ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

মহাপ্রয়াণে আনোয়ার হোসেন

জায়েদ ফরিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-০৫ ৬:৩৫:৪৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-০৫ ৬:৩৫:৪৪ পিএম

|| জায়েদ ফরিদ ||
আনোয়ার হোসেনকে বহু অভিধায় স্মরণ করা যায়। চিত্রশিল্পী, আলোকচিত্রী, চিত্রগ্রাহক, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা- সব মিলিয়ে মনেপ্রাণে তিনি একজন শিল্পী। তারচেয়েও তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় তিনি ছিলেন নিখাঁদ দেশপ্রেমী। দীর্ঘকাল শিল্পের লীলাভূমি ফ্রান্সে বাস করলেও বাংলার প্রকৃতি তাকে বারবার মাতৃক্রোড়ে ডেকে এনেছে। জীবনের শেষ কয়েক বছর ফরাসী স্ত্রী মারিয়াম ও দুই সন্তানকে রেখে মাটির টানে দেশে ফিরে এসে তিনি বসবাস করেছেন শরিয়তপুরের নিরিবিলি পরিবেশে।

ছেলেবেলায় আনোয়ার হোসেন থাকতেন পুরানো ঢাকার আগা নওয়াব দেউড়ির ঘিঞ্জি গলিতে। যাকে তিনি ‘বস্তি’ বলেই অভিহিত করতেন। বিদেশীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় একে বোঝাতেন ‘স্লাম’ হিসাবে। অকপট স্বভাবের মানুষটা তাঁর প্রাথমিক জীবনের এই হীন অবস্থানকে কখনও লুকানোর প্রয়োজন মনে করতেন না। ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটর পিতার অবসর গ্রহণের পর ক্ষুদ্র দালানের সীমিত পরিসরে, দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই বড় হয়েছে তাঁর পরিবারের বিদ্যার্থীরা। এমন করুণ সাংসারিক অবস্থার মধ্যেও প্রতিভার গুণে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে ভর্তির সুযোগ করে নিয়েছেন তিনি এবং তাঁর অনুজ ইকবাল হোসেন।

আনোয়ার হোসেন স্কুল জীবনে ছবি আঁকতেন। ছবি এঁকে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু সূক্ষ্মভাবে কোনো কিছুর ছবি আঁকতে গিয়ে তাঁর ভেতরে এক অসহ বেদনাবোধ এসে জমা হতো, কারণ কিছুতেই রিয়াল অবজেক্টকে স্কেচ করা সম্ভব হতো না। এই ব্যর্থতার গ্লানি থেকেই তার ভিতরে জন্ম নিয়েছিল আলোকচিত্রের প্রতি আগ্রহ। একটানা পড়াশোনা করে ১৯৭৪ সালে স্থাপত্য বিভাগ থেকে পাশ করে বেরুলেন তিনি। কিন্তু মনটা তাঁর ঝুঁকে রইল ভিজুয়াল ফাইন আর্টের প্রতি। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে। ১৯৭৪ সালে সিনেমাটোগ্রাফি বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ৩ বছরের জন্য স্কলারশিপ নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ভারতের পুনা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

পুনাতে অবস্থানকালে চলচ্চিত্রশিল্পে তাঁর ত্রিনয়ন বিকশিত হওয়ার সমূহ সুযোগ ঘটেছিল। দূর বিদেশে অধ্যয়নের আরও কিছু সুযোগ সৃষ্টি হলেও পুনায় পড়াশোনা করবেন- মনস্থির করেছিলেন তিনি। কারণ এতে দেশজ সংস্কৃতির নিকটে অবস্থান করার সুযোগ ছিল অবারিত। প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তাঁর সুযোগ এসেছিল দুটি ছবির সিনেমাটোগ্রাফি করার, যার একটি আবু ইসহাকের খ্যাতনামা উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ এবং অন্যটি ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ ছবিটি দেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও জার্মানির ‘ম্যানহেইম’ ও পর্তুগালের ‘ফিগুয়েরা দা ফোজ’ চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার লাভ করে। পরবর্তীকালে ‘চাকা’, ‘দহন’, ‘লাল সালু’ বা হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ ইত্যাদি ছবি নির্মাণের সময় তিনি যা লক্ষ্য করেছিলেন সে সম্পর্কে পরে আক্ষেপ করে বলেছেন, অপ্রতুল যন্ত্রপাতি ও স্বল্পব্যয়ে নির্মিত ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ ছবিটিতে সকলের যতটা মিলিত শিল্প-নিষ্ঠা ছিল তা যেন পরবর্তী ছবিগুলোতে ছিল না। এই ছবি করতে গিয়ে অভিনেত্রী ডলির সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিবাহিত জীবনের এক পর্যায়ে ডলি আত্মহত্যা করলে আনোয়ার হোসেনের জীবন ভীষণভাবে তছনছ হয়ে যায়, ঔদাসিন্যে হারিয়ে যায় তার পুরস্কারের অনেক নথিপত্র। আনোয়ার ভাইয়ের এমন এলোমেলো অবস্থা আমরা কেউ কেউ নিশ্চয়ই দেখেছি। একবার দারুল কাবাবে ঢুকে দেখি আনোয়ার ভাই অত্যন্ত বিমর্ষভাব নিয়ে একা বসে আছেন, টেবিলের ওপর একগাদা ক্যামেরা। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম, মূলত ক্যামেরা পাহারা দিতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বললেন, ‘ওহ, আমি তাহলে এখানেই ক্যামেরা ফেলে গিয়েছিলাম!’ ক্যামেরা-অন্তঃপ্রাণ যে মানুষের তাঁর কতটা মুড সুইং হলে এমন হতে পারে!

বরাবর শহরে বাস করলেও স্থাপত্যের তৃতীয় বর্ষের শেষে, মুক্তিসংগ্রামের সময় তাঁর সুযোগ হয়েছিল নিবিড়ভাবে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার। দোহার এলাকায় অখণ্ড অবসরে নদী, নারী ও প্রকৃতিকে গভীরভাবে অবলোকন করেছেন তিনি। ক্যামেরায় বন্দী করেছেন সেসব অনুপম স্মৃতি। গ্রামের মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে এই মানুষটি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি শেখানোর বন্দোবস্ত করেছেন। ইচ্ছামত বেঁকে চলা ইছামতী নদী ও তাঁর পাড়ের গ্রামগুলো তার শিল্পমনকে এ সময় ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে; একপ্রকার গ্রাস করেছে। এই গ্রাস তাঁর শিল্পজীবনের এক সম্পদ, এক অসাধারণ সঞ্চয়। একেই ধারণ করে বিকশিত হয়েছে তার পরবর্তী জীবনের যাবতীয় শিল্পকর্ম, আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র।

আনোয়ার হোসেনের জীবনে সময়ের সংজ্ঞাটাই ছিল ভিন্ন রকম। গ্রীক ক্রোনাস কাস্তে দিয়ে শস্য কাটার ছন্দে সময় নিরূপণ করতে চেয়েছেন। আধুনিক ঘড়ির কাঁটার টিকটিক যেমন সময়ের প্রবাহকে প্রকাশ করে, তেমনি তার জীবনে সময়-প্রবাহের প্রতীক ছিল ক্যামেরার ক্লিক। অবিরাম ক্লিক করে দিবারাত্র কাটিয়ে দিতেন তিনি। পথ চলতে গিয়ে দেহের মোড় ঘুরলেই যেন তৈরি হতো নতুন আবিষ্কারের জগত। ছাত্রাবস্থায় ৩০ টাকার এক সস্তা আগফা ক্যামেরা দিয়ে তাঁর জীবনে ফটোগ্রাফির শুরু। ক্যামেরা ছিল তাঁর পোশাকের মতো, যেখানেই তিনি সেখানেই তাঁর ক্যামেরা। একটি হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে চলা টডলার বেবির কাছে পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু যেমন খাদ্য হয়ে ওঠে, তেমনি তাঁর কাছে যে কোনো বস্তুই ছিল ফটোগ্রাফির উপাদান। তিনি তার প্রিয় ছাত্রদের বলতেন, উপচার বা গ্যাজেট নিয়ে মাতামাতি নয়, কী ছবি তোলা হচ্ছে সেটাই প্রধান। বিষয় খোঁজার জন্য দূরে যেতে হয় না, মায়ের ছবি, ঘরের ছবি এসবও অনন্য উপাদান হতে পারে।

বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্প ও চলচ্চিত্র-বিজ্ঞানের জগতে আনোয়ার হোসেনের নাম মহীরুহের বাকলে খোদাই হয়ে থাকবে। বিদেশে বা ফ্রান্সে সিনেমাটোগ্রাফির ব্যাপারে কতটা আগ্রহী ছিলেন, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি সরলভাবে ব্যক্ত করতেন, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে একটি দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, মনস্তত্ব বা সব মিলিয়ে ঐ দেশের ‘আলো’টা না বুঝলে এসব শিল্পকাজ কখনও সফলভাবে করা যায় না। তাঁর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারের সংখ্যা ৬০টি। ১৫টা লং ফিল্ম এবং গোটা তিরিশেক ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন তিনি। এমন সাফল্য ও অবদানের পেছনে যে অধ্যবসায় ও মেধা কাজ করেছে তা শিল্পজগতের সব মানুষেরই জানা উচিত। ৩০ বছরে তিনি গোটাদশেক পুস্তক মুদ্রিত করেছেন যার ভেতরে অধিকাংশের শিরোনামই ‘বাংলাদেশ’ বা সমার্থক শব্দ দিয়ে রচিত যেমন ‘দি বাংলাদেশ ইমেজ’, ‘এ ব্যালাড অব বাংলাদেশ’, ‘সোনার বাংলা’ ইত্যাদি।

ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ‘রুল অব ওয়ান থার্ড’, প্রেস ফটোগ্রাফারদের ফরমায়েশি বা সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে ছবি সংস্থাপন করা ইত্যাদি গতানুগতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। তার ছবিগুলো ছিল ডাইনামিক ও অদ্ভুত কম্পোজিশন-সম্পন্ন। তরুণদের তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন সবচেয়ে বেশি। অগ্রজ ও সার্থক শিল্পীকে সাদরে গ্রহণ করেছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন বিজন সরকার, মঞ্জুর আলম বেগ, নাইমুদ্দীন আহমেদ, নওয়াজেশ আহমেদ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। চিত্রমেলায় তিনি তাঁর শ্রদ্ধাভাজন সকলকে মনশ্চক্ষুতে সামনে দেখতে পেতেন, দেখতে পেতেন তার প্রিয় জননীকেও।

তাঁর অনেক ছবি আইকন হয়ে আছে চিত্রজগতে যার বিষয় অত্যন্ত সাধারণ হলেও শিল্পগুণে তা হয়ে উঠেছে অনন্য। ভাষা শহীদ বরকতের মায়ের ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি যখন সেই গর্বিত মাতা বিধবার বেশে গাঁদাফুলের মালা নিয়ে শহীদ মিনারে এসেছিলেন। এই ছবিটি ভাষা আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে চিরকাল ব্যবহৃত হবে।



ছবি : কেএমএ হাসনাত

কানাডায় উঁচু স্তবকের স্বর্ণপদক লাভ করেছে তাঁর পছন্দের একটি অনুপম ছবি। মুক্তিসংগ্রাম চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রামসংলগ্ন জয়পাড়া ব্রিজের কাছে তিনি এই ছবিটি তুলেছিলেন। ব্রিজটি বাঁকা ছিল, একপাশ থেকে মনে হতো যেন অন্যপাশ বিলীন হয়ে গেছে এক অজানা জগতে। তাঁর বিষয় ছিল, ব্রিজের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া নারকেল বহনকারী একজন মেহনতি মানুষ, ফলভারে যার শরীরটা হয়ে উঠেছে অদ্ভুত রকম বাঁকা। তিনি চাইছিলেন, নারকেলওয়ালা মানুষের ছবি এককভাবে তুলতে যার থিম হবে অসামান্য। বেদেনী এবং অন্যান্য মানুষ চলাফেরা করছিল ব্রিজের উপর দিয়ে কিন্তু এক মুহূর্তে কপালগুণে তিনি পেয়ে গেলেন সুযোগটা। এই ছবি দেখে মনে হয়, যেন ঐ মানুষটা চড়াই পার হয়ে তার জীবনকে কষ্ট করে বয়ে চলেছে অদৃশ্য পরপারে।

যে কোনো শিল্পকাজের মধ্যেই চিন্তাধারার মতানৈক্য দেখা দেয়া স্বাভাবিক। এসব নিয়েও শিল্প সৃষ্টিতে এগিয়ে গেছেন তিনি যতক্ষণ পেরেছেন। আলোকচিত্রের জগৎ তাঁর স্বপ্নকে অনুসরণ করতে পারেনি। হয়ত নিজের উপর বিরাগ কিংবা অভিমান করে তিনি চলে গেছেন প্যারিসে কিন্তু তার হৃদয় মন চিরকাল বাস করেছে বাংলাদেশেই। ফ্রান্সে তার ৯ ট্রাঙ্ক ভর্তি নেগেটিভ ও স্লাইড রয়ে গেছে যা দিয়ে তিনি বাংলাদেশে একটি আর্কাইভ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন- তার সৃষ্টির মাত্র এক দশমাংশ সম্পর্কেই হয়ত বাংলাদেশের মানুষ জানতে পেরেছে।

আনোয়ার হোসেন শিল্পীর দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, অনুভব করেছেন তাদের অন্তর্নিহিত বেদনাবোধ। এই দরিদ্র দেশে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বেদনার উপস্থিতি তীব্র ও নৈমিত্তিক। বেদনাগুলো বৃষ্টির মতো অবিরাম ঝরে যা নদীর স্রোতের মতই নিয়ত বহমান। এই কষ্ট লাঘবের জন্য মানুষ ভাটিয়ালি গায়, লালনকে আশ্রয় করে, প্রার্থনা করে। আনোয়ার হোসেন সেই কষ্ট লাঘব করেছেন ছবি তুলে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। তাঁর শিল্পকর্মের ইতিহাস মূলত সাধারণ মানুষের ব্যথা-বেদনারই ইতিহাস। আমরা তাঁকে পেয়েছি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যিনি ছিলেন আমাদের সকলের মধ্যে বিরাজিত এক ব্যথিত আপনজন।

লেখক: গদ্যকার, স্থাপত্যবিদ ও উদ্ভিদবিদ



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC