ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা : ভিন্ন ডানার উদ্ভাস

মতিন বৈরাগী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১১-২২ ৩:৪৮:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-২২ ৩:৪৮:৫৪ পিএম

মতিন বৈরাগী : কবিতার শুরু কীভাবে হয়েছিল; না কি তা কখনোই কবিতা ছিল না; ছিল শব্দ যার ভাষা ছিল না, একটা সুর ছিল, বাঁকে বাঁকে উঠতি-নামতি ছিল, সরল আবার জটিল এক সম্মোহন- স্থির করে বলা মুশকিল। কিন্তু এই সুর অঙ্গভঙ্গি দোলার সম্মোহনে মানুষ যে অভয় পেতো তার শ্রম যে উৎসাহিত ও লাঘব হতো এবং যুথবদ্ধতায় প্রতিরক্ষাগুলো সবল সচল থাকতো, সর্বোপরি শিকারী জীবনে তা যে বিরাট অস্ত্র হয়ে উঠেছিল তার কিছু প্রমাণ অনুমান ইত্যাদির জোড়াতালিতে একটা সিদ্ধান্ত তৈরি করে নেয়া যায়। কবিতার [আদি কবিতা এবং তার বর্তমান বিবর্তিত রূপ আধুনিক কবিতা] সম্মোহন শক্তি রয়েছে এবং কালে কালে সভ্যতার বিস্তারে ভাষাকে সে বাহন করে নিজের রূপ বদলিয়ে সমাজ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি রাজনীতির উত্থান-পতনে শক্তির ক্ষয় নবশক্তির সঞ্চারণ এবং নবভাবনার এক সাঁতারু নব কৌশলে গড়ছে শরীর। বিনয় ঘোষ তাঁর কাব্য প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন: ‘এই ভাবে সমাজের ক্রমবিকাশের সঙ্গে মানুষ পরিবেষ্টনে সংগ্রাম করে কাব্যকে সমৃদ্ধ করল। অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটাবার জন্য উৎপাদনের অস্ত্র যেমন ক্রমে উন্নীত  হলো, তেমনি কাব্যও অজৈব প্রেরণা থেকে উন্নততর উপায়ে রূপায়িত হলো’। আজকের কবিতা আর আমাদের প্রাচীন কাব্য এক নয়। এর পার্থক্য কেবল আকারে আকৃতিতেই নয়, ভাব ভাবনায় বিজ্ঞান-দর্শন চিন্তায় সমাজপ্রগতির ধারায় যুক্ত হয়ে নতুন হয়ে উঠেছে, যাচ্ছে আরো নতুনের দিকে।

‘চেয়েছি আলাদা হতে মর্মমূল ছিঁড়ে

ফিরতে চেয়েছি নীড়ে

ভিন্ন ডানার উদ্ভাস;

দীর্ঘবুক আগুনের শ্বাস

নিয়েছি মরণপণ প্রচেষ্টা অবধি;

শ্বাপদসংকুল অরণ্য জলধি

পেরিয়েছি একা ইউলিসিস

সার্সীর জাদুমন্ত্র বিষ

আকণ্ঠ করেছি পান নীলকণ্ঠ আমি,

স্বপ্ন দেখেছি দূর অনন্ত আগামী

...

ভিন্ন এক স্বরের সন্ধান

আমার আজন্ম ব্রত; অশত্থের তলে বিছিয়েছি ধ্যান।’

[চেয়েছি আলাদা হতে ]

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন আমাদের বাংলা কাব্যে এখন এক প্রবল কবি। এই কবিতাগুলো তার ‘বায়োডাটা’ কাব্যের। স্টালিনের কবিতায় প্রতিদিন নতুনকে খুঁজে পাওয়া যায়। কি বিষয়ের ভাঙচুরে, কি জীবন সমাজ দর্শনে, কি বিজ্ঞানের বিষয়াবলী নিত্য ব্যবহার্যের মতো উঠে আসে তার কবিতায় নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা অন্যের থেকে অনেকখানি আলাদা এক দিগন্তপ্লাবী ভিন্ন ডানার উদ্ভাস। সে কবিতায় অবলীলায় মিথের চরিত্রগুলো বসিয়ে দেয়। আপাতদৃষ্টে মনে হয় এ হলো এক আকস্মিক উপস্থাপনা [যদিও এটাও একটা কৌশল পাঠককে চলমান গতি থেকে ভিন্নতর গতিতে প্রত্যাবর্তন করানো]  বাস্তবে তা কিন্তু নয়, তারও একটা কেন্দ্র আছে বর্ণিত টেক্সটগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে। নিশ্চয়ই রেজাউদ্দিন স্টালিন ব্যতিক্রম, সে বলার ক্ষেত্রেও এবং গঠনের ক্ষেত্রেও। যেমন ‘চেয়েছি আলাদা হতে মর্মমূল ছিঁড়ে’ এই যে ভাষ্য, তাতে রয়েছে এক ইচ্ছের উপস্থিতি যা আন্তরিক যা নির্দিষ্ট, ‘হৃদয়মূল’ অন্তর প্রতীতি বা বিশ্বাস ভাঙার বিশ্বাস যা পারিপার্শ্বিকতাকে ভাঙতে চায় নতুনে; যা আটকে যায়, আছে। চেষ্টা অবদ্ধ হয় দীর্ঘ সামাজিক আরোপিত ক্রিয়ায় কবি ফিরতে চান তার স্বপ্নে। সে চলমান ক্রিয়াকাণ্ড নয়, সে স্থবিরতা নয়, তার দোলা আছে, তার ডানার প্রকাশ আছে, বিকাশ আছে শোভা ও সুন্দরে, সে দীপ্তিময়। আর দীর্ঘবুক নির্গত করে আগুন প্রশ্বাস যা প্রতিজ্ঞার, পুরাতনকে ভাঙার। এ জন্য কবির চেষ্টা উদ্যোগ জ্ঞানারোহণ নতুনকে জানা বোঝা উপলব্ধি করার প্রয়াস থেকে যে চেষ্টার বিস্তার লগ্ন হয় সৃষ্টিতে শত প্রতিকুলতা ডিঙিয়ে আর যেগুলো অসূয়া সেগুলো পারস্পরিক সম্পর্কের অসহযোগিতা, বিষ সর্প সেই পথ পেরিয়ে যেতে যেতে মনে হয় সে ইউলিসিস যে একা হারিয়েছিল পথ গভীর সমুদ্রে। আর কবি তার নিঃসঙ্গতা উপলব্ধি করেন এ ভাবে: ‘আমি আকণ্ঠ করেছি পান নীলকণ্ঠ আমি, স্বপ্ন দেখেছি দূর অনন্ত আগামী’। এই তার কাঙ্খা, উপলব্ধির মধ্য দিয়ে নিজেকে শনাক্তকরণ জেনে নেয়া। কারণ তার সামনে রয়েছে ‘বেদব্যাস’। যে বেদকে ভাগ করেছিল ও মানুষের গ্রহণসীমায় স্থির করেছিল। আর সে জন্য সেই ভিন্ন স্বরের জন্য তবে সে দক্ষিণা [মানে স্বাধীনতার বিসর্জন] দিতে প্রস্তুত নয় একলব্যের মতো। এক গভীর আত্মবোধ তার শেষ ভাষ্য- আমার আজন্ম ব্রত, মানে সাধ, মানে ইচ্ছে, মানে চিন্তামগ্নতা, হৃদয়ের মর্মমূল থেকে এই মন্ত্র বিছিয়ে দিতে চান অশত্থের অর্থাৎ সেই জ্ঞানবৃক্ষের তলে বসে যা আপাতত তার নিজের যা একদিন হতে পারুক সর্বজনীন।

০২.

এই ভাবে প্রতিদিন সে বেরিয়ে যায়

খাদ্যপিতার খোঁজে

চষে বেড়ায় মর্ত্য পাতাল

কিন্তু সে জানে না তাকে ছাড়া

তার পিতা জন্মাতেই পারে না।

[খাদ্যপিতা]

এই কবিতাটিতে ক্ষুধা যা মানুষের চিরকালীন যা মূলত তাড়িয়েছে অন্বেষণে কেবল খাদ্য নয়, খাদ্যসংগ্রহ উপলক্ষে সে পেয়েছে আরো অধিকের সন্ধান। আর তাই তাকে শিকারী জীবন থেকে দিনে দিনে বর্তমান সভ্যতায় পৌঁছালেও সেই খাদ্য রয়ে গেছে ‘গোল্ড রাশের’ সেই পর্বতচূড়ার মতো ঝঞ্ঝাসংকুল, কণ্টকাকীর্ণ। রয়ে গেছে তার আয়ত্বের বাইরে। সে কালে যে খাদ্যপিতা বলে মানুষ নানা প্রাকৃতিক বিষয়কে প্রণাম জানিয়েছে, সেই সব বদলে গিয়ে আজ বুর্জোয়াদের শিকারে পরিণত হয়েছে। তার ক্ষুধা যখন আসে আজো পাঁজর ভাঙে। আর তার তাড়নায় সে যে শ্রম সস্তায় বিক্রি করে  উৎপাদনে আর তাই  সৃষ্টি করে বাজার আর ফুলে ফেপে উঠছে বুর্জোয়া তার ‘গোল্ডরাশ’। কিন্তু ছবিতে তবু সেই দুজন জিম আর তার বন্ধু ধনী হয়েছিল, আজকের শ্রমিকরা সেই ‘গোল্ডরাশ’ প্রতিদিনের খাটুনিতে তৈরি করে দিচ্ছে শিল্পপতিকে। কিন্তু সেই শ্রমিক জানে না তাকে ছাড়া এই ‘গোল্ডরাশ’ যা বুর্জোয়ার জন্মদাতা তার সৃষ্টিই হতো না। স্টালিন এখানে এর ব্যবহারে  ম্যাজিক রিয়ালিজম-এর কাব্যিক বাস্তবতা দিয়ে বিষয়টিকে চমৎকারভাবে কাব্যে রূপান্তরিত করেছেন। ‘গোল্ডরাশ’ ছবিটি ১৯২৫ সালের সাউন্ডলেস ছবি। ছবিটিকে কবিতায় টেনে আনা এবং তার উল্লেখের মধ্যে একটা বিন্যাস আছে, যেমন ক্ষুধার তাড়নায় জিমের বন্ধু জিমকে দেখে মোরগের মতো সামনে হাঁটা চলা করছে, এবং এই মোরগ মারতে গেলে সে মানুষ হয়ে যাচ্ছে। এই যে সিমিলী এতোদিন পরে একটি কবিতায় টেনে আনা এবং ক্ষুধার বিস্তৃতিকে বিস্তার দেয়া অভিনব। এরকম নানা কাজ থাকে তার কবিতার ভেতর সে বলতে চায় যা কিছু তাকে বলে নানা কিছুর মধ্য দিয়ে। যেন তা পাঠক মনকে আলগা না করে। যেন সে কেবল এটা না ভাবে যে, সে একটা কবিতা পড়ছে, সে পড়ছে বেশী কিছু, যা কবিতায় বলা হয়েছে। সন্দেহ নেই যে সে গতানুগতিক নয়, বরং অনেক রকম ভাবনার ভিতর দিয়ে চলতে চলতে টুপ করে কেন্দ্রীয় ভাবনার দিকে যাওয়া যার জন্য পাঠককে অভ্যেসের মধ্য দিয়ে মনোযোগী হয়ে উঠতে হয়। বাড়তি যা সেটি হচ্ছে এমন কতগুলো বিষয় তার কবিতায় যুক্ত হচ্ছে যা পুরাণের, ঐতিহাসিক চরিত্র, গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ, ভৌগলিক কিংবদন্তী, অজানা কোনো সমুদ্রতল এবং স্মৃতি। এগুলো এখানে আমাদের চলমান কাব্যে তেমন ব্যবহার হয়ে ওঠেনি, সেদিক থেকে সে রয়েছে নতুনের দিকে।

যারা সব কিছুর স্রষ্টা যারা কবিতাকে সৃষ্টি করেছিল প্রয়োজনে জীবিকাকে স্বচ্ছন্দ করার জন্যে যা এখন বিনোদন নাম পেয়েছে তারা আজও রয়ে গেছে বঞ্চিত, নিপীড়িতের দলে। আর তাদের সৃষ্ট সৃষ্টি শ্রমলাঘবের হাতিয়ার বিশ্বাস বৃদ্ধির বলকারক না হয়ে হয়েছে গণিকা। এখন কাব্যে এমন সব বিষয় যুক্ত হয়ে গেছে যা মূল প্রেরণাকে সরিয়ে একসময় সামন্তের এবং ধারাহিকতায় বুর্জোয়ার জয়গানই গাইছে শিল্পের স্বাধীনতা নামে। এটা যে কেবল সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাই নয়, জনগণের অর্জনও এমনি বেহাত হয়ে যায় এবং তার মূল চরিত্র হারায়। যে স্বাধীনতার জন্য জনগণ অবর্ণনীয় দুঃখ যাতনা ভোগ করেছে সেই স্বাধীনতা কুক্ষিগত হয়েছে কতিপয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং জনগণ হয়েছে তাদের ভোগ-পর্বের উচ্ছিষ্ট।

‘আদিম শিকারীর ও খাদ্য সংগ্রহকারীর চিৎকারে হল কবিতার জন্ম’, একসঙ্গে একত্র হবার কাজে এই চিৎকারধ্বনি সুর হয়ে বাজত এবং শিকার করা বা খাদ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতো। সেই আদিম যুগে মানুষের অন্তর থেকে উৎসারিত প্রকৃতির অনুকৃতি বা মিমিক্রাই আজকের কবিতার আদিরূপ। সে যুগে কাব্য তাই প্রার্থনায়, স্তবস্তোত্রে, মিলিত সংঘ সঙ্গীতের রূপ। আজকেও আমরা তা দেখি, রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো গান যা মূলত কবিতা; হয়েছে প্রার্থনা সঙ্গীত। এরিস্টটল মিমেসিস নিয়ে কথা বলেছেন এবং তিনি মূলত এ বিষয়টি বেশী জোর দিয়েছিলেন নাটকের উপর, কিন্তু সৃষ্টির সকল ক্ষেত্রেই অনুকৃতির উপস্থিতি রয়েছে সে কথাটাও তিনিই উল্লেখ করেছেন। কবিতা কি- এ নিয়ে কত ব্যাখ্যা তত্ত্ব তৈরি করেছে পণ্ডিতগণ, তা আবার একজন অন্যকে বাতিল বা আংশিক বাতিলের মধ্যদিয়ে তার তত্ত্ব হাজির করছেন। এই বাতিল আর পুর্ণবাতিল প্রক্রিয়ায় কবিতা হয়ে উঠেছে কখনো আকাশবাণী, কেউ কেউ পেয়ে যান কখন হয়েছে প্রেমের কচকচানি, কখনও হয়েছে বিমূর্ত বোধগম্যতার বাইরের বিষয়। বাস্তবে কবিতার সৃষ্টিটাই হয়েছিল মানব ইতিহাসের অগ্রগতির অনিবার্যতায়। তাই প্রতিটি শিল্প জনগণের মৌলিক অধিকারের বিষয় কোনোভাবে তা কারো বেশাতির জন্য নয়, তোয়াজ তোষণের জন্যও না। তবু কবিতাকে তাই হতে হয়েছে আর এই দুরবস্থার দাগরাজি আমরা প্রত্যহই দেখি কবিতার শরীরে। হ্যাঁ এটা সত্য পুরনো সমাজ আর নেই। বুর্জোয়া বিপ্লবের পর সামাজিক ধারণাটাও বদলে গেছে। উপকরণের ব্যবহার উপস্থিতির ভিন্নমাত্রার প্রয়োজনগুলোর কেন্দ্রের বদল ঘটেছে। স্বাভাবিক যে শিল্পের গতিধারা তার নির্মাণ, তার গঠন এসবের মধ্যে এসে গেছে সমাজ রাষ্ট্র ইতিহাস চেতনা। সে সব সংযুক্ত করতে হলে কৌশলেরও বদল ঘটতে হবে। কাদার উপর তো পাথর বাড়ি হবে না, টিকবেও না, তাই তত্ত্বগুলোর উদ্ভব অবলোকন করা কবির কর্তব্য। ‘ধনতান্ত্রিক সমাজের প্রারম্ভিক কাল ১৫৫০ থেকে ১৬০০ আর এই বিপ্লব রাজকীয় আত্মসংকল্পকে বুর্জোয়া আত্মপ্রতিজ্ঞায় রূপ দিতে চাইল সে গাইতে চাইল নিজেদের জয়গান। স্বাভাবিক কারণেই কবিতায় কেবল নয়- সকল সৃষ্ট প্রকাশ কর্মে তার প্রতিফলন দেখা দিল। এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে সামন্তীয় ভাবধারা উল্টে ফেলে জয়গান গাইল বুর্জোয়ার। তারা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। সে যুগ হলো বিদ্রোহ ও অন্তর্বিপ্লবের যুগ, সে যুগের বিদ্রোহী কবি বলে অনেকেই মিল্টনকে উল্লেখ করেন। তার ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ এই মনোভাব রয়েছে।  `Hail horrors,hail/Infernal world, and thou profoundest, Hell’ এই ভাষা তখন কব্যের যৌক্তিক ভাবেই বিদ্রোহের। এ ভাবে পরিবর্তিত সমাজে, পরিবর্তিত রূপে কবিতা রূপবান হয়ে আজকের কবিতা যাবে নতুন আধুনিকতায়। সঙ্গত কারণে তার রূপ বদল হবে কিন্তু কিছুতে ভাববিলাসে দায়দায়িত্বহীনতার শরীর নিয়ে অশ্লীলতায় ডুববে না। রেজাউদ্দিন স্টালিন সচেতন থেকেছেন তার প্রতিটি কবিতায়, নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, সে কবিতায় সুন্দরের ঐতিহ্যকে কদাকার করেন নি।

০৩.

‘মানবচৈতন্য শুধু বাস্তবের প্রতিবিম্ব নয়, বাস্তবের স্রষ্টাও, লেনিনের এই মন্তব্যে চৈতন্য ও বাস্তবের যে নিবিড় সম্পর্ক স্বীকার করে নেয়া হয়েছে তাতে কার্যত স্বীকার করে নেয়া হয়েছে মানুষ বস্তুজগতের নিরপেক্ষ দর্শক নয়, বস্তুর উদ্দেশ্যানুযায়ী সে তার পরিবর্তন সাধনে সক্ষম সৃজন শক্তির অধিকারীরও [মার্কসীয় সাহিত্য তত্ত্ব: বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়] অর্থাৎ বস্তু যা ভাবকে উদ্দীপ্ত করে এবং চিন্তন যা কল্পনা তা স্পষ্ট হয় ভাষায় ভাষা তাকে রূপ দেয় এবং সে হয়ে ওঠে পাঠকের চিন্তনে নতুন রূপ যা বস্তুলগ্ন। এরিস্টটল এ কথাটি স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন যে সৃষ্টির ভাব বস্তুলগ্ন তিনি তার গুরু প্লেটোর ভাব স্বর্গীয় এই ধারণার বিরোধিতাই করেছেন। এ কারণে এরিস্টটলকে প্রাচীনকালের বস্তুবাদী বলে উল্লেখ করা হয়। এ কথাগুলো বলা এ কারণে যে, কবিতার উদ্ভব বস্তুলগ্ন সম্পর্ক থেকে তা নিয়ন্ত্রিত হয় শ্রেণি চেতনা দ্বারা। আর চেতনা নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ যা মূলত রাজনীতিদ্বারা নিয়ন্ত্রিত। স্টালিনের কাব্য কেন আমাদের সকলের কাব্যে নিয়ন্ত্রিত চেতনার ছাপই রয়েছে। যেদিন মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করবে এবং প্রবেশ করবে নতুন সমাজে তখনও এই ভাবধারা মুছে যাবে না, কারণ কোনো একটি আরোপিত ভাবনা দীর্ঘকাল মানুষের মনে জাগরুক থাকে যেমন আমরা আজো সামন্তীয় সমাজের শিল্পরূপকেই রূপায়ণ করছি। সে দিক থেকে এই কবি বিক্ষিপ্তভাবে হলেও সামন্তীয় ভাবনার অনেক কিছুর ভাঙচুর করছেন এবং এগুচ্ছেন আধুনিকতার দিকে, যদিও তা পুঁজিবাদী সমাজের খোলা দুয়ার। একদিন এসবও ভাঙবে এবং নতুন সমাজের উপযোগী হবে নতুন শিল্পের শ্বেতসার।

‘কেউ আসে খনিজের খোঁজে কেউ ঘন সবুজ গ্যাসের

চেখের জলের খনি কারো কারো উপজীব্য উপন্যাসের

স্বর্গের সড়ক খোঁজে কোনো কোনো মুনিঋষী মুষিক দেবতা

মানবশক্তির চেয়ে বড় কিছু নেই বুঝে বলে- নেবো তা

প্রযুক্তির কলি যুগে অগণিত ইতিহাস অলিখিত থাকে

সরল হৃদয় যাকে মিত্র ভাবে সেও খায় সবুজ বাংলাকে

মুগ্ধ কোনো দৃশ্য নেই মাঝে মাঝে ঈসা খাঁর অশ্বের হ্রেষা

আর আর্তের সেবায় ঘরে ঘরে জেগে আছে মাদার তেরেসা’

[সেবাধর্ম ]

সেবা কেমন, কী রকম, কেমন করে আসে, কেমন করে যায়- এই কবিতাটি পড়লে তার একটা বিন্দুচিত্র পাওয়া যায় যাকে প্রসারিত করে নিতে পারে যে কোনো পাঠক। যে কোনো পাঠক বন্ধুর রূপটি চিনতে পারবে, জানতে পারবে অকৃত্রিম বন্ধুর মুখচ্ছবির রেখাগুলো কখন কোন দিকে কুঁচকায়, এবং কীভাবে সেও খেয়ে যায় বাংলার সবুজ। আর এইসব দেখে ঈসা খাঁ যিনি দিল্লীর অধীনতা মানেননি তার ঘোড়া মাঝে মাঝে বেড়িয়ে পড়ে সে জনগণ যদিও সে ঘন অরণ্য এখনও নয়, ভাঙা, কুঁজো, আত্মবিস্মৃত আর কতোগুলো দালাল নেচে যায় এ ওর মুখ দেখে লোভের আয়নায়। মুগ্ধ কোনো দৃশ্য নেই, কেবল সেবার প্রতিষ্ঠান হাজারো এনজিও সুদ তোলে, সুদ খায় ফতুর করে মানুষ কিন্তু তারা যেন মাদার তেরেসার মতোই মমতাভরা চাইলেই পাশে, দাও তোমার শরীরের রক্ত ঘরের টিন গোয়ালের ছাগল এক প্রস্থ জমি দাও দিয়ে দাও তারা তো সেবিকা আছে ঘরে ঘরে। এটুকুই নয় ‘আরো কতো কি রয়েছে গোপন যা প্রযুক্তির এই যুগেও শনাক্ত কঠিন’। স্টালিন এতো সুন্দর করে, এতো নরম করে এই কুৎসিতকে প্রকাশ করেছেন, কুৎসিতে নয় নন্দনে, অনুভবে, চেতনার দরজায় মাপা টোকাটা দিয়ে। এই কবিতায় ইতিহাস চেতনা শিল্প ঋদ্ধির সরল প্রয়োগ রয়েছে এবং পাঠক সে সব পার হয়ে অর্থাৎ ইতিহাসের ঘটনাপুঞ্জের মধ্য দিয়ে বর্তমানকে মিলিয়ে দেখতে পারেন। কবিতাটি কিন্তু সরল বুননের। আর এর মধ্য দিয়ে পাঠক প্রাগ-পর্বের ইতিহাস থেকে অদ্যাবধি একটি সেতু পার হয়ে যেতে পারে। এখানেই একজন কবির কৃতিত্ব নির্মাণের দক্ষতা। আন্তরিকতা না থাকলে পথঘাট না চিনলে তো নিতম্ব, উরু, স্তন, নাভি নিয়ে ঠেলাঠেলি করতেই হয়। আর ন্যূনতম দিশা থাকলে নির্মাণ স্বচ্ছ হয়ে ওঠে এটি তার উদহরণ হয়ে থাকবে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ নভেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC