ঢাকা, সোমবার, ১১ চৈত্র ১৪২৫, ২৫ মার্চ ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মৃণাল সেন: সাময়িক বিশ্লেষণ

মুম রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-০৩ ২:১৪:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-০৭ ১২:৩১:০৯ পিএম
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ইন্টারনেট থেকে নেয়া

 

আমার এক বন্ধু যখন তর্ক শুরু করলো- গঁদার, না গোদার? তখন আমি তিনটি কারণে চুপ মেরে গেলাম। প্রথমত আমার বন্ধুটি নির্বোধ। দ্বিতীয়ত সে ক্ষমতাধর এবং তৃতীয়ত আমি ফরাসি উচ্চারণ অতো ভালো জানি না। নিজে যা জানি না, তা নিয়ে তর্ক করে কী লাভ! এবং নির্বোধ ও ক্ষমতাধরের সঙ্গে তর্ক করা নেহাতই বোকামি। ফরাসি ভাষা নিয়ে যেমন আমার বহু দ্বিধা আছে তেমনি জঁ লুক গঁদারকে (১৯৩০-)  নিয়েও দ্বিধা কম নয়। ১৯৬০ সালে মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ‘বিদ্রলেস’ ছবি বানালেন তিনি; এটা শুধু ছবি ছিলো না, একটা বিরাট প্রতিবাদও ছিলো। আর এটা ছিলো ফরাসি চলচ্চিত্রে নয়া তরঙ্গের সূচনা। অস্তিত্ত্ববাদ আর মার্ক্সসবাদের একনিষ্ঠ চর্চাকারী গঁদার ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর হুট করে ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে বলে ফেললেন, ‘আমি পূঁজিবাদী। আমি চলচ্চিত্র প্রযোজক।’ আমি তখন আবার সিদ্ধান্ত নিলাম- গঁদার নিয়ে আমার পক্ষে মীমাংসায় আসা সম্ভব নয়।

মৃণাল সেন (১৯২৩ -২০১৮) আমাদের কাছে মীমাংসিত। তাঁর অবস্থান, তাঁর চলচ্চিত্র, তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত সুনির্ণীত। ব্রিটিশ অভিনেত্রী ভেনেসা রেডগ্রেভ পরিষ্কার করেই বলেন, ‘আমি বাম-দলের যতোটা সম্ভব ততোটাই।’ মৃণাল সেন ‘যতোটা-ততোটা’, ‘সম্ভব-অসম্ভবের’ ধার ধারেন না। তিনি পুরোটাই শ্রেণী সচেতন। মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র মানেই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। ‘শিল্পের জন্যে সিনেমা’ বা ‘বিনোদনের জন্যে সিনেমা’ যাদের আরাধ্য তারা আর যাই হোক মৃণাল সেনের ছবিতে আরাম পাবেন না, পাওয়ার কথাও না। মৃণাল সেন সচেতন, বিচক্ষণ এবং নিজের কাজটি সম্পর্কে জানেন।
 


ভারতীয় বাংলা সিনেমার ত্রয়ী গুরুদের শেষজন মৃণাল সেন। সত্যজিৎ রায়ের (১৯২১- ১৯৯২) সঙ্গে তাঁর চিন্তাগত নৈকট্য কমই ছিলো। বয়সে তাঁর চেয়ে দু’বছরের বড় ছিলেন সত্যজিৎ। ১৯৫৫ সালে মৃণাল সেনের প্রথম ছবি ‘রাত ভোর’ মুক্তি পায়। একই বছর সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ মুক্তি পায়। ‘পথের পাঁচালি’ বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে, অথচ মৃণাল সেনের প্রথম ছবি সে অর্থে কোন আলোড়নই তোলেনি। তৃতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’ (১৯৬০) তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসাবে চিহ্নিত করে। আরো পরে ১৯৬৯ সালে ‘ভুবন সোম’ চলচ্চিত্রের কারণে মৃণাল সেনকে আমরা সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটকের কাতারের চলচ্চিত্রকার মনে করি। ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) অবশ্য বয়সে সত্যজিৎ ও মৃণাল সেনের চেয়ে ছোট হলেও চলচ্চিত্রে তাঁর আগমন ও প্রস্থানও তাঁদের আগেই। ‘নাগরিক’ (১৯৫২) চলচ্চিত্র দিয়ে ঋত্বিকের চলচ্চিত্র অভিযান শুরু আর সমাপ্তি ঘটে ‘যুক্তি তক্ক গপ্পো’ (১৯৭৩) দিয়ে। ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের একটা কমন আইডেন্টিটি ছিলো। দুজনই আইপিটিএ (Indian People’s Theatre Association) এর কর্মী ছিলেন। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক মুখপাত্র ছিলো এই নাট্যদল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪২ সালে এ নাট্যদলের জন্ম। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, উপনিবেশিকতার ভয়াবহবতা এবং সর্বোপরি শ্রেণি শত্রু নিধনই আইপিটিএ-এর অন্যতম কাজ ছিলো। নানা সময়ে পৃথ্বিরাজ কাপুর, বিজন ভট্টাচার্য, বলরাজ সাহানি, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত, মৃণাল সেন, সলীল চৌধুরী, পণ্ডিত রবি শঙ্কর, সফদর হাসমির মতো ব্যক্তিরা এখানে কাজ করেছেন। এবং অনিবার্যভাবেই তাদের কাজে আইপিটিএ-এর প্রভাব পড়েছে। বিশেষত বাংলা চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন এবং উৎপল দত্ত শ্রেণী সংগ্রামকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা। সত্যজিৎ রায় সরাসরি এই দলে যোগ দেননি। তবে তাঁর একাধিক চলচ্চিত্রে সাধারণ মানুষ, শ্রেণী শোষণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মৃণাল সেনের ‘আকালের সন্ধানে’র (১৯৮০) আগেই সত্যজিৎ রায় বানিয়েছেন ‘অশনি সংকেত’ (১৯৭৩) আবার ১৯৭২-এ মৃণাল সেন বানিয়েছেন ‘কলকাতা ৭১’। উল্লেখ করা দরকার এই তিনটি চলচ্চিত্রেই ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের চিত্রায়ণ হয়েছে বলিষ্ঠভাবে। ‘অশনি সংকেত’ বিভূতিভূষণের উপন্যাস অবলম্বনে করা। অন্যদিকে ‘কলকাতা ৭১’ এর কাহিনী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধ স্যান্নাল, সমরেশ বসু এবং অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি গল্প থেকে নেয়া। এটাই তো স্বাভাবিক যে, লেখক, চলচ্চিত্রকার, শিল্পীরা তাদের সময়, সমাজের সংকট তুলে ধরবেন। অতীত আর বর্তমানকে বিশ্লেষণ করবেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়ে। মৃণাল সেন সময় ও সমাজের দায় পালন করেছেন ‘কলকাতা ৭১’, ‘আকালের সন্ধানে’র মতো চলচ্চিত্র বানিয়ে। সোজা করে বললে, মৃণাল সেনের সব চলচ্চিত্রই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নির্মিত।

গঠনগত দিক থেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সরল ভঙ্গির গল্প। মানবিক সংকটের একটি গল্প বলাই তার লক্ষ্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি তাই করেন। অন্যদিকে ‘কলকাতা ৭১’ অনেকটাই জটিল। কারণ, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির হিসাবটা একরৈখিক নয়। অসহায় মানুষগুলো সদা এক জটিল রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদির আবর্তে পাক খেতে থাকে। সেই বিবিধ পাকের গল্প ‘কলকাতা ৭১’। গ্রিফিতের ‘ইন্সটলারেন্স’ চলচ্চিত্রে যেমন নানা সময় উঠে এসেছে, শোষণের নানা কাল উঠে এসেছে, তেমনি ‘কলকাতা ৭১’ এর চারটি সময় তুলে ধরা হয়েছে। গ্রিফিথের মতো মৃণাল সেনও পুঁজিবাদ, শ্রেণী শোষণ ও সামাজিক অসঙ্গতিকে চারটি ভিন্ন ভিন্ন গল্পে বয়ান করেছেন। এবং এই গল্প বয়ানটিও সরল নয়; প্রায়ই ব্রেখটিয় এলিনিয়েশন দ্বারা তাড়িত। মৃণাল সেনের গণনাট্য চর্চার অভিজ্ঞতা হয়তো এ ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। দর্শককে তিনি আবেগাপ্লুত করেননি, বরং যখনই আবেগের মোহ তৈরি হয়েছে, যখনই মন নরম হয়েছে তখন তিনি সজোরে আঘাত করে জানিয়ে দিয়েছেন, আবেগে ভেসে যাওয়ার কিছু নেই, বিশ্লেষণে মন দিতে হবে। মন নয়, মৃণালের ছবি মগজের খাদ্য। ব্রেখটিয় এলিনিয়েশনের মতো তিনি দর্শককে গল্প বলার মুগ্ধতায় নয়, বরং গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন করে মুহূর্তেই বুদ্ধি জাগিয়ে দিতে চান। ছবিতে জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের চিত্র ব্যবহার করা মগজ আর মননের দারূণ সমন্বয়।
 


তাঁর ‘আকালের সন্ধানে’ চলচ্চিত্র বাস্তবতার বিশ্লেষণাত্মক চিত্ররূপ। আঙ্গিকগত দিক থেকে একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক আর মার্সেল প্রুস্তের উপন্যাসের জটিলতা ও নান্দনিকতাকে ধারণ করে। এ চলচ্চিত্র ক্ষুধা, দারিদ্র আর দুর্ভিক্ষের মোক্ষম চিত্রায়ণ। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার মতো ধ্রুপদী মৃণাল সেনের ‘আকালের সন্ধানে’। নির্মাণের দিক থেকে এটি ফরাসি চলচ্চিত্রকার ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র ‘ডে ফর নাইট’ এবং ইতালীয় নাট্যকার লুইজি পিরানদেল্লার ‘সিক্স ক্যারেক্টার ইন সার্চ অব আ রাইটার’ বা ‘হেনরি দ্য ফোর্থ’ মঞ্চ নাটকের কথা মনে করিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রের ভেতরে চলচ্চিত্র, নাটকের ভেতরে নাটক, চলচ্চিত্র নিয়ে চলচ্চিত্র, নাটক নিয়ে নাটক- এই ব্যাপারগুলো আছে মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রে। কথাগুলো আরও পরিষ্কার হবে ‘আকালের সন্ধানে’র কাহিনীর দিকে দৃষ্টি দিলে।

বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক গ্রামে গেছেন শুটিং করতে। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’-এর মতো তারাও ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের চিত্রায়ণ করতে চান। একটি বোমাও ফেলা হয়নি, একটি বন্দুকও ছোড়া হয়নি- অথচ মানুষের তৈরি এই দুর্ভিক্ষে ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো অনাহারে। ১৯৮০ সালে চলচ্চিত্রের পরিচালক, কুশলী, শিল্পীরা গ্রামে এসে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের গল্প চিত্রায়ণ করতে গিয়ে মুখোমুখি হন এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার। ১৯৪৩ সালের সাথে সংযোগ তৈরি হয় ১৯৮০ সালের মানুষের। গ্রামের দারিদ্র্য, অশিক্ষিত মানুষগুলোর সঙ্গে সিনেমার শৈল্পিক, শিক্ষিত লোকগুলোর মিল আর তফাত বেরিয়ে আসে। সিনেমার বাস্তবতা আর জীবনের বাস্তবতা এক নয়। ফলে ক্ল্যাপস্টিক চালু হওয়ার সাথে সাথেই সিনেমার শিল্পীকুশলীরা ক্রমশ ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে থাকে। গ্রাম্য গৃহবধূর চরিত্র নিজের সমস্ত দরদ দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করে স্মিতা পাতিল বুঝতে পারেন এই মানুষগুলোকে চেনার ক্ষেত্রে কতোটা পিছিয়ে আছি আমরা। আরেক নাগরিক অভিনেত্রী তো দুর্ভিক্ষের কালে শরীর বিক্রি করা নারীর চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে গ্ল্যামার বিসর্জন দিতে রাজি হন না। তিনি শুটিং রেখেই চলে যান। গ্রামের একটি নারী কি পারবে এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে? এদিকে যে বাড়িতে শুটিং সেখানেই একটি মৃত্যু পুরো ইউনিটকে বিব্রত করে। লোকেশনে শুটিংয়ের নানা কারিগরি সমস্যা তো আছেই, সেই সঙ্গে অভিনেতাদের দ্বৈত সত্তা ক্রমশ জটিল করে তোলে। এদিকে গ্রামের সরল মানুষগুলো এই শুটিং নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে। এর মধ্যে গ্রাম্য জটিলতাও দেখা দেয় কিছু।

‘আকালের সন্ধানে’ করতে এসে কেবল দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর নয়, আরো বাড়তি কিছু অনুভব যোগ হয়। গ্রামীণ সমাজের সারল্য, অজ্ঞতা, নারীর অবমূল্যায়ন, শহর ও গ্রাম জীবনের ফারাক- এমনি সব বিষয় উঠে আসে একটি সিনেমার শুটিংয়ের অজুহাতে। শহর আর গ্রাম যে ‘দুটো আলাদা পৃথিবী’ ছবির শেষে তাই মৃণাল সেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। ১৯৪৩ আর ১৯৮০ একাকার হয়ে যায়। ইতিহাস আর বাস্তব একাকার হয়ে যায়। জীবন আর সিনেমার ফারাক বেরিয়ে আসে। ফলে পুরো টিম ফিরে যায়, যেতে হয়। গ্রামে নয়, স্টুডিওতেই শুটিং করতে হবে বাকী চলচ্চিত্রের, কারণ শেষতক চলচ্চিত্রও একটা বুর্জোয়া শিল্পমাধ্যম। চলচ্চিত্র মুনাফা, পূঁজির হিসাবের বাইরের কিছু নয়। প্রসঙ্গত আবার গঁদারের কথা মনে পড়ে যায়। মৃণাল সেন বরাবরই এই নানা প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দেন। প্রচুর রেফারেন্স ব্যবহার করেন তিনি। মাঝে মাঝে প্রবন্ধের নির্লিপ্ততা চলে আসে তাঁর চলচ্চিত্রে। মাঝে মাঝে গল্প হয়ে ওঠে তথ্যচিত্রের মতো একনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণ তবে তা বাস্তবসম্মত এবং বোধ জাগানিয়া।

একটি ছবির কথা না বলে আলোচনা শেষ করা যায় না। মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ এমন এক চলচ্চিত্র যা আমাদের বোধ জাগ্রত করে।

‘আলো-অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরে

স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে;

স্বপ্ন নয়- শান্তি- নয়- ভালোবাসা নয়,

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;

আমি তারে পারি না এড়াতে,

সে আমার হাত রাখে হাতে,

সব কাজ তুচ্ছ হয়- পণ্ড মনে হয়,

সব চিন্তা- প্রার্থনার সকল সময়

শূন্য মনে হয়,

শূন্য মনে হয়।’

[বোধ, জীবনানন্দ দাশ]
 


ওড়িয়া গল্পকার ভগবতি চরণ পানিগ্রাহী’র গল্প অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ‘মৃগয়া’। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের প্রেক্ষাপটে এক আদিবাসী যুবকের জীবন ও সংগ্রাম কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কাহিনী। ঘিনুয়া সরল আদিবাসী যুবক, শিকারই তার নেশা-পেশা। ইংরেজ সাহেবও শিকারের নেশায় মত্ত। শিকারকে ঘিরেই দুই অসম শ্রেণীর মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। ঘিনুয়া ও আদিবাসীদের সঙ্গে মহাজনের সংঘাত চিরকালই লেগে আছে। এর মাঝে বিপ্লবী হয়ে ওঠে কোনো কোনো আদিবাসী যুবক। তারা জানে বুনো জন্তু আর শোষক-মহাজনে কোনো তফাত নেই। মহাজন একদিন ঘিনুয়ার প্রিয়তম স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। বউকে লুণ্ঠনের শাস্তি ঘিনুয়া নিজ হাতে তুলে নেয়। ব্রিটিশ আইন তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়। কিন্তু ঘিনুয়া আর তার আদিবাসী সঙ্গীরা বুঝতে পারে না, বিশ্বাসঘাতককে হত্যা করলে তার শাস্তি হবে কেন! কারণ তারাই দেখেছে তাদের গ্রামের বিপ্লবী শাপলুকে যে হত্যা করেছিলো তাকে সরকার পুরস্কার দিয়েছে। এমনকি সাহেবও এই অন্যায়ের  প্রতিবাদ করে না। বিচারও যেন শ্রেণী ও মানুষ ভেদে ভিন্ন এ গল্প চোখে আঙুল দিয়ে তা-ই দেখিয়ে দেয়। ছবির শেষে এক ভিন্নতর অর্থেই ‘সব চিন্তা- প্রার্থনার সকল সময়/শূন্য মনে হয়,/শূন্য মনে হয়।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এইসব সাময়িক বিশ্লেষণ দিয়ে কি আমরা মৃণাল সেনকে ছুঁতে পারি? আমাদের বোধ কি কোনো অর্থে জাগ্রত হয়? ছবি দেখা শেষ করে আমরা আবার ডিনারের প্রস্তুতি নেই। যেমন এ লেখা শেষ করে আমি ডিনারে যাচ্ছি।

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রসমূহ :

১.        রাত-ভোর (১৯৫৫)     

২.        নীল আকাশের নীচে (১৯৫৮)

৩.        বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০)

৪.        পুনশ্চ (১৯৬১)

৫.        অবশেষে (১৯৬৩)       

৬.        প্রতিনিধী (১৯৬৪)       

৭.        আকাশ কুসুম (১৯৬৫)

৮.        মাটির মনিষা (১৯৬৬, ওড়িষা)

৯.        ভুবন সোম (১৯৬৯, হিন্দি)

১০.      ইন্টারভিউ (১৯৭০)

১১.      এক আধুরি কাহানি (১৯৭১, হিন্দি)

১২.      ক্যালকাটা ৭১ (১৯৭২)

১৩.      পদাতিক (১৯৭৩)       

১৪.      কোরাস (১৯৭৪)         

১৫.      মৃগয়া (১৯৭২, হিন্দি)

১৬.      ওকা উরি কাথা (১৯৭৭, তেলুগু)

১৭.      পরশুরাম (১৯৭৮)      

১৮.      একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯)       

১৯.      আকালের সন্ধানে (১৯৮০)      

২০.      চলচ্চিত্র (১৯৮১)     

২১.      খারিজ (১৯৮২)          

২২.      কান্দাহার (১৯৮৩, হিন্দি)

২৩.      জেনেসিস (১৯৮৬, হিন্দি)

২৪.      এক দিন আচানক (১৯৮৯, হিন্দি)

২৫.      মহাপৃথিবী (১৯৯১)     

২৬.      অন্তরীণ (১৯৯৩)

২৭.      আমার ভুবন (২০০২)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton AC