ঢাকা, শুক্রবার, ৮ চৈত্র ১৪২৫, ২২ মার্চ ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সৃজনশীল সাহিত্যের মূল্যায়ন কেনো জরুরি?

রুমা মোদক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০৬ ৬:৫৬:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৩-০৬ ৮:২৭:১৮ পিএম

একজন লেখক কেনো লিখেন? লেখকে লেখকে মতভিন্নতা স্বীকার করেও বলা যায়- লেখক লিখেন তার নিজস্ব বিশ্বাসের জায়গা থেকে। অন্যভাবে বললে, লেখক লিখেন তার অন্তর্গত সংঘাত থেকে। যে সংঘাতের জন্ম  বর্তমান পারিপ্বার্শিকতা তথা এস্টাব্লিশমেন্টের সঙ্গে সংবেদনশীল লেখক সত্তার দ্বন্দ্ব থেকে। এর বাইরে আরো বলা যায়, লেখক লিখেন তার সংগ্রহ থেকে। প্রতিদিন যে জীবনাভিজ্ঞতা তিনি সংগ্রহ করেন, যা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ঘটে, লেখক তা অন্তরে তুলে নেন মুক্তোর মতো। অতঃপর লেখকের বেদনা ঠিক সেই ঝিনুকের মতো; মুক্তা ফলাতে ঝিনুক যেরকম বেদনার মধ্য দিয়ে যায়। লেখকের ভেতরে বাইরের জগতাভিজ্ঞতা থেকে যে লেখাটির জন্ম হয়; ক্ষোভে কিংবা বেদনায়, আনন্দে কিংবা প্রতিবাদে, অতঃপর সেই লেখাটি প্রকাশে সে ব্যস্ত হয় অনিবার্য এক তাড়নায়। সেই তাড়া থেকে মুক্তি নেই লেখকের। হারুকি মুরাকামি যেমন বলেন, ‘লেখালেখি ব্যাপারটি অনেকটা মুষ্টিযুদ্ধের মত। একবার রিঙের মধ্যে ঢুকে পড়লে লেখক আর বের হতে পারেন না, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে।’

কিন্তু এই যে লেখকের লেখা, কী উদ্দেশ্য তার, তার উদ্দীষ্টই বা কারা, লক্ষ্য কী, কেনো লেখকের এই অবিশ্রাম শ্রমে মেধায় লিখে চলা, সমাজ সভ্যতায় এর প্রয়োজনীয়তাটাই বা কী? মারিয়ো বার্গাস ইয়োসা বলেন, ‘লোকজন জানে একজন স্থপতির কী কাজ বা ডাক্তারের প্রয়োজনীয়তা কীসে, কিন্তু যখন একজন লেখকের প্রসঙ্গ আসে, তখন লোকজন দ্বিধায় পড়ে, নিশ্চিত করে বলতে পারে না।’ ইয়োসা শেষ অব্দি বলেন, ‘আমি নিজেও সন্দিহান।’ অন্যদিকে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর উপলব্ধি- ‘আমার বিশ্বাস লেখক সবসময়ই সমাজের সঙ্গে বিবাদ করছেন।’ মার্কেজ আরেকটু এগিয়ে এর সঙ্গে যুক্ত করেন- ‘একজন লেখক লেখেন তার পরিবেশের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বিরোধের অবসান খোঁজার একটি উপায় হিসেবে।’

লেখক কীভাবে লিখেন? সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এভাবে ভাবেন যে: ‘লেখক কোনো অভিজ্ঞতার ভিতরে থেকে লিখতে পারেন না। তিনি বেরিয়ে আসেন অভিজ্ঞতা থেকে। বা অভিজ্ঞতাই তাকে অভিজ্ঞতার বাইরে ঠেলে দেয়। তার মতে এই দেখা এবং লেখা বাইরে থেকে না হলে ফর্ম এবং বিষয় সেভাবে চেহারা নিতে পারে না।’

এই যে সৃজনপ্রতিভার লেখালেখি নিয়ে অবিরাম ভাবনা এবং নানা পরিক্রমণ, এই যে নিয়ত যুদ্ধ নিজের এবং চারপাশের সঙ্গে, যার বিনিময়ে অর্জন কেবল এক পরিতৃপ্তিহীন পথচলা, লেখকরা কেনো নিজেদের সঁপে দেন এই অস্থির জগতে? কী চান তারা? বিধাতা কেনো বক্ষে এই অপার বেদনা প্রোথিত করেন যে, লেখকের মুক্তি নেই বেদনাভার থেকে।

যিনি লিখেন তিনি জানেন, কেবল তিনিই জানেন এই মুক্তিহীন শৃঙ্খলিত বেদনা বহন করে চলার যন্ত্রণা কিংবা আনন্দ। যে যন্ত্রণা কিংবা আনন্দ তাকে লিখিয়ে চলে। আচ্ছা, কেবলই কী লিখে চলাতেই লেখকের যন্ত্রণার মুক্তি কিংবা আনন্দের চূড়ান্ত প্রকাশ? না। লেখকমাত্র সর্বদা চান তিনি যা লিখছেন, তা পাঠকের কাছে পৌঁছাক। গ্রহণযোগ্যতা কিংবা সমালোচনায় তা পঠিত হোক অধিকসংখ্যক পাঠক দ্বারা। এই পাঠকের কাছে পৌঁছানোর ইচ্ছাও তাকে ক্রমাগত লিখিয়ে চলে। এই যে ইচ্ছা, তা কেবলই তার নিজেকে প্রকাশের লোভ কিংবা খ্যাতির মোহ নয়। বরং নিজ অভিজ্ঞান এবং লেখক সত্তার দ্বান্দ্বিক বিকাশে তিনি যা লেখেন; তার মনের সুপ্ত প্রত্যাশা থাকে- তার প্রতিফলিত আকাঙ্ক্ষা রেখাপাত করুক পাঠকের মনে। যে বিক্ষুব্ধতা কিংবা সন্তুষ্টি তাকে লিখতে প্ররোচিত করেছে তাতে প্রভাবিত হোক পাঠকের অন্তর্জগত। পাঠকই লেখকের আরাধ্য। পাঠকের কাছেই লেখকের সকল দায়। আমাদের সমাজ ও জীবন বাস্তবতায় লেখা মোটেই নির্ভেজাল আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে থাকার উপায় নেই।


মাত্র শেষ হলো বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে গ্রন্থমেলা। এই মেলা দেশের সবচেয়ে বড় বই প্রকাশ ও বিক্রির মেলা। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগত এই মেলাকেন্দ্রিক। এদেশের প্রকাশনা জগত সম্পূর্ণ অপেশাদার ও সিজনাল ব্যবসার মতো বই প্রকাশকে অন্য দশটি ব্যবসার মতো কিংবা কখনো তার চেয়েও হেয় দৃষ্টিতে বিবেচনা করে। এবং মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া এই প্রকাশনা ব্যবসায়ীরা ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ দিন ছাড়া বাকি ১১ মাস বইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই রাখেন না। অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে পাণ্ডুলিপি গ্রহণ ও ছাপা প্রক্রিয়া শুরু হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় নেই কোনো পেশাদারিত্ব, সম্পাদনা, নির্বাচন কিংবা প্রচার। কয়েকটা বড় প্রকাশনী  ছাড়া অধিকাংশ প্রকাশনীর নিজস্ব কোনো বিক্রয়কেন্দ্র নেই। ঢাকার বাইরে মফস্বলে এখন লাইব্রেরি বলতে নোট ও গাইডের স্তূপ। কোনো সৃজনশীল মননশীল বই সেখানে নেই। ফলে সৃজনশীল ও মননশীল বই প্রকাশ মানে ফেব্রুয়ারির এই বাংলা একাডেমির বইমেলা। কিন্তু এই মেলা ঘিরে বেশিরভাগ প্রকাশকের অপেশাদার আচরণ, তীব্র ব্যবসায়ী কূটকৌশলের কারণে যে কেউ, যে কোনো কিছু লিখে এখন প্রকাশের ক্ষমতা রাখে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে বই প্রকাশ এখন ডালভাত এবং যে কারো পক্ষে লেখক হয়ে ওঠা অতি সহজ। প্রতিবছর মেলা কেন্দ্র করে কয়েক হাজার বই প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে পাঠকের পক্ষে তার রুচি অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত বইটি নির্বাচন করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ।

পাঠক কারা এবং কিসের পাঠক? যিনি কোর্টে মামলা লড়ার জন্য আইনের বই পড়েন তিনিও পাঠক, যিনি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার জন্য বিসিএস গাইড পড়েন তিনিও পাঠক। আমরা তবে কোন পাঠকের কথা বলছি এবং এই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক বইমেলার পাঠক বা ক্রেতা কারা? এই দুটি বিষয় স্পষ্ট না হলে আমাদের সকল আলোচনা বৃথা।

এজন্য  যেতে চাই প্রমথ চৌধুরীর কাছে। ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘যিনি যাই বলুন, সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, লোকে যে তা সন্দেহ করে তার কারণ এই শিক্ষার ফল হাতেহাতে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ তার কোনো নগদ বাজারদর নেই। এই কারণে ডেমোক্রেসি সাহিত্যের সার্থকতা বোঝে না, বোঝে শুধু অর্থের সার্থকতা। ডেমোক্রেসির গুরুরা চেয়েছিলেন সকলকে সমান করতে, কিন্তু তাদের শিষ্যরা তাদেরকে উল্টো বুঝে সকলেই হতে চায় বড় মানুষ। একটি বিশিষ্ট অভিজাত সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও ইংরেজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা গুণগুলো আয়ত্ব করতে না পেরে তার দোষগুলো আত্মসাৎ করেছি। এর কারণও স্পষ্ট, ব্যাধিই সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়।’ এবং এই ব্যাধি আজ আমাদের সমাজে নিরাময় অযোগ্য ক্যানসার হয়ে উঠেছে। আপাতত আমরা কুতর্কে এই ব্যাধির পক্ষে যতো যুক্তি দেখাই না কেন, এর ফল যে কতোটা ভয়াবহ তা আন্দাজ করতে পারছি না। কোর্টে মামলা লড়ার জন্য যে বই, বিসিএস-এ উত্তীর্ণ হবার জন্য যে বই, হতাশাগ্রস্ত সমাজকে অনুপ্রাণিত করার জন্য যে বই, আপনি পাড়ার মোড়ের বইয়ের দোকানে খোঁজ করুন পাবেন। নীলক্ষেতে ফুটপাতে খোঁজ করুন পাবেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারির বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। আমাদের সৃজনশীল সাহিত্যের মেলা। আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, মানিক, শরৎ, বিভূতিভূষণদের উত্তরাধিকার তৈরি হওয়ার মেলা। কিন্তু কী ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় আমরা দেখছি সেই মেলার বেস্ট সেলার- প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ বা চমক হাসানের গণিতের বই। আয়মান সাদিকের মোটিভেশনাল বই! কোথায় সাহিত্য?  সাদাত হোসাইন আর জাফর ইকবালের সৃজনশীল বই দুটি জায়গা করে নিয়েছে তালিকার নিচের দিকে। আমাদের আশঙ্কার জায়গাটি এই যে, কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আমাদের বৃহত্তর পাঠকের প্রবণতা! আনন্দ নয়, সাহিত্যের রসাস্বাদন নয়, আমাদের বৃহত্তর পাঠক রুচি পড়েছে লাভ আর লোভের চক্করে। ফলে যে মেলাটির বেস্ট সেলার হওয়ার কথা একটি কাব্যগ্রন্থের, একটি উপন্যাসের, একটি গবেষণা গ্রন্থের, সেই স্থান নিয়েছে মোটিভেশনাল বই, নাস্তিকদের যুক্তি খণ্ডনের ‘প্রয়োজনীয়’ একটি বই। এই তালিকা প্রকাশ করেছে অনলাইনে দেশের সবচেয়ে বড় বুক সেলার একটি প্রতিষ্ঠান। এই তালিকা নিয়ে আমি নিঃসন্দেহ যে, এটি মোটেই কোনো পক্ষপাতিত্বমূলক কিংবা উদ্দেশ্যমূলক তালিকা নয়। আমরা যারা সারাবছর বই কিনি, আমরা জানি এখন ঘরে বসে বই সংগ্রহের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ওই প্রতিষ্ঠানটি। যখন ফেব্রুয়ারি ফুরিয়ে যাবার পর আমরা আর জানি না কাঙ্ক্ষিত বইটি কোথায় পাবো, তখন প্রতিষ্ঠানটিই হয়ে ওঠে ভরসার জায়গা। এবং বলাবাহুল্য বই বিপণনে প্রতিষ্ঠানটি সুপরিকল্পিত পেশাদার মনোভাব বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে। তারা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। ফলে বই সাহিত্যের নাকি মোটিভেশনের- এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ডিজিটাল হিসাবনিকাশে তারা বেস্ট সেলারের তালিকা প্রকাশ করেছে। তো এই সৃষ্টিশীল প্রকাশনার মাসে, এই রফিক, শফিক, জব্বারের আত্মদানের মাসে, জাতীয়তাবোধের উন্মেষের মাসে, এই রবীন্দ্র-নজরুলের উত্তরাধিকারের দেশে প্রতিষ্ঠানটি যে বেস্ট সেলার তালিকাটি প্রকাশ করেছে, এতে আমরা কী বার্তা পাই? একে কী কেবল সাময়িক বা বছরের সিজনাল প্রবণতা কিংবা আমাদের সৃজনশীল লেখকদের সাদামাটা ঈর্ষা দ্বারা ব্যাখ্যা করলেই চলে?

আমরা জাতি হিসেবে বাঙালি পরিচয় দিতে যারা শ্লাঘা বোধ করি, আমরা বিশ্বের দরবারে কী পরিচয় নিয়ে দাঁড়াই? দাঁড়াই আমাদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ সাহিত্য এবং সংস্কৃতি নিয়ে। এই সাহিত্য কিন্তু কেবল মনগড়া কিছু ফিকশন নয়। যে সময়ে, যে কালে, যে সাহিত্য রচিত হয়, সেই সাহিত্য ধারণ করে সেকালের রুচি ও জীবনধারাকে। ফলে একটি জাতির সাহিত্য হয়ে ওঠে তার অতীত ঐতিহ্যের পরিচয় আর গবেষণার প্রতিনিধিত্বশীল আঁতুরঘর। আমাদের চর্যাপদ থেকে মঙ্গলকাব্য, মঙ্গলকাব্য থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সাক্ষ্য দেয়, জাতি হিসেবে কতো সমৃদ্ধ দর্শন আর জীবনবোধের উত্তরাধিকার বহন করি আমরা। বঙ্কিমচন্দ্র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, কিন্তু তার সেই পেশাগত পরিচয় অতিক্রম করে আমাদের কাছে লেখক সত্তাটাই আজ মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো আরো কতো ম্যাজিস্ট্রেট, ব্যারিস্টার আমাদের ছিলেন তাদের নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই। কিংবা আমাদের গর্বিত উত্তরাধিকার তারা বহন করেন না।


‘রকমারি’ ঘোষিত এই বেস্ট সেলার তালিকা নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্নতার কারণটি ঠিক কী? লেখক হিসেবে আমাদের নিরাপত্তাহীনতা? বই বিক্রি হচ্ছে না বলে হতাশা বা ঈর্ষা? তালিকার বইগুলোর পক্ষে কলমধারীরা এই কথাগুলো গলা ফাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন যে, লেখকরা সব হতাশায় নিমজ্জিত। কেউ এককাঠি বেড়ে বলছেন, এদেশে সাহিত্যের কোনো প্রয়োজনই নেই। কী ভয়ানক! আমি জানি না পৃথিবীর আর কোনো জাতির এমন মানসিক দৈন্য আছে কিনা যে বলতে পারে- ‘সাহিত্যের প্রয়োজন নেই’।

হ্যাঁ, সাহিত্যপ্রেমী হিসেবে আমাদের মূল সংকট এবং শঙ্কার জায়গাটি এই যে, মহান ভাষা আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার মুক্তিযুদ্ধের দেশে আমরা এমন প্রজন্ম সৃষ্টি করে চলেছি যারা লাভ ছাড়া অন্যকিছু দূরে থাকুক বইও কিনে না। তারা ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ কিনে নাস্তিকদের সঙ্গে যুক্তির লড়াই করার জন্য। তারা চমক হাসানের বই কেনে গণিত শেখার জন্য। তারা ‘ভাল্লাগে না’ কিনে নিজেদের হতাশা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। অর্থাৎ এই একটি বেস্ট সেলার তালিকা প্রতিনিধিত্ব করে পুরো জাতির মানসিক দৈন্যের। ক্রমাগত আত্মিক নিমজ্জনের। যে জাতি সাহিত্য পাঠের আনন্দ খুঁজে নিতে জানে না, যে জাতি বই বলতে বুঝে মোটিভেশনাল বই সে জাতির সন্তানেরা কেউ জঙ্গী হবে, ধর্ষক হবে, সফল আমলা হবে, ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার সব হবে। কিন্তু মানবিক মানুষ হবে না।

বিশ্বজুড়ে বেস্ট সেলার তালিকা প্রায় একইরকম।  হুজুগে কিছু বই, যার হয়তো দীর্ঘমেয়াদি আবেদন তেমন নেই। সেই অর্থে বেস্ট সেলারের তালিকা দেখে বইয়ের মান নির্ধারণ করা বোকামী। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বই কিংবা হাসান আজিজুল হকের বই কখনো বেস্ট সেলার হবে না। জীবনানন্দ সাহিত্য খ্যাতি পেয়েছেন মৃত্যুর পর। মার্কেজ, কামু, কাফকা, বোর্হেস কেউ বেস্ট সেলার ছিলেন না। এমনকি আমাদের রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পাওয়ার আগে পাঠক সেভাবে চিনতেনই না। এই বাংলাদেশে গত কয়েকবছর বেস্ট সেলারের তালিকায় ছিলো ক্রিকেটার সাকিবের বই, অভিনেত্রী কুসুম সিকদারের বই। আমাদের ছাত্রজীবনে আমরা দেখেছি ব্যাক পেজে তীব্র আবেদনময় ছবিসমৃদ্ধ তৎকালীন স্টার শমী কায়সার, বিপাশা হায়াতের বই শোভা পেত বইমেলার স্টলে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে তখনো এগুলোই বেস্ট সেলারই ছিলো। কাজেই এই বেস্ট সেলার খুব দুর্ভাবনার বিষয় নয়।

তবে কেন এই উদ্বিগ্নতা? এ কি বেস্ট সেলার হওয়ার জন্য লেখকদের আক্ষেপ, রকমারি’র তালিকাকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করার প্রয়াস? এসব যারা বলছেন, তারা অজ্ঞানী কিংবা বোধের এবং বুদ্ধির নিম্নস্তরে বাস করে নিজেদের খুব বুদ্ধিসম্পন্ন ভাবছেন। কেউ কেউ এরকম ব্যাখ্যা প্রদানকারীদের পিঠও চাপড়াচ্ছেন। ফলে অনেকেই লেখককুলকে সাংঘাতিক জব্দ করা গেছে ভেবে ভীষণ পুলকিত বোধ করছেন। লেখক নয়, কেবল সমাজের সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের উদ্বিগ্নতার জায়গাটি এখানেই। আমাদের সো-কল্ড শিক্ষিতরা লেখকদের জব্দ করার উপায় খোঁজেন! এই যে আমাদের একের পর এক সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, থিয়েটার দর্শক হারাচ্ছে, পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে পাল্লা দেয়া দূরে থাকুক, ধারেকাছে ঘেঁষবার মতো ইন্ডাস্ট্রি আমরা দাঁড় করাতে পারিনি। গত তিন দশকে বিশ্বমানের কোনো গান, চলচ্চিত্র, সাহিত্য আমরা তৈরি করতে পারিনি। কেনো আমরা সাহিত্যের পাঠক তৈরি করতে ব্যর্থ হলাম? কেনো আমাদের প্রজন্ম আত্মিক উন্নয়ন নয় বরং আর্থিক উন্নয়নকেই বড় বলে ভাবছে। এর দায় কী কেবল প্রজন্মের বা লেখকদের? কারণ তারা পাঠক আকৃষ্ট করতে পারছেন না! সাহিত্য মোটেই বিনোদন মাধ্যম নয় যে, এ দিয়ে পাঠক আকৃষ্ট করার ব্যাপার থাকবে। সবাই না হোক, কেউ না কেউ তো ভালো লিখছেন। উত্তম সাহিত্য সৃষ্টি করছেন। সেগুলো কি পাঠক জানছেন, খুঁজছেন বা পড়ছেন? সাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ব্যাপার। আমাদের প্রজন্মকে মানবিক বোধসম্পন্ন করে তোলার ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার এবং রাষ্ট্র? কেনো বিগত বছরগুলোতে প্রশ্ন ফাঁস আটকানো গেল না? কেনো ধর্ষিতা হয়ে নিথর পড়ে থাকে কন্যাশিশুর দেহ? কারণ যে প্রজন্ম নারীদের দেখলে চলতি বাসে আসন ছেড়ে দিতো, সেই প্রজন্ম নারীদের মডেস্ট করছে। এ এক অভিন্ন অবিচ্ছিন্ন শিকল। আমরা স্বীকার করি বা না করি, মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষের অভাব আমাদের এক উত্তুঙ্গ জাতি হিসেবে পরিণত করছে। যার একটি ছোট্ট প্রতিচ্ছবি রকমারি’র এই বেস্ট সেলার।


কারণগুলো অনুসন্ধানের পর আমাদের এ থেকে পরিত্রাণের উপায়গুলোতেও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। মার্কেজের কাছেই আবার ফিরে যাই। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক লেখকেরই একটা আদর্শিক নির্মাণ থাকে।’ অর্থাৎ যিনি সত্যিকারের লেখক তিনি তার আদর্শের নির্মাণের জায়গা থেকে লিখেন। এবং তা কখনোই পশ্চাৎপদ কোনো ধ্যান ধারণার অনুগামী হবে না। যদি হয়, তবে তা সাময়িক হিসেবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এ নিয়ে প্রকৃত লেখকদের দুশ্চিন্তার কিংবা অস্তিত্বের সংকটে ভোগার কিছু নেই। কারণ প্রকৃত লেখক লিখেন নিজের আনন্দে, যার সাথে যুক্ত হয় স্বসমাজ ও কালের প্রতি দায়বদ্ধতা। কারণ তিনি যা গ্রহণ করেন সমাজ থেকেই করেন, যা রেখে যান সমাজের কাছেই রেখে যান। নির্দিষ্ট পাঠকের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে কিংবা সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তিনি লিখেন না। এই লেখাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়ার কিছু দায় রয়েছে রাষ্ট্রের, সমাজের এবং সংকীর্ণভাবে বললে প্রকাশকেরও। আমাদের দেশে এক হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া বাকি সব লেখক অর্থনৈতিকভাবে দীন। কিন্তু কোনো প্রকাশক পাওয়া যাবে না এমন।   

লেখক তাদের সর্বোচ্চ ঘামে-শ্রমে-মেধায় নিজেকে উজাড় করে যে লেখাটি লেখেন, পাঠকের হাতে পৌঁছানোর জন্য তাকে নির্ভর করতে হয় প্রকাশকের উপর। এদেশের বেশিরভাগ প্রকাশক সাহিত্যপ্রেমী নয়, সাহিত্যসেবী নয়, সাহিত্যপাঠকও নয়। তারা সাহিত্য ব্যবসায়ী। লেখকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই ছাপানোর ইতিহাস বোধকরি একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। টাকাওয়ালারা যে কারণে যা ইচ্ছে তাই লিখে ছাপিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত লেখককে বসে থাকতে হয় প্রকাশকের করুণার আশায়। তিনি কবে বইটি প্রকাশ করবেন! টাকার বিনিময়ে ছাপানো বইটি মেলার প্রথম সপ্তাহে এলেও, প্রকৃত লেখকের বইটি হয়তো আসে শেষ সপ্তাহে। তারপর মেলা শেষে সেই বই কোথায় পাওয়া যাবে কেউ জানে না। বইটি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রকাশকের নেই কোনো প্রচার, রিভিউ। লেখককেই তার আরেকটি সৃজনের সময় ব্যয় করতে হয় নিজের বইটি প্রমোট করার জন্য। কখনো বন্ধুবান্ধব, কখনো মিডিয়া, সোশাল মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে।

তার ওপর রয়েছে লেখকদের নানামুখী সিণ্ডিকেটের দাপট। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আপনি লেখক যদি কোনো সিণ্ডিকেটের সদস্য না হন, তবে আপনার সাহিত্য কিংবা ঊনসাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে ভালো কিংবা মন্দ টুঁ শব্দ উচ্চারণ করাতে পারবেন না কাউকে দিয়ে। কখনো এই ভালো-মন্দ বলাও হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পুরস্কার প্রবণতা লক্ষ্য করুন, অপরিচিত কোনো সাহিত্যিকের ভালো সাহিত্যের খোঁজ নেয়ার নজির নেই। 

আমরা পাঠকরা কিছুকাল অনুসরণ করলেই জেনে যাই, কোন সাহিত্যপাতা ‘কাকে’ প্রমোট করবে; তা সাহিত্য হোক কিংবা না হোক! ফলে লেখকের লেখার গুণে নিজস্ব পাঠক তৈরি হওয়া এখন কেবল কঠিন ব্যাপারই নয় প্রায় অসম্ভব।

তাই রাষ্ট্রের এখনই ভাবা দরকার আমরা ‘বই’ বলতে ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ কিংবা ‘ভাল্লাগে না’ বুঝবো নাকি ‘খোয়াবনামা’, ‘ক্রীতদাসের হাসি’কে বুঝবো? যতো তাড়াতাড়ি এই সত্য জাতি-সমাজ-রাষ্ট্র উপলব্ধি করবে ততোই মঙ্গল। নইলে সামনে অপেক্ষা করছে অন্ধকার হাজার বছর।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ মার্চ ২০১৯/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton AC