ঢাকা, শনিবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৪, ১৯ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

রাজশাহীতে জঙ্গি তৎপরতা : সাঁড়াশি অভিযানে পুলিশ

তানজিমুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২১ ১১:৪২:২৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২১ ১২:০৪:২৬ পিএম
বাগমারায় গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ জেএমবি সদস্যকে আদালতে নেওয়া হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী : বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে আবারো সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে নিষিদ্ধঘোষিত তিন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। সংগঠনগুলো হলো জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ ও হিযবুত তাহরির।

ছদ্মবেশে এসব জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে তারা সুবিধা করতে পারছে না। গত দুই মাসে বৃহত্তর রাজশাহীর নাটোর, নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অন্তত অর্ধশতাধিক শীর্ষ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ ও হিযবুত তাহরিরের সক্রিয় সদস্য। এ ছাড়া গত ১ মার্চ গোয়েন্দা পুলিশের ওপর হামলাকারী নব্য জেএমবির উত্তরাঞ্চল শাখার সামরিক কমান্ডার আমিজুল ইসলাম ওরফে আলামিন ওরফে রনি (২৩) ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।

রাজশাহী অঞ্চলে কর্মরত গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এখন জিরো টলারেন্স নীতি পুলিশের। তাই অভিযানের কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তাড়া খেয়ে জঙ্গিরা এ অঞ্চলে আশ্রয়  নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। জঙ্গিদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই এ অঞ্চলে জঙ্গিরা আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ পাবে না।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলে নিষিদ্ধঘোষিত তিনটি জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা গত তিন মাস থেকে বেড়েছে। সাংগঠনিক তৎপরতার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসার পর শুরু হয় নজরদারি। এরপর চলে তথ্য সংগ্রহ। তথ্যে এ অঞ্চলে তিন জঙ্গি সংগঠনের  অন্তত দেড়শ সক্রিয় সদস্যের তৎপর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ মার্চ থেকে বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান।

ওই সূত্র আরো জানায়, গত ১ মার্চ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জেএমবির উত্তরাঞ্চলের সামরিক শাখার প্রধান আমিজুল ইসলাম নিহত হয়। তার বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌর এলাকার বুজরুক রাজারামপুর মহল্লায়।

এর আগের দিন রাতে নিজ বাড়ি থেকেই আমিজুলকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ওই সময় তাকে ধরতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দুই কনস্টেবল আবদুস সালাম ও ইসমাঈল হোসেন ছুরিকাহত হন।

পুলিশ জানায়, আমিজুল ছিল জেএমবির দুর্ধর্ষ  জঙ্গি। এর আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট থেকে জিহাদি বই ও লিফলেটসহ আনসার তালহা ওরফে মামুন (৩৬) নামের এক জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে রাজশাহী র‌্যাব-৫ সদস্যরা। তার বাড়ি জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি এলাকায়। ফেরি করে গেঞ্জি বিক্রেতা সেজে সে এ অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী রেল স্টেশনে গ্রেপ্তার হয় হরকাতুল জিহাদের দুই জঙ্গি। র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ মন্ডলের (৩৫) বাড়ি মাগুরা ও বুলবুল রহমান ওরফে বাবুর (২২) বাড়ি সাতক্ষীরায়। একইদিনে নওগাঁতে গ্রেপ্তার হয় জেএমবির আরেক জঙ্গি।

গত ১০ মার্চ বাগমারা থেকে জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন উপজেলার ভবানিগঞ্জ গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে রহিদুল ইসলাম (৪৩), উদপাড়া গ্রামের মৃত নাসির উদ্দিনের ছেলে লুৎফর রহমান (৩৮), চন্দ্রপুর গ্রামের আবুল হোসেন (৫৫), জাবেদ আলীর ছেলে আবদুল মান্নান (৩৫) ও মৃত সামির উদ্দিনের ছেলে আবদুস সাত্তার (৩৩)। এরপর তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

বাগমারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসিম উদ্দিন জানান, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাঁচ জঙ্গি পুলিশের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে অন্য চার জেএমবি সদস্য বাগমারায় আবার নতুন করে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। তারা জেএমবির পুরোনো সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এর মধ্যে তারা বেশকিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষমও হন। এরপর তারা চেষ্টা চালাচ্ছিলেন একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ার। এর মাধ্যমে তারা নাশকতার পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।

এদিকে বাগমারা থেকে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে জেএমবির এক সদস্য ও হিযবুত তাহরিরের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হলেন পুলিশের তালিকাভুক্ত জেএমবি সদস্য বাগমারার ঝিকড়া গ্রামের আবদুর রাজ্জাক এবং পবা উপজেলার নওহাটা এলাকার শরিফুল ইসলামের ছেলে হিযবুত তাহরিরের সক্রিয় সদস্য আরিফুল ইসলাম সদয় (২৮) ও গোলাম মোস্তফার ছেলে মানসুর রহমান (২৭)।

রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানান, ঝিকড়া গ্রাম থেকে জেএমবি সদস্য আবদুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তালিকায় ৪৮ নম্বরে তার নাম রয়েছে। রাজ্জাক কিছুদিন পর পর নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন। পরে গোয়েন্দা নজরদারি ছিল তার ওপর। সম্প্রতি সে বাড়ি ফিরে আসে। এরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ছাড়া হিযবুত তাহরিরের সদস্য আরিফুল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের ছাত্র ছিল। আর মানসুর রাজশাহী কলেজের ভূগোল বিভাগে পড়াশোনা করত। তারা দুই বন্ধু মিলেই হিযবুত তাহরিরের কার্যক্রম চালাচ্ছিল। আরিফুল ও মানসুরের বিরুদ্ধে ঢাকার পল্টন থানায় নাশকতার মামলা রয়েছে।

এর আগে ২০১৩ সালে তারা ঢাকায় আটক হয়েছিল। সম্প্রতি এলাকায় ফিরে তারা আবার এই নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে স্থানীয়দের সংগঠিত করছিল। এ ছাড়া সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, জঙ্গি তৎপরতার জন্য রাজশাহীর অরক্ষিত চরগুলো নজরদারির মধ্যে রয়েছে। মূলত পদ্মার বিস্তীর্ণ চর তাদের আস্তানা ও চলাচলের জন্য সহজ এলাকা। সম্প্রতি নিউ জেএমবি ভিন্ন আঙ্গিকে তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। কেউ কেউ ছদ্মবেশের আশ্রয় নিচ্ছে। সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মাসুদুর রহমান ভুইয়া বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছে। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, জঙ্গিরা প্রতিনিয়তই তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। শুধু কৌশলই নয়, তাদের অবস্থানও পাল্টে ফেলছে। দীর্ঘদিন এক জায়গায় বা জেলায় থাকছে না। ঘন ঘন এলাকা পরিবর্তন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করে তালিকাভুক্ত জঙ্গিদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন সময়ে যেসব জঙ্গি ধরা পড়েছে, তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে পলাতক জঙ্গিদের ধরা হচ্ছে। এ ছাড়া যারা ধরা পড়ছে, তাদের কাছ থেকে রাজশাহী অঞ্চলে তিন জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এসেছে। শীর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে। কাজেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার মতো শক্তি জঙ্গিদের আর নেই।’

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ৩১ মার্চ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রাজশাহীর বাগমারায় সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে জেএমবির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওই সময় তারা রাজশাহী অঞ্চলের অন্তত ২৪ নিরীহ ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করে।




রাইজিংবিডি/রাজশাহী/২১ মার্চ ২০১৭/তানজিমুল হক/রুহুল

Walton Laptop