ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘মনীষার মুখরেখা’ পাঠ

মোজাফ্ফর হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-০২ ৬:৩১:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-০২ ৬:৩৫:০৬ পিএম

মোজাফফর হোসেন : ‘মনীষার মুখরেখা’ অনন্য একটি প্রবন্ধ সংকলন। লেখক পিয়াস মজিদ। গ্রন্থে পিয়াস মজিদের পাঠ ও অনুধ্যান থেকে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পর্যায়ের ১৮জন লেখককে আমরা পাই। তাঁরা হলেন: সমর সেন, প্রতিভা বসু, শামসুদদীন আবুল কালাম, আবদুশ শাকুর, রফিক আজাদ, উৎপলকুমার বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সেলিনা হোসেন, মুনতাসীর মামুন, হুমায়ুন আজাদ, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হক, মুর্তজা বশীর, জাহানারা ইমাম, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও শামসুজ্জামান খান। লেখক নির্বাচনে পিয়াস মজিদ সাহিত্যের কোনো নির্দিষ্ট শাখায় নিজেকে বন্দি রাখেননি। অবিভক্ত বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, চিত্রশিল্পী সকলেই তাঁর গভীর বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে পাঠকের কাছে উন্মুক্ত হয়েছেন।

আলোচনার ক্ষেত্রে পিয়াস মজিদ প্রথাগত প্রবন্ধের ছক মেনে চলেননি। প্রত্যেকের জীবন ও কর্মের বহুতল তিনি অন্বেষণ করেছেন সচল অনায়াস ভঙ্গিতে। কোনো কোনো আলোচনায় সাহিত্যিক দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে, কোনো কোনো আলোচনায় উঠে এসেছে ব্যক্তিত্বের অনালোচিত নানা অধ্যায়। অনুসন্ধিৎসু পাঠকের চোখ দিয়ে কেবল নয়, হৃদয়নিঃসৃত ও মস্তিষ্কসৃজিত চেতনা দিয়ে তিনি মূল্যায়ন করেছেন বাংলা ভাষার এই গুরুত্বপূর্ণ মনীষাদের। আলোচনার সূত্র হিসেবে যেখানে যা প্রয়োজন, যেমন— গল্প-উপন্যাস-কাব্যগ্রন্থ, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথামূলক রচনা ও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ— তা তিনি অবলম্বন করেছেন পরিমিতিবোধের সঙ্গে। একজন লেখকের কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রসঙ্গক্রমে সমকালীন অন্যান্য লেখকদেরও উপস্থিত করেছেন। ফলে বইটি পাঠের মধ্য দিয়ে সমকালীন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহুকৌণিক চর্চার একধরনের তুলনামূলক পাঠ আমাদের হয়ে যায়।

ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ কিভাবে এসেছে তার একটা নমুনা দেয়া প্রয়োজন। ‘রফিক আজাদ: পাখির উড়ে যাওয়া, পাখির পালক পড়ে থাকা’ গদ্যের একটি জায়গায় পিয়াস লিখেছেন: “একবার তাঁর (রফিক আজাদের) ধানমন্ডির বাড়ি থেকে গুলিস্তানে তখনকার কর্মস্থল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্দেশ্যে তাঁরই সরকারি বাহনে যেতে যেতে বলেছিলেন টুকরো টুকরো অনেক কথা। সেখানে নিজের চেয়ে বেশি ছিল বন্ধুদের প্রসঙ্গ। বন্ধু রাজীব আহসান চৌধুরীর কথা বলতে গিয়ে কবির মূল্যায়ন ছিল, ‘বুঝলে, রাজীব আহসানের মুখের কথাই ছিল বিশুদ্ধ বাংলা গদ্যের উদাহরণ।’ বলেছিলেন কবি তারাপদ রায়ের গল্প। আর সেই গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল, তারাপদের আত্মজীবনী কোথায় যাচ্ছেন তারাপদ বাবু(২০০৫)সহ নানা লেখাজোখাতেই তো ভীষণভাবে জড়িয়ে আছেন উদ্দাম এক কবি রফিক আজাদ।” [পৃ৪৯] এভাবেই একজনের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে পিয়াস প্রসঙ্গক্রমে নিয়ে এসেছেন আরও অনেক লেখককে। 

পিয়াস মজিদ কবি ও প্রাবন্ধিক দুটি পরিচয়েই পরিচিত। ইতোপূর্বে প্রকাশিত তাঁর ‘করুণ মাল্যবান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’সহ কবিতাকেন্দ্রিক প্রবন্ধের সংকলন ‘কবিতাজীবনী’ ও কথাসাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধের বই ‘কামু মার্কেস ইলিয়াস ও অন্যান্য’ আমার পাঠ করার সুযোগ হয়েছে। বরাবরই দেখেছি তাঁর গদ্যভাষা পরিশীলিত, একইসঙ্গে আধুনিক ও ক্লাসিক। আলোচ্য গ্রন্থ থেকে তার একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে: ‘অনুকূল বাতাবরণ উত্তরাধিকারসূত্রে নয় বরং এক জীবনে শাকুরের যেমন স্বনির্মিত তেমনি তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির ভাষা ও শৈলীও স্বোপার্জিত। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন প্রকৃত লেখক সে-ই যে তাঁর ভাষার মধ্য দিয়ে নিজের সমান্তরালে নতুনতর পাঠককেও প্রস্তুত করে চলে। শাকুর এদেশের নগন্যসংখ্যক লেখকেরই একজন। খ্যাতি নয়, ঋদ্ধিই ছিল তার মোক্ষ।’ [ধ্রুপদী-আধুনিক আবদুশ শাকুর, পৃ. ৩২]

‘মনীষার মুখরেখা’ গ্রন্থটি সকলের তো বটেই বিশেষ করে তরুণ লেখকদের জন্য শিক্ষণীয় পাঠ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আধুনিক গদ্যসাহিত্যের ভাষাগত বিবেচনায় একধরনের নিপুণ দৃষ্টান্ত আমরা এখানে পাই। পাঠলব্ধ জ্ঞান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মিশেলে গদ্য লেখার চমৎকার শৈলী আয়ত্ত করেছেন পিয়াস মজিদ, এখান থেকেও অনেককিছু গ্রহণ করার আছে।

পিয়াস মজিদের আলোচ্য প্রবন্ধ সংকলনটি ২০১৮ সালে নবীন শাখায় ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছে। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। ১৪৪ পৃষ্ঠার বইয়ে মূল্য রাখা হয়েছে ২৫০টাকা।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC