ঢাকা, সোমবার, ৫ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:
বুক রিভিউ

অনভ্যাসের দিনে : গল্পের ময়নাতদন্ত

কামরুজ জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২২ ১২:৫৫:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-২২ ১:০২:৫৩ পিএম

কামরুজ জামান: শিরোনাম দেখে আপনি এই লেখার যে সমাপ্তি কল্পনা করেছেন, তা শেষ পর্যন্ত শুধু কল্পনা হয়েই থাকতে পারে। ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দটির এক ধরনের নেতিবাচক ভাব বহন করে আমাদের কাছে। কিন্তু ‘ময়না’ শব্দে তদন্ত করে দেখা যায়, আরবি ‘মু’ ‘আয়িনা’ শব্দ দুটি থেকে এর উৎপত্তি। যার অর্থ ‘ভালো করে দেখা’। বইয়ের শুরুতে অভিজিৎ মুখার্জির গুরুত্ব ভূমিকার পর ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বলে রাখা ভালো যে, ভালো করে দেখতে গিয়েই এই লেখাজুড়ে শুধু আছে একজন সাধারণ পাঠকের মুগ্ধতার বয়ান।

গল্পকারের নিজস্ব ভাবনার সাথে একমত হয়ে আমি বলতে চাই, প্রত্যেক লেখকের বুনিয়াদ তার কাল। লেখক হবেন তার কালের সবচেয়ে ভালো বুঝদার ব্যক্তি। এই বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে তিনি সমাজের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব আবিষ্কার করেন। দ্বন্দ্বের এই আবিষ্কার, মননশীল উপস্থাপন ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি কাল অতিক্রম করেন। সেদিক দিয়ে লেখক হচ্ছেন তার সময়ে সেই অগ্রবর্তী মানুষ, যিনি তার কালের সময় ও মানুষের দ্বন্দ্ব দেখেছেন এবং বিশ্লেষণ করেছেন এবং তা উপস্থিত করেছেন।

গল্পের আলোচনায় প্রবেশের আগে অলাত এহ্‌সানের সাধারণ কিছু প্রবণতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। একটা সমাজ দ্বি-স্তর বিশিষ্ট। অর্থাৎ এর আছে উপর কাঠামো ও ভেতর কাঠামো। দ্বন্দ্ব এই দুই কাঠামোর ভেতরই ঘটে। যা প্রকাশ পায় সমাজের ব্যক্তির ক্রিয়াকলাপের ভেতর দিয়ে। ব্যক্তির কার্যকলাপের ভেতরে যেমন দ্বন্দ্ব থাকে, তার মনের ভেতরও দ্বন্দ্ব চলতে থাকে অবিরত। গল্পকারের চোখ এই ব্যক্তির দিকেই। তিনি ব্যক্তির বাহ্যিক দ্বন্দ্বের দিকে নজর দেন বটে। তবে বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে মানসিক দ্বন্দ্বের দিকটি উন্মোচনেই তিনি বেশি আগ্রহী। এই মানসিক দ্বন্দ্ব ব্যক্তি চরিত্রের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। যে কারণে মনঃসমীক্ষকের মতো পাঠককে গল্পের তাৎপর্য উদ্ধারের জন্য কাহিনীর উৎস ভূমিতে চলে যেতে হয়, কার্যকারণ এবং বিভিন্ন সম্পর্ক খুঁজে বের করার জন্য। অলাত এহ্‌সানের গল্পে এই চিন্তা-প্রকরণের ব্যবহার দেখা যায়। এটা তার সময়কার গল্পকারদের সাধারণ প্রবণতা নয়। এবার গল্পে মনোযোগ দেয়া যাক।

‘সাপ আর হিসহিসের গল্প’ শুরু হয় দুজন যুবকের কথোপকথন দিয়ে। যারা শহরের ফুটপাতে সাপ দেখে অথবা দেখে না। কিন্তু এই সাপ দেখা না-দেখার ভ্রমের মধ্যে গল্পকার আমাদের দেখায় সংসদ ভবন থেকে সাপ বের হচ্ছে, হাজার হাজার সাপ। দলীয় সাপ, আন্তর্জাতিক সাপ, গণতন্ত্রের সাপ। গল্পের অন্যতম চরিত্র সাহিত্য উৎসাহী তরুণ কবির। তিনি গল্পের ভেতরে আরো এক গল্প বলেন। সেই গল্পের নায়িকা কবিরের ফুফু যিনি সাপতাড়ানো বিদ্যা জানেন। ব্যাপারটা ফ্রিদা কাহলোর সেলফ পোর্ট্রেটের মতো। দুটো সাপ নাকি কবিরের ফুফুর স্তন চুষতো, কিন্তু তার মানসিক অবস্থা ছিল ‘উনডেট ডিয়ার’র মতো। কবির ও গল্পের কথক তার ফুফুর গল্পের ভেতরে এতই মগ্ন থাকে যে, তাদের মনে হয় সেখানে সত্যই সাপ ছিল। ‘এই ছেলেরা, তোমরা এখানে বসে আছো আর ওখানে কত বড় একটা সাপ মেরে ফেলল, টেরই পেলে না! শেষে চমকের মতো লোকটা বলে।’ অথচ শেষে সাপ থাকা না-থাকার মিমাংসা হলেও তা ডোরা না গোখরা তার মিমাংসা না দেয়ায় পাঠক আন্দোলিতই থাকে। এই গল্প শব্দের বাহুল্যহীন। কিন্তু নিখুঁত বর্ণনা পাঠককে দৃশ্যের গভীরে প্রবেশ করায়।

‘আয়নায় দেখা দুই হাত’ গল্পে আমরা একটি চাকরিজীবী দম্পতির যাপিত জীবনের গল্প দেখতে পাই। এখানে প্রেম আছে, অবৈধ আঙুলের ইশারা আছে। প্রতিশোধ আছে। ভালোবাসা আর প্রতিশোধ-এ দুটোই যে মানুষের মাথা বিগড়ে দেয় তা দৃশ্যমান হয় গল্পের শেষে। এই গল্পে যাপিত জীবনের এক গভীর বিষাদ লক্ষ্য করে পাঠক। ‘অন্ধ হয়ে যাওয়ার রাতটি’ মূলত আমাদেরই অন্ধ হয়ে যাওয়ার বয়ান। আমাদের বিবেক বিবস হয়ে গেছে। আমরা দৌড়ে যাচ্ছি এক অজানা গন্তব্যে। আমাদের পেছনে তাড়া করছে এক অদ্ভুত দৈত্য ‘টেম্পল রান’ গেমের মতো। গল্পের ভেতরে আমাদের সামগ্রিক অন্ধত্ব তুলে ধরেছেন গল্পকার এক অভিনব কায়দায়। যা আমরা লক্ষ্য করেছি কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ গল্পে। কাফকার দেখানো পথে, তবে ভিন্ন এক গন্তব্যে হেঁটেছেন এই গল্পকার।

‘নীলগিরি পাহাড়ে সবুজের পুনরাবৃত্তি’ গল্পের প্রধান চরিত্র একজন ছাপোষা চাকরিজীবী। যিনি কথা বলতে পছন্দ করেন, কথা বলতে গিয়ে অনুভব করেন তিনি কেবল কথার পুনরাবৃত্তি। এটা আসলে চাকরি নামের যে শিকল আমরা বহন করি, সেই শিকলে মানুষের জীবনের পুনরাবৃত্তিকেই ইঙ্গিত করে। গল্পটি আমাদের সমকালীন কর্মজীবন এবং নাগরিক জীবনের হাহাকারের অনুবাদ। ‘বোতলজাত বিষয়-আশয়’ গল্পে আমরা খুঁজে পাই একটি মাতাল সময়ের ছবি। যেখানে ভালোবাসা রাজনীতির অংশ। মাতাল বারী শেখ যেন তার সময়ের প্রতিচ্ছবি। ‘কেউ দেখছে’ গল্পে ঈশ্বরের চোখ যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের জীবন যাপন, তেমনি এক অদৃশ্য জাল আমাদের আটকে রেখেছে। এই ঈশ্বর প্রচলিত ধারণা নয়, বরং ঈশ্বরের সেই নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা দিয়ে আধুনিক শাসন, মারণাস্ত্রই ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ উপন্যাস থেকে উদ্ধৃত উপরের লাইন দুটির প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যায় গল্পজুড়ে।

‘শুয়োরটা বলে কী!’ দুই বাস যাত্রীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ নিয়ে গল্প, তবে বিদ্রুপের ঢংয়ে। গল্পের শেষে এটা আর বাসযাত্রীর গল্প থাকে না, হয়ে উঠে সমকালীন মানুষের গল্প। যেখানে আমরা পরস্পরের প্রতি অন্তঃসার এক যুদ্ধে লিপ্ত আছি। ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ত ছিল’ গল্পে আমরা দেখি ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার। ধর্মের সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে ক্ষুধা আর শক্তির সংস্কৃতি। এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন গল্পকার। এটাকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক অভিশাপও বলা যায়। ‘ইছহাক নামের পারিবারিক ভূত’ গল্পে গল্পকার ফিরে গেছেন ইতিহাসে। আবার ইতিহাস যে ঘটনার বিবরণ নয় তা দেখতে পাই এই গল্পে। গল্পকার একটি পারিবারিক গল্পের ভেতরে ফুঁটিয়ে তুলেছেন জনপদের ইতিহাস। সেই জনপদের রাজনৈতিক পটভূমি। সুপাঠ্য এই গল্পটিতে লেখক আমাদের অস্তিত্বের বিস্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন অনিবার্যভাবে।  ‘আশার বসতি’ গল্পটি সমসাময়িক গ্রামীণ সমাজের প্রেক্ষাপটে রচিত। দীর্ঘদিন প্রবাস ফেরত একজন মানুষের যৌনতা, ধর্মীয় বিশ্বাস, দ্বিধা, ক্ষমতাসীন রাজনীতির প্রভাব, একটি পুরো সমাজকে গল্পকার আঁকতে চেয়েছেন শব্দের তুলি দিয়ে। এই গল্প রচিত হয়েছে একটি বৃহৎ ক্যানভাসে।  রাষ্ট্র ক্ষমতায় দলীয় একছত্রতা কোথায় পৌঁছাতে পারে, একটা দেয়াল ভাঙাকে কেন্দ্র করে গল্পকার তা এঁকেছেন সত্যের রং তুলি দিয়ে। ভঙ্গুরতার ব্যাপারটি বইয়ের প্রচ্ছদে এসেছে শিল্পী বিপুল শাহ-এর কর্মে। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও ‘রক্তমাখা নোট’ গল্পটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত। কিন্তু গল্পকার নকশাল বিষয়টিকে পরিষ্কার করতে চাননি। গল্পটিকে আমাদের দেশের পুঁজিপতিদের সূচনার ইতিহাসের ইঙ্গিত বলতে পারি। ইতিহাস লেখা গল্পকারের কাজ না। গল্পকার কেবল একটা গল্প লিখতে চেয়েছেন, সেটা থেকে পাঠক চাইলে ইতিহাসের ধারণা পেতে পারেন।

‘পাতায় ছায়ায় মেঘ করে আসে’ এই গল্পে খুঁজে পেয়েছি সমকালীন জাতীয় রাজনীতির ছবি। কখনো গল্পটি শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি, হয়ে উঠেছে এক দম্পতির আদর্শের দ্বন্দ্ব। যা বিচলিত করেছে আমাদের দেখার চোখকে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়ে ছিল, তা জাতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। জানিয়ে রাখছি, গল্পটা সেই সময়ই রচিত। এই ঘটনার ভেতর আর বাহির চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন গল্পকার। আমি মনে করি, এটা সেই সময়ের পটভূমিতে অত্যন্ত সাহসী কাজ। আজকের পৃথিবীতে সাহিত্যের পাঠকদের যে লেখকরা ভাবাচ্ছেন সবচেয়ে বেশি তারা তো প্রকারান্তরে নিজেদের কাফকার উত্তরসূরি বা তার কাছে ঋণী বলে ঘোষণাই করে দিয়েছেন। অলাত এহ্‌সানের ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও, বলাবাহুল্য, এর ব্যত্যয় ঘটছে না। তার গল্পগুলো অভিনব, বার্তাটাও নির্দিষ্টতার রোগে আক্রান্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যের সেভাবে বিচার করা যায় না। তবু এই গল্পকারের গল্প পড়ে সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, তার জগত দেখার আলাদা চোখ আছে। তবে তার গল্পগুলো পড়ে কিছু জায়গায় আমি ব্যাখ্যা খুঁজে পাই নি। এখানেই খুব সম্ভবত জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ। জাদুবাস্তবতা সম্পর্কে ম্যাক্সিকান সাহিত্য সমালোচক লুই লীল যথার্থই বলেছেন, ‘আপনি যদি ব্যাখ্যা করতে পারেন এটা কি, তাহলে তা জাদুবাস্তবতাই না।’

সাহিত্যের কাজ হলো, আমাদের পরিচিত গল্পগুলো নিজস্ব কায়দায় উপস্থাপন করা। হ্যাঁ, স্বাতন্ত্র্যই  সৃষ্টিশীল প্রাণের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করি। আর এখানেই অলাত এহ্‌সানের সফলতা। যার বদৌলতে ভিন্ন গল্পের নতুন গল্পকারের সাক্ষী হতে যাচ্ছে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের পাঠক। শেষে বলতে হবে, বইয়ে গল্পের ক্রমবিন্যাস থেকে শুরু করে সম্পাদনায় যত্নের ছাপ স্পষ্ট। আর শুরুতে অনুবাদক ও অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জির লেখা যুতসই ভূমিকা চিন্তাশীল পাঠককে গল্পের গভীরতা প্রাপ্তি ও ভাবনার বৈচিত্র্য সন্ধানে সহায়তা করবে।

গল্পগ্রন্থ : অনভ্যাসের দিনে

লেখক : অলাত এহ্‌সান

প্রচ্ছদ : বিপুল শাহ

প্রকাশনী : প্রকৃতি

মূল্য : ২২০ টাকা




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ মে ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton