ঢাকা, সোমবার, ৭ কার্তিক ১৪২৫, ২২ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

‘উপন্যাস স্মৃতিলোপের ওপর টুকে রাখা কথামালা’

মোজাফ্‌ফর হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০১-১২ ৫:০৩:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-২১ ৮:১৪:২৫ পিএম

জনপ্রিয় মার্কিন কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও কবি জয়েস ক্যারল ওটস ১৯৩৮ সালে নিউ ইয়র্ক শহরের লকপোর্টে জন্মগ্রহণ করেন। বিংশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সব্যসাচী আমেরিকান লেখক হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয়। একইসঙ্গে সাধারণ জনপ্রিয়তা যেমন অর্জন করেছেন তেমন সমালোচকীয় প্রসংশাও পেয়েছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৪০টি উপন্যাস, ৩৯টি ছোটগল্পের সংকলন, ১১টি উপন্যাসিকা, ১১টি কাব্যগ্রন্থ, ৯টি নাটক এবং বেশ কিছু প্রবন্ধ ও শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকান সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সব পুরস্কার অর্জন করেছেন। গত বিশ বছর ধরে টানা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সম্ভাব্য তালিকায় উঠে আসছে তাঁর নাম। বর্তমান সাক্ষাৎকারটি প্যারিস রিভিউ, টিন হাউস, লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস, সুইচব্যাক ও বিলিভারম্যাগে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার থেকে নির্বাচিত অংশের সমন্বয়

প্রশ্ন: বেড়ে ওঠার মুহূর্তে কোন বইগুলো আপনার প্রিয় ছিল?
জয়েস ক্যারল ওটস: আমার প্রিয় শিশুতোষ বই হলো অ্যালিস’স অ্যাডভেঞ্চার ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড এবং থ্রু দ্য লুকিং-গ্লাস। কিশোরী বয়সে আমি তথাকথিত বড়দের বই পড়তে শুরু করি। হেনরি ডেভিড থরু, এমিলি ব্রন্টি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, উইলিয়াম ফকনার এবং দস্তয়েভস্কি- এঁদের লেখার ভক্ত হয়ে যাই। এছাড়াও জুনিয়র হাইস্কুলে থাকতে কিছু কিছু রহস্য ও গোয়েন্দা গল্পও পড়েছি।

প্রশ্ন: আপনার উপন্যাসের অনেক চরিত্র ভীষণভাবেই বাস্তব। তারপরও আপনি এমন করে তাদের দাঁড় করান যে তারা দৃশ্য চরিত্রগুলো থেকে সরে যায়। আপনি কীভাবে উরসুলা, ম্যাট এবং ব্রিয়ার টুইনসয়ের (বিগ মাউথ অ্যান্ড আগলি গার্ল উপন্যাসের চরিত্র) মতো চরিত্র সৃষ্টি করলেন?
জয়েস ক্যারল ওটস: জীবন একইসঙ্গে বেদনা ও আনন্দের। ‘হালকা করো, জয়েস’- একজন প্রখ্যাত বর্ষীয়ান মার্কিন লেখক আমাকে একবার উপদেশ দিয়েছিলেন। এরপর আমি কিছুটা সরল ও রসিক হওয়ার চেষ্টা করেছি। ঘটনার চমকপ্রদ দিকটি তুলে ধরতে চেয়েছি।

প্রশ্ন: আমি নিশ্চিত অধিকাংশ পাঠক আপনার সৃষ্ট চরিত্রদের সঙ্গে একাত্ম বোধ করবেন। আপনি কিশোর-কিশোরীদের জন্য এত চমৎকারভাবে লেখেন কেমন করে?
জয়েস ক্যারল ওটস: বিগ মাউথ অ্যান্ড আগলি গার্ল উপন্যাসের অনেকগুলো বার্তার মধ্যে একটি হলো- বন্ধুরা খুব ভালো করে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারে। আমাদের উচিত খুব অল্প পরিচিত হলেও অন্যকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে যাওয়া।

প্রশ্ন: বিগ মাউথ অ্যান্ড আগলি গার্ল উপন্যাসটি হাস্যরসাত্মক হলেও ছুঁয়ে যাওয়ার মতো মর্মস্পর্শী এবং চিন্তা উদ্দীপক। আপনি এই সমন্বয়টা করলেন কীভাবে?
জয়েস ক্যারল ওটস: উপন্যাসটির আরো একটা বার্তা হলো, যখন অন্যের প্রভাব ক্ষতিকর বলে মনে হবে তখন সেটি এড়িয়ে যাওয়া। ম্যাট লোকজনের সামনে বন্ধুদের হাসানোর জন্যে মজার কাণ্ড করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যায়। সে তার বন্ধুদের মাঝে অনিরাপদ। সে জানে তার মুখটা বড়। কিন্তু তাতে তার কিছু করার নেই। অন্যদিকে উরসুলা নিজেকে কুৎসিত চেহারার মেয়ে হিসেবে ভাবে। এ কারণে সে নিজে নিজের জন্য একটা মুখোশ বানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু মুখোশের আড়ালে সে নিরাপত্তাহীন। যখন সে ম্যাটের প্রতি খুব আবেগঘন হয়ে ওঠে তখন সে নিজে থেকেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন: এটাই আপনার প্রথম কিশোর উপন্যাস। একটা গোটা উপন্যাস একজন কিশোরের বয়ানে উপস্থাপন করা কতটা শক্ত কাজ?
জয়েস ক্যারল ওটস: বয়স্করা নিজেদের জীবনের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে চান না। কিন্তু যুবকরা প্রতিনিয়ত ভুল করে শুধরে নেয়। যারা যত মেধাবী হয় তারা তত দ্রুত মানব চরিত্রের নানাদিক রপ্ত করে নেয়। প্রকৃতিগতভাবে, বা যেটাকে আমরা বলি সহযাতভাবে, আমরা আমাদের অস্তিত্ব ও বিকাশ সহায়ক আচরণগুলো রপ্ত করে নিই।

প্রশ্ন: তরুণ লেখকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
জয়েস ক্যারল ওটস: উঠতি লেখকদের উচিত হবে তাদের নিজেদের আগ্রহকে অনুসরণ করা। আশেপাশে দেখা, শোনা এবং যে মানুষগুলো নানাকারণে আলাদা মনে হবে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতাগুলো টুকে রাখা। আর অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পড়া ও নিয়মিত লেখা। বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখার মতো লেখালেখিও অনুশীলনের বিষয়। 

প্রশ্ন: আপনার বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে আপনি অতিরিক্ত লেখেন?
জয়েস ক্যারল ওটস: বেশি লেখা আপেক্ষিক বিষয়; এবং এটা পাত্তা দেওয়ার মতো বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- একজন লেখকের শক্তিশালী বই কতগুলো? এভাবেও ভাবা যেতে পারে, আমাদের লেখকদের অনেক বই লেখার দরকার যেন কয়েকটি বই টিকে যায়। যেমন ধরুন, একজন উঠতি কবিকে শতাধিক কবিতা লিখতে হয় নিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কবিতাটি খুঁজে পেতে। যদিও প্রতিটা বই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা নিয়ে আসে। লেখার সময়ও লেখকের মনে হয় এই বইটি লেখার জন্যই তার লেখকজন্ম হয়েছে। এরপর সময় যত পেরিয়ে যায় তত নির্মোহভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগ আসে। আমি সত্যিই জানি না আপনাকে এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলা উচিত? আমি সমালোচকদের জন্য সমবেদনা জানাতে পারি, তারা হয়ত মনে করে থাকেন, যদিও সেটি ঠিক না, আমার সর্বশেষ বইটির সমালোচনা করতে হলে তাদের আমার পেছনে লেখা সব বই পড়তে হবে। (অন্তত আমি মনে করি, এই কারণে তারা খুব বিরক্তিকর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন)। নিশ্চয় প্রতিটা বই স্বতন্ত্র এবং সেটি প্রথম লেখা হলো না দশম, না পনেরতম এটা কোনো বিবেচ্য বিষয় না।

প্রশ্ন: আপনি কী আপনার মালোচকদের পড়েন? আপনার বই আলোচনা বা আপনার ওপর লেখা গদ্য থেকে এ পর্যন্ত কোনো কিছু কি গ্রহণ করেছেন?
জয়েস ক্যারল ওটস: কখনো কখনো আমি বই-আলোচনা পড়ি। যে সকল বিশ্লেষণমূলক লেখা আমাকে পাঠানো হয়, সেগুলোও পড়া হয়। ওগুলো আগ্রহ-উদ্দীপক। খুব স্বাভাবিকভাবেই কেউ বই পড়েছেন এবং তার অনুভূতি প্রকাশ করছেন ভাবতে ভালো লাগে। যদিও বুঝতে পেরেছেন কিংবা প্রশংসা করেছেন এটা প্রত্যাশা করা যায় না। অধিকাংশ রিভিউ খুব অল্প সময় নিয়ে লেখা, নিশ্চিত করে কিছু বলা না। তাই এ ধরনের রিভিউ একজন লেখকের মনোযোগ দিয়ে পড়লে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয়, লেখার জন্য মানসিক স্থিরতা দরকার? নাকি আপনি চাইলেই যে কোনো অবস্থাতেই লিখতে বসতে পারেন?
জয়েস ক্যারল ওটস: মানসিক অবস্থাকে অবশ্যই অগ্রাহ্য করতে হবে। এক অর্থে লেখালেখিই আপনার মানসিক অবস্থা তৈরি করে দেবে। যদি শিল্প সত্যিই মানুষকে তুরীয় অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে; আমি বিশ্বাস করি পারে, তাহলে আমরা মনের কোন অবস্থার ভেতর দিয়ে শুরু করছি সেটা খুব একটা ধর্তব্যের বিষয় না। আমি নিজের ক্ষেত্রে এটি সত্য বলে প্রমাণ পেয়েছি। দেখা গেছে ক্লান্তি বা অবসাদের ভেতর জোর করে নিজেকে লিখতে বসিয়েছি, কিছুক্ষণের ভেতর মনটা হালকা হয়ে গেছে।

প্রশ্ন: আপনি যখন একটা উপন্যাস শেষ করেন, এরপর কী করেন? পরের প্রকল্প কি তৈরিই থাকে? নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটা কিছু চলে আসে?
জয়েস ক্যারল ওটস: যখন একটা উপন্যাস শেষ করি, সেটা সরিয়ে রাখি। ছোটগল্প লিখতে শুরু করি। কিছুটা সময় নিয়ে বড় কাজে হাত দিই। যখন এই উপন্যাসটি শেষ করি তখন আগের লেখাটি ফের ধরি, অনেকটা সম্পাদনা করি। তখন আবার পরের উপন্যাসটা টেবিলের ড্রয়ারে জাগ দেওয়া থাকে সম্পাদনার জন্যে। কখনো কখনো আবার দুটো উপন্যাস একসঙ্গে সম্পাদনা করি। লেখা, পুনঃপাঠ, লেখা, পুনঃপাঠ-এসবে আমার কখনো ক্লান্তি আসে না।   

প্রশ্ন: বলা হয়ে থাকে আপনি কখনো রাইটার্স ব্লকে ভোগেননি। আপনার কল্পনাশক্তি কীভাবে এতটা পেরে ওঠে?
জয়েস ক্যারল ওটস: ঠিক ঐ অর্থে ব্লকে না পড়লেও অনেক সময় লিখে যাওয়াটা কঠিন হয়ে উঠেছে। গল্পটা হয়ত আমাকে আকৃষ্ট করেছে, তাড়িত করেছে লিখতে কিন্তু কষ্ট হয়েছে যুৎসই ভাষা ও শৈলী খুঁজে পেতে। গল্প বানাতে আমার কখনোই সমস্যা হয়নি, সমস্যা হয়েছে গল্পবলার স্বর নির্মিতিতে।

প্রশ্ন: কোন বইটি স্বাভাবিকভাবে আপনার কাছে এসেছে বলে মনে হয়েছে?
জয়েস ক্যারল ওটস: স্বাভাবিকভাবে? কোনোটিই না। তবে হ্যাঁ, আপনি যদি মৌলিক কিছু করতে চান তবে উপন্যাস সবচেয়ে কঠিন ফর্ম।

প্রশ্ন: আপনি অনেক কিছু লেখেন। অনেক বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। এসব ভাবনা কি আপনাকে রাতে ঘুমাতে দেয়?
জয়েস ক্যারল ওটস: সত্যি বলতে আমি একসাথে একটি কাজই করি। অনেকগুলো বই একসঙ্গে লিখি না।

প্রশ্ন: ক্ষেতে-খামারে বেড়ে উঠেছেন আপনি। সেটা আমার লেখালেখির ওপর কতখানি প্রভাব ফেলেছে?
জয়েস ক্যারল ওটস: গ্রামে বাস করার সবচেয়ে সুবিধা হলো নৈঃশব্দের মাঝে বেড়ে ওঠা যায়। নিজের জন্য অনেক সময় পাওয়া যায়। যদিও শহর সবসময় চিত্তাকর্ষক ও বৈচিত্রপূর্ণ বিষয়আশয়ে ভরা, তবে গ্রামে আত্মপ্রশান্তির জন্য আরও নিবিঢ়ভাবে নিজেকে সময় দেওয়া যায়।

প্রশ্ন: আপনার বই পড়তে শুরু করেছেন এমন পাঠকের জন্য আপনি কোন বইটি পড়ার পরামর্শ দেবেন? এবং আপনি যা লিখেছেন তার যদি একটা সারৎসার বাতলে দিতে হয় কয়েক লাইনে, তাহলে সেটা কী হবে?
জয়েস ক্যারল ওটস: আমি বিভিন্ন ধরনের লেখা লিখেছি। কাজেই একজন পাঠক যদি দীর্ঘ উপন্যাস পড়তে চান, অথবা উপন্যাসিকা বা ছোটগল্পের সংকলন, তার উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করতে হবে। ব্লন্ডে উপন্যাসের কথা সবচেয়ে বেশি বলা হয়। এটি খুব দীর্ঘ উপন্যাস; উত্তরাধুনিক ধারার নিরীক্ষামূলক কাজ। জম্বি উপন্যাসিকা একজন সাইকো সিরিয়াল কিলারের জবানে লেখা। এটা সব পাঠকের জন্য না। মিসিং মম উপন্যাসটি অ-সাহিত্যিক ভাষায় লেখা, একেবারে প্রচলিত ভাষা। আমার মা পড়লে উপভোগ করতেন এমন একটি শৈলী কল্পনা করে লিখেছি। লাভলি, ডার্ক, ডিপ ছোটগল্পের সংকলনে ব্যক্তির নানামুখী সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প আছে। যদি পাঠকরা স্মৃতিকথা পড়তে পছন্দ করেন তাহলে এ উইডো’স স্টোরি যথার্থ হবে।

প্রশ্ন: স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনী লেখার জন্য কি উপন্যাস লেখার চেয়ে বেশি সাহসিকতার প্রয়োজন পড়ে?
জয়েস ক্যারল ওটস: আমি জানি না ‘সাহসিকতা’ লেখার কোনো উপকরণ কিনা- এটা যে কোনো শিল্পমাধ্যমের যে প্রণোদনা থাকে তা থেকে আলাদা করা মুশকিল। উৎসটা কল্পনাশক্তি থেকে আসে যেটা একত্রিত হয়ে গল্পে প্রকাশ পায় অথবা আখ্যানে। লেখক বা শিল্পী যে বক্তব্য তুলে ধরতে চান তার ভেতর কিছু অপরিহার্য ন্যয়নিষ্ঠতা থাকে। আমি সাহসী লেখক হওয়ার ব্যাপারে সচেতন নই। যদি কোনো গল্পে প্রয়োজন হয় খোলাখুলিভাবে কিছু বলার, তাহলে কোনো কোনো পাঠকের কাছে সেটা বোল্ড বলে মনে হতে পারে; যেখানে হয়ত লেখকের কাছে এটা তেমন কিছু না। [সম্ভবত এই কারণে আমিসহ অনেক লেখক তাঁদের লেখায় পাঠকের অতি উৎসাহ দেখে বিস্মিত হন, যেটা তাঁরা হয়ত ভাবেননি।]

প্রশ্ন: আপনি কীভাবে এক বই থেকে অন্য বই লেখায় চালিত হন, কোনো আবেগ কিংবা কোনো চরিত্র কি টেনে নিয়ে যায়?
জয়েস ক্যারল ওটস: উপন্যাসের মতো দীর্ঘ কাজে অনেকগুলো বিষয় একসাথে কাজ করে। এটা অনেকটা নদীর মতো যেখানে অনেকগুলো ছোটবড় স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে। আপনার একটি ধারণা আছে, এরপর আরেকটি চলে আসে, ফের আরেকটি। আমি সবসময় শুরু করি, যে চরিত্রগুলো আমি পছন্দ করি তাদের দিয়ে। আমি প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রগুলো নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। আমি ব্যক্তিক অনুষঙ্গ তুলে ধরতে আগ্রহী কিন্তু বৃহৎ পরিসরে তার একটা সামাজিক গুরুত্ব থাকতে হবে।

প্রশ্ন: স্মৃতি কীভাবে একটি বইয়ের নির্মিতি ও শিল্পকে প্রভাবিত করে?
জয়েস ক্যারল ওটস: উপন্যাস নির্মিত হয় এমনভাবে যেন এটা স্মৃতিলোপের ওপর টুকে রাখা কথামালা। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা ব্যক্তিগত জার্নাল রাখেন, যেটার একটা অংশ উপন্যাসের মতো। এরপর আমাদের এলির (দ্য ম্যান উইদাউট শ্যাডো উপন্যাসের চরিত্র) স্মৃতি এবং কল্পনাও আছে।  আমরা দেখি সে তার অতীত থেকে কি স্মরণ করছে। সে অতীত দ্বারা তাড়িত। আমাদের অনেকের ক্ষেত্রে সেটা ঘটে। মানুষের জীবনে কিছু প্রকৃতিগত ঘটনা আছে যা বারবার ঘটতে থাকে। এলি এমন একটি ঘটনা দ্বারা উৎপীড়নের শিকার যেটা ঘটেছে তার শিশুবয়সে, তখন তার বোঝার মতো অবস্থা ছিল না। সে তার শিল্পের ভেতর দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে।

প্রশ্ন: শিল্প এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে বোঝার ভেতর কি কোনো পার্থক্য আছে? আপনি মারগটকে (দ্য ম্যান উইদাউট শ্যাডো উপন্যাসের চরিত্র) নিয়ে লিখেছেন, ‘সে সবসময় এমন প্রশ্ন করে যার তৈরি কোনো উত্তর নেই। মারগট মনে করে বিজ্ঞানী হতে পারা মানে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে সেটি জানা।’ এটাও কি লেখকের এক ধরনের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে?
জয়েস ক্যারল ওটস: একজন বিজ্ঞানী সবসময় ঘটনার কার্যকারণ খোঁজেন। আপনি যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হতেন, আপনি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অন্যদের মিলিয়ে বিশ্লেষণাত্মকভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। বিজ্ঞানীরা সবসময় পূর্বসূত্র খুঁজতে থাকেন, যেখানে অধিকাংশ মানুষ খবরের কাগজ পড়া শেষ হলেই গুটিয়ে রাখে। ‘এই বিষয়ের কি কোন ধরনের পরিণতি হতে পারে?’ ‘এর কি কোনো অর্থ আছে?’ ‘ইতিহাসে কি এর কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত আছে?’-এই প্রশ্নগুলো বিজ্ঞানীরা উত্থাপন করবেন। এবং একজন উপন্যাসিকও একই প্রশ্ন তুলে ধরেন।

প্রশ্ন: মাসকয়েক আগে আমি রিচার্ড ফোর্ডের সাথে আপনার আলাপচারিতাটি পড়ি। যদিও আমি আপনার লেখা ছোটগল্পের বাইরে তেমন কিছু পড়িনি, তবুও আপনাকে সত্যকথনের লেখক বলে মনে হলো। আপনি কি সত্য বলাকে আপনার লেখালেখির উদ্দেশ্য হিসেবে দেখেন?
জয়েস ক্যারল ওটস: বটেই। আমার মনে হয় অধিকাংশ লেখক ও শিল্পী সত্যটাই বলছেন বিভিন্ন উপায়ে। সত্যকে আমি ভীষণ জটিল একটা বিষয় হিসেবে দেখি। একটা দৃশ্যত বা আপাত সত্য আছে, কিন্তু প্রকৃত লেখক বা শিল্পীর কাজ হলো সেই সত্যের আরও গভীরে প্রবেশ করে সত্যের যত তল আছে সবগুলো উপস্থাপন করা। মানুষের স্বভাব আমি মনে করি যথেষ্টই কুটিল ও জটিল।

প্রশ্ন: আপনি ‘রোসামন্ড স্মিথ’ ছদ্মনাম নিয়ে বেশ কিছু রহস্য-উপন্যাস লিখেছেন। আপনি যদি পুরুষ নামে লিখতেন বা পুরুষ হতেন তাহলে আপনার বইগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আলাদা হতো বলে কি আপনি মনে করেন?
জয়েস ক্যারল ওটস: নিশ্চয়। আমি মনে করি আমার যে উপন্যাসগুলো নারীবিষয়ে বা নারীকেন্দ্রিক নয়, সেগুলো যদি পুরুষ লেখকের নামে বাজারে আসতো তবে অন্যরকম গ্রহণযোগ্যতা পেত।

প্রশ্ন: আপনি দেখিয়েছেন আপনার লেখায় ভূদৃশ্য এবং নগরের দৃশ্যপট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কি মনে করেন, প্রত্যেকটা লেখকই কোনো না কোনোভাবে আঞ্চলিক?
জয়েস ক্যারল ওটস: সব লেখকই কোনো না কোনোভাবে আঞ্চলিক। ঔপন্যাসিক যেমন জেমস জয়েস, উইলিয়াম ফকনার, মার্ক টোয়েন, এমনকী হেমিংওয়েও (বিশেষ করে মিশিগানের গল্পগুলোতে ভূদৃশ্যের বিবরণ যেভাবে এসেছে); কবি যেমন ডিলান থমাস, ডব্লিউ বি ইয়েটস, রবার্ট ফ্রস্ট; ছোটগল্পকার যেমন ইউডোরা ওয়েলটি, ফ্রাংক ও’কনর, এডনা ও’ব্রেইন, ফ্লানারি ও’কনর- এঁদের কথা বলা যেতে পারে। কাউকে কোনো স্থান সম্পর্কে গভীরভাবে অনুভব করার জন্যে সেখানে জন্মাতেই হবে, এমন না। আমাদের কারো কারো কাছে গ্রামীণ ভূদৃশ্য বা শহরের দৃশ্যপট নিয়ে লিখতে বা পড়তে খুব ভালো লাগে।

প্রশ্ন: সৃজনশীল তরুণ লেখক প্রকল্পের শিক্ষক হিসেবে আপনি কি লেখালেখির কোনো ছাঁচে বিশ্বাস করেন?
জয়েস ক্যারল ওটস: আমরা টেক্সট-এর ওপর গুরুত্ব দেই সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এ করলে লেখা হবে, সে করলে ভালো লেখা সম্ভব- মোটা দাগে এ ধরনের কোনো কথা আমি বলি না। প্রিন্সটনে আমার কর্মশালায়, আমরা নিজেদের নিউইয়র্কারের মতো প্রথম সারির পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ভাবি- প্রতিদিনের আলোচ্য লেখাটি সম্পাদনার নানা দিক নিয়ে আলাপ করি। কর্মশালায় প্রাণবন্ত সময় কাটে। অংশগ্রহণকারী লেখকরা জানে সেখানে তাদের নিয়ে বা তাদের লেখা নিয়ে খুব হতাশাজনক কিছু বলা হবে না।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton