ঢাকা, শুক্রবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ভীষ্ম সাহানির গল্প || ওয়াং চু

অভিজিৎ মুখার্জি : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৬ ৪:০৩:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-২৬ ৪:০৬:৪২ পিএম

 

চোখে পড়ল, নদীর ধারে লালমান্ডি রোড ধরে ওয়াং চু ঘোরাঘুরি করছে। হাঁটু পর্যন্ত একটা খাকি জোব্বা পরনে, দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ওর মাথাটা যেন কামানো, ঠিক বৌদ্ধ শ্রমণদের মতো। পেছনে খাড়া হয়ে উঠে গেছে শংকরাচার্যের পাহাড়, আর মাথার ওপরে অনাবিল নীল আকাশ। রাস্তাটার দু’ধারে সার দিয়ে উঁচু উঁচু ইউক্যালিপ্টাস গাছ। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ওয়াং চু যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে। প্রাচীনকালে, ঠিক এরকম পোশাকেই নানা জায়গা থেকে শ্রমণরা ভারতে আসার পথে পর্বত, উপত্যকা সব পেরিয়ে এসেছিল নিশ্চয়ই। ওয়াং চু-কেও দেখে মনে হচ্ছিল যেন অতীতের রোমান্টিক গোধূলির আলোয় পদচারণা করছে। শ্রীনগরে এসে ও কেবলই মিউজিয়াম আর নানা বৌদ্ধ সংঘের ধ্বংসাবশেষ দেখে বেড়াচ্ছিল। এখনও ও আসছিল লালমান্ডির মিউজিয়াম থেকে। ওখানে বৌদ্ধ যুগের অনেক ভাস্কর্য রাখা আছে। ওর হাবভাব দেখে সত্যিই মনে হতো, বর্তমানের সঙ্গে ওর সংযোগ যেন বিচ্ছিন্ন।

‘এক আধজন বোধিসত্ত্বটত্ত্বের দেখা পেলে?’ কাছে আসতেই, একটু পেছনে লাগতে আমি বললাম।

ও খুব মৃদু, একটু বাঁকা করে স্মিত হাসল, যেটাকে আমার এক খুড়তুতো বোন বলত, দেড়খানা দাঁতের হাসি, কেননা, ও কেবল ওপরের ঠোঁটটা একদিকে সামান্য তুলে ঐ হাসিটা হাসত।

‘মিউজিয়ামের বাইরে অনেক মূর্তি আছে, ওগুলোই দেখলাম’, আস্তে করে উত্তর দিল। ‘একটা মূর্তির শরীরে কেবল হাত আর পা’গুলো আছে...’

মনে হয়েছিল, আরেকটু কিছু বলবে, কিন্তু এতই মর্মাহত যে গলাটা ধরে এল ওর, কথা বলতে পারল না। আমরা একসঙ্গে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

‘প্রথমদিকে, মহান বুদ্ধের শুধু পা’টা দেখানো হতো’, কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, আমার কনুইয়ের ওপর ওর হাতটা। টের পাচ্ছিলাম যে ওর হাতটা, দ্রুত হৃদস্পন্দনের মতো, অল্প অল্প কাঁপছিল।

‘শুরুর দিকে মহান বুদ্ধের কোনও মূর্তি বানানো হতো না! জানো তো, প্রথম প্রথম, স্তূপের নিচে শুধু পা’টুকু দেখানো হতো। মূর্তি বানাতে শুরু করে অনেক পরে।’

বোঝাই যাচ্ছিল যে বোধিসত্ত্বের পায়ের দর্শন পেয়ে ওর বুদ্ধের পা’র কথা মনে পড়ে গিয়েছে এবং অভিভূত হয়ে পড়েছে। কীসে যে ও উত্তেজিত হয়ে উঠবে, আর কীসে আনন্দে উদ্বেল, ধরা যেত না।

‘অনেক দেরি করে ফেলেছ। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। চিনার গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম।’

‘আমি মিউজিয়ামে ছিলাম।’

‘সে ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের তো দু’টোর সময় হাব্বা কাদালে থাকার কথা, নাহলে আর গিয়ে কী লাভ।’

ছোট করে, ঝাঁকুনি দিয়ে দিয়ে তিনবার মাথা ঝোঁকাল, আর বড় বড় পা ফেলে এগোতে থাকল।

মুক্তপ্রাণে ভারতভ্রমণ করছিল ওয়াং চু। এরমধ্যে নগ্নপদে হেঁটে, আদ্যন্ত প্রার্থনার ভঙ্গীতে হাতজোড় করা অবস্থায়, সে লুম্বিনীতে বুদ্ধের জন্মস্থানে গিয়েছিল। যেখানে যেখানে মহান বুদ্ধ হেঁটেছিলেন, সেখানে সেখানে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে ওয়াং চু-ও হেঁটে এসেছে। সারনাথে, যেখানে বুদ্ধ তার প্রথম বাণী শুনিয়েছিলেন আর দু’টো হরিণশিশু বন থেকে বেরিয়ে এসে মুগ্ধ হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে ছিল, সেখানে গিয়ে ওয়াং চু একটা অশ্বত্থ গাছের নিচে ভক্তিপ্রণত হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসেছিল, আর তারপর একসময়, ওর কথা অনুযায়ী, ওর মাথার মধ্যে অস্ফুট কীসব কথা ধ্বনিত হতে শুরু করেছিল, আর ওর মনে হয়েছিল যে ও বুদ্ধের প্রথম বাণী শুনতে পাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতায় ও ভক্তিতে এতটাই আপ্লুত হয়ে পড়ে যে সারনাথেই থাকতে শুরু করে দেয়। হাজার হাজার বছরের কুয়াশা ভেদ করে ও গঙ্গাকে এক নিষ্কলুষ স্রোতস্বিনী হিসেবে দেখতে পায়। শ্রীনগরে এসে, তুষারে ঢাকা পর্বতের দিকে তাকিয়ে ও প্রায়ই আমাকে বলত, ‘ওটা লাসায় যাওয়ার রাস্তা, তাই না? ওই রাস্তায় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সব তিব্বতে পাঠানো হয়েছিল।’ ওর কাছে সেই পর্বতশ্রেণী পবিত্র ও শুভ, কেননা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা পায়ে চলার পথ ধরে হেঁটে এধার থেকে ওধারে গিয়েছিলেন তিব্বতে পৌঁছতে।

এর কয়েকবছর আগে ওয়াং চু ভারতে এসেছিল প্রফেসর তান শানের সঙ্গে। ওঁর সঙ্গেই ওয়াং চু ছিল কিছুদিন, হিন্দি আর ইংরিজি শিখল, তারপর প্রফেসর শান চিনে ফিরে গেলেন, আর কোনও একটা বৌদ্ধ সমিতি থেকে কিছু টাকা মঞ্জুরি পেয়ে ওয়াং চু থেকে গেল, চলে এল সারনাথে। আবেগপ্রবণ, কবিসুলভ এক সত্তা, যার লক্ষ্যই ছিল অতীতের আবেশের মধ্যেই বাস করা। কোনও কিছু প্রতিপন্ন করতে ও এখানে আসেনি। বোধিসত্ত্বদের মূর্তিগুলো দেখে উদ্বেল হয়ে উঠতেই যেন ও এসেছিল। পুরো একটি মাস ধরে ও মিউজিয়ামের ভেতরে টহল দিয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু কখনও আমাদের বলেনি বুদ্ধের ঠিক কোন বাণী ওকে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা যোগাত। কোনও বিশেষ তথ্য আবিষ্কার করে উৎসাহ বেড়ে যেতেও যেমন দেখা যায়নি, তেমনই আবার কোনও অনিশ্চয়তা বা অস্পষ্টতা নিয়েও ব্যতিব্যস্ত হতে দেখা যায়নি। অনুসন্ধিৎসু জ্ঞানার্থী বলার চেয়ে ওকে ভক্ত বলাই শ্রেয়।

ও কখনো নিজে থেকে মুখ খুলেছে, বা কোনও বিষয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছে বলে মনে পড়ে না। সেই সময় আমরা বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানারকম বিতর্কে মেতে থাকতাম, কখনো জাতীয় রাজনীতি নিয়ে, কখনও ধর্ম বিষয়ে, কিন্তু ওয়াং চু কখনও তার মধ্যে ঢুকত না। সারাটা সময় মৃদু হেসে ও এক কোণে লুকিয়ে বসে থাকত। দেশে সেই সময় প্রভূত পরিমাণে নানা অসাধারণ ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। স্বাধীনতা আন্দোলন তখন তুঙ্গে উঠেছে, আমরা নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে আলোচনা করতাম। কংগ্রেস কেমন নীতি অবলম্বন করবে, আন্দোলন কেমন রূপ পরিগ্রহ করবে। সক্রিয়ভাবে কিছুই করতাম না আমরা, কিন্তু আবেগের দিক থেকে খুবই জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। ওয়াং চু-র নিস্পৃহতায় কখনও কখনও খুব উত্যক্ত বোধ করতাম, কখনও খুবই আশ্চর্য লাগত। শুধু যে আমাদের দেশের ঘটনাবলিতেই ওর নির্দিষ্ট করে তেমন কোনও আগ্রহ ছিল না তাই নয়, নিজের দেশের ঘটনাবলিতেও ছিল না। চীন নিয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেও, ও স্রেফ হেসে মাথা ঝাঁকাত।

ইদানিং শ্রীনগরের পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। কয়েকমাস আগে গুলি চলেছিল। কাশ্মীরের লোকেরা রাজার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল, কিছুদিন ধরেই নতুন একধরনের উত্তেজনা টের পাওয়া যাচ্ছিল। নেহরু আসছেন, ওঁকে অভ্যর্থনা জানাতে শহরকে একেবারে কনের সাজে সাজানো হচ্ছে। নেহরু সেইদিনই বিকেলে আসবেন। ঠিক হয়েছে যে নৌকোর শোভাযাত্রায় নদীপথে ওঁকে আনা হবে, আর সেই কারণেই আমি ওয়াং চু-কে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।

বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলাম আমরা, কিন্তু যেতে যেতে ওয়াং চু হঠাৎ করেই থেমে গেল।

‘সত্যিই কি যাওয়া প্রয়োজন আমার? তুমি যেমন বলছ...’

মনে হলো কে যেন আমায় একটা ধাক্কা দিল। লাখে লাখে লোক যখন জড়ো হচ্ছে নেহরুকে অভ্যর্থনা করবে বলে, ওয়াং চু বলছে, ‘উনি যদি না আসেন, তাহলে কেমন হয়’, আমি এতে বেশ আহত হলাম। কিন্তু ও নিজেই পুনর্বিবেচনা করে এরপর আর সেকথা বলল না, এবং আমরা একসঙ্গে গেলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা হুব্বা কাদালে লাখ লাখ লোকের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওয়াং চু, দু’তিনজন বন্ধু, আর আমি। চারদিকে, যতদূর চোখ যায়, কেবল লোক আর লোক- ছাদের ওপরে, ব্রিজের ওপরে, নদীর ঢালু পাড়ে। প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য আমি মাঝেমাঝেই আড়চোখে ওয়াং চু-র দিকে তাকাচ্ছিলাম, আমাদের মনে যে বিপুল উৎসাহ, তার কোনও প্রভাব ওর ওপরে পড়ছে কি না। অবশ্য আমার আদতই ছিল, কোনও বিদেশি সঙ্গে থাকলেই তার মুখ পর্যবেক্ষণ করা আর আমাদের রীতিনীতি, আমাদের জীবনযাত্রা দেখে তার প্রতিক্রিয়া চেয়ে চেয়ে দেখা। অর্ধ নিমীলিত চোখে ওয়াং চু তার সামনের সব দৃশ্য দেখে যাচ্ছিল। যে মুহূর্তে নেহরুর বোটটা আমাদের সামনে দিয়ে গেল, ছাদের ওপরগুলো মুখর হয়ে উঠল। রাজহাঁসের আদলে সাজানো একটা বোটে নেহরু স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যাচ্ছিলেন, আর দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে অভিবাদন করছিলেন। আমি ঘুরে ওয়াং চু-র দিকে তাকালাম। সে আগের মতই, অবিচলভাবে দৃশ্যটা দেখে যাচ্ছে। 

‘নেহেরু সম্বন্ধে তোমার কী অভিমত?’ আমার বন্ধুদের একজন ওকে জিজ্ঞেস করল।   

ওয়াং চু চোখ তুলে ওর দিকে ফিরে, ওর সেই দেড়খানা দাঁতের মুচকি হাসিটা হেসে উত্তর দিল, ‘ভালো, খুব ভালো!’

মাঝারি ধরনের হিন্দি আর ইংরিজি জানত ওয়াং চু, যদিও কেউ দ্রুত বলে গেলে আর বুঝতে পারত না। 

নেহরুর বোট ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গেছে, শোভাযাত্রাটা তখনো চলছে, এইসময় ওয়াং চু হঠাৎই আমাকে বলল, ‘আমি কিছুক্ষণের জন্য মিউজিয়ামে যাব। এখান থেকে একটা রাস্তা আছে। নিজেই চলে যেতে পারব।’ তারপর, আর কিছু না বলে চোখ কুঁচকে একটু হাসল, ধীরে ধীরে হাতটা নেড়ে, অন্যদিকে চলে গেল।            

আমরা তো তাজ্জব। এত তাড়াতাড়ি যখন নিজে থেকেই মিউজিয়ামে চলে গেল, এই শোভাযাত্রায় ওর কোনও আগ্রহই ছিল না, তার মানে।

‘ইয়ার, কী বুদ্ধু জুটিয়েছিস একখানা! লোকটা কী রে? কোত্থেকে বের করলি একে?’ এক বন্ধু জানতে চাইল।

‘বিদেশ থেকে এসেছে। আমাদের ব্যাপারে কত আর আগ্রহ থাকবে?’ আমি ওর সমর্থনে বলি।

‘বাহ্, দেশে এত কিছু ঘটছে, আর ওর কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই।’

ততক্ষণে ভিড় ছাড়িয়ে, গাছের সারির নিচে ও দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গেছে।

‘কিন্তু, লোকটা কে?’ আরেক বন্ধু জিজ্ঞেস করল। ‘কথাই বলে না। হাসছে না কাঁদছে বোঝা যায় না। সবসময় এক কোণে নিজেকে লুকিয়ে রাখছে।’

‘না, না, খুবই ভদ্র ছেলে। পাঁচবছর এখানে আছে। বেশ উচ্চশিক্ষিত এবং বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে’, আমি সমর্থন জারি রাখি।

আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে, ও যে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ থেকে অর্থোদ্ধার করেছে, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, এতটা দূর থেকে যে জ্ঞানার্জনে এসেছে, সেটাও তারসঙ্গে।

‘আরে, ওসব পড়াশুনোয় গুলি মারো! শোভাযাত্রা ছেড়ে মিউজিয়ামে চলে গেল, বাহ্ রে!’ 

‘খুবই স্বাভাবিক ভাই’, আমি চালিয়ে যাই। ‘আজকের ভারতের টানে তো ও এখানে আসেনি; অতীতের ভারতের ব্যাপারে ও এসেছে। হিউয়েন সাঙও তো বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতে এখানে এসেছিল। ওয়াং চু-ও একজন জ্ঞানার্থী। ওর আগ্রহের বিষয় বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র।’

বাড়ি পর্যন্ত আমরা ওয়াং চু-কে নিয়ে আলোচনা করতে করতে গেলাম। অজয়ের ধারণা, ও যদি ভারতে পাঁচবছর কাটিয়ে থাকে, তাহলে বাকি জীবনটাও এখানেই কাটিয়ে দেবে।

‘এই যে এসেছে, আর ফিরে যাবে না। বাইরের কেউ একবার এলে আর ফেরার কথা ভাবে না।’

দিলীপ রসিকতা করে বলে, ‘ভারত হচ্ছে জলাভূমির মতো। কোনও লোক একবার বাইরে থেকে এসে এখানে পা রাখলে, কাদায় ডুবতেই থাকে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পেরে ওঠে না। ভগবান জানে, কোন পদ্ম তুলতে আসার স্বপ্ন ছিল ওর, কিন্তু তারপর এদেশ টেনে নিয়েছে ওকে।’

‘আমরা ভারতীয়রা নিজেদের দেশটাকে ভালোবাসি না, কিন্তু বাইরের লোকেরা ভালোবেসে ফেলে!’ আমি বলি।

‘ভালোবাসবেই বা না কেন? কিছুই করতে হয় না, সবসময় আকাশে সূর্য, লোকেরা বিদেশিদের ঘাঁটায় না, শান্তিমতো থাকতে দেয়। তার ওপরে আবার, তোমার মতো বুদ্ধুদের দেখা পেয়ে যায়, যারা কিনা ওদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে পড়ে আর রাজকীয় অভ্যর্থনা দেয়! তোমার ঐ ওয়াং চু এখানেই জীবনটা কাটিয়ে দেবে।’

ঐসময় আমার খুড়তুতো ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বোনটি আমাদের সঙ্গেই থাকত, সেই যে, যে ওয়াং চু-র হাসির নাম দিয়েছিল, দেড়খানা দাঁতের হাসি। খুব উচ্ছ¡ল প্রাণবন্ত মেয়ে, সবসময়ই রসিকতায় মেতে থাকত। দু’একবার আমি দেখে ফেলেছি যে ওয়াং চু আড়চোখে ওকে দেখছে, কিন্তু সেই নিয়ে আর বেশি মাথা ঘামাইনি কারণ ও সবার দিকেই আড়চোখেই তাকাতো। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় নীলম এসে আমায় বলল, ‘তোমার বন্ধু আমাকে একটা উপহার দিয়েছে। ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে।’

আমি উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী দিয়েছে ও?’

‘একজোড়া কানের দুল।’

দু’হাতের তালু মেলে ধরতেই ঝকমক করে উঠল উজ্জ্বল দু’টো রূপোর কাশ্মিরী স্টাইল পেন্ডেন্ট দুল। তারপর দু’টোকে তুলে নিজের কানের কাছে ধরে বলল, ‘কেমন লাগছে দেখতে?’

আমি কী বলব বুঝে পেলাম না। 

‘ওর নিজের কানদু’টো কী অদ্ভুত হালকা বাদামি!’ নীলম হাসে।

‘কা’র কান?’

‘আমার এই প্রেমিকটির।’

‘ওর অদ্ভুত বাদামি কান তোর পছন্দ?’

‘খুউব! লজ্জা পেলে অমনি বাদামি হয়ে যায়, গাঢ় বাদামি!’ ও খিলখিল করে হাসতে থাকে।

যাদের নিয়ে আদৌ মাথা ঘামায় না, তাদের ভালোবাসা নিয়ে মেয়েরা কত সহজে ঠাট্টাতামাসা করতে পারে! না কি নীলম আমার চোখকে ফাঁকি দিতে চাইছে?

 তবে আমার এই খবরে তেমন দুশ্চিন্তা কিছু হয়নি। নীলম পড়াশোনো করত লাহোরে, আর ওয়াং চু থাকত সারনাথে, তাছাড়া আর একসপ্তাহের মধ্যে ওয়াং চু শ্রীনগর ছেড়ে চলে যাবে। রোমান্সের কুঁড়ি নিজের থেকেই শুকিয়ে যাবে।

‘নীলম, ওর থেকে এই দুলটা নিয়েছিস বটে, কিন্তু এই ধরনের বন্ধুত্বে কিন্তু শেষ অবধি বেশ আঘাত পেতে হয়। ওকে আর এগোতে দিস না।’

‘এই তো চাই, ভাইয়া। কী যে গেঁয়ো না তুমি! আমিও ওকে একটা উপহার দিয়েছিÑ চামড়ার একটা রাইটিং প্যাড। ওটা অবশ্য ছিল আমার কাছে, ওকে দিয়ে দিলাম। ফিরে গিয়ে যাতে প্রেমপত্র লিখতে সুবিধে হয়।’

‘ও কী বলল?’

‘বলবে আবার কী? সারাটাক্ষণ হাত কাঁপছিল, মুখটা একবার লাল হয়ে যাচ্ছে, আবার হলুদ হয়ে যাচ্ছে। বলল, ‘লিখো আমাকে, আমার চিঠির উত্তর দিও।’ এছাড়া আর কী বলবে, বেচারা, ছোট ছোট বাদামি কান।

নীলমের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, হাসি ছাড়া আর কিছু দেখলাম না ওর চোখে। মনে যেটা আছে, সেটা মেয়েরা ভালোই লুকোতে জানে। আমার মনে হলো ও বোধহয় ওয়াং চু-কে আশকারাই দিচ্ছে। ওর কাছে এটা একটা খেলা, কিন্তু ওয়াং চু এটা অন্যভাবে নেবে।

এরপর, আমার মনে হলো, ওয়াং চু খানিকটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। সেই রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উপত্যকার সার দিয়ে দাঁড়ানো চিনার গাছ দেখছিলাম, দেখলাম ওয়াং চু, একটু দূরের গাছের নিচে, চাঁদের আলোয় পায়চারী করছে। রাতে ও সাধারণত অনেকটা সময় ধরে চিনার গাছের তলায় পায়চারী করে, কিন্তু এদিন ও একা ছিল না। ওর পাশেপাশে নীলমও রয়েছে। আমার রাগ হল নীলমের ওপর। মেয়েরা যে কত নিষ্ঠুর হতে পারে! এই খেলায় যে ও কতটা আঘাত পাবে, জেনেও নীলম ওকে আশকারা দিচ্ছে।

পরদিন খাওয়ার টেবিলে নীলম আবার ওকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশায় মেতে উঠল। রান্নাঘর থেকে একটা চওড়া অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র নিয়ে এসেছে। ওয়াং চু-র মুখটা উত্তপ্ত তামার মতো লাল।

“আমি তোমার জন্য কয়েকটা রুটি আর খানিকটা আলুর তরকারি এনেছি। এক টুকরো ম্যাংগো পিকল্ও আছে সঙ্গে। ম্যাংগো পিকল্ কী, জানো তো? একবার বলো তো, ‘পিকল্’। বলো, ওয়াং চু ‘পিকল্।” 

দিশেহারা চোখে নীলমের দিকে তাকিয়ে ও বলল, ‘বিকল!’ আমরা সবাই হাসিতে ফেটে পড়লাম।

“বিকল না, ‘পিকল্’।”

‘বিকল।’ আবার একচোট হাসাহাসি।

নীলম পাত্রের ঢাকনাটা খুলে, ভেতর থেকে এক টুকরো পিকল বের করে ওয়াং চুকে দেখাল, আর বলল, ‘টিকল্, একেই বলে পিকল্!’ ওয়াং চু-র নাকের কাছে ধরে বলতে থাকে, “এর গন্ধে জিভে জল এসে যায়। তোমার জিভে জল আসছে? তাহলে বল, ‘পিকল’।”

‘নীলম, এসব কী হাবিজাবি করছিস! চুপ করে বোস!’ ওকে ধমক দিয়ে বললাম।  

নীলম বসল বটে, কিন্তু ফক্কুড়ি থামাল না। মিনতি করে বলতে থাকল, ‘বেনারসে গিয়ে আমাকে ভুলে যেও না কিন্তু! অবশ্যই চিঠি দিও কিন্তু। কিছু দরকার পড়লে, যোগাযোগ করতে কখনো সংকোচ কোরো না।’

 কথাগুলোর মানে বুঝতে পারছিল ওয়াং চু, কিন্তু এগুলোর পিছনের পরিহাসটা ধরতে পারেনি। ক্রমশই আরও আবেগের সৃষ্টি হচ্ছিল ওর মধ্যে।

‘ধরো যদি তোমার দরকার হয় একটা ভেড়ার ছাল, কিংবা কোনওরকম কম্বল, বা আখরোট...’

‘নীলম!’

‘কেন ভাইয়া, ও কি ভেড়ার ছালের ওপর বসে পুঁথিপত্র পড়বে না?’

ওয়াং চু-র কান ততক্ষণে রং পালটাতে শুরু করে দিয়েছে। সম্ভবত এই প্রথম ও টের পেল যে নীলম ওর সঙ্গে ঠাট্টা করছে। ওর কানদুটোতে সত্যিই গাঢ় বাদামি রং ধরছিল, নীলম ঠাট্টা করে যেটা বলত।

‘নীলমজী, আপনারা সবাই আমাকে অনেক আতিথেয়তা দেখিয়েছেন। আমি গভীরভাবে ঋণী।’

সবাই আমরা চুপ করে গেলাম। এমনকি নীলমও খানিকটা বিব্রত। ওয়াং চু ওর ঠাট্টা নির্ঘাত ধরতে পেরেছে। নিশ্চয়ই আঘাতও পেয়েছে। কিন্তু সঙ্গে এটাও মনে হলো আমার, যদি নীলমের প্রতি ওর মনোভাবটা পাল্টায়, তাহলে একপ্রকার ভালোই হবে, নইলে তো ওকেই কষ্ট পেতে হবে।

হয়তো, পরিস্থিতিটা বুঝেও, একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল ওর মধ্যে। যাদের আবেগটা বেশি তাদের নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে কম। ওর নিজের ভুল ও তখনই কেবল বুঝতে পারবে যখন একেবারে ধরাশায়ী হয়ে পড়বে।

সপ্তাহের শেষ দিকটায় এসে, ও প্রত্যেকদিন একটা করে উপহার আনতে লাগল। এমনকি একবার আমার জন্য একটা জোব্বা নিয়ে এসে শিশুর মতো পীড়াপীড়ি করতে লাগল আমরা যেন দু’জনেই জোব্বা চাপিয়ে একসঙ্গে বেরোই। ও তখনও মিউজিয়ামে যাওয়া চালিয়ে যাচ্ছিল। দু’একবার নীলমকেও সঙ্গে নিয়েছিল, আর ফিরে নীলম সারাটা সন্ধ্যে বোধিসত্ত¡দের নিয়ে হাসাহাসি করেছিল। ভেতরে ভেতরে আমি নীলমের এই আচরণকে স্বাগতই জানিয়েছিলাম যেহেতু আমার একেবারেই ইচ্ছা ছিল না যে ওয়াং চু-র ধ্যানধারণাগুলো আমাদের পরিবারেও আদৌ গেড়ে বসুক। সপ্তাহ কেটে যেতেই ওয়াং চু সারনাথে ফিরে গেল।

ও চলে যাওয়ার পর, সাধারণ চেনা পরিচিতদের মধ্যে যতটুকু থাকে, ওর সঙ্গেও ততটুকুই যোগাযোগ ছিল। কখনো কখনো ও চিঠি লিখতো; কখনো অন্য কারুর সঙ্গে সাক্ষাত হয়ে গিয়ে ওর খবর পেতাম। ও হচ্ছে সেই ধরনের লোক, প্রথাগত পরিচয় যাদের সঙ্গে, তাদের বৃত্তের মধ্যেই নিজেকে বছরের পর বছর আবদ্ধ রাখে, এবং কক্ষনো সীমা অতিক্রম করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে না, আবার একেবারে হারিয়ে যাওয়ার মতো দূরত্বও সৃষ্টি করে না। আমি খবর পেলাম যে ওর দৈনন্দিন কাজের ধারা অপরিবর্তিতই আছে। ওর আর নীলমের মধ্যে সম্পর্কটা আর এগিয়েছে কি না, এই নিয়ে কিছুদিন আমি কৌতূহল বজায় রেখেছিলাম, কিন্তু মনে হলো, প্রেমও ওয়াং চু-র জীবনে খুব একটা প্রাধান্য অর্জন করতে পারেনি।

বেশ ক’বছর কেটে গেল। আমাদের দেশে সেই সময় অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছিল। প্রত্যেকদিন সত্যাগ্রহ হতো, বাংলায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ল, ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলো, রাস্তায় রাস্তায় গুলি চলল, বম্বেতে নৌ-বিদ্রোহ হলো, রক্তপাত হচ্ছিল, তারপর দেশভাগ, এই পুরো সময়টা ধরে ওয়াং চু সারনাথেই রয়ে গেল। নিজের পরিস্থিতিতে ও বেশ তৃপ্তই ছিল বলে মনে হচ্ছিল। কখনো কখনো লিখত যে ও তন্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করছে; কয়েকবার শুনলাম যে ও একটা বই লেখার তোড়জোড় করছে।        

এরপর ওয়াং চু-র সঙ্গে আমার দেখা হয় দিল্লিতে। সেইসময় রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে চিনের প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাই ভারতে আসবেন বলে ঠিক হয়েছে। রাস্তায় হঠাৎই ওয়াং চু-র সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় আমি ওকে বাড়িতে নিয়ে এলাম। চিনের প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ও যে সারনাথ থেকে রাজধানীতে এসেছে, এতে আমি খুশি হলাম। কিন্তু যখন বলল যে ও এসেছে ওর টাকা মঞ্জুর হওয়ার ব্যাপারে এবং আসার পরে জানতে পেরেছে চৌ-এন-লাইয়ের পরিদর্শনে আসার কথা, ওর মানসিকতায় আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। স্বভাব এতটুকু বদলায়নি। আগের মতই, সেই দেড়খানা দাঁতের হাসি। এক্কেবারে একই রকম নিস্পৃহ, বিচ্ছিন্ন। এরমধ্যে একখানাও বই বা গবেষণাপত্র লেখেনি। তেমন ইচ্ছে আছে বলেও মনে হলো না, তন্ত্রের ব্যাপারেও বিশেষ উৎসাহ দেখলাম না। যে একটা না দুটো ধর্মগ্রন্থের ওপরে একটা ভাষ্য তৈরি করছে, সেই নিয়েই কথা বলে যাচ্ছিল। আরেকটা কী যেন লেখা তৈরি করছে, সেটার কথাও বলল। বলল যে, ও আর নীলম নাকি পরস্পরকে চিঠি লেখা চালিয়ে গেছে, যদিও অনেকদিন আগেই নীলমের বিয়ে হয়ে গেছে, দুটি সন্তানের মা এখন। সময়ের সঙ্গে, আমাদের মূল মানসিকতায় যদি তেমন পরিবর্তন না-ও ঘটে, উৎসাহের তীব্রতায় তো ফারাক হয়ই। ওর পড়াশোনা নিয়ে বলল, তবে এখন ওর উদ্যমে একটা স্থিতিশীলতা এসেছে। আগের মতো অতটা আবেগপ্রবণ আর নেই। বোধিসত্ত্বদের পায়ে নিজেকে সঁপে দিতে ঘোরাঘুরি আর করে না। এই জীবনে ও তৃপ্ত। আগের মতই কম খায়, অল্পস্বল্প পড়াশোনা করে, ঘোরাঘুরিও অল্প করে, ঘুমোয়ও কম, সেই অস্পষ্ট ও সুদূর শৈশবে কী খেয়ালে নিজের জন্য যে পথ বেছে নিয়েছিল, কচ্ছপের গতিতে সেই পথেই চলতে ওর খারাপ লাগছে না, উপভোগই করছে।

খাওয়া দাওয়ার পর কথা প্রসঙ্গে বললাম, ‘সামাজিক শক্তিগুলোকে না জেনে কী করে তুমি বৌদ্ধতত্ত্ব বুঝতে পারবে? জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্র প্রতিটি অন্য ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত, জীবনের সঙ্গে জড়িত। জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয় কিছুই। জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে তুমি ধর্মকে বোঝার প্রত্যাশা কর কীভাবে?’

কখনো মুচকি হাসছিল, কখনো মাথা ঝাঁকাচ্ছিল, কিন্তু আদ্যন্ত আমার দিকে এক দার্শনিকের দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। মনে হলো, আমার কথাগুলোর কোনও প্রভাবই পড়ছিল না ওর ওপর, যেন তৈলাক্ত পাত্রে জল ঢালছি। 

‘আমাদের দেশের ব্যাপারে যদি না-ও থাকে, নিজের দেশের ব্যাপারে তো খানিকটা আগ্রহ থাকা উচিত তোমার। কী হচ্ছেটচ্ছে সেগুলো জানার চেষ্টা তো কর অন্ততপক্ষে!’  

স্মিত হেসে সামনে মাথা ঝোঁকালো। আমি জানতাম যে এক ভাই ছাড়া চিনে ওর আর কেউ নেই। ১৯২৯ সালে এক রাজনীতিঘটিত সংঘর্ষে ওর গ্রামে আগুন দিয়ে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ওর সমস্ত আত্মীয় তাতে মারা যায় অথবা পালিয়ে যায়। কুল্যে এখন একটিই ভাই, বেজিং-এর কাছে এক গ্রামে থাকে। বহুবছর আগেই ওদের মধ্যে যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছে। ওয়াং চু নিজের গ্রামের স্কুলে পড়ে, তারপর বেজিং-এর এক কলেজে পড়েছে। সেখান থেকে প্রফেসর শানের সঙ্গে ও ভারতে চলে আসে।

‘শোনো ওয়াং চু, চিন আর ভারতের মধ্যে বন্ধ দরজা এখন খুলে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যেই যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে, আর সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন যে গবেষণা একা একা চালিয়ে যাচ্ছিলে, সেটাই এখন নিজের দেশের একজন সম্মানিত প্রতিনিধি হিসেবে করতে পার। তোমার দেশ তোমাকে কিছু টাকা মঞ্জুর করতে পারে। এবার আর তুমি এক্কেবারে একা নও। পনেরো বছরেরও বেশি সময় ভারতে আছ, হিন্দি আর ইংরিজি জান, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করে চলেছ, তুমি এখন সাংস্কৃতিক সংযোগের একজন মূল্যবান সূত্র হয়ে উঠতে পার।’

সামান্য যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর চোখ দু’টো। সত্যিই কিছু টাকাপয়সা ও এখন পেতে পারে। তার সুবিধে নেবে না কেন? দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যের দিকটাও ওর মনে ধরল। বলল যে সম্প্রতি যখন মঞ্জুর হওয়া টাকা আনতে ও বেনারস গিয়েছিল, সাধারণ লোকেরা রাস্তায় ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি ওকে উপদেশ দিয়ে বললাম যে ওর এখন কিছুদিনের জন্য নিজের দেশে ফিরে যাওয়াই একান্ত উচিত, যেসব বড় বড় পরিবর্তন সেখানে ঘটছে সেগুলোর সাক্ষী থেকে বুঝতে চেষ্টা করা উচিত, এখানে একা একা সারনাথে বসে থেকে কোনও লাভ নেই।

ও শুনল, সামনে মাথা ঝোঁকালো এবং মৃদু হাসল, কিন্তু একথায় কোনও ফল হলো কিনা ধরতে পারলাম না।

মাস ছয়েক পরে আমি ওর থেকে একটা চিঠি পেলাম যে ও চীন যাচ্ছে। খুব খুশি হলাম জেনে। নিজের দেশে ফিরে গেলে ওর অবস্থাটা আর সেই ধোপার কুকুরের মতো হয়ে থাকবে না, কোথাও যার তেমন ভূমিকা নেই। কোথাও একটা ওর স্থান হবে। জীবনে নতুন একটা উদ্যমের সৃষ্টি হবে। ও লিখল যে ও একটা ট্রাঙ্ক রেখে যাচ্ছে সারনাথে, ওতে কিছু বই আর গবেষণাপত্র রাখা আছে, এতবছর ভারতে থেকে যে ও নিজেকে ভারতীয়ই মনে করে, এবং শীঘ্রই ফিরে এসে আবার নিজের কাজ শুরু করবে। আমি নিজের মনে হাসলাম। একবার নিজের দেশে ফিরে গেলে আর ফিরবে না কখনো।

বছর দুয়েক ও চীনে ছিল। বেজিং-এর প্রাচীন রাজপ্রাসাদের ছবিওলা একটা পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিল, আর দু’একটা চিঠি, কিন্তু ওর মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে কিছু জানতে পাইনি তাতে।

চীনে তখন তুমুল অবস্থা, বিশাল উৎসাহের জোয়ার, এবং প্রায় সকলেই বস্তুতপক্ষে তাতে সামিল। জীবন একটা নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। লোকেরা দলবেঁধে কাজে যেত, হাতে লালপতাকা নিয়ে, গান গাইতে গাইতে। ওয়াং চু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে ওদের দেখত। লাজুক স্বভাবের জন্যে ঐ কর্মীদের দলের সঙ্গে গাইতে গাইতে যেতে পারত না, তবে আশ্চর্য হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত, যেন একটা অন্য জগতে এসে পড়েছে।

ভাইকে আর খুঁজে বের করতে পারেনি ও, কিন্তু এক বৃদ্ধ শিক্ষক, দূরসম্পর্কের এক পিসি এবং দু’একজন পরিচিতজনের দেখা পেয়ে গিয়েছিল। অনেক কিছুই পালটে গেছে। স্টেশন থেকে গ্রামে যাওয়ার রাস্তায় এক সহযাত্রী ওকে বলেছিল, ‘ঐখানে ওই গাছটার নিচে জমিদারের সমস্ত নথিপত্র, দলিল, সব পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, হাত বাঁধা অবস্থায় জমিদার সেখানে দাঁড়ানো তখন।’

ছোটবেলায় সেই জমিদারবাড়ি ওয়াং চু দেখেছে। সেই রঙিন কাচের জানালার কথা ওর এখনও মনে আছে। শহরের রাস্তায় জমিদারের ছাদখোলা গাড়িও কয়েকবার দেখেছিল। এখন সেই বাড়ি ঐ গ্রামের প্রশাসন ভবন। অন্য অনেক কিছুই এরমধ্যে বদলে গেছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও ওর অবস্থান, ভারতে থাকার সময় যেমন ছিল, ঠিক সেরকমই। ওর কোনও উৎসাহ নেই। অন্যদের উৎসাহ ওকে স্পর্শই করতে পারে না। এখানেও ও নেহাত দর্শকের ভূমিকায় ঘুরে বেড়ায়। শুরুতে ওকে বেশ একটা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। ওর সেই প্রাক্তন শিক্ষকের উদ্যমে, ওকে স্কুলে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভারত ও চীনের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হিসেবে ওকে সম্মানিত করা হয়েছিল, ভারত সম্পর্কে বিশদে ও বক্তব্য রেখেছিল সেখানে। ভারতের বিভিন্ন প্রথা, তীর্থস্থান, মেলা, উৎসব, এইসব নিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করেছিল লোকে। ওয়াং চু কেবল সেইসব প্রশ্নেরই সন্তোষজনক উত্তর দিতে পেরেছিল, যেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আহরণ করতে পেরেছিল। কিন্তু এমন অনেক কিছুই ছিল, ভারতে এসে থেকেও, যেগুলো সম্বন্ধে ও কিছুই জানত না।

অল্প কিছু পরেই, ‘দ্য গ্রেট লীপ ফরোয়ার্ড’ অর্থাৎ ‘উলম্ফনে অনেকটা এগিয়ে যাওয়া’-র কর্মসূচি জোরালো হতে শুরু করে। ওর নিজের গ্রামেও লোকেরা লোহা সংগ্রহ করতে শুরু করে দিল। একদিন সকালে, একদল লোকের সঙ্গে ওকেও পাঠানো হলো বাতিল লোহা সংগ্রহ করে আনতে। সারাদিন ও তাদের সঙ্গেই কাটালো। একটা নতুন উদ্যম তখন ছেয়ে ফেলেছে চারদিক। প্রতিটি লোহার টুকরো লোকে গর্বিতভাবে এনে, রীতিমতো প্রদর্শন করছিল, তারপর জড়ো করা লোহার স্ত‚পে ছুঁড়ে দিচ্ছিল। রাতে, লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠা আগুনের শিখার মধ্যে, সেগুলোকে গলাতে শুরু করলো ওরা। আগুনের চারপাশে বসে থাকা লোকেরা বিপ্লবের গান গাইছিল। সেই যৌথ সংগীতে সবাই একস্বরে যোগ দিচ্ছিল। কেবল ওয়াং চু চুপ করে বসেছিল, অন্যদিকে মুখ করে।

 চীনে থাকাকালীন, পরিস্থিতিতে একটা টেনশন ধীরে ধীরে তৈরি হতে শুরু করে এবং একধরনের অন্ধকার যেন ওকে ঘিরে ফেলতে থাকে। একদিন, নীল কোট আর নীল ট্রাউজার্স পরা একজন লোক ওর কাছে এসে ওকে গ্রামের প্রশাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। যাওয়ার পথে লোকটা কোনও কথা বলেনি। সেই কেন্দ্রে পৌঁছে ও দেখল যে পাঁচজনের একটা প্যানেল বেশ বড়ো একটা ঘরের মধ্যে ওর অপেক্ষায় টেবিলের অপরদিকে বসে আছে।

ওয়াং চু ওদের সামনে গিয়ে বসল। একের পর এক ওরা, ও যে ভারতে এসে ছিল সেই নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করল। ‘কতদিন ছিলেন ভারতে?’ ‘ওখানে কী করতেন?’ ‘কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন?’ ইত্যাদি। তারপর, বৌদ্ধধর্ম নিয়ে ওর গভীর আগ্রহ জানতে পেরে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘বৌদ্ধধর্মের বস্তুগত ভিত্তি কী, সেই ব্যাপারে আপনার কী ধারণা? দ্ব›দ্বমূলক বস্তুবাদের দিক থেকে বিচার করলে বৌদ্ধধর্মের যাথার্থ কতটা বলে আপনি মনে করেন?’

ওয়াং চু এতেও প্রশ্নটা ঠিক ধরতে পারেনি, ও তবু অসম্বদ্ধভাবে কিছু একটা বলেছিল। ‘সুখ শান্তি পেতে গেলে মানুষের যে আধ্যাত্মিক উন্নতি হওয়া দরকার, তারজন্য বৌদ্ধধর্মে যে পথনির্দেশ আছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহান বুদ্ধের বাণী...’

বৌদ্ধধর্মে যে আটপ্রকার মার্গ আছে, সেই নিয়ে এবার ওয়াং চু বলে যেতে শুরু করল। সেটা শেষ করে ওঠার আগেই, মুখ্য প্রশ্নকর্তার চেয়ারে যে শ্যেণচক্ষু ব্যক্তিটি বসেছিল সে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভারতের বিদেশনীতি সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?’

ওয়াং চু এবারে স্মিত হাসল, সেই দেড়খানা দাঁতের হাসি, এবং বলল, ‘আপনারা মানী লোকেরা সে ব্যাপারে আমার চেয়ে ভালো জানবেন। আমি বৌদ্ধধর্মের এক সাধারণ শিক্ষার্থী। তবে, ভারত এক অতি প্রাচীন দেশ। সেখানকার সংস্কৃতিই হচ্ছে সব মানুষের প্রতি সৌহার্দ্য ও শান্তির সংস্কৃতি।’

‘নেহরু সম্বন্ধে আপনার অভিমত কী?’

‘আমি ওঁকে তিনবার দেখেছি। একবার কথাও বলেছিলাম। উনি পশ্চিমী বিজ্ঞানের দ্বারা খানিকটা প্রভাবিত, তবে ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির উচ্চপ্রশংসা করেন।’

এই উত্তরে কেউ কেউ মাথা নাড়তে শুরু করে দেয়, অন্যরা ফুঁসতে থাকে। এরপর ওরা নানা ধরনের তীক্ষ্ম প্রশ্ন করতে থাকে ওকে। ওরা দেখতেই পাচ্ছে যে তথ্যাদি এবং বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপারে অন্তত, ওয়াং চু-র জ্ঞান অসম্পূর্ণ ও হাস্যকর।

‘রাজনৈতিক দিক থেকে আপনি একেবারেই অন্তঃসারশূন্য। সামাজিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আপনি বৌদ্ধধর্মকে যাচাই করতে অসমর্থ। এতদিন ধরে ওখানে বসে থেকে আপনি যে কী করছিলেন, বোঝাই দুষ্কর! তবে, আমরা আপনাকে সাহায্য করব।’

ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই জিজ্ঞাসাবাদ চলল। পার্টির আধিকারিকরা ওর ওপর হিন্দি শেখানোর দায়িত্ব অর্পণ করল, সঙ্গে সপ্তাহে দু’দিন করে বেজিং-এর মিউজিয়ামে কাজ করার অনুমতিও করে দিল।

পার্টি অফিস থেকে ওয়াং চু যখন ফিরল, তখন ও একেবারে বিধ্বস্ত। মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। নিজের দেশে এসে তেমন স্বস্তি ও বোধ করেনি, আর আজ আরো যেন উৎপাটিত বলে বোধ হলো। খড়ের ছাউনির নিচে শুয়ে, হঠাৎই ভারতের স্মৃতি ওকে পীড়িত করতে শুরু করল। সারনাথে ওর নিজের ঘরটার কথা মনে পড়ে গেল, সেখানে সারাটা দিন বসে পাণ্ডুলিপি পড়ে কাটিয়ে দিত ও। পাতায় ভরা নিমগাছটার তলায় যে মাঝেমাঝে বিশ্রাম নিত, সেই কথা মনে পড়ল। স্মৃতির সারি ক্রমেই দীর্ঘায়িত হতে থাকল। সারনাথের ক্যান্টিনের রাঁধুনি-ঠাকুরের কথা মনে পড়ল। লোকটা সবসময় মমতা ভরে কুশল প্রশ্ন করত ওকে, সবসময় হাতজোড় করে স্বাগত জানিয়ে বলত, ‘বলো ভগবান, কী করব তোমার জন্য?’

ওয়াং চু একবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, দ্বিতীয় দিনেই ক্যান্টিনের সেই রাঁধুনি নিজে ওর ঘরে এসে হাজির। ‘আমি বলছিলাম, চাইনীজ বাবু আজ দু’দিন ধরে চা খেতে আসেনি! তার আগে আসতো, আমার পুণ্য হতো ওকে দেখে। আমাকে বললেই পারতে ভগবান, আমি ডাক্তার ডেকে দিতাম। কী হয়েছে, একটু বলবে আমাকে?’ তারপর ওয়াং চু-র চোখের সামনে ভেসে উঠল গঙ্গার তীর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ও সেখানে ঘুরে বেড়াত। এরপর হঠাৎ করেই দৃশ্য পালটে গিয়ে ভেসে উঠল কাশ্মীরের লেক, তাদের পিছনে তুষারাচ্ছাদিত পর্বতরাশি। তারপর এল নীলম, তার বড় করে চোখ মেলে তাকানো, মুক্তোর মতো ঝকঝকে দাঁতের সারি... ওর হৃদয়টা কেমন করে উঠল।

যতই দিন যেতে থাকে, ভারতের স্মৃতি ততই বেশি বেশি করে ওকে বিচলিত করে তুলতে শুরু করল। জলের বাইরে বের করে আনা মাছের মতো ও ছটফট করতে থাকল। সারনাথের মঠে জিজ্ঞাসাবাদের কোনও বালাই ছিল না। যেখানে খুশি পড়ে থাক। মঠই খাবার ও আশ্রয় যোগাত। ধর্মগ্রন্থগুলোকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে বোঝার ধৈর্য, কৌতূহল কোনোটাই আর ওর ছিল না। বহুবছর ধরে একটা পথে এগিয়ে, পরিবর্তনের কথায় ও ঘাবড়ে যেত। সেই সাক্ষাৎকারের পর থেকে ও অন্যদের এড়িয়ে চলত। এখানে ওখানে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে মন্তব্য টন্তব্যও কানে আসছিল। হঠাৎই ওয়াং চু এক অনন্ত একাকিত্ববোধে আক্রান্ত হয়ে পড়ল, ওর মনে হলো যে বেঁচে থাকতে হলে, ছোটবেলায় যে কল্পনা করত, ভারতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে ও ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেই দিবাস্বপ্নে ফিরতে হবে।

হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে ও ভারতে ফিরে আসবে। ব্যাপারটা সহজ ছিল না। ভারতীয় দূতাবাস থেকে ভিসা পাওয়া কঠিন কিছু নয়, কিন্তু চীন সরকার অনেক আপত্তি তুলল। নাগরিকত্ব ও অন্যান্য নানা ব্যাপার সংক্রান্ত। তবে, তখনও ভারত আর চীনের মধ্যে সম্পর্কের ততটা অবনতি ঘটেনি, আর তাই, শেষ পর্যন্ত, ওয়াং চু ফেরার অনুমতি পেল। মনে মনে ঠিক করে ফেলল যে এবারে বাকি জীবনটা ও ভারতেই কাটিয়ে দেবে। ওর লক্ষ্য, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়া।

যেদিন ও কলকাতা এসে পৌঁছল, সেদিন সীমান্তে চীনা ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে এক সংঘর্ষে দশজন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছে। ও দেখল লোকে কেমন করে যেন ওর দিকে তাকাচ্ছে। রেলস্টেশন থেকে বেরোতেই পুলিশের দুই কনস্টেবল এসে ওকে থানায় নিয়ে গেল। সেখানে এক অফিসার একঘণ্টা ধরে ওর পাসপোর্ট আর অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখল।

‘আপনি তো দু’বছর আগে চীনে গিয়েছিলেন। ওখানে গিয়েছিলেন কী উদ্দেশ্যে?’

‘বহু বছর ধরে এখানে ছিলাম তো, কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরতে চেয়েছিলাম।’ পুলিশ অফিসার ওকে আপাদমস্তক তাকিয়ে দেখল। ওয়াং চু স্বাচ্ছন্দই বোধ করছিল, সেই দেড়খানা দাঁতের হাসি হেসে।

‘ওখানে কী করতেন?’

‘ওখানে এক যৌথখামারে একটা দলের সঙ্গে কাজ করতাম।’

‘তবে যে বলছেন, আপনি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করেন?’

‘হ্যাঁ, আমি বেজিং-এ একটা ইনস্টিটিউটে হিন্দি শেখাতে শুরু করেছিলাম, আর বেজিং মিউজিয়ামে কাজ করারও অনুমতি ছিল।’

‘অনুমতি যখন ছিলই, আপনি নিজের দেশ থেকে পালিয়ে এলেন কেন?’ রাগতভাবে পুলিশ অফিসার জানতে চায়।

কী উত্তর দেওয়া উচিত ওর? কী বলবে?

‘আমি নেহাতই অল্প কিছুদিনের জন্য গিয়েছিলাম ওখানে। এখন আবার ফিরে এসেছি।’

এবার আবার সেই পুলিশ অফিসার কঠোর চোখে ওর দিকে তাকাল, পা থেকে মাথা অবধি দেখে নিল। চোখ থেকে সন্দেহ উপচে পড়ছে। ওয়াং চু বেশ বিচলিত ও দিশেহারা বোধ করতে শুরু করল। কোনও ভারতীয় পুলিশ অফিসারের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা ওর এই প্রথম, ও প্রথমে তান শান আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম বলল, কিন্তু দু’জনেই তো আর বেঁচে নেই তখন। সারনাথের সেই প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারির নাম বলল, সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যে দু’একজন সঙ্গী সাথীর নাম ওর মনে ছিল। সুপারিন্টেনডেন্ট সেই সব নাম আর ঠিকানা টুকে নিলেন। তিনবার ওর পোশাকের ভেতরে তল্লাশি চালানো হলো। যে ডায়েরিতে ও বহু উদ্ধৃতি আর মন্তব্য লিখে রেখেছিল, সেটা নিয়ে নেওয়া হলো, আর সুপারিন্টেনডেন্ট ওর নামের পাশে লিখে দিল যে ওর গতিবিধির ওপরে নজর রাখা একান্ত দরকার।

ট্রেনের কামরায় উঠে ও যখন সিটে বসল, যাত্রীরা তখন গুলিচালনা নিয়ে আলোচনা করছিল। ওকে দেখেই, সবাই চুপ করে গিয়ে ওকে দেখতে লাগল।

কিছুক্ষণ বাদে, যখন সহযাত্রীরা দেখল যে ও অল্পস্বল্প বাংলা জানে এবং হিন্দি বলতে পারে, এক বাঙালি ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে, হাতের ভঙ্গি করে বলে উঠলেন, ‘হয় আপনি স্বীকার করুন যে আপনার দেশের লোকেরা আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, নয়তো এদেশ থেকে চলে যান। গেট আউট! গেট আউট!’

ততক্ষণে ওর দেড়খানা দাঁতের হাসি উবে গেছে। তার জায়গায় মুখে পড়েছে উৎকণ্ঠা আর গ্লানির ছাপ। ভয় পেয়ে, ওয়াং চু চুপ করে বসে রইল। কী বলবে ও? গুলি চলার কথা শুনতে পেয়ে ও নিজেও গভীরভাবে আহত হয়েছিল। সংঘাতটা কী নিয়ে সে সম্পর্কে ওর কোনও পরিষ্কার ধারণাই ছিল না, এমনকি জানতেও চায়নি।

হ্যাঁ, সারনাথে পৌঁছে ও সত্যিকারের অভিভূত হয়ে গেল। আশ্রমের কাছাকাছি যখন পৌঁছেছে, রিকশায় ব্যাগটা পাশে রেখে, ক্যান্টিনের সেই রাঁধুনি দৌড়ে বেরিয়ে এল, ‘তুমি কি ফিরে এসেছ, ভগবান! ফিরে এসেছ, আমার চাইনীজবাবু! কতদিন বাদে আমার আশীর্বাদ হয়ে এসেছ! আমি তো বলছিলাম, কতদিন হয়ে গেল, চাইনীজবাবু এখনও এল না। সবকিছু ভালো তো, খুশি তো? তুমি ছিলে না, আমি বলছিলাম, ক’বে যে তুমি ফিরবে? যখন এখানে ছিলে, আমরা রোজই একটু কথাবার্তা বলতাম। একজন ভালো লোকের কাছাকাছি ছিলাম, পুণ্য হচ্ছিল। সে তো কম কথা নয়।’ ওয়াং চু-র ব্যাগটা নেওয়ার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল ও। ‘রিকশার ভাড়াটা আমি মিটিয়ে দেব?’

ওয়াং চু-র মনে হলো, ও যেন নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছে।

‘চাইনীজবাবু, তোমার ট্রাঙ্কটা আমার কাছে আছে, সেক্রেটারির থেকে নিয়ে রেখেছি। তোমার ঘরে অন্য এক ভদ্রলোক থাকতে এসেছিলেন, তাই আমি বললাম, ‘চিন্তা নেই, আমার কাছে রেখে দিচ্ছি।’ আর, তোমার লোটাটা তুমি বাইরে ফেলে রেখে গিয়েছিলে, চাইনীজবাবু। আমি সেক্রেটারিকে বললাম, ‘এই লোটা চাইনীজবাবুর। আমি ওকে চিনি। আমি রেখে দিচ্ছি।’

ওয়াং চু-র হৃদয় ছাপিয়ে গেল। ওর অনিশ্চিত, অনির্দিষ্ট অস্তিত্ব যেন একটা স্থিতিশীলতার আশ্রয় পেল। উথালপাথাল ঢেউয়ে বারবার উৎক্ষিপ্ত হতে থাকা জাহাজ যেন আবার শান্ত জলরাশির মধ্যে যাত্রা শুরু করতে পারল।

সেক্রেটারিও ওকে সহৃদয়ভাবে গ্রহণ করলেন। অনেকদিনের পরিচয় ওঁর সঙ্গে। উনি এমনকি একটা ঘরও খুলে দিলেন ওকে, যদিও বললেন যে ওয়াং চু-কে আবার আবেদন করতে হবে, মঞ্জুরি পেতে। ওয়াং চু আবার ঘরের ঠিক মাঝখানটায় ওর মাদুরটা পেতে নিল, আর জানালা দিয়ে সেই আগের দৃশ্য ওর চোখের সামনে আভির্ভূত হল। ওর হারিয়ে ফেলা জীবন আবার তার নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে।

এর পরেই আমি ওর চিঠি পেলাম, তাতে লেখা আছে যে ও ভারতে ফিরে এসেছে এবং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গবেষণায় কঠোর পরিশ্রম শুরু করে দিয়েছে। ও আরও লিখেছে যে ওর মাসোহারা মঞ্জুর হওয়া নিয়ে ও একটু উৎকণ্ঠায় আছে, এই ব্যাপারে, আমি যদি বেনারসের জনৈক ভদ্রলোককে একটু লিখি, সেটা পেতে সুবিধে হবে।            

চিঠিটা পেয়ে আমি একটু অস্বস্তিতে পড়লাম। কোন মরীচিকা যে ওকে ফিরিয়ে আনল? ফিরে এল কেন? আরও যদি কিছুদিন থাকত, ক্রমে নিজের লোকেদের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতে শুরু করত। কিন্তু বাতিক কি সহজে সারে, সারে না। এখন ও যখন ফিরেই এসেছে, আমি অনন্যোপায়। সেই ‘জনৈক ভদ্রলোক’কে লিখলাম এবং ছোটখাটো একটা মঞ্জুরির ব্যবস্থা হলো।

কিন্তু ফেরার দিন দশেক পরেই একদিন, সকালে মাদুরের ওপর বসে পড়ছে আর তারিয়ে তারিয়ে উপভোগও করছে সেটা, এমন সময় বইজুড়ে একটা ছায়া এসে পড়ল। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে থানেদার এক টুকরো কাগজ হাতে এসে দাঁড়িয়েছে। ওয়াং চু-র মনটা দমে গেল। আবার কী আপদের উদ্ভব হলো কে জানে? ওয়াং চু-কে বেনারসে মূল থানায় ডেকে পাঠানো হয়েছে। হৃদকম্পন ধরে গেল ওয়াং চু-র।

তিনদিন পরে, ও বসে আছে বেনারসের থানার বারান্দায়। ওর সঙ্গে আরেকজন বয়স্ক চাইনীজ, সে জুতো বানায়। শেষ অবধি একসময় ওর ডাক পড়ল, বাঁশের খড়খড়ি উঠিয়ে ভেতরে ঢুকে ও দাঁড়াল ওপরওয়ালা অফিসারের ডেস্কের সামনে।

‘ক’বে ফিরেছেন আপনি, চীন থেকে?’

ওয়াং চু বলল।

‘কলকাতায় আপনি যে জবানবন্দী দিয়েছেন, তাতে বলেছেন যে আপনি শান্তিনিকেতনে যাচ্ছেন, তাহলে এখানে এলেন কেন? আপনার হদিস করতে পুলিশ নাজেহাল হয়ে গেছে।’

‘আমি দু’জায়গারই নাম বলেছিলাম। শান্তিনিকেতনে শুধু দু’দিনের জন্য যেতে চেয়েছিলাম।’

‘চীন থেকে ফিরে এসেছেন কেন?’

‘আমি ভারতেই থাকতে চাই!’ আগেও যেটা বলেছে, সেটাই আবার বলল ও।

‘যদি ফিরতেই চেয়েছিলেন, তাহলে আদৌ গিয়েছিলেন কেন, বলুন তো?’

এই প্রশ্ন ও আগেও বহুবার শুনেছে। উত্তরে আর কী বলবে বুঝে পেল না ও, বৌদ্ধ পুঁথিপত্রে ওর আগ্রহের কথাটুকুই বলল।

খুব বেশিক্ষণ চলল না সেই সাক্ষাৎকার। ওয়াং চু-কে নির্দেশ দেওয়া হলো প্রতিমাসে প্রথম সোমবার করে বেনারস থানায় হাজিরা দিয়ে নিজের নাম লেখাতে।

খুবই মনমরা হয়ে বেরিয়ে এল ওখান থেকে ওয়াং চু। প্রতিমাসে একবার করে থানায় আসা কোনও ভালো কথা নয়, ওর ওঠাপড়াহীন মসৃণ জীবনে ভয়ানক বিঘ্নের, বিপত্তির জিনিস।

এতই ক্লিষ্ট বোধ করতে শুরু করেছিল ওয়াং চু যে বেনারস থেকে ফিরে, নিজের ঘরে না গিয়ে ও চলে যায় সেই বিশেষ জায়গাটিতে, শান্ত, বহু শতাব্দী আগে বুদ্ধ যেখানে প্রথম তাঁর বাণী শুনিয়েছিলেন, এবং চিন্তায় ডুবে গিয়ে দীর্ঘসময় বসে থাকে। অনেকক্ষণ পরে ওর মন সুস্থিত হয়ে আসে, আবার আনন্দময় অনুভূতির ঢেউ তৈরি হতে থাকে হৃদয়ে।

কিন্তু শান্তি ওয়াং চু-র কপালে ছিল না। কয়েকদিন পরেই চীন আর ভারতের মধ্যে যুদ্ধ লেগে গেল। দেশজুড়ে বিশাল ঝড় বয়ে গেল যেন। সেই সন্ধ্যায় জিপে করে এসে পুলিশ ওকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে রাখল বেনারসে। সরকার আর কীই বা করতে পারত এছাড়া? যাঁরা ক্ষমতায় আসীন, সংকটের সময়ে তাদের কি অত সময় থাকে নাকি যে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি নাগরিকের পরিস্থিতি সহমর্মিতা আর সংবেদনশীলতা সহকারে পরীক্ষা করে করে দেখেন।

দু’জন চাইনীজকেই দু’দিন ধরে থানায় একই সেলের ভিতরে রাখা হলো। তাদের মধ্যে কোথাও কোনও মিল ছিল না। জুতো প্রস্তুতকারী হাঁটুর ওপরে কনুইয়ের ভর রেখে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যেত আর বিড়বিড় করত, আর ওয়াং চু, খানিকটা দিশেহারা, দুর্বল, দেয়ালে হেলান দিয়ে শূন্যে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে।

ওয়াং চু যখন নিজের পরিস্থিতিটা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছে, দু’টো কি তিনটে ঘর পরেই, ওর জিনিসপত্রের ছোট্ট বান্ডিলটা সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব পুলিশের ডেস্কের ওপরে, ওতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ওয়াং চু-র অনুপস্থিতিতেই এক পুলিশ কনস্টেবল ঘর থেকে ট্রাঙ্কটা বের করে নিয়ে এসেছে। সুপারিন্টেন্ডেন্টের সামনে একগাদা কাগজপত্র, তাতে নানা উদ্ধৃতি লেখা আছে, কিছু পালিতে, কিছু সংস্কৃতে। একটা বড় অংশ চীনা ভাষায়। অফিসার কাগজপত্রগুলো একটু উলটে পালটে দেখলেন, আলোর নিচে এনে রেখে খুঁজে দেখলেন কোনও গোপন বার্তা আছে কি না এবং সব শেষে হুকুম দিলেন যে সব বেঁধেছেঁদে দিল্লিতে আধিকারিকদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হোক, বেনারসে কেউ চীনা ভাষা জানে না।

যুদ্ধ পাঁচদিন পরে শেষ হয়ে গেল, কিন্তু ওয়াং চু সারনাথে ফেরার অনুমতি পেল একমাস বাদে। যাওয়ার সময় ওকে ওর ট্রাঙ্কটি ধরিয়ে দেওয়া হলো, খুলে তো ওর চক্ষুস্থির। এত বছর ধরে যেসব টিকা, ভাষ্য ও লিখেছে, ওর নিজের জিনিসপত্র বলতে যেগুলোই একমাত্র, সেগুলো নেই। পুলিশ অফিসার যখন বলল যে ওগুলো দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে, ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপতে লাগল।

‘আমার কাগজপত্রগুলো আমাকে দিয়ে দিন প্লিজ, অনেক কিছু লিখে রেখেছি ওতে। খুব জরুরি।’

তাতে অফিসার সরাসরি বলে দিল, ‘ও দিয়ে আমি কী করব? ওসব আপনারই। পেয়ে যাবেন।’ বলে ওয়াং চু-কে ভাগিয়ে দিল। ওয়াং চু তার ঘরে ফিরে এল। কাগজপত্রগুলো ছাড়া ওর প্রায় অর্ধমৃত অবস্থা। আর নতুন করে কোনও উদ্ধৃতি পড়ার বা টুকে রাখার উৎসাহ পাচ্ছিল না। সঙ্গে রয়েছে ওর ওপর কড়া নজরদারির ব্যবস্থা। জানালার ওধারে রোজই একটা লোককে দেখে নিমগাছটার নিচে বসে রয়েছে। হাতে একটা লাঠি, কোনওদিন এধারে বসে, কোনওদিন ওধারে। কখনও কখনও উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারী করে; কখনও গিয়ে কুঁয়োর ধারে বসে; কখনও ক্যান্টিনের বেঞ্চে; কখনও বা গেটে গিয়ে দাঁড়ায়। অধিকন্তু, প্রতিমাসের পরিবর্তে, ওয়াং চু-কে এখন প্রতি সপ্তাহে বেনারস থানায় হাজিরা দিয়ে আসতে হয়।

সেই তখন আমি ওর থেকে একটা চিঠি পাই। সব বিশদে জানিয়ে, তারপর ও লিখেছে যে, সংঘের  সেক্রেটারি বদল হয়েছে এবং এই নতুন সেক্রেটারি চীনকে ঘৃণা করেন, ফলত ওয়াং চু-র ভয়, ওর মঞ্জুরি হয়তো আর চালু থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যেভাবে পারি, আমি যেন ওর কাগজপত্রগুলো রক্ষা করি। যত শীঘ্র সম্ভব ওগুলোকে পুলিশের হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে যেন সারনাথে ওর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর প্রতি সপ্তাহের পরিবর্তে যদি ওকে মাসে একবার থানায় গিয়ে হাজিরা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, ওর খুব সুবিধে হবে, কেননা এই মুহূর্তে মাসে গাড়িভাড়ায় খরচ হয়ে যাচ্ছে দশ টাকার মতো, অথচ ওর কাজ করার ইচ্ছেও কমে এসেছে কারণ মাথার ওপর মনে হচ্ছে যেন খাঁড়া ঝুলছে।

ওয়াং চু চিঠিটা লিখেছিল, কিন্তু এটা বিবেচনায় রাখেনি যে আমার মতো একজন লোক এ কাজটা করতে সক্ষম নয়। এখানে চেনাশোনা না থাকলে, যোগাযোগ না থাকলে কিছুই করা যায় না। আর আমার চেনাশোনার মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হচ্ছেন, আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল। তবু আমি দু’একজন সংসদ সদস্যের কাছে গিয়েছিলাম। এঁদের মধ্যে একজন আমাকে অন্য একজনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন, আর দ্বিতীয়জন, তৃতীয়জনের কাছে। আমি ঘোরাঘুরি করলাম এখানে সেখানে। প্রচুর আশ্বাস পেলাম, কিন্তু সকলেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি চীনে চলেই গিয়েছিল, ফিরে এল কেন?’ কিংবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘গত কুড়ি বছর ধরে কেবল গবেষণাই করে যাচ্ছে?’

কিন্তু ওর পাণ্ডুলিপির কথা যখন তুললাম, সকলেই বললেন, ‘হ্যাঁ, সেটাতে অসুবিধে কিছু হবে না।’ তারপর সামনের কাগজে কিছু একটা লিখে রাখলেন। এরকম অনেক আশ্বাস পেলাম; প্রত্যেকেই সামনের কাগজে আমার আবেদনটা লিখে রাখলেন। কিন্তু সরকারি ব্যাপার স্যাপার হচ্ছে চক্রব্যূহের মতো, প্রতিটি মোড়েই কেউ না কেউ আপনাকে যেখানে ছিলেন সেখানেই ফিরিয়ে দেবে। আমার প্রচেষ্টার কথা সবিস্তারে ওয়াং চু-কে লিখে জানালাম। আমি ওকে এই আশ্বাসও শুনিয়ে রাখলাম যে ঐ একই লোকদের সঙ্গে আমি আবারও দেখা করব, কিন্তু তারসঙ্গে এও পরামর্শ দিলাম যে, যখন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, ও যেন দেশে ফিরে যায়, সেটাই ওর পক্ষে ভালো হবে।

আমার চিঠিতে ওর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা জানি না। কী ভেবেছিল ও? কিন্তু ঐ উত্তেজনার দিনগুলোতে, আমি নিজেই যেখানে চীনের কাজে বেশ ক্রোধান্বিত ছিলাম, ওয়াং চু-র এই বিপদে খুব বেশি সহমর্মিতা অনুভব করে উঠতে পারিনি।

আরও একটা চিঠি এল। এটাতে চীনে ফেরত যাওয়ার প্রসঙ্গে কিছু নেই, কেবল টাকা মঞ্জুর হওয়ার ব্যাপারে। ও তখনও চল্লিশ টাকা করে পায়, কিন্তু আগেই ওকে জানানো হয়েছে যে একবছর বাদে ওরা পুনর্বিবেচনা করে দেখবে টাকাটা ও পাবে নাকি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

বছরখানিক পরে ওয়াং চু-র কাছে একটা কাগজ এল যেখানে ওকে বলা হচ্ছে যে ওর কাগজপত্র ওকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, ও যেন থানায় এসে সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। ও তখন অসুস্থ, কিন্তু সেই অসুস্থ, নড়বড়ে অবস্থায়ই ও বেনারসে গিয়ে পৌঁছোয়। ওর কাগজপত্রের মাত্র এক তৃতীয়াংশ ওকে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো। কাগজের বান্ডিলটার অর্ধেক খোলা। প্রথমটায় ওয়াং চু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি, তারপরে ওর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, হাত-পা কাঁপতে থাকে। এতে থানেদার রুক্ষস্বরে বলে ওঠে, ‘আমি কিছু জানি না, হয় নিয়ে কেটে পড়, নয়তো এখানে লিখে দাও যে তুমি এটা নেবে না।’

কম্পিত পদক্ষেপে, কাগজপত্র বগলে করে, ওয়াং চু ফিরে এল। কেবল একটা প্রবন্ধই পুরোটা আছে, আর কিছু টিকা।

সেদিন থেকে ওর চোখের সামনে সবকিছু ধুলোয় আবিল হয়ে যেতে থাকল।

এক মাস বাদে আমি ওয়াং চু-র মৃত্যুসংবাদ পাই, তা-ও সেই সংঘের সেক্রেটারির কাছ থেকে, তিনি জানালেন যে, মারা যাওয়ার আগে ওয়াং চু বারবার বলেছিল, ওর ছোট্ট ট্রাঙ্কটা আর বেছে নেওয়া কয়েকটা বই যেন আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আমার বয়েসে এসে, দুঃসংবাদ জিনিসটাতে অভ্যেস হয়ে যায়, মনে তেমন গভীর ক্ষতও তৈরি হয় না।   

তক্ষুণি সারনাথে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি, যাওয়ার তেমন কোনও অর্থও হতো না, কারণ সেখানে ওয়াং চু-র ভালোবাসার জন এমন কেউ ছিল না যাকে সান্ত¡না দেওয়া যেত। কেবল একটা ট্রাঙ্ক। তবে কিছু পরে, সুযোগ পেতেই আমি গিয়েছিলাম। সেক্রেটারি ওয়াং চু সম্পর্কে সহানুভূতিসূচক কথাবার্তা বললেন- সে ছিল একজন সহৃদয় ব্যক্তি, প্রকৃত অর্থেই একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি সই করে দেওয়ায় ট্রাঙ্কটা আমাকে হস্তান্তর করা হলো। ভেতরে সব ওয়াং চু-র জামাকাপড়, মায় সেই জীর্ণ হয়ে যাওয়া পুরোনো জোব্বাটা, যেটা শ্রীনগরে কিনেছিল। একটা চামড়ার রাইটিং প্যাড, এটা নীলম ওকে উপহার দিয়েছিল। পালি আর সংস্কৃতে তিনটে কি চারটে বই। কিছু চিঠিপত্র, কতকগুলো আমার লেখা, কিছু নীলমের থেকে, আর কিছু অন্য লোকেদের থেকে।

ট্রাঙ্কটা হাতে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, পিছনে পায়ের আওয়াজ পেলাম। পিছন ফিরে দেখি ক্যান্টিনের রাঁধুনি-ঠাকুর আমার দিকে দৌড়ে আসছে। চিঠিপত্রে ওয়াং চু সাধারণত ওর কথা উল্লেখ করত।

‘বাবু খুব আপনার কথা বলত। অনেকবার করে বলত আপনার সম্বন্ধে। খুব ভালো লোক ছিল।’ ওর চোখটা ভিজে ওঠে। সমস্ত জগতে এই একটিই প্রাণী হয়তো ওয়াং চু-র মৃত্যুতে ক’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছে।

‘নিষ্পাপ মনের লোক। পুলিশ যে কী নাজেহাল করল ওকে। প্রথম কথা, দিনের চব্বিশটা ঘণ্টাই ওরা ওকে নজরে নজরে রাখত। আমি হাবিলদারকে বলতাম, ভাইয়া, বেচারাকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? সে বলত যে সে কেবল তার ডিউটি করছে।’

আমি সেই ট্রাঙ্ক আর কাগজের বান্ডিল সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। এই কাগজপত্রগুলো যে কী করব! কখনো কখনো ভেবেছি যে এগুলো ছাপিয়ে ফেলা যেতে পারে, কিন্তু অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি কেউ ছাপে না। রোজ আমার স্ত্রীর মেজাজ গরম হয়ে যায়, আমি আবর্জনায় আবর্জনায় বাড়ি ভরে ফেলছি বলে। এরমধ্যেই দুই কি তিনবার সব টান মেরে ফেলে দেবে বলে শাসিয়ে রেখেছে, আমি সরিয়ে সরিয়ে রেখেছি। কখনও তাকের ওপর রাখি; কখনও বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখি। কিন্তু এও জানি,  একদিন ঠিক ওগুলোকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হবে।
 

লেখক পরিচিতি:

বিশ শতকের হিন্দি সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্বর ভীষ্ম সাহানি। একাধারে লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা, গবেষক ও সমাজ সংগ্রামী। জন্ম অবিভক্ত ভারতে, ১৯১৫ সালে। কিন্তু ’৪৭-এর দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে চলে আসতে হয় বিভক্ত ভারতে। এই স্মৃতি নিয়ে লেখেন তার সর্বাধিক পঠিত উপন্যাস ‘তমস’। পরবর্তীতে উপন্যাসটি বহু ভাষায় অনুবাদ ও টিভি নাটকে রূপান্তর হয়। বহুভাষিক ভীষ্ম সাহানি বিভিন্ন পেশা ঘুরে যুক্ত হয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ পাবলিশিং হাউজে। জীবৎদশায় ভারতে সব গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারসহ অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। লেখায় তীক্ষ্ম কৌতুক বোধ, শান্ত বিদ্রূপ, চরিত্রে সহজ গমন, বিষয়ের গভীরে প্রবেশ, গোছানো ভাষা, মানব হৃদয়ানুভূতির গল্প বলার সমৃদ্ধির জন্য অনেক সমালোচকই তাঁকে হিন্দি গল্প ও নাটকের প্রবাদ পুরুষ মনে করেন। লিখেছেন আত্মজীবনী, শিশুতোষ গল্প ও চিত্রনাট্য। দশটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে তাঁর শতাধিক গল্প। অনুদিত গল্পটি তাঁর ‘ওয়াং চু’ (১৯৭৮) গ্রন্থ থেকে নেয়া।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC