ও নানারকম সংগঠন করে, দেশের স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারিসহ নানারকম বাঙালি কালচার করে। এসব করে তারা পরস্পরের পিছনে লাগার এবং পরচর্চা করার সুযোগ তৈরি করে নেয়। কিন্তু আমাদের সেরকম কোনো সামাজিকতা নেই বলেই আমরা দুজনে দলাদলি করি। একে অন্যের বিরুদ্ধে লাগি। এই সমস্যা থেকে বেরুনোর  জন্য আমি একটা প্ল্যান ঠিক করে ফেলেছি।’

‘কী প্ল্যান?’

‘সামনেই বাংলা নববর্ষ। মনে আছে, বিয়ের আগের বছর বাংলানববর্ষে রমনার ভিড়ে আমাদের দেখা হয়েছিল?তারপর তুমি সেদিন আমাকে প্রথম বাড়িতে নিয়ে গেলে। শাশুড়ি আম্মা ইলিশের সঙ্গে পান্তাভাত, পাটশাক আর দু’রকমের যে ভর্তা খাইয়েছে, এখনো তার স্বাদ লেগে আছে মুখে। এবার জিজানের পার্কে আমি প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে বাংলা নববর্ষ আয়োজন করব। ঋতুকে বলেছি, অনুষ্ঠানে সে রবীন্দ্রসংগীত গাইবে। আর বাচ্চারা নানারকম মুখোশ পরে পার্কে খেলবে। প্রবাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নিউজটা ফেসবুকেও পোস্ট করে দেব আমি।’

বিবাহপূর্ব প্রেমের স্মৃতি জাগিয়ে তোলায় মনটা অনেক নরম হয়ে এসেছিল জোবায়দার। কিন্তু তাকে না জানিয়েই অনুষ্ঠানে ঋতুকে দিয়ে গান করার কথা হয়েছে জেনে বুকের ভিতরে চোরাকাঁটা খচ করে বেঁধে। চকিতে মনে পড়ে, নববর্ষের দিন সকালে রমনার ভিড়ে হাসানকে খুঁজে পেতে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। টেলিফোনে নিজের অবস্থান বোঝাতে গিয়ে মোবাইলের ব্যালেন্স শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই অপেক্ষার তিক্ত স্মৃতি নিয়ে বলে, ‘তুমি বাংলা নববর্ষ করতে চাইলেও কেউ আসবে না।’

‘আসবে না মানে! আমি নিজেই অতিথিদের জন্য পান্তা ভাত আর ইলিশ রাঁধব। ভর্তাও করব কয়েক রকম।’

‘অতিথিদের জন্য এত রান্নাবাড়ি করার উৎসাহ, এদিকে ঘরে বউবাচ্চাকে খাওয়ানোর বাজার করা হয় না কতদিন। ডিম ভাজার জন্য মরিচ-পেঁয়াজ পর্যন্ত খুঁজে পেলাম না। যাও আগে বাজার করে নিয়ে আসো, তারপর আমার একাউন্ট থেকে কত টাকা তুলেছো, আজকেই হিসাব দেবে।’

‘সব খরচ তো আমাকেই করতে হয়। এখন কথায় কথায় এত হিসাব চাও কেন?’

‘ছেলেসহ তুমি আমাকে পথে বসাবে, আর আমি হিসাব চাইব না? মগের মুল্লুক পেয়েছো?

‘আমাকে রাগিয়ে দিও না জো, সেদিনের মতো মার খাবে।’

হাসানের চোখে ক্রোধের অগ্নি দেখে জোবায়দারও ঝগড়ার প্রস্তুতিটা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। সহসা প্রচণ্ড চড় খাওয়ার স্মৃতিটাও গালে ঝনঝন করে জেগে ওঠে যেন। চেঁচিয়ে জবাব দেয়, ‘শাটাপ শুয়ারের বাচ্চা, তুই মারবি আর আমি মার খেয়ে কাঁদব? আবার মারতে আসলে তোকে খুন করে ফেলব আমি।’

এতটা রাগ যে ভিতরে জমে ছিল এবং প্রতিরোধে হাতের পেঁয়াজকাটা ছুরিটাও উঁচিয়ে ধরবে, জোবায়দা নিজেও বুঝতে পারেনি। হাসান গাড়ির চাবি নিয়ে দরজা সশব্দে বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে না গেলে ঝগড়াটা কোন পর্যায়ে গিয়ে থামত, বলা মুশকিল। 

পরাস্ত স্বামী বাজারে যাওয়ার পর জোবায়দা কিচেনে ঢুকে জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড করতে থাকে। কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিল ঝনঝন করে আওয়াজ দেয়। লণ্ডভণ্ড সংসার আজ হাসানকে দিয়েই গুছিয়ে নেবে সে।


তিন
ঋতুর ছেলের জন্মদিন অনুষ্ঠান ঘিরে জোবায়দা-হাসানের সন্ধি সাময়িক মধুর হয়ে ওঠে নিজেদের ছেলের স্বার্থ চিন্তা করেও। এ ধরনের অনুষ্ঠানে গিয়ে সমবয়সী খেলার সাথী পেলে নীল বেশ খুশি হয়। নীলের আগামী জন্মদিনটিও বাসায় বেশ ঘটা করে পালন করবে তারা। তার আগে জিজান পার্কে আসন্ন বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান আয়োজনেও হাসানকে সম্মতি দেয় জোবায়দা। কারণ তাদের যে সামাজিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন, এ বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একমত হয়। জিজান ইউনিভার্সিটি ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির কলেজগুলোতে কমবেশি বাংলাদেশি শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী রয়েছে আরবের সব শহরেই। কিন্তু ঘরে-বাইরে সমান অধিকার নিয়ে হাসান-জোবায়দার মতো সৌভাগ্যবান দম্পতি খুব বেশি নেই হয়তো। একা চাকরি করেও দেশ থেকে স্বামী বা স্ত্রীকে এনে পারিবারিক জীবন যাপন করছে, এমন বাংলাদেশির সংখ্যাই বেশি। ঋতু-মোমেন দম্পতিও এরকম। ঋতু চাকরি করে কিং খালেদ ইউনিভার্সিটিতে, আর তার স্বামী মোমেন ডিপেনড্যান্ট ভিসায় স্ত্রীর গাড়ি চালনা ছাড়াও সংসার ও সন্তান লালনপালনের সব কাজই করে। তাদের একমাত্র সন্তান শুভ নীলের চেয়ে মাত্র তিনমাসের ছোট। বড়দের মতো গুছিয়ে কথা বলে। গান গাইতে  পারে। শুভর পাশে নিজেদের ছেলেকে সত্যিই বোবা মনে হয়। একমাত্র ছোট শুভ নীলকে কখনোই বোবা ভাবে না। কাছে পেলে খুব খুশি হয়।

শুভর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য দুপুরের পরই স্ত্রী-পুত্রসহ গাড়িতে ওঠে হাসান। ঘণ্টাতিনেক গাড়ি চালিয়ে পাহাড়ি শহর আবহায় যেতে হবে। তার আগে প্রেজেন্টেশন কেনার জন্য শহরের সেরা শপিংমলে যায় তারা।

বড় বড় শপিংমলগুলোই যে সৌদি পরিবারের প্রধান বিচরণক্ষেত্র, বিশাল পার্কিং-এ গাড়ির ভিড় দেখেও বোঝা যায়। প্রায় প্রতিটি গাড়ি থেকে বোরখাওয়ালি এবং তাদের বাচ্চাকাচ্চা বের হয়। হাসান সাধারণত স্ত্রীকে কেনাকাটার স্বাধীনতা দিয়ে, বাস্কেট-ট্রলিতে ছেলেকে বসিয়ে নিজে ড্রাইভার কুলির ভূমিকায় থাকে। আজো টয় স্টোর থেকে অল্পসময়ে প্রেজেন্টেশন কেনার পর বাস্কেট-ট্রলি ঠেলার দায়িত্ব পালন করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা, কাল থেকে বাইরের হোটেলের খাবার সপ্তাহে দু’একবারের বেশি খাবে না। নিজেরাই যা হোক রেঁধে খাবে। রান্নার জন্য চাল-ডিমসহ প্রয়োজনীয় মশলাপাতি কিনে গাড়িতে রেখে দেবে। কেনাকাটা শেষে, সর্বশেষ আইটেম হিসেবে নীলের জন্য আইসিক্রম এবং নিজেদের জন্য দু’টা কফি নিয়ে গাড়িতে গিয়ে ওঠে তারা।

গাড়িতে জোবায়দা আজ হাসানের পাশে বসে। পেছনে নিজের আসনে বসে নীল আইসক্রিম খেতে খেতে বন্ধুর খেলনা পাহারা দেয়। সামনে বসলেও জোবায়দার মনোযোগ ছেলের দিকেই থাকে বেশি। আলগা চাইল্ড সিটে বসিয়ে সিটবেল্ট বেঁধে দিলে সিটে বসেও ঘুমাতে পারে নীল। দু’বছর বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে এভাবে গাড়িতে চড়ে অভ্যস্ত সে। বাসায় যেমন হাসান স্ত্রীকে এড়িয়ে একা থাকতেই ভালোবাসে, গাড়িতেও জোবায়দা তেমনি পেছনে বসে ছেলেকে সঙ্গ দিতে তৎপর থাকে। কিন্তু আজ কফির কাপে চুমুক দিয়ে, টুকটাক কথা বলে চালককে উৎসাহ দিতে ভালো লাগে তার।

‘আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে নীলের খেলনা হেলিকপ্টার নিয়ে যাওয়ার জন্য কাঁদছিল শুভ। আজ আমাদের হেলিকপ্টার গিফট পেয়ে খুশি হবে। ’

‘হ্যাঁ, প্রেজেন্টেশনের সঙ্গে মেমোটাও দিতে হবে। নইলে ঋতু-মোমেন নীলের পুরনো খেলনা ভাবতে পারে।’

‘মোমেন ছেলেটা কিন্তু বেশ প্রাকটিকাল। নিজে আয় না করলেও ঋতুর সংসারে সবকিছু একাই সামলায়। একা চাকরি করেও ঋতু আমাদের চেয়ে সুখেই আছে, কী বলো?’

‘এই শুরু হলো কম্পারেটিভ স্টাডি!’

‘বাহ, ভালোকে ভালো বলতে হবে না? ওরকম বর না পেলে ঋতু সংসার করতে পারত না। নিজেই প্রাউডলি বলে এ কথা।’

‘আমিও বা কম কিসে জো? কফি খেতে খেতে যাখন গাড়ি চালাই, নিজেকে কী মনে হয় জানো, সৌদি প্রিন্স! বাসায় ফিরলে প্রিন্স হয়ে যাবে বউয়ের গোলাম, গোলামির দিক থেকে ভেড়া মোমেনের চেয়ে আমি সেরা হবো। ঠিক আছে ম্যাডাম?’

মুখে গরম কফি থাকায় জোবায়দা না পারে হাসতে, না পারে গিলতে। চালকের দিকে ঝুঁকে তার গায়ে আদুরে কিল দেয়। হাসান ড্যাশবোর্ডে রাখা বক্স থেকে টিস্যু ছিড়ে স্ত্রীকে এগিয়ে দেয়। গরম এক ফোটা কফি লেগেছে তার গালে।

যে অশুভ ঘটনার ভয়ে গাড়িতে উঠলে জোবায়দা সচরাচর বিষণœ ও চুপচাপ থাকে, আজ তার ব্যতিক্রম ঘটানোর মাশুল দিতেই যেন পিছনে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে, ‘হায় হায়! আমার নীলুর কী হলো? গাড়ি থামাও জলদি।’

হাসান রাস্তার ধারে গাড়ি চাপায় এবং ব্রেক কষে। নীল আসলে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা ঝুঁকে পড়েছে সিটের সামনে। হাতের আইসক্রিম গড়িয়ে পড়েছে কালো সিটের ওপর।

গাড়ি থামলে ছেলের পাশে উঠে বসে জোবায়দা। হাসান ঘুমন্ত ছেলেকে পরীক্ষা করে বলে, ‘কিছু হয়নি। বাসাতেও ওর ঘুম পাচ্ছিল, ঘুমাচ্ছে। উহ! যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে! ধ্যাত্!’

‘আমি নীলকে দেখছি। তুমি সাবধানে চালাও।’

ঋতু-মোমেনের বাসায় পৌঁছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। দরজা খুলে দিয়ে মোমেনই স্বাগত জানায় এবং অভিযোগ করে। সবাই ঠিক সময়ে এসেছে বলে কেক কাটা হয়ে গেছে। শুভ নিজের চেয়েও কম ও বেশি বয়সের তিনটি ছেলেমেয়ের সঙ্গে ড্রয়িংরুমে কার্পেটের উপর খেলছে। নীল ছুটে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে যোগ দেয়। হাসান হাতের গিফট-বক্স মোমেনের হাতে দিয়ে, শুভকে কোলে নিয়ে ‘হ্যাপিবার্থ ডে’ বলে আদর-শুভেচ্ছা দেখায়।

ড্রয়িংরুমের সোফায় হাসানের পরিচিত, মুখচেনা ও অচেনা মিলে জনাসাতেক অতিথি। দরজার পাশে জুতো-স্যান্ডেল খুলে রেখেছে সবাই। নিজের জুতো খোলার সময় মেয়েদের অন্তত পাঁচ জোড়া জুতো-স্যান্ডেল দেখেছে হাসান। কিন্তু ড্রয়িংরুমে শুধুই পুরুষ অতিথি। কারণটা বুঝতেও বিলম্ব হয় না। এ দেশে মসজিদে মেয়েদের নামাজের জন্য যেমন আলাদা জায়গা, লেখাপড়ার জন্য আলাদা স্কুল-কলেজ, সামাজিক অনুষ্ঠানেও তেমনি পর্দানশীলরা থাকে পর্দার আড়ালে। প্রবাসী বাঙালিরাও বাসায় কোনো পার্টি দিলে সৌদি রীতি মেনেই হয়তো মেয়েদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করে। ঋতুও সেরকম ব্যবস্থা করেছে দেখে বিরক্ত বোধ করে এবং জোবায়দাকে নিজের পাশে বসতে বলে হাসান। মেয়েদের বসার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঋতু বন্ধু দম্পতিকে স্বাগত জানায়, ‘এই তোমরা এত দেরি করলে কেন? জো তুই আয়, আমরা ভিতরে বসি।’

ঋতু শাড়ি পরলেও মাথায় স্কার্প বেঁধেছে। হাসান ও জোকে অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়। আর হাসান সবার সামনেই ঋতুর সমালোচনা করে, ‘এই ঋতু, তুই বাসাতেও মেয়েদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করছিস কেন? তুই কি সৌদি রিলিজিয়ান পুলিশ হয়েছিস! মেয়েরা আমাদের পাশেই বসবে।’

‘তুই তো জোবায়দাকে পাশে বসিয়েছিস বাবা, অন্যদের ব্যাপারে জবরদস্তি করছিস কেন?’

‘জবরদস্তি নয়, সৌদি যুবরাজ সালমান ক্ষমতায় বসেই সৌদি সমাজের সংস্কারে হাত দিয়েছে। মেয়েরা গাড়ি চালাবে, স্টেডিয়ামে পুরুষদের সঙ্গে বসে খেলা দেখবে। ইউনিভার্সিটিতেও কো-এডুকেশন চালু হবে শিগ্গির। আজ পান্ডায় দেখে এলাম, হিজাব খুলেই ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি সৌদি মেয়ে।’

স্থানীয় হাসপাতালের বাংলাদেশি ডাক্তারটি বলল, ‘তরুণ সৌদি প্রিন্স যত সংস্কারই করুক হাসান, নবীজির জন্মভূমি এ দেশ কোরান-সুন্না অনুসরণ করেই চলবে। তুমি এ দেশে মেয়েদের হিজাব খোলার পক্ষে বলছো, ইউরোপ-আমেরিকাতেও মুসলিম নারীরা হিজাবের পক্ষে আন্দোলন করছে।’

কিং খালেদের চেনা শিক্ষকটি বলল, ‘ঘরে-বাইরে মেয়েদের সমান অধিকার নিশ্চিত না হলে নারীস্বাধীনতার কথা বলে লাভ নেই।’

হাসান চেনা ডাক্তারটির কথার জবাব দেয়, ‘দেশে আমরা নারী-পুরুষ একত্রে বাঙালি সংস্কৃতির জয়গান করি, পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিতেও সহজে প্রভাবিত হই, তারাই কিন্তু সৌদিতে এসে শিক্ষিত মেয়েদেরও বোরখা পরিয়ে পূণ্য সঞ্চয়ের তালে আছি। ডাক্তার ভাই, বলেন এটা হিপোক্রেসি নয়?’

ডাক্তার এবার সরাসরি খোঁচা দেয়, ‘তাহলে তোমার ওয়াইফ বোরখা পরে আছে কেন? তাকেই আগে বোরখা খুলতে বলো।’

জোবায়দা এবার স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে, ‘হাসান, তোমাকে এতো বিপ্লব করতে হবে না। সৌদি সরকারের টাকা কামাতে এসেছো, এ দেশের রীতিনীতি মেনে চলতে বাধ্য সবাই। চল ঋতু, পুরুষরা তর্ক করুক, দেখি তুই কী রান্না করেছিস?’

হোস্ট বান্ধবীকে নিয়ে জোবায়দা মহিলা অতিথিদের মাঝে আলাদা হয়ে স্বস্তি বোধ করে। চেনা-অচেনাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় হয়। কিন্তু আলাদা ঘরে বসেও ড্রয়িংরুমে হাসানের কথাবার্তা শুনতে কান খাড়া রাখে সে। সৌদি যুবরাজের ভিশন ২০৩০ থেকে শুরু করে সৌদি সমাজের ভালো-মন্দ নিয়ে কথা বলছে সবাই। যে কোনো আলোচনায় হাসানের বিরুদ্ধবাদী তর্কবাজ স্বভাবটা সহজে প্রকাশ পায়। বিয়ের আগে হাসানের স্পষ্টবাদিতা ও সারল্য বড়গুণ মনে হতো, এখন তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে চরিত্রের বড় দুর্বলতা। হিপোক্রেসি ঘৃণা করে বলে কৌশল করে চলতে পারে না একদম। ধর্মশাসিত দেশে চাকরি করতে এসে ঘরে হারাম জিনিস খাওয়া কিংবা মক্কা শরীফে গিয়েও ওমরা না করার যুক্তি প্রকাশ্যে দেখালে দেশের কোনো ধার্মিক তাকে সহজভাবে নেবে?হাসান এখন তাই করছে, সৌদি তরুণসমাজের উপর আমেরিকান সংস্কৃতির প্রভাব ও  মাদকাসক্তি বাড়ার প্রমাণ হিসেবে কোন ছাত্র তাকে বোতল গিফট দিতে চেয়েছিল, সেই গল্প শোনাচ্ছে।

ঋতুর সহকর্মী কিং খালেদেরে শিক্ষকটি হাসানকে সতর্ক করে, ‘ছাত্রদের এসব ব্যাপারে একদম প্রশ্রয় দেবেন না হাসান। তা হলে ওরাই আপনার নামে কমপ্লেন দিয়ে চাকরিচ্যুত করাবে। ছাত্রদের কমপ্লেনের কারণে আমাদের এক কলিগের চাকরি যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে কিন্তু।’

‘এ দেশে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সাংঘাতিকভাবে কাজ করে। রাজার বিরুদ্ধে ধর্মের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো সৌদিকে রা করতে শুনেছেন?’

হাসান যাতে অবাঞ্ছিত মন্তব্য করে শত্রুসংখ্যা  না বাড়ায়, সে জন্য কৌশলে তাকে নিবৃত করতে জোবায়দা আবার ড্রয়িংরুমে এসে হুকুম জারি করে, ‘এই হাসান, তুমি এদিকে একটু আসো তো। দেখো নীল-শুভরা ও ঘরে কীভাবে লাফাচ্ছে। ঋতু বলছে, রিমোর্ট চালিয়ে হিলকপ্টারটা একটু উড়িয়ে দেখাতে।’

স্বামীকে ছোটদের মাঝে ব্যস্ত করে জোবায়দা বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। দূরের পথ, নয়টার মধ্যে রওয়ানা না হলে বাসায় পৌঁছতে বারোটা পেরিয়ে যাবে। মোমেন-ঋতু টেবিলে খাবার সাজিয়ে ফেলেছে। অতিথিদের অনুরোধ করলে নিজেরাই প্লেটে ইচ্ছে মতো খাবার তুলে খায়। খাবার সময় দেশের মাছ নিয়ে গল্প করে অতিথিরা। হাসান সুযোগ বুঝে বাংলা নববর্ষের দেশি খাওয়া এবং আগামী সপ্তাহে তার নববর্ষ আয়োজন নিয়েও কথা বলে।

নয়টার আগেই সকলের কাছে বিদায় নিয়ে, ফিরতিযাত্রার জন্য গাড়িতে গিয়ে বসে আবার। ছেলেকে নিয়ে এবার পেছনের সিটে বসে জোবায়দা। নীল কিছু খায়নি বলে ঋতু তার জন্য খাবার প্যাকেট করে দিয়েছে। গাড়িতে বসে ছেলেকে খাওয়াতে হবে, ঘুমিয়েও দিতে হবে। গাড়ি চলতে শুরু করার পর ঘাড় এগিয়ে হাসানের সঙ্গে কথা বলে।

‘ড্রয়িংরুমে তোমার সামনে বসেছিল, ঐ যে ঘরে-বাইরে মেয়েদের সমান রাইটের কথা বলল, চিনেছো?’

‘হ্যাঁ, চাটগাঁইয়া সামাদ, কিং খালেদে আছে।’

‘হ্যাঁ, ওর ওয়াইফ ঋতুর কলিগ। ওরা কানাডায় ইমিগ্রেশন ভিসার অ্যাপ্লাই করেছিল। ওদেরটা হয়ে গেছে। আগামী বছরই সৌদি ছেড়ে চলে যাবে।’

‘কই, আমাকে তো কিছু বলল না। জিজানে পার্কে বাংল নববর্ষ উদযাপন করব শুনে সামাদ নিজেও খুব যাওয়ার উৎসাহ দেখাল। অথচ ওর ওয়াইফের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো না। কানাডায় গিয়েও ওরা ঠিক ধুমসে নামাজ-রোজা করবে।’

‘হাসান তোমাকে বলেছি না, ধর্ম নিয়ে তুমি কখনোই কারো সঙ্গে কথা বলবে না।’

‘ওকে ডার্লিং। আমি আসলে খাওয়ার সময় কোনো তর্ক করিনি। নববর্ষের অনুষ্ঠান নিয়ে শুধু কথা বলেছি। ঋতুর সঙ্গে অনুষ্ঠানসূচি নিয়ে কথা হলো না, ফোনে বলে নেব।’

জোবায়দা হসানের সঙ্গে আর একটাও কথা বলে না। স্মৃতিতে সে হয়তো ঋতুর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছে, কল্পনায় বৈশাখি ভিড়ে হইচই করছে। কিন্তু জোবায়দাকে একাকিত্ব, আবারও সেই বিষণœতা গ্রাস করতে থাকে। আবহার পাহাড় পেরুতে গাড়ি এখন পেঁচানো রাস্তা ধরে উঁচু থেকে নিচুতে নামছে। নীলকে একহাতে জড়িয়ে রেখে সিটে মাথা এলিয়ে, চোখ বুজে চুপচাপ থাকে সে ।


চার

রেড সী’র ধারে মরুভূমির শহর জিজানে প্রথম, সম্ভবত সৌদিতেও এই প্রথম বাঙালির বৈশাখি নববর্ষ উদযাপন হবে। উদ্যোক্তা হাসানের একা গাড়ি নিয়ে ছোটাছুটি এবং বাসায় ফোনালাপের অন্ত নেই। প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত প্রায়, জোবায়দার তুচ্ছ এক স্বপ্নকে কেন্দ্র করে দু’জনার সম্পর্কটা সহসা চূড়ান্ত বিচ্ছেদের দিকে ধাবিত হয়। বাবা-মায়ের অনেক দুর্বোধ্য ঝগড়ার মতো এই ঝগড়াতেও সাক্ষী থাকে অসহায় নীল। ছেলেকে খেলায় সঙ্গ দিতেই তার পায়ের কাছে বল ছুড়ে দিচ্ছিল হাসান। জোবায়দা গোল বাধাতে জবরদস্তি করে তার রাতের স্বপ্নটা শোনাতে থাকে।

‘আগে শোনই না, ভেরি ইন্টারেস্টিং। স্বপ্নে দেখলাম, রেড সী’র ধারে দাঁড়িয়ে তোমার বাংলা নববর্ষের সূর্যকে দেখছি। নীলের চোখে তোমার মস্ত সানগ্লাস, আমার হাত ধরা। হঠাৎ কোত্থেকে কে জানে, সামনে এক দরবেশ এসে দাঁড়ায়। সৌদিদের মতো গায়ে সাদা আলখাল্লা, মাথায় সাদা পাগড়ি, হাতে বড় পাথরের তসবি। নীলকে ইংরেজিতে নাম জিজ্ঞেস করল। নীল ইংরেজিতে বলল, ‘আকাশের রং দেখ, আমার নাম পেয়ে যাবে।’ দরবেশ খুশি হয়ে এবার আমাকে  বলল, ‘জোবায়দা, আল্লাহ তোমার ছেলেকে ইংলিশ জবান আর অসাধারণ মেধা দিয়েছে কেন জানো? কারণ ও ইংরেজিভাষী উন্নত দেশের নাগরিক হবে। তোমাদের উচিত এখনই সেরকম কোনো দেশে চলে যাওয়া।’ অচেনা দরবেশের মুখে উপদেশ শুনে আমি চমকে উঠি। কে লোকটা? তার মুখের দিকে ভালো করে তাকাতেই দেখি, দরবেশ আর কেউ নয়, আমাদের ইউনিভার্সিটির ডীন।’

স্বপ্নে নববর্ষের সূর্য, নাকি ডীনকে দেখার আনন্দে জোবায়দা হাসে? হাসান ঠিক বুঝতে পারে না। তবে স্পষ্টই  বিরক্ত হয়। সত্য যে, বিদেশে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এ দেশে এসেছে তারা। সৌদি রাজতন্ত্র যেহেতু ভিনদেশি মুসলিমদের এ দেশে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেয় না, তাই দু’চার বছরে যত বেশি সম্ভব টাকা জমিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশে যাবে ভেবেছিল। বিদেশি ইউনিভার্সিটির উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আমেরিকা, কানাডা অথবা অস্ট্রেলিয়ার মতো কোনো দেশের স্থায়ী নাগরিক হবে। জোবায়দার এক বোন-ভগ্নিপতি কানাডায় মাইগ্রেট করার পর থেকে, সৌদিতে পেটের সন্তানের চেয়ে জোবায়দার মনে কানাডার স্বপ্নটার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে বেশি। ঋতুর বাসায় গিয়ে দু’জন কানাডাযাত্রী দেখে নিজের আর তর সইছে না তার। কিন্তু নিজের সহজ ইচ্ছেটিকে সরাসরি না বলে  স্বপ্ন ও ডীনের দোহাই দিয়ে ফালতু গল্প বলায় হাসান শুধু বিরক্ত নয়, রাগে ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। নববর্ষ  আয়োজনের কথা ভেবে নিজেকে সংযত রাখে।

‘কী, ডীনই যে দরবেশ সেজে স্বপ্নে এসব বলেছে, বিশ্বাস করলে না?’

‘তোমাকে স্বপ্নে বলেছে, আর ডীন শালা আমাকে বাস্তবে বলেছে উল্টো কথা। বলেছে বোবা ছেলেকে নিয়ে দেশে ফেরো, ওর মুখে দেখবে ঠিক বাঙলা বোল ফুটবে।’

এরপর মিষ্টি ভূমিকা এবং স্বপ্নের দোহাই ছাড়াই খাপখোলা তরবারির মতো ঝলসে না উঠলে জোবায়দার আত্মরক্ষা হয় কীভাবে?

‘তোমার আসল মতলবটা আজ বলে ফেল তো হাসান। সৌদি অ্যাডভেঞ্চার শেষ হলে আর কোনো বিদেশে নয়, দেশে ফিরে যাবে, এই তো?’

‘দেখো, পলিটিকাল নেতাদের মতো দেশপ্রেমিক আমি নই। প্রতিটি সাধারণ দেশি মানুষের মতো দেশকেই প্রথম এবং শেষ আশ্রয় ভাবি। কাজেই দেশে ফেরার টান তো কাজ করবেই।’

‘কিন্তু আমাকে বিয়ের আগে থেকেই তুমি জানো, আমি দেশে থাকতে চাইনি। আর এ দেশে আসার ছয় বছর ধরে জেনে আসছো, আমি দেশে ফিরতে চাই না। কেন চাই না, তার কারণগুলো কি আবার ব্যাখ্যা করতে হবে?’

এই মুহূর্তে মূল কারণ হিসেবে হাসানের বুরোক্রাট বাবার অধীনে জোবায়দার বাবা চাকরি করেছে বলে বিয়েতে মত না দেওয়া এবং গত বছর ছুটিতে দেশে গেলে হাসানের মায়ের চূড়ান্ত নোটিশ ‘আমি নাতিকে বাংলা শেখালে যদি তার জাত যায় তবে এ বাড়িতে তোমরা আর এসো না’ মনে পড়ে জোবায়দার। অন্যদিকে স্ত্রীর  দেশবিমুখতার কারণ হিসেবে হাসান রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম থেকে শুরু করে দেশের হাজার সমস্যার কথা জানে, কিন্তু জোবায়দা যে কারণটি কখনই বলবে না, তাও আজ স্ত্রীকে শুনিয়ে দেয়।

‘আসল কারণ হলো তুমি স্বাধীন হতে চাও। এদেশে আমাকে স্বামী হিসেবে মানতে বাধ্য হচ্ছো, কিন্তু কানাডায় তো তেমন বাধ্যকতা থাকবে না।’

এবং ডিভোর্স হবে। কথাটা মনে এলেও হাসান নিজেকে সংযত রাখে। জোবায়দা বেঁকে বসলে তার সব আয়োজন ভ-ুল হবে। হাসান তাই ঠাট্টার হাসিতে যোগ করে, ‘কানাডায় গেলে তুমি স্বাধীনতা পাবে ঠিক, কিন্তু আমি আরো একা হয়ে যাব। এ জন্যই তো বাঙালির মেলামেশা সংস্কৃতি নিয়ে মাতামাতি করছি জো।’

‘তার মানে আমি নিজে স্বাধীন হওয়ার জন্য কানাডায় যেতে চাই, তোমার বা নীলের ভবিষ্যতের জন্য নয়?’

‘দেখো উন্নত পুঁজিবাদি দেশে গেলেই আমাদের জীবন সুখে ভরে উঠবে, এটা হলফ করে বলতে পারো?’

‘এ নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে আর তর্ক করতে চাই না হাসান। তুমি কানাডার সিটিজেনশিপের জন্য এ বছরই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ফরম প্রসেস করবে কিনা আমাকে স্পষ্ট বলে দাও। হ্যাঁ বা না।’

‘আমি যাব না তা তো বলিনি। কানাডায় তোমার বোন আছে, তুমি অ্যাপ্লাই করলে অগ্রাধিকার পাবে। ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টে স্কোর তুলে তুমি অ্যাপ্লাই করো, ডিপ্যানডেন্ট হিসেবে আমি আর নীল তোমার লেজ ধরেই উড়াল দেব।’

‘ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট দিয়ে অবশ্যই আমি স্কোর তুলতে পারবো। আমি অ্যাপ্লাই করতে গেলে আমার ব্যাংক একাউন্টে যথেষ্ট ডলার শো করতে হবে। কিন্তু আমার একাউন্ট খালি করেছে কে? গাড়ির লোনের টাকা শোধ করে মাসে কয় টাকা জমাচ্ছ আমার একাউন্টে?’

‘দরকার হয় গাড়ি বেচে এবং দেশ থেকে টাকা এনে তোমার ঋণ এবার শোধ করব আমি। ঠিক আছে? এখন  নববর্ষ প্রোগ্রামের জন্য বাজারে গিয়ে আমি ইলিশ মাছ কিনে আনব। তুমি ফোন করে আর যাদের ডাকতে চাও, বলে ফেলো প্লিজ।’

এ সময় ক্রীড়ারত নীলের বলটা হঠাৎ জোবায়দার কপালে এসে লাগে। নীল বাবার পক্ষ নিয়ে ইচ্ছে করেই মাকে আঘাত করল কি? ছেলের উপর রাগটা বাপের উপর ঝাড়ার আগেই হাসান বাজারে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।

পাঁচ

প্রথমে যারা উৎসাহ দেখিয়েছিল, একে একে পিছিয়ে যায় সবাই। অজুহাত দেখায় নানারকম। আমন্ত্রিতদের ভয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আসল কারণটাও আঁচ করতে পারে হাসান। দেশে বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। সৌদি আরবে ইসলামের দৃষ্টিতে নাকি মুখোশ-মূর্তি সংবলিত শোভাযাত্রা অনেকেই সমর্থন করে না। হাসান আরবের সরকারি পার্কে বাচ্চাদের মুখোশ পরিয়ে আনন্দ দিতে চায়। সৌদি পুলিশের দৃষ্টিতে এমন আয়োজন সন্দেহজনক অপরাধ গণ্য হতে পারে। এটা ঠিক যে, পার্কে অনেক সৌদি পরিবার চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবান্না করে, দল বেঁধে খায়। পুলিশ ধারেকাছেও ঘেঁষে না। কিন্তু সৌদিদের দৃষ্টিতে শিক্ষিত বাংলাদেশিরাও আজনবি ও আমেল ছাড়া তো কিছু নয়। শেষ মুহূর্তে ঋতু-মোমিনও বাচ্চার শরীর খারাপের কথা বলে তাদের উপস্থিতি বাতিল করলে হাসান হতাশ হয়ে পড়ে।

জোবায়দা সহানুভূতি দেখাতেও খোঁচা দেয়, ‘আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, তোমার অনুষ্ঠানে কেউ আসবে না। কেনাকাটা করে ফর নাথিং কতগুলো টাকা নষ্ট করলে।’

জেদ চাপে হাসানের। বাঙলা নববর্ষে রমনার অনুষ্ঠানে ধর্মান্ধরা বোমা ফাটিয়েছিল। কিন্তু তাতে কি বাঙালির প্রাণের আবেগ রোধ করতে পেরেছে ওরা? সৌদিতে শিক্ষিত বাংলাদেশি সপরিবারে বাস করে, প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে তাদের সংখ্যা শতকরা একজনও হবে না। হাসান এদের বাচ্চাদের খুশি করার জন্য স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান ও রয়ের বেঙ্গল টাইগারের মুখোশ কিনেছে দশটা। অতিথিদের খাওয়াতে ফিশ মার্কেট ঘুরে আড়াইশ রিয়াল দিয়ে পদ্মার ইলিশ কিনেছে দুটি। অনুষ্ঠানের ছবি তুলবে বলে সাদা কাপড়ে বাংলায় শুভ নববর্ষ লিখে ব্যানারও তৈরি করেছে নিজের হাতে।

অনুষ্ঠান প-কারীদের গাল দিয়ে জোবায়দাকে বলে সে, ‘আমি তোমাকে সবসময় বলে আসছি, এই আমরা  শিক্ষিত মিডিল ক্লাসরাই সবচেয়ে বেশি হিপোক্রেট, সুবিধাভোগী এবং স্বার্থপর। এরা না করেছে বলেই কি দেশি বাঙালির অভাব হবে জিজানে? আমরা কাল সকালে অবশ্যই রেডসী’র পাড়ে গিয়ে বৈশাখি সূর্যকে স্বাগত জানাব। আমি এখনই বিকল্প অতিথি ঠিক করে আসছি।’

সন্ধ্যাবেলা অতিথির সন্ধানে গাড়ি নিয়ে একা বেরিয়ে পড়ে হাসান। প্রতিদিনই রাস্তায় অসংখ্য বাংলাদেশি চোখে পড়ে। রাস্তায় এবং প্রতিটি পার্কে দেশি মানুষদের চোখে পড়ে, যারা কোম্পানির ড্রেস পরে ক্লিনারের কাজ করে। বিভিন্ন দোকানে, মাছ ও সবজি বাজারে দেখা হয়, কথাও হয় অনেকের সঙ্গে দেশি ভাষায়। সী বিচে এক দেশি ক্লিনার তার গাড়ি ধুয়ে দিয়েছে দু’দিন। বাঙালি বাজারের হোটেলে গেলে কয়েকজন চেনে তাকে দেশি প্রফেসর হিসেবে, সালাম দেয়। এতদিন মানুষগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে, আজ কথাবার্তা বলে কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেখা যাক, কী হয়?প্রয়োজনে নিজের গাড়িতে চড়িয়ে শহরের বিভন্ন স্থান থেকে পার্কে অতিথিদের জড়ো করবে হাসান।

সৌদিতে বসবাসকারি পঁচিশ লক্ষ বাংলাদেশির মধ্যে জিজানেও বাঙালির সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের উর্ধ্বে হবে অবশ্যই। এদের মধ্য থেকে নববর্ষ অনুষ্ঠানে দশজনকে উপস্থিত করা যে এত সহজ হবে, হাসান নিজেও ভাবতে পারেনি। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে বিকল্প অতিথি নির্বাচন সম্পন্ন করে বিজয়গর্বে ঘরে ফেরে সে।

স্বদেশের মেহনতি বাঙালি ভাইদের আপ্যায়ন করতে হাসানকেও কিচেনে ঢুকে মেহনত করতে হয় দীর্ঘ সময়। অবশেষে বাঙলা নতুন বছরের সকালে পান্তার বড় পাতিল এবং আলাদা আলাদা পাত্রে ইলিশ ভাজি, পাট শাক, আলু ভর্তা নিয়ে সবকিছু একা একাই গাড়িতে তোলে সে। স্বামীর গোঁ দেখে জোবায়দা আর ঝগড়া করেনি। বরং বোরখায় ঢাকা থাকবে জেনেও, হাসানকে দেখাতেই হয়তো নববষের্র সকালে শাড়ি পরে, নীলকেও ঈদের পাঞ্জাবি পরিয়ে দেয়। স্ত্রীর নির্দেশে নিজেও আজ পাজামা-পাঞ্জাবি পরে হাসান। অতঃপর লোহিত সাগরে বাংলার বৈশাখি সূর্যকে স্বাগত জানাতে স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে হাসানের গাড়ি বড় পার্কটায় পৌঁছতে দশ মিনিটও সময় নেয় না।

সৌদি জনগণের বিনোদন ও অবসর যাপনের জন্য মরুভূমির এ দেশে পার্কের অভাব নেই। গাছ ও ঘাস লাগিয়ে অনেক পার্কের চেহারা সবুজ করে তোলা হয়েছে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে দিনের বেলা পার্কগুলো ফাঁকাই থাকে সাধারণত। সন্ধ্যার পর গাড়িতে পরিবার নিয়ে পার্কে আসতে থাকে সৌদিরা, বিশেষ করে সমুদ্রসংলগ্ন পার্কগুলোতে। মধ্যরাত পর্যন্ত পরিবার নিয়ে কাটায় অনেকে। বাচ্চাদের বিনোদন ও খেলাধুলার জন্য সব পার্কেই কমবেশি ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে নীলকে নিয়ে প্রায় রোজই সন্ধ্যায় সমুদ্রের ধারে পার্কে আসে হাসান। কিন্তু আজ  সকালে এসে মনে হয়, নির্জন পার্ক যেন শুধুমাত্র বৈশাখি অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করে আছে। গাড়ি থেকে নামার পরই আমন্ত্রিত অতিথি চারজনকে যখাসময়ে উপস্থিত দেখে মুখে হাসি ফোটে। হাসান তাদের সঙ্গেই প্রথম নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে।

এবারে গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামাতে হাসানকে আর হাত লাগাতে হয না। অতিথি চারজনই একে একে সবকিছু বহন করে পার্কের খেজুর গাছতলায় রাখে। গাছতলায় দুটি ম্যাট্রেস বিছিয়ে অতিথিদের বসিয়ে খাদ্যদ্রব্য পাহারা দিতে বলে। স্ত্রী-পুত্রকে সকালের সমুদ্র দেখার সুযোগ করে দিয়ে বাকি অতিথিদের আনার জন্য বাঙালি বাজারে যায়। দশ মিনিটের মধ্যে হাসানের গাড়িতে আসে পাঁচজন। পায়ে হেঁটেও আসে আরো দু’জন। সব মিলিয়ে মোট এগারোজন নানা বয়সী দেশি মানুষ। একটু বেশি বয়সী দাড়ি টুপিঅলাও আছে চারজন। পার্কে বিছানো কার্পেটে গোল হয়ে বসে সবাই। হাসান বাংলা লেখা ব্যানারটিও গাছের গোড়ায় মেলে ধরলে, অতিথিরাই তা গাছে উত্তমরূপে সাঁটানোর ব্যবস্থা করে।

নীল খেলাধুলার স্থান হিসেবে পার্কটার সঙ্গে বেশ পরিচিত। এখন বাঘের মুখোশ পরে একাই ছোটাছুটি করছে।  ভয় দেখাতে মাকে রেখেই ছুটে আসে বাবার কাছে। হাসান প্রথমে ছেলেকে এবং জোবায়দাকেও কাছে ডেকে অতিথিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘আমার ওয়াইফ. ইনিও আমার মতো এখানকার ইউনিভার্সিটির টিচার।’

এ দেশে কালো আবায়ায় অন্তর্লীন মেয়েমানুষকে সালাম দেয় না কেউ। হাসানের অতিথিরা তার স্ত্রীর দিকে তাকায় না পর্যন্ত। একজন শুধু হাসানের দিকে তাকিয়ে সালাম দেয়, ‘আপনারা দু’জনই সৌদি সরকারের সম্মানিত প্রফেসার মানুষ, আর আমরা ছোটখাট কাম করতে বিদেশে আইছি, তা ম্যাডামের দেশ কোন জেলায়?’

জোবায়দা হিজাব না সরিয়েই জবাব দেয়, ‘ছোট বড় কী ভাই, এ দেশে আমরা সবাই বাঙালি। সৌদি সরকারের একই আইন মেনে আমাদের চলতে হয়। আজ নববর্ষে আমাদের দেশি খাবার খান একটু। হাসান তুমি পরিবেশন করো, আমি নীলকে দেখছি।’

অচেনা অতিথিদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে ছেলেকে নিয়ে চিলড্রেন কর্নারে যায় জোবায়দা। সন্ধ্যার পর পার্কে যখন সৌদি পরিবার ও বাচ্চাদের ভিড় থাকে, খেলার উৎসাহ বাড়ে নীলের। উঁচু স্লিপার থেকে পিছলে পড়ে বারবার। দোলনায় কি ঘোড়ায় চড়ে দোল খায়। খেলার সময় সমবয়সী সৌদি বাচ্চাদের সঙ্গে যাতে সংঘর্ষে জড়িয়ে না পাড়ে, সে জন্যে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় জোবায়দা কিংবা হাসান। আজ সকালবেলা পার্ক একদম ফাঁকা দেখে ছেলের সঙ্গে নিজেও একটা দোলনায় বসে দোল খায় জোবায়দা। দুলতে দুলতে অতিথিদের পান্তা-ইলিশ খাওয়া দেখে। হাসান সবার ছবিও তুলছে। খেতে খেতে ওরা দেশের বৈশাখি মেলার গল্প করছে সম্ভবত।

খাওয়া পর্ব শেষ হলে, হাসানের হাতছানিতে নীলকে নিয়ে আবার অতিথিদের কাছে যায় জোবায়দা। খেয়ে নিশ্চয় তৃপ্ত হয়েছে সবাই। হাসান লাবান ও পেপসির বড় বোতল কিনেছিল বন্ধুদের জন্য। সেগুলোর সৎকার করতেও বেশ তৎপরতা দেখায় অতিথিরা। খাওয়ার পর উচ্ছিষ্ট, ওয়ানটাইম প্লেট, গেলাস সবকিছু পরিষ্কার করে পার্কের ডাস্টবিনে ফেলে দেয় নিজেরাই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বলে একজন, ‘ম্যাডামের রান্না চমৎকার! সৌদিতে আসার পর বহুদিন পর আইজ দেশি রান্না খাইলাম।’

আরেকজন হাতের মোবাইলে হাসানের ব্যানারের ছবি তুলে বলে, ‘আমি তো পার্ক থাইকাই বাড়িতে ফোন দিছিলাম। জিজানের পার্কেও  পয়লাবৈশাখ পালনের খবর দিলাম বউরে।’

আধাপাকা দাড়ির টুপিঅলা বয়োজ্যেষ্ঠ একজজন বলে, ‘এই সময় দেশে থাকলে চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় যাইতাম, মহাজনের হালখাতায় গিয়া বাকিবকেয়া শোধ কইরা পেট ভইরা গরম জিলিপি খাইতাম। বিদেশ বিভূঁইয়ে আপনাদের হালখাতায় আইসা শুধু খাইয়া গেলাম ম্যাডাম। দোয়া ছাড়া তো আমাদের আর দেওয়ার কিছু নাই ।’

দু’একজন প্রতিদান দিতেই যেন প্রফেসরের ছেলেকে আদর দেখাতে চায়, ‘ও বাজান, কী নাম তোমার? এইদিকে আহ, উটের পিঠে উঠবা? এই দেখো উট হইলাম আমি।’

নীল ভয়ে সিঁটিয়ে যায়, মায়ের কাছে  মুখ লুকায়।

হাসান অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করে বলে, ‘বাংলা নববর্ষের সকালে আমার ডাকে আপনারা যে এসেছেন, আমরা খুশি হয়েছি। আমাদের ছেলেটা বাংলায় কথা বলতে পারে না, ওর জন্য দোয়া করবেন আপনারা।

‘আমাদের মধ্যে একজন হুজুরও আছে। ছোট কাম করলেও কোরানে হাফেজ। হুজুর, প্রফেসার সাহেবের হালখাতায় আইসা মেলা খাইছো, এখন হাত তোলো, দোয়াখায়ের করো সবাই।’

হাফেজ লোকটি দোয়া করার জন্য হাঁটু মুড়ে বসে এবং যথারীতি সুরা পাঠ শুরু করে। পার্ক জুড়ে নীরবতার মাঝে হাফেজের সুরা আবৃত্তির সুর এবং সমুদ্র থেকে উঠে আসা ঢেউয়ের কলতান গলাগলি করে বাজে। তারপর  মোনাজাতের জন্য হাত তোলে সবাই। হাফেজের কণ্ঠ আরবির সঙ্গে বাংলা মিলিয়ে শুধু প্রফেসর ও তার সন্তানের জন্য নয়, দেশবাসীসহ বিশে^র সকল মুসলমানদের মুক্তি কামনায় আল্লাহর কাছে আকুল আবেদন জানাতে মুখর হয়ে ওঠে।

অদূরে দাঁড়ানো দোয়া-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য দু’হাত তুলতে গিয়েও থেমে যায় জোবায়দা। তার এক হাতে নীলের হাত ধরা। অন্য হাতে মোবাইল ফোন। ভিড়ের দিকে তাকিয়ে মজা লাগে তার, হাসান নিজেও আজ আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছে।

দোয়া সমাপ্ত হলে সবাই আবার বিদায়ী সালাম জানিয়ে বিদায় নিতে থাকে। অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হাঁড়িপাতিল ও অন্যান্য জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে দেয় দু’জন। গাড়িতে উঠে এসি অন করে হাসান স্ত্রীর কাছে জানতে চায়, ‘কেমন হলো জো?’

স্টার্ট নেয়ার আগে হঠাৎ জোবায়দার হাসিতে গাড়ি ভরে যায় আজ। হাসতে হাসতে শরীর ভাঙে তার এবং মুখেও জবাব দেয়, ‘দারুণ হাসান! তোমার শুভ হালখাতার মোনাজাতের ভিডিও কিন্তু আমি ধরে রেখেছি।’





রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ মে ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC